ঢাকায় জলাবদ্ধতা নিরসন করা যাচ্ছে না কেন?

0
323

নাজিম উদদীন, বিশেষ প্রতিবেদক
নিম্নচাপের প্রভাবে টানা দুদিনের অবিরাম বৃষ্টির ফলে ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ও কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় পানি জমে ছিল দীর্ঘক্ষণ। এছাড়া ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর সড়ক, মতিঝিল, মিরপুর, বাড্ডা ও রামপুরাসহ প্রায় সব এলাকাতেই কোথাও হাটুপানি, কোথাও কোমরপানি দেখা গেছে। শুক্র ও শনিবারের বৃষ্টিতে কয়েকটি এলাকার রাস্তায় নৌাকা এমনকি ভেলা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। এই যে ঢাকার জলাবদ্ধতা ক্রমে বেড়েই চলেছে। কিন্তু এটি নিরসন করা যাচ্ছে না কেন? সমস্যা কোথায়?
বিগত বছরগুলোতে রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতার চিত্র পর্যবেক্ষণে লক্ষ করা যায়, ঘণ্টায় মাত্র ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই শহরের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা তলিয়ে যায়। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা প্রায় দেড় কোটি মানুষের বসবাসের মহানগরী ঢাকায় খালগুলো ভরাট করে পরিকল্পনাহীনভাবে বাড়িঘর, রাস্তাঘাটসহ নানা নগর অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। ছোটবড় নালা-নর্দমা ময়লা-আবর্জনায় পরিপূর্ণ থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর নিম্নাঞ্চল পানিতে ডুবে যায়।
রাজধানী ঢাকায় প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ওয়াসার ড্রেনেজ নেটওয়ার্কের বাইরে। এক সময় ঢাকা নগরীর ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৪টি নদী ও ৬৫টি খাল মহানগরীর পানি নিষ্কাশনে বড় ভ‚মিকা ছিল। কিন্তু রাজধানীর নদী, নালা-খালসহ সব প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট ও অবৈধ দখলদারের হাতে চলে যাওয়ায় আজ তা অস্তিত্বহীন। ধীরে ধীরে সেখানে গড়ে উঠেছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন। বিলুপ্তপ্রায় এসব খালের সঙ্গে আজ আর নদীর কোনো সংযোগ নেই। ফলে বৃষ্টির পানি ও বিপুল পরিমাণ তরল বর্জ্য অপসারিত হতে না পেরে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করে। ২০০১ সালে ঢাকা মহানগরীর জলাবদ্ধতা রোধে ওয়াসা ভ‚গর্ভস্থ পাইপলাইনে বক্স কালভার্ট নির্মাণ, খাল উন্নয়ন ও পানি নিষ্কাশনের জন্য ২০৩ কোটি ৯৩ লাখ টাকার ৭ বছর মেয়াদি প্রকল্প গ্রহণ করে। এর আওতায় বিভিন্ন সময়ে যেসব বক্স কালভার্ট নির্মিত হয় তার অনেকটাই ছিল অপরিকল্পিত। এরপরে গৃহীত পদক্ষেপগুলোও রাজধানীর জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে তেমন কোনো সুফল বয়ে আনেনি।
১৯৯২ সালে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে ‘ইনটিগ্রেটেড ফ্লাড প্রোটেকশন’ প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় মহানগরীর জলাবদ্ধতারোধে তেমন কোনো সাফল্য আসেনি। রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতার স্থায়ী নিরসনকল্পে এ প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়নসহ আরো ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন।
রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত ডিডিসি এবং ওয়াসার কাজের সমম্বয় সাধন করা এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নগরীর হারিয়ে যাওয়া খাল-নদীগুলোকে দখলমুক্ত করে যথাযথ সংস্কার করে আগামীতে খাল-নদীসহ কোনো জলাধার যাতে দখল বা ভরাট হতে না পারে তার দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। এখনো ঢাকা মহানগরীতে হাতিরঝিলের মতো যে সব জলাধার আছে সেগুলোকে সযতেœ রক্ষা করে আরো জলাধার সৃষ্টি করার বিকল্প নেই। এছাড়া বর্ষা মৌসুমের আগেই ভরাট হয়ে যাওয়া খাল-নদী খনন, খালের তলদেশে জমাকৃত বর্জ্য এবং স্পয়েল আর্থ অপসারণ করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখতে পারলে তা আগামীতে রাজধানীর জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে ভ‚মিকা রাখতে সক্ষম হবে। ঢাকার মতো একটি রাজধানী শহরে এ ধরনের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে ব্যর্থ হলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সকল পরিকল্পনা, আইনকানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তথাকথিত উন্নয়ন ও গৃহায়ন সমস্যা নিরসনের নামে নির্বিচারে গ্রাস করা হচ্ছে জলাভ‚মি খাল-বিল ও নদী-নালা। জলাভ‚মি ভরাটের এই মহোৎসব রোধ করা ঢাকার কোন নগর পিতার একার পক্ষে সম্ভব নয়। রাজউক এক্ষেত্রে সক্রিয় ভ‚মিকা রাখতে পারে যদি এই প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিদের সততা, দেশপ্রেম সর্বোপরি কাজের ক্ষেত্রে ¯^াধীনতা থাকে। ¯^াধীনতার বিষয়টি এজন্য আসছে কারণ আমাদের সমাজে অতি ক্ষমতাবানদের কাছে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনেক সময়েই অসহায়। তবে সরকার তথা সরকারের কর্ণধার ব্যক্তিরা কোনভাবেই দায় এড়াতে পারবেন না। কারণ দেশের প্রচলিত আইনকানুন, মহাপরিকল্পনা ইত্যাদির প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব। আইন প্রয়োগে কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী গাফিলতি করলে বা বাধা দিলে তা কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের একান্ত কর্তব্য।
জলাবদ্ধতার কারণে সরকারি বা ব্যক্তিপর্যায়ে যে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে তা কি কোনভাবেই জলাভ‚মি ভরাট করে নগরায়নকে সমর্থন করে? তাহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেন রক্ষা করতে পারছে না খাল আর জলাধার। এখানেই প্রশ্নবিদ্ধ হয় আমাদের আইন ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগে সদিচ্ছা। সভা সেমিনারে সহজেই দায়ী করা যায় কিছু ব্যক্তিকে। অবশ্যই জলাবদ্ধতায় নাকাল নগরবাসীর কাছে তাঁদের দায়বদ্ধতা আছে। তবে নগরবাসী বুঝতে পারে সমস্যার মূল, শাখা-প্রশাখা অনেক গভীরে। যতদিন পর্যন্ত নগরায়নে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রাধান্য পাবে, কতিপয় গোষ্ঠীর অর্থলিপ্সার কাছে উপেক্ষিত হবে মানুষ, সামাজিক মূল্যবোধ ও পরিবেশ; ততদিন প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে আমরা বার বার বিপর্যস্ত হব।
ঢাকার জলাবদ্ধতার আরেকটি অন্যতম কারণ বক্স কালভার্ট করে প্রাকৃতিক খাল ধ্বংস আর এই সব বক্স কালভার্ট এখন ময়লা আবর্জনায় পূর্ণ। ঢাকার মতো শহরে এই ধরনের বক্স কালভার্ট নিয়মিত পরিচ্ছন্ন রাখা যে প্রায় অসম্ভব তা অদূরদর্শী নীতিনির্ধারকরা বোঝেননি কিংবা বুঝতে চাননি। এখনও ঢাকার পূর্বাঞ্চলে বক্স কালভার্ট করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। এখন থেকে প্রায় তিন দশক আগে ঢাকার জন্য প্রস্তাবিত ফ্লাড এ্যাকশন প্ল্যানে ঢাকার সবগুলো খাল খননের মাধ্যমে জল নিষ্কাশনের উপযোগী করার কথা বলা হয়েছিল। খালগুলোকে যুক্ত করার কথা ছিল নির্ধারিত জলাধারের সঙ্গে। উন্নয়নের নামে, রাস্তা তৈরির অজুহাতে খাল বন্ধ করেছি। ব্যক্তি বা সমষ্টিগতভাবে খাল দখল করেছি, ময়লা আবর্জনায় ভরেছি।
ঢাকা শহরের প্রায় ৪৩% বর্জ্য সংগৃহীত হয় না। যার এক উল্লেখযোগ্য অংশ জলাভ‚মি, খাল ও নদীতে জমা হয়। নালাগুলো দিয়ে ময়লা আবর্জনার কারণে পানি নিষ্কাশিত হতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে নালার মুখই আবর্জনায় বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের দুই নগরপিতা বর্জ্য নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখতে পারেন, যা পক্ষান্তরে জলাবদ্ধতা নিরসনে সহায়তা করবে এবং সার্বিকভাবে নগরীর পরিবেশ উন্নত করবে। সর্বোপরি নগরায়নের সঙ্গে সঙ্গে আমরা উন্মুক্ত মাটি ক্রমশ হারাতে থাকি। বিশেষত ঢাকায় উদ্যান বা খোলা জায়গা ক্রমাš^য়ে কমে যাচ্ছে। যা জলাবদ্ধতা তথা নগরীর পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি। এছাড়া বাড়িঘর তৈরির সময় চারদিকে যে খোলা জায়গা রাখার আইন আছে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জলাবদ্ধতার সমস্যা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। তাই রাতারাতি নিরসন করাও যাবে না। তবে ¯^ল্প ও দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ এখনই হাতে নেয়া দরকার। যেমন : ১. হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী অনতিবিলম্বে ঢাকার নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ২. উবঃধরষবফ অৎবধ চষধহ (২০১১)-এ উল্লেখিত সকল জলাধার, প্লাবনভ‚মি এবং খালের সীমানা ভ‚মিতে পিলারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা দরকার। ৩. ২০৩৫ সাল পর্যন্ত যে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, ওই পরিকল্পনায় ঢাকার প্লাবনভ‚মি, জলাধার এবং খালগুলো সংরক্ষণের যথার্থ নির্দেশনা ও পরিকল্পনা থাকতে হবে। ৪. বক্স কালভার্ট তৈরির প্রকল্প আর করা যাবে না। ৫) যুগোপযোগী ও পরিবেশবান্ধব ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন ৬. আবর্জনায় বন্ধ হয়ে যাওয়া নালাগুলো সংস্কার করা। ৭. সুষ্ঠু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য অনতিবিলম্বে কাজ শুরু করা। ৮. সংসদ সদস্য এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলরগণ তাঁর এলাকার জলাভ‚মি রক্ষার দায়িত্বে থাকবেন। এক্ষেত্রে সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর কাছে তারা দায়বদ্ধ থাকবেন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্লানিং বিভাগ শিক্ষক ড. সারওয়ার জাহান বলেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে অপরিকল্পিত উন্নয়ন হচেছ। একই সাথে প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেম অর্থাৎ খাল বিল পুকুড় যা ছিলো তা ভরাট হয়ে গেছে। পানি তো যেতে হবে কিন্তু সে সুযোগ তৈরি করতে হবে। প্রাকৃতিক সিস্টেম যেহেতু ধ্বংস হয়ে গেছে তাই কৃত্রিম সুযোগ তৈরি করতে হবে পানি যাওয়ার। সিটি কর্পোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড একসাথে কাজ করতে হবে পানি নষ্কাশনের জন্য কিন্তু তাদের মধ্যে কোন সমš^য় নেই। পুরো শহর ভেঙ্গে নতুন কিছু করা যাবেনা তাই ড্রেনেজ সিস্টেম যাতে কাজ করে তা দেখার পাশাপাশি নতুন ড্রেনেজ সিস্টেম মাটির উপরে ও নীচে বাড়িয়ে সেটির ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।’’
ঢাকার জলাবদ্ধতার মতো জটিল সমস্যার সমাধানে কার্যকরী গবেষণার মাধ্যমে হওয়া একান্ত প্রয়োজন। জলাবদ্ধতা নিরসনে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। কিন্তু আশানুরূপ ফল কেন পাওয়া যাচ্ছে না তা দেখা দরকার। জলাবদ্ধতা নিরসনে বিস্তৃত ও সর্বাঙ্গিন পরিকল্পনা প্রয়োজন যেখানে জলাবদ্ধতার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ওয়াসা, রাজউক, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সমšি^ত উদ্যোগে কাজ করতে হবে এবং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অবশ্যয়ই বলিষ্ঠ সমš^য়কের প্রয়োজন রয়েছে। সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছাই হবে জলাবদ্ধাতা নিরসনের ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তি। [সূত্র বিবিসি বাংলা]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here