চলচ্চিত্র ভাবনা- হল বাঁচলেই এদশের সিনেমা বাঁচবে শৈবাল চৌধূরী

0
149

কয়েকদিন আগে ২০১৫ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান করা হলো। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য গণ্যমান্য জনেরা নানান আশ্বাস ও পরিকল্পনার কথা বললেন আমাদের চলচ্চিত্র শিল্পকে নিয়ে। বেশ জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হলো। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, যে দুটো ছবিকে যুগ্মভাবে শ্রেষ্ঠ ছবির পুরস্কার দেয়া হলো (অনিল বাগচির একদিন ও বাপজানের বায়োস্কোপ) এর কোনটিই সিনেমা হলে মুক্তি পায় নি। দেশের কয়েকটি শহরে বিকল্প পদ্ধতিতে প্রদর্শিত হয়েছে। হল মালিকেরা আগ্রহী হন নি ছবি দুটো দেখাতে এটাও যেমন সত্যি, তেমনি এটাও সত্যি যে দেশে এখন হলই তেমন নেই।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও তথ্যমন্ত্রী বলেছেন, দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের জন্যে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। ঢাকার সাভারে বঙ্গবন্ধু ফিল্ম সিটি নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের দিকে বলেও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যেখানে এফডিসি নামক দেশের চলচ্চিত্র নির্মাণের একমাত্র কারখানাটিই এখন প্রায় বিলুপ্ত- সেখানে ফিল্ম সিটি নির্মাণ করে কি হবে। ফিল্ম সিটিতে নির্মিত ছবিগুলো দেখানো হবে কোথায়? সরকারি অনুদানে নির্মিত ছবিগুলো সিনেমা হলে প্রদর্শিত না হওয়ার কারণে সাধারণ দর্শকের কাছে পৌঁছতেই পারে না। বিকল্প প্রদর্শন পদ্ধতি কোনো সমাধান হতে পারে না। এটা বিকল্প পদ্ধতি। ¯^াভাবিক বা সাধারণ পদ্ধতি নয়। এই পদ্ধতিতে প্রদর্শনের মাধ্যমে আপামর দর্শক সাধারণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। নির্দিষ্ট কিছু মুষ্টিমেয় দর্শক বিকল্প পদ্ধতিতে প্রদর্শিত ছবিগুলো দেখেন।
কোনভাবেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বাণিজ্যকে শিল্প বলা যায় না। ১৭ কোটি লোকের দেশে সিনেমা হল রয়েছে ২৭০টি। অর্থাৎ প্রতি ৭ লক্ষ ৪০ হাজার লোকের জন্যে একটি সিনেমা হল! সিনেমা হলের সংখ্যা খুব শীঘ্রই আরো কমবে। বেশ কিছু হল মালিক ইতোমধ্যেই হল বন্ধ করে দেয়ার কথা বলেছেন। স¤প্রতি একটি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, বাংলাদেশের অনেক শহরে একটিও সিনেমা হল নেই। এর মধ্যে রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শহর। যেমন: কক্সবাজার, রাঙামাটি, নরসিংদি, খাগড়াছড়ি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঝালকাঠি, নড়াইল, পঞ্চগড়, মুন্সিগঞ্জ, নেত্রকোনা, নাটোর। এগুলো প্রতিটি জেলা শহর। খোদ ঢাকা শহরে এখন ডজনখানেক হল চালু আছে। আর হলবিহীন মুন্সিগঞ্জ ও নরসিংদি বৃহত্তর ঢাকার দুটি জেলা শহর। গত ২০ বছরে সারাদেশে বন্ধ হয়েছে দুই তৃতীয়াংশ সিনেমা হল। গত ২০ বছরে দেশের কোথাও পূর্ণাঙ্গ কোনো সিনেমা হল নির্মিত হয় নি। এক সময়ে (১৯৯০-এর দশকে) এদেশে সিনেমা হল ছিল ১৪৩৫টি। মৌসুমী হল ছিল প্রায় শ’দুয়েক, যেগুলো ধানকাটার পর শীতের মৌসুমে চালু হতো। আজ এদেশে সিনেমা হলের সংখ্যা নেমে এসেছে ২৭০টিতে। হল মালিকেরা এর প্রধান কারণ হিসেবে বলছেন চলচ্চিত্রের অভাব। আর সত্যিই এটি প্রধান কারণ। আবার এটিও প্রধান কারণ, হল নেই বলে ছবিও নেই।
বেশ কয়েক বছর ধরে শুনে আসছি, সরকারি উদ্যোগে ৬৪ জেলা সদরে সিনেমা হল তৈরি হবে। সিনেপ্লেক্স তৈরি হবে বিভাগীয় সদরে। সরেজমিনে তদন্তও হয়েছে সরকার মনোনীত কমিটির। তারপর সে প্রকল্প ধামাচাপা পড়েছে ¯^াভাবিকভাবেই। ঢাকার রমনা শাহবাগ এলাকা এবং চট্টগ্রামের শহীদ মিনার, টিআইসি, মুসলিম হল এলাকা ঘিরে দুটি সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তোলার কথাও শুনেছিলাম। এদেশের যিনি সংস্কৃতি মন্ত্রী তিনি রীতিমত একজন অগ্রজ সংস্কৃতি কর্মী। অথচ তাঁর নেতৃত্বাধীন সময়েও কিছু হলো না। ঢাকার রমনা শাহবাগ এলাকা জুড়ে বিশাল যে সংস্কৃতি বলয় গড়ে তোলার কথা, সেটির নামকরণও করা হয়েছিল- ‘সোনার বাংলা সংস্কৃতি বলয়’। কত আশা, কত ¯^প্ন। তারপর কি গুড়ে বালি?
সা¤প্রতিককালে ভারতীয় একটি চলচ্চিত্র দুনিয়া জুড়ে বেশ আলোড়ন তুলেছে। ২০০০ কোটি রুপি মুনাফা করেছে এ ছবি। চলেছে হাজারের বেশি সিনেমা হলে শুধু ভারতে। এছাড়া চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশে ছবিটি চলেছে এবং ৩০০ কোটি ডলারের ব্যবসা করেছে। ছবিটি এস. এস. রাজামৌলি পরিচালিত ‘বাহুবলী-২’ প্রিয় পাঠক মুনাফার অংক এবং সিনেমা হলের অংক লক্ষ্য করুন। অর্থাৎ হাজার কোটি টাকা খরচ করে সিনেমা বানালেই কেবল হবে না, হাজার হাজার সিনেমা হলে সে ছবি চালাতেও হবে।
আমাদের দেশের চলচ্চিত্রের বাজার ভারতের মতো ¯^ভাবতই বিশাল নয়। তবে ১৭ কোটি (এতদিনে তা আরো বেড়েছে নিশ্চয়) মানুষের দেশের বাজারটিও নেহাত ছোট নয়। আনুপাতিক হারে এদেশে কমপক্ষে ৩০০০ সিনেমা হল থাকা উচিত। একটা সময় পর্যন্ত প্রায় ১৫০০ টি স্থায়ী সিনেমা হল ছিলও এখানে। তখন এদেশের সিনেমা বাণিজ্যিকভাবে ইন্ডাস্ট্রি ছিল। কোটি কোটি টাকার লগ্নী ছিল। লক্ষ লোকের রুটি রুজির বন্দোবস্ত ছিল। হাজার লোকের কর্মসংস্থান ছিল। পাশাপাশি ছিল মেধার সংস্পর্শ। প্রতি বছর দুয়েকটা শিল্প সম্মত ছবিও তৈরি হতো। সে অর্থে আর্টেরও একটা সংযোগ ছিল। ইন্ডাস্ট্রি ও আর্ট বাংলাতে দুটোই শিল্প। যে চলচ্চিত্র জগতে ইন্ডাস্ট্রি ও আর্ট এই দুই শিল্পই থাকে সে জগত টেকসই হয়।
প্রমাণ হাতের কাছেই- ভারতের চলচ্চিত্র জগৎ। বিশ্বের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র জগৎ, সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র বাজার। মূলধারার হাজার হাজার ছবি যেমন নির্মিত হয় অনেকগুলো ভাষায়, অনেকগুলো শহরে, তেমনি বেশ কিছু শিল্পসম্মত উৎকৃষ্ট মানের ছবিও তৈরি হয় বিভিন্ন ভাষায়। চলচ্চিত্র যেমন প্রধান একটি অর্থকরী ফসল ভারতের, তেমনি মানসম্ভ্রমের একটি মানদণ্ডও বটে।
এত কথার মূল বিষয় হলো বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে সত্যিই যদি বাঁচিয়ে রাখতে হয় তবে নতুন করে প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ জরুরি। তেমনি জরুরি এখনো টিকে থাকা প্রেক্ষাগৃহগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সহযোগী ভ‚মিকা পালন করতে পারে। চলচ্চিত্র নীতি প্রণয়নের কথা দেশবাসী শুনে আসছে কয়েক দশক ধরে। এক্ষুণি এটা জরুরি। দেশীয় চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি উন্নতমানের বিদেশি চলচ্চিত্র আমদানির এবং নির্ধারিতভাবে সেসব ছবি প্রদর্শনের অনুমতি দিতে হবে। তবেই হল বাঁচবে এবং হল তৈরি হবে। সাথে সাথে দর্শক হবে রুচি পরিবর্তিত হবে এবং দর্শক হলমুখী হবে। বিদেশি ছবি এখন মানুষ ঘরে বসেই নিয়মিত দেখে যাচ্ছে। তাহলে হলে দেখলে দোষের কী? এখন অনেকটা চুপিসারে কলকাতার বস্তাপচা তৃতীয় শ্রেণির বাংলা ছবিগুলো দেশে চলছে। সেখানে প্রকাশ্যে বিভিন্ন দেশের উন্নত মানের ছবি আমদানি করে প্রদর্শন করলে এদেশের চলচ্চিত্র ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাবে। যে দুয়েকটা ভালো ছবি তৈরি হচ্ছে সেগুলোও প্রদর্শিত হওয়ার সুযোগ পাবে। দেশের সামগ্রিক চলচ্চিত্র চর্চা চাঙা হয়ে উঠবে।
আর নাহলে মিথ্যে স্তোক বাক্য শুনিয়ে শুনিয়ে দিন পার করে দেশের চলচ্চিত্রকে নিঃশেষ করে দিয়ে কোন লাভ নেই। বড় পর্দায় সিনেমা দেখার যে যৎসামান্য সুযোগ এখনো রয়েছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই তা বিনষ্ট হবে। চলচ্চিত্র পরিবার ইত্যাদি গঠন করে, সভা সেমিনার মিছিল মিটিং, প্রতিবাদ, মারামারি, হাতাহাতি, বয়কট, পাল্টা বয়কট, ঘেরাও, হুমকি, পাল্টা হুমকি, মানববন্ধন এসব করে কোন সুরাহা হবে না। সবকিছু হাস্যকর হয়েই থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here