জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও ফসলহানির আশঙ্কা উত্তরাঞ্চলে জলাভ‚মি ও কৃষি জমি থেকে নির্বিচারে শামুক নিধন

0
657

ৃষি ডেস্ক
দেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক জলাভ‚মি চলনবিলসহ দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জলাভ‚মি ও কৃষি জমি থেকে নির্বিচারে চলছে শামুক নিধন। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষি জমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর। প্রতি বছর ব্যাপকহারে শামুক-ঝিনুক নিধন অব্যাহত থাকায় ইতিমধ্যে সোনালি শামুকসহ বেশ কয়েক প্রজাতির জলজ শামুক বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কৃষি জমি হারাচ্ছে তার উর্বরতা। পরিবেশ হারাচ্ছে ¯^াভাবিক ভারসাম্যতা। ফলে পরিবেশে দেখা দিচ্ছে ক্ষতিকর বিরুপ প্রভাব। জমির উৎপাদন সক্ষমতা কমছে।
শামুক ধরা বন্ধে আইন থাকলেও তা প্রয়োগ করা হচ্ছে না। অনুমতি ছাড়া বন্য প্রাণী শিকার, ওঠানো, উপড়ানো ও ধ্বংস বা সংগ্রহ করা যাবে না। এ ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় বা আমদানি-রফতানি করা যাবে না। এ নিয়ম না মানলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। আর এ অপরাধের জন্য এক বছরের কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। ২০১২ সালের ১০ জুলাই প্রকাশিত সরকারি প্রজ্ঞাপনে শামুককে বন্য প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। অথচ প্রকাশেই শামুক নিধন চলছে। সড়কের পাশে আড়ত খুলে একশ্রেণির মানুষ শামুক ক্রয় করে বিক্রির জন্য দেশের বিভিন্ন মোকামে পাঠাচ্ছে গাড়ি বোঝাই করে। বিলে নৌকা নিয়ে দলে দলে শামুক শিকারিরা শামুক সংগ্রহে নেমেছে। প্রশাসন দেখলেও কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে শামুক ধরা চলছেই।
প্রাণীবিদরা জানান, শামুক হচ্ছে প্রাকৃতিক ফিল্টার। শামুক-ঝিনুক পরিবেশের বিশেষ বন্ধু হিসেবে সুপরিচিত। শামুক-ঝিনুক মরে গিয়ে তার মাংস ও খোলাস পচে জমির মাটিতে প্রাকৃতিকভাবে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও পটাশ তৈরি করে। জমির উর্বরতা বৃদ্ধিসহ ধানগাছের শিকড় মজবুত ও ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে জীবিত শামুক-ঝিনুক বর্ষা মৌসুমে আমন ধানের ব্যাপক উপকারে আসে। যেমন-শামুক দূষিত পানি ফিল্টারিং করে প্রাকৃতিকভাবে পানি দূষণমুক্ত রাখে।
ধানের জমিতে শামুকের ডিম খেয়ে ইঁদুর তার খাদ্য চাহিদা মিটায়। এতে ইঁদুর ধান নষ্ট করা থেকে বিরত থাকে। প্রাকৃতিক ও দেশীয় মাছের প্রধান খাদ্য হচ্ছে শামুকের ডিম ও মাংস। বিশেষ করে কৈ, শিং, মাগুর, ট্যাংরা, টাকি, শোল মাছের ডিম থেকে সদ্যজাত পোনার একমাত্র খাদ্য হচ্ছে শামুকের নরম ডিম। আর এ খাবার না পেলে ওইসব মাছের পোনা মরে যায়। শামুকের অভাবে দেশীয় মাছের বংশ বিস্তারও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন দেশীয় মাছসহ নানা প্রজাতির জলজ প্রাণী। অন্যদিকে ম্যাচোফেলিয়া ও মাইক্রোফেলিয়া নামের দুই ধরনের কীট শামুক থেকে খাবার সংগ্রহ করে বেঁচে থাকে। ওই দু’টি কীট ধান গাছের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষি ক্ষেতের ব্যাপক উপকার করে থাকে।
কৃষকরা জানান, অধিকাংশ কৃষি জমি ও জলাভ‚মি বর্ষার মৌসুমে অর্থাৎ বৈশাখ মাসের শেষ দিক থেকে শুরু করে কার্তিক মাসের শেষ পর্যন্ত বর্ষার পানিতে ডুবে থাকে। এসব কৃষি জমি ও জলাভ‚মিতে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় অসংখ্য শামুক। শামুক নিরীহ জলজ প্রাণী হওয়ায় সহজেই একে কুড়িয়ে নেয়া যায়। এর খোলসের ভেতরের নরম অংশ চিংড়িসহ বিভিন্ন মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়। দক্ষিণাঞ্চলের চিংড়ি ঘের মালিকেরা শামুক সংগ্রহ করে থাকেন। দিনদিন শামুকের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এটি এখন এক ধরনের অর্থকরী পণ্যে পরিণত হয়ে গেছে। এ কারণে মূল্যবান এ পণ্যটি কেনা বেচায় জড়িয়ে পড়ছে স্থানীয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ। বর্ষা মৌসুমে দরিদ্র জনসাধারণ প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ মণ শামুক সংগ্রহ করে বর্ষাকালের কর্মহীন সময়ে অতিরিক্ত আয়ের পথ করে নিয়েছে। রোদের সময় শামুক পানির নিচের অংশে চলে যাওয়ায় শিকারিরা সকাল-বিকেলে শামুক কুড়ানোর কাজ করে।
চাটমোহর বোয়ালমারী, ধানকুনিয়া, গুরুদাসপুরের মসিন্দা এলাকার শামুক ফরিয়ারা জানান, তারা শিকারিদের কাছ থেকে শামুক কিনে খুলনা, বাগেরহাটসহ দেশের বিভিন্ন মোকাম চিংড়ি ও মাছের ঘের মালিকদের কাছে বিক্রি করছেন। আড়তদাররা জানান, এভাবে বর্ষার শুরুতে আষাঢ় মাস থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত চলবে শামুক কেনাবেচা। তারা জানান, শামুক আহরণকারীদের আড়তদাররা ও আড়তদারদের দাদন দিয়ে থাকে চিংড়িঘের ও মাছচাষিরা। কয়েকজন শামুক সংগ্রহকারী জানান, তারা এভাবে শামুক কুড়িয়ে প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। শিশু-কিশোরাও এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে শামুক সংগ্রহকারীরা ¯^ীকার করেন, আগে যেখানে দিনে এক নৌকা শামুক সংগ্রহ করা যেত। এখন সেখানে মাত্র ১০ থেকে ১৫ কেজি শামুক সংগ্রহ করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা জানান, তৈরি ফিস ফিডের তুলনায় মাছের বৃদ্ধিতে শামুক খাদ্য হিসাবে ভালো। মূল্যের দিক থেকেও শামুক অনেক সস্তা। শামুক ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী এখন প্রতিদিন চলনবিল অঞ্চল থেকেই গড়ে প্রায় ৫০০/৬০০ টন শামুক বিক্রি করা হচ্ছে। বিলের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৩০ থেকে ৩৫ ট্রাক শামুক খুলনা এলাকায় চালান হয়ে থাকে বলে তারা জানান।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নজরুল ইসলাম জানান, প্রতিটি প্রাণী কোনো না কোনোভাবে পরিবেশের উপকারী। শামুক ফসলি জমির ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ খেয়ে ফেলে। এ ছাড়া শামুকের খোলস জমির উর্বরতা শক্তি বাড়ায়। শামুক নিধনের ফলে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস ও ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এদিকে ভালো করে নজরদারী দরকার বলে তিনি মত দেন।
বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ রাজশাহী কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোল্যা রেজাউল করিম জানান, পৃথিবীতে প্রতিটি প্রাণী একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষাকাল শামুকের প্রজনন সময়। এই মৌসুমে শামুক ধরা হলে প্রজনন ব্যাহত হবে। শামুকখেকো অন্য প্রাণীরা খাদ্যসংকটে পড়ে মারা যাবে। ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। অল্প কিছু মানুষ বেশি লাভের আশায় শামুক ধ্বংস করছে। কিন্তু প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় শামুক রক্ষা করতে হবে। তাই আমরা শামুক ধরা বন্ধে পদক্ষেপ হাতে নিয়েছি। কোথাও শামুক ধরার খবর পেলে অভিযান চালানো হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here