হায়াতুন্নবীর আধ্যাত্মিক মোজেজা

0
35

হিজরী ৫৫৭ সালের এক রাত্রে বাগদাদের সুলতান নুরুদ্দীন জাকি (র:) তাহাজ্জুদ এবং অন্যান্য ইবাদতের পর ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, চারিদিকে নীরব নিস্তব্ধ এমন সময় তিনি ¯^প্নে দেখলেন রাসুল (স:) ¯^য়ং তাঁর কাছে উপস্তিত হয়ে দুইজন নীল চক্ষু বিশিষ্ট ইহুদী লোককে দেখিয়ে বললেন এরা আমাকে খুব বিরক্ত করছে। তুমি এদের থেকে আমাকে মুক্ত কর। এই ভয়াবহ ¯^প্ন দেখে সুলতান নুরুদ্দীন জাকী অত্যান্ত ভয় পেয়ে কিংবর্তব্য বিমুখ হয়ে পক্ষের মধ্যে পায়চারী করতে লাগলেন এবং বিভিন্ন চিন্তায় উদিগ্ন হয়ে পড়লেন। তিনি ভাবলেন আল্লাহ্র রাসুল তো এখন কবরের জীবনে রয়েছেন, তার সাথে অভিসপ্ত ইহুদীরা কি শত্রæতা করতে পারে? তাহারা রাসুল (স:) কে পরজগতে কিভাবে বিরুধীতা করবে তাহা হলে আমি কি ভুল কিছু দেখলাম? কিন্তু শয়তান তো আল্লাহর রাসুল (স:) রূপ ধারণ করতে পারে না। তাহলে কি আমি ¯^প্ন সত্য দেখেছি এই সব ভাবতে ভাবতে সুলতান অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি অজু গোসল শেরে দুরাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে ক্রন্দন রত মুনাজাত করলেন এবং তিনি আবার শয়ন করলেন এবং তন্দ্রাস্ত অবস্থায় পূর্বের ন্যায় ¯^প্ন দেখলেন আল্লাহর রাসুল (স:) আবার আগমন করে তাঁকে বলছেন নুরুদ্দীন মাহমুদ এই দুই জনের থেকে আমাকে মুক্ত কর এটা তোমার দায়িত্ব। তিনি বুঝতে সক্ষম হয়েছেন প্রিয় নবী (স:) রওজা মোবারক কোন বিপদের সম্মুখিন হয়েছে। তিনি সারা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে সকালে ফজর নামাজ অন্তে ক্রন্দন রত অবস্থায় আল্লাহ্ পাকের দরবারে আবার দীর্ঘ মোনাজাত করে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। তিনি তাহার প্রধানমন্ত্রী জালালউদ্দিন মৌসুরির নিকট গোপনীয়তা রক্ষার প্রতিশ্রæতি নিয়ে গত রাত্রের ¯^প্নের বিস্তারিত বর্ণনা করলেন এবং এই মুহূর্তে কি করা যায় সুচিন্তিত পরামর্শ চাইলেন। জালালউদ্দিন মৌসুরী সুচিন্তিত পরামর্শ দিলেন যে আমার বিশ্বাস হুজুরের রওজা পাক কোন বিপদের হুমকির মধ্যে পড়েছে এবং অতি সত্তর মদীনা অভিমুখে অভিজানের ব্যবস্থা নেওয়া একান্ত প্রয়োজন বোধ হইতেছে। সুলতান নুরুদ্দিন জাকী (র:) ষোল হাজার আরোহী সেনা দল এবং বিপুল রসদ পত্র এবং যুদ্ধ সামানা নিয়ে বাগদাদ থেকে মদিনা অভিমুখে রওনা হলেন। রাত-দিন সফরে সতের দিনে মদিনায় পৌছালেন এবং সেনা বাহিনী সহ অজু গোসল সেরে দুরাকাত নামাজ আদায় করে আবারও আল্লাহ্র সাহায্য চেয়ে দীর্ঘ মোনাজাত করলেন এবং মদিনার চর্তুদিক সেনাবাহিনীর দ্বারা গেরাও করে ফেললেন এবং এলান করে দিলেন মদিনার কোনলোক মদিনা ছেড়ে বাইরে যেতে পারবে না কিন্তু বাইরের লোক ভিতরে আসতে পারবে। এবং জুমার দিন খোৎবা অন্তে ঘোষণা দিলেন মদিনার সব লোককে এক বেলা দাওয়াতের আমন্ত্রণ জানালেন এবং কোনলোক যেন এই দাওয়াত হতে বঞ্চিত না হয়। শাহী দাওয়াতে সবাইকে তৃপ্তি পরিমাণে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো যারা মদিনার দুর দুরান্তে ছিল তাহাদেরও বিভিন্ন বাহনে করে এনে দাওয়াতে শরীক করানো হলো। সুলতান ঘোষণা করলেন আর কোন লোক দাওয়াতে আসতে বাকি আছে নাকি কিছু জানতে পারলেন আর কেহ দাওয়াতে অংশগ্রহণ করতে বাকি নাই। এই কথা শুনে সুলতান সীমাহীন অস্থির হয়ে পড়লেন, কিন্তু কি করবেন ঠিক করতে পারতেছিলেন না সেই দুইজন নীল চক্ষু বিশিষ্ট লোককে তো পাওয়া গেল না। চিন্তার মধ্যে নিমগ্ন হয়ে পড়লেন, কেননা সব লোককেই গভীরভাবে দেখা হয়েছে কাহারো চেহারাই তো ¯^প্নের লোকের সাথে মিল খুজে পাওয়া গেল না। ভয়ানক চিন্তাযুক্ত হয়ে আবার ও তিনি ঘোষণা দিলেন আমার বিশ্বাস মদিনাবাসী সকলে দাওয়াতে শরীক হতে আসেনাই, আবারও ঘোষণা দিলেন যারা বাকি আছে তারা যেন অবিলম্বে দাওয়াতে শরীক হয়, না হলে তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। লক্ষাদিক জনতা হইতে এক ব্যক্তি বলে উঠলো হুজুর আমার জানা মতে দুইজন লোক এখনো বাকি আছে তারা খুব আল্লা ওয়ালা লোক জীবনে কাহারো কাছ হইতে হাদীয়া তোফা গ্রহণ করে না এমন কি কারো দাওয়াতে ও শরীক হন না, অধিক দান খয়রাত করেন লোক সমাজে উপস্থিত হন না, সারাদিন ইবাদতে মশগুল থাকেন, কেহ তাহাদের নিকট হইতে খালি হাতে ফিরে আসেন না তাদের দানের উপর প্রচুর লোকের জীবিকা নির্ভর করে, সারাদিন নফল নামাজ কোরআন পাক তেলওয়াত এবং জিকিরে মশগুল থাকেন। নুরুদ্দীন জাকি (র:) তাদের ডেকে আনলেন, এতো সেই দুইজন যাদের হুজুরে পাক ¯^প্নে দেখিয়েছেন, তিনি প্রশ্ন করলেন তোমরা দাওয়াতে শরীক হইলানা কেন, সুলতানের সারা শরীর আতঙ্কে কাপতে লাগলো। লোক দুইটি বললো আমরা মুসাফির হজ্জের উদ্দেশ্যে এসে মদিনা জিয়ারতে এসে প্রিয় নবী (স:) প্রেমে আত্মহারা হয়ে বাকি জীবন এখানে কাটিয়ে দিব বলে রয়ে গেছি আমরা শুধু এবাদত বন্দিগির মাঝে বাকী জীবন এখানে কাটিয়ে দিবার ইচ্ছা পোষণ করছি, আমরা কোন জনসমাবেশ কিংবা কোন দাওয়াতে অংশগ্রহণ হইতে বিরত থাকি। নামাজ, কোরআন পাক তেলওয়াত এবং অজীফা পাঠের মধ্যে আমাদের সময় চলে যায় দাওয়াত খাওয়ার সময় আমাদের কোথায়? উপস্থিত জনগণ তাদের পক্ষে বললো হুজুর এরা অত্যান্ত ভাল লোক সারাদিন এবাদত বন্দিগি এবং লোককে দান খয়রাত করে, তাই আমরা এদের অত্যান্ত পছন্দ করি। হযরত নূরুদ্দীন জাকী (র:) লোকদের কথার দিকে ভ্রƒক্ষেপ না করে ঐ দুইজন লোককে মাথা হইতে পা পর্যন্ত অত্যান্ত গভীর ভাবে দেখলেন, এবং তিনি সুনিশ্চিত বলেন যে এরা তারাই যাদের হুজুর পাক (স:) ¯^প্নে দেখিয়েছেন। সুলতান তাদেরকে অত্যান্ত রাগšি^ত হয়ে বললো তোমরা কারা কেনই বা এখানে এসেছো? তারা পূর্বকার ন্যায় একই কথা বললো। সুলতান তাদের আবাসস্থল তল্লাসী চালিয়ে পেলেন অনেক ইসলামি গ্রন্থ এবং অনেক ব্যবহায্য তৈজষপত্র, এমন কিছু পেলেন না যাতে করে ¯^প্নের নিশ্চিত প্রমাণ অবলোকন করতে সক্ষম হন। অত্যাদিক প্যারেসান এবং অস্থির, কি করবেন বুঝতে পারছেন না। এই দিকে উপস্থিত লোক সকল তাদের সুনামের বর্ণনা মসজিদে নব্বীতে মসজিদে কুবাসহ ইসলামের পবিত্র জায়গায় তাহারা গমন করে এবাদত বন্দিগি করেন এই সব সুখ্যাতি উপস্থিত সকলে বলতে লাগলো, সুলতান তাদের আবাসস্থল আবারও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন কিন্তু সন্দেহ জনক কিছুই পাইলেন না। এক পর্যায়ে তিনি তাহাদের আদেশ দিলেন আচ্ছা তোমাদের নামাজের মসল্লাটা একটু উঠাও দেখি তারা সুলতানের নির্দ্দেশে নামাজের মসল্লা সরালে সেখানে দেখা গেল একটা চাটাই সুলতান উক্ত চাটাই ও সরাতে বললেন, চাটাই সরালে সেখানে দেখা গেল একটা বিশাল পাথর, সুলতানের নির্দ্দেশে উক্ত পাথরটিও সরানো হলো, এবার পাওয়া গেল এমন একটি সুড়ঙ্গ যাহা পবিত্র রওজা মোবারকের সন্নিকটে পৌছে গেছে, দৃশ্য অবলোকন করার পর সুলতান নুরুদ্দীন জাকী (র:) অস্থির হয়ে কাঁপতে থাকলেন, লাল হয়ে যায় গোটা মুখমন্ডল, তৎপর বর্জকণ্ঠে বললেন, বল তোমাদের আসল পরিচয় কি? কারা তোমাদের এখানে পাঠিয়েছে। কি উদ্দেশ্যেই বা এখানে রওজা পাকের দিকে সুড়ঙ্গ করে প্রায় রওজা পাক পর্যন্ত পৌছে গিয়েছে। সুলতানের কথায় তাহারা ভয় পেয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললো ইহুদীরা আমাদিগকে প্রচুর পরিমাণে ধন সম্পদ দিয়ে এখানে পাঠিয়েছে যেন আমরা যদি কোনভাবে হযরত মোহাম্মদ (স:) সব দেহ উদ্ধার করে ইউরোপিয়দের হস্তান্তর করতে পারলে তারা আমাদের আরো বিপুল পরিমাণে অর্থ সম্পদ উপটোকন হিসাবে দিবে। সুলতান বললেন তোমরা কি পদ্ধতি অবলম্বন করেছ এই দুরহ কাজের জন্য, তারা বললো আমাদের মুল কাজ হলো রাত গভীর হলে এই সুড়ঙ্গ খনন করা এবং অতি সান্তপর্নে মাটিগুলো মদিনার বাইরে ফেলে আসা, দীর্ঘ তিন বছর আমরা এই মহা পরিকল্পনার কাজে ব্যস্ত আছি। যে সময় আমরা রওজা মোবারকের কাছে উপনীত হলাম আমাদের অনুভূত হলো সারা পৃথিবীর আসমান জমীন সব থর থর করে কাঁপছে তাই আমরা ঘাবড়ে যেয়ে ভয়ে চিন্তাš^ীত আছি। যেন সমগ্র পৃথিবীটা প্রলয় সংগঠিত হতে যাচ্ছে এই আস্থা পরিলক্ষিত হয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে আমরা কাজ বন্ধ করে রেখেছি। তাদের কথায় সুলতান অত্যান্ত রেগে গেলেন এবং এইরূপ কাজ যেন কেউ করতে না পারে তাদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। এবং অনেক উচ্চ একটি মঞ্চ তৈরী করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং মদিনা ও মদিনার আশেপাশের সবাইকে উক্ত স্থানে হাজীর হতে নির্দ্দেশ দিলেন, সুলতান সেই লোক দুইটির হীন চক্রান্তের শাস্তি দিবার পূর্বে সমগ্র সমবেত জনগণকে বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করলেন, সুলতানের সত্য উৎগাটন দেখে লোকজন বিস্ময়ে হতভাগ হয়ে গেল, তারা এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবী করলেন, তিনি ঐ দুই ইহুদীকে অগ্নি কুন্ডলী জালিয়ে সেখানে পুড়িয়ে মারলেন, কোন কোন বর্ণনায় আছে সে আগুন নাকি দীর্ঘ ১১দিন পর্যন্ত জ্বলছিল। তৎপর তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করে এক হাজার মন শীশা গলিয়ে রওজা শরীফের চতুর্পাশ্বে অনেক মোটা প্রাচীর নির্মাণ করে দেন, যেন ভবিষ্যতে আর কেউ এই রূপ ঘৃণ্য চক্রান্ত না করতে পারে। তারপর তিনি কায়মন বাক্যে আল্লাহ্ পাকের নিকট শুকর আদায় করলেন, এবং তাকে যে এতবড় খেদমতের জন্য কবুল করা হলো সেই জন্য সপ্তাহ কাল ব্যাপি মদিনা মনোয়ারায় অবস্থান করে আনন্দ অশ্রæ বিশর্জন করলেন, এবং ইতিহাসের পাতা থেকে অবগত হওয়া যায় সুলতান নুরুদ্দীন জাকী (র:) ইন্তেকালের পর তার অছিয়ত অনুযায়ী তাকে রওজা পাকের কাছাকাছি সমাধিস্থ করা হয়।
মোহাম্মদ মীর লিয়াকত আলী চিশতী
তাসাউফ এবং এলমেলাদুন্নি গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here