বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক গবেষণা কতটা হচ্ছে?

0
280

বাংলাদেশে অনুমোদিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৪২ টি আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৯৫টি। মোট ১৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক রয়েছেন কয়েক হাজার। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পাঠদান, জ্ঞান চর্চা এবং নতুন জ্ঞানের আবিষ্কার এই তিনটা বিষয়কে বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু পাঠদান, জ্ঞান চর্চা হলেও নতুন জ্ঞানের আবিষ্কার বা মৌলিক গবেষণা বা মৌলিক গবেষণার সংস্কৃতি দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে ওঠছে।
দেশের সবচেয়ে প্রাচীন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৫টি গবেষণাকেন্দ্রের মধ্যে ২৮-৩০টিতেই কয়েক শিক্ষাবর্ষ ধরে মৌলিক কোনো গবেষণা কার্যক্রম নেই। এর মধ্যে কিছু গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মৌলিক কোনো গবেষণা হয়নি। গবেষণায় পথ হারিয়েছে প্রাচীন উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়।
যদিও শিক্ষাবিদরা বলছেন, গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, বিকাশ ও বিতরণই হলো উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। আর বিষয়ানুগ গবেষণার ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ থেকে দূরে সরে যাওয়ায় লক্ষ্যচ্যুত হচ্ছে উচ্চশিক্ষা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে দেশের মোট ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটিই গবেষণার পেছনে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি। কোনো গবেষণা প্রকল্প পরিচালিত হয়নি, এমন বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ১১টি।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার দুরবস্থার কথা ¯^ীকার করেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, একসময় মৌলিক গবেষণায় নেতৃত্ব দিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। গবেষণায় অবদানের জন্য আন্তর্জাতিক ¯^ীকৃতিও মিলেছে পুরনো কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের। সে ঐতিহ্য ভুলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সবাই এখন ডিগ্রি অর্জন ও প্রদানেই ব্যস্ত। গবেষণার দিকে কারো নজর নেই। বর্তমানে শিক্ষকরা বেশির ভাগ সময় পাঠদানে ব্যস্ত থাকেন। অবসরে গবেষণা করার কথা থাকলেও অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছেন তারা।
গবেষণার অতীত ঐতিহ্য হারিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বিবরণী (২০১৪-১৫) অনুযায়ী, ওই শিক্ষাবর্ষে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের প্রায় ৯১ শতাংশ শিক্ষকের কোনো ধরনের গবেষণা, প্রবন্ধ বা প্রকাশনা ছিল না। একইভাবে কোনো ধরনের গবেষণাকাজে ছিলেন না আইন অনুষদের ৯৫, কলা অনুষদের ৭৫ ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ৯০ শতাংশ শিক্ষক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে ৪৫টির মতো। এর মধ্যে কিছু কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠার পর থেকে কখনই কোনো মৌলিক গবেষণা হয়নি। অথচ গবেষণাকাজে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ থাকে। এর বেশির ভাগই খরচ হয় সভা-সেমিনারে।
বিষয়টি অনেকটাই অ¯^ীকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান বলেন, ‘‘বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় কিন্তু দুর্ভাগ্য হল সেগুলোর প্রচারণা কম। প্রত্যেকটি একাডেমিক কাউন্সিলে আমরা প্রচুর মৌলিক গবেষণা কাজের প্রতিবেদন পাই। তবে বড় একটা ঘাটতি হল বাজেট। সরকারিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য বড় অংকের বাজেট নেই।’’
শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য মৌলিক গবেষণা থাকা বাধ্যতামূলক। এই বাধ্যবাধকতা থেকে বেশিরভাগ শিক্ষক গবেষণা করেন। তবে সেই গবেষণা কতটা মৌলিক বা মান সম্মত হচ্ছে কিনা সেটার নির্ধারণ করছে কে বা কারা?
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের তত্ত¡াবধান করে থাকে। গবেষণা বিভাগের সদস্য ড. দিল আফরোজা বেগম জানান, ‘‘গবেষণার প্রস্তাব ইউজিসির কাছে পাঠাতে হবে। তবে তারো আগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি ধাপ পার হয়ে আসতে হয়।’’
তিনি আরও জানান, ‘‘একটি গবেষণা কাজের মধ্যে কোথাও থেকে কপি করা হয়েছে কি না সেটা প্রথমে সুপারভাইজার, এরপর ডিফেন্স কমিটি, তারপর বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কাউন্সিল দেখবে। এদের কাছ থেকে গবেষণার বিষয় অনুমোদিত হওয়ার পর আমাদের কাছে আসে। যদি কোন মৌলিক গবেষণা নিয়ে অভিযোগ উঠে সেটা ইউজিসির কাছে রিপোর্ট না করা পর্যন্ত আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি না।’’
যদিও এই প্রক্রিয়ায় সূ² একটা ফাঁক থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়র শিক্ষক নিয়োগ,পদোন্নতি নিয়ে একটি গবেষণা করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলছিলেন, পদোন্নতির জন্য গবেষণা বাধ্যতামূলক হলেও তাদের গবেষণায় যে তথ্য তারা পেয়েছেন সেটা হতাশাজনক। দেখা গেছে মৌলিক কোন গবেষণা না থাকার পরেও রাজনৈতিক যোগসাজশ,দলীয়করণ এসবের মাধ্যমে পদোন্নতি হচ্ছে। যার ফলে সত্যিকার মৌলিক গবেষণা এখন প্রাধান্য পায় না।’’
শিক্ষক এবং গবেষকরা বলছেন ২০ বা ৩০ বছর আগে যে মৌলিক গবেষণার সংস্কৃতি বাংলাদেশর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছিল সেটা এখন প্রায় বিলুপ্ত হচ্ছে।
মৌলিক গবেষণার ঘাটতিতে সার্বিক শিক্ষাক্ষেত্রে কী প্রভাব ফেলছে?
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড.ইফতেখারুজ্জামান বলছিলেন, ‘‘মৌলিক গবেষণার সংস্কৃতি আস্তে আস্তে লোপ পাচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুনগত যে মান সেটার ¯^ল্প মেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব হতাশাজনক, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অশনিসংকেত। এই অর্থে যে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের যে ¯^প্ন সেটা ধূলিসাৎ হয়ে হতে পারে যদি বিশ্ববিদ্যালয় গুলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টির ভাণ্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে। আমরা সেদিকেই ধাবিত হচ্ছি।’’
যেখানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাজেটের ¯^ল্পতা একটা বড় কারণ হিসেবে দেখছে, সেখানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোন বাজেট পায় না সরকার থেকে। ইউজিসি বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বলছে চলতি অর্থবছরে ২০১৭-১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ৪ কোটি টাকা।
সরকারি, বেসরকারি অনেক বিশ^বিদ্যালয়েই গবেষণার জন্য বাজেট নেই। যেসব বিদ্যালয়ে আছে সেখানেও অপ্রতুল। যদিও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের বার্ষিক বাজেটের একটি উল্লেøখযোগ্য অংশ গবেষণার কাজে ব্যয় করার কথা। কিন্তু উচ্চশিার এ প্রতিষ্ঠানগুলো এ বাধ্যবাধকতা মানছে না। তাদের বাধ্য করা যাচ্ছে না আইনে অর্থ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বল নির্দেশনার কারণে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, গবেষণা খাতে কোনো বরাদ্দ নেই বা গবেষণা করেনি যাদের কোনো প্রকাশনা নেই সেগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় মানা যায় না। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় মানে হচ্ছে জ্ঞান সৃষ্টি করা। সেখানে গবেষণা না করে জ্ঞান সৃষ্টি সম্ভব নয়। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যথেষ্ট টাকা থাকার পরও গবেষণায় ব্যয় না করা দুঃখজনক।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য কেন এত কম বরাদ্দ?
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলছিলেন, ‘‘আমাদের যে পরিমাণ অর্থ থাকা উচিত সেটা নেই। এবং ৪ কোটি টাকা মোটেই যথেষ্ট নয়। এ কারণে অন্যান্য খাত থেকে কমিয়ে আমরা এই খাতে দেয়। যে মৌলিক গবেষণা হচ্ছে সেটাতে আমরা সন্তুষ্ট নয়। তবে আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। ২০৩০ সালে পর্যন্ত আমরা স্ট্রাটেজি প্ল্যান নিয়েছি, যেখানে আরো অর্থ বরাদ্দ হবে। যার উদ্দেশ্য হবে জ্ঞান চর্চা এবং নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি।’’
ইউজিসি বলছে মৌলিক গবেষণা কম হওয়ার পেছনে আরো দুইটি কারণ রয়েছে। একটি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব। আবার অর্থ যোগার করে সেসব যন্ত্র কিনতে পারলেও সেগুলো চালনা বা মেইনটেনেন্স এর জন্য দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালগুলোতে বিজ্ঞান বিষয়ে অধিকাংশ বিভাগের নিজ¯^ গবেষণাগার থাকলেও পূর্ণাঙ্গ গবেষণার জন্য নেই পর্যাপ্ত সরঞ্জাম। চাহিদার ২৫-৩০ শতাংশ সরঞ্জাম আছে গবেষণাগারগুলোয়। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না গবেষকরা। বিশেষ করে বিজ্ঞান গবেষণাগারগুলোয় পর্যাপ্ত সরঞ্জাম নেই। অপ্রতুল বরাদ্দে গবেষণা সরঞ্জাম কিনতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ গবেষণাবান্ধব নয়। গবেষণায় তেমন কোনো প্রণোদনা নেই। এখনকার শিক্ষার্থীরাও গবেষণা করতে চান না। পদোন্নতি বা নিয়োগের ক্ষেত্রেও গবেষণার মূল্যায়ন হয় না। এসব কারণে গবেষণায় উৎসাহ হারাচ্ছেন গবেষকরা। উচ্চশিক্ষার জন্য এটা অশনিসংকেত।
[সূত্র বিবিসি বাংলা]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here