অন্ধ জাতি- প্রবীর পাল

0
37

গল্প
অন্ধ জাতি
প্রবীর পাল

বাবুলের পায়ের নীচে হঠাৎ করে শুকনো পাতা মর্মর করে উঠলে সে চমকায় না। জড়ো করে রাখা শুকনো পাতার স্তুপ তার পথ চলায় বাধা দিলে সে একটু থামে, রিক্সা বা গাড়ির গতিপথ অনুমান করে, তারপর রাস্তার একদম পাশ ঘেসে না হেঁেট একটু মাঝের দিকে এসে হাঁটতে থাকে। একটি তীব্র চিৎকার আশঙ্কা করেছিল, পাতাওয়ালীর। এখানে রাস্তা খানিকটা বড়, কোন একটি সরকারি কলোনী এটি। যার দু’পাশে অনেকগুলি দালান আছে। অনুমান করা যায়, পাতাওয়ালী আশপাশে নেই। নতুবা গালাগালির বৃষ্টি হয়ে যেতো বাবুলের উপর। তাড়াহুড়া করে পাতার স্তুপ থেকে নামতে গিয়ে কিছু পাতা সে হয়তো ছড়িয়ে দিয়েছে রাস্তাজুড়ে। চটপট স্থান ত্যাগ করা দরকার। বাবুল দ্রুত পা ফেলতে গেলে ছোটখাট একটি গর্তে পা পড়ে, প্রায় মচকে যেতে যেতে কোনমতে সামলে বিড়বিড় করে দিনের শুরুটা নিয়ে নিজেকেই গালাগাল করে। আজ সে লাঠি নিয়ে বের হয়নি, ফলে পথ চলতে তার সময় লাগছে বেশি। ভ্রƒ কুচকে আছে আরো বেশি। সামনের বাতাস ধরে ধরে এগুনো বা কোন শব্দের উৎস বুঝে আশপাশের প্রতিবন্ধক অনুমান করে তাল সামলে চলা বাবুলের জন্য মোটেও কঠিন নয়। কিন্তু কাকের ডাক আর মুরগীর ডাক পাশাপাশি শুনে সে একটু থেমে যায়, কাক মাটিতে নামল নাকি কোন ছোটগাছে মুরগী উঠেছে?
তার গতি আরো মন্থর হয়, যদিও এই চলতি রাস্তা ঘেঁষে কোন ছোট গাছ থাকার কথা নয়। একাকী চলতে চলতে নিজের সাথে কথা বলতে অভ্যস্ত বাবুল এগিয়ে যেতেই ছোট একটি গাছের সাথে মৃদু ধাক্কা খায়। গাছটি উচ্চতায় তার চেয়ে ছোট। কাক উড়ে যায়, মুরগী লাফিয়ে নামে। পাতা ও চিকন ডাল হাতড়ে হাতড়ে পরীক্ষা করে সে খানিক, হ্যাঁ আমগাছের চারা। কোন সন্দেহ নেই। মালিকবিহীন অযতেœ বেড়ে উঠছে। পাতার স্তুপে পা লাগায় ভাবনাটা মাথায় এসেছিল, শুকনো পাতার স্তুপে একটু ভারী ভারী কাঁচা পাতা কেন? জ্বালাবে নাকি?
বাবুলের মাথার ভিতর একটি মানচিত্র আছে। নিখুঁত ভাবে পুরো শহর চষে ফেলতে পারে সে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর কোন এলাকায় গেলে একটু সমস্যার পড়ে যায়, দ্রুত পাল্টাচ্ছে শহর। বিভিন্ন অবকাঠামো প্রতিদিনই বদলে যাচ্ছে। এখানে ঠোকর ওখানে ধাক্কা খেতে খেতে তার মানচিত্রও বদলাতে থাকে। মনে মনে মাথার ভিতর রাখা মানচিত্রটির বিভিন্ন দিক সে পরিবর্তন করে নেয়, প্রয়োজনীয় ফুটনোট দিয়ে দেয়।
তার গন্তব্য নিয়ে সে পরিষ্কার। কিন্তু এ এলাকায় সে কখনো আসেনি বলেই মনে হতে থাকে তার। চেনা শহরের ভিতর যেন অজানা পরিবেশ। সাধারণ নিঃশব্দ সময়টা যেন থমথমে। গাছ আর মুরগীর ডাক, পাশে ইটভাঙার বিরানহীন শব্দ, একটু এগিয়ে গেলে সিমেন্টের সাথে কংকর মেশানোর শব্দ, অর্থাৎ আশপাশে বিল্ডিং উঠছে। বাবুল জানে তাকে একটি রেললাইন পার হতে হবে। রেললাইনের পাশে আরেকটি বিশাল আবাসিক কলোনী। এ কলোনী সে আগেও পার হয়েছে। কিন্তু রেললাইনের খবর না পাওয়ায় সে একটু চিন্তিত হয়, রাস্তা ভুল হলো না তো? তা তো হবার কথা নয়? এমনতো হয়নি কখনোÑ
কাউকে জিজ্ঞাসা করবে কিনা একবার ভাবে বাবুল। ভাবনাটা মুহূর্তেই বাদ দেয়। তার ধারণা রাস্তা তার ভুল হচ্ছে না। দ্বিতীয় কারণ, লোকের অবজ্ঞার পাত্র হতে চায় না সে।
আ – ন – ধা –
একটি ডাক ভেসে আসে। বাবুলের বিশেষ ভাবান্তর হয় না। সে শব্দটি পরিষ্কারভাবেই শুনেছে। আসছে তার পেছনের ডানপাশ থেকে। অনুমান, দশবারো হাত দূর থেকে। এক ঢিলে কুত্তার বাচ্চার নাক ফাটিয়ে দেয়া যাবে। বাবুল এগুতে থাকে।
আ – ন – ধা –
শব্দটি এবার আরো কাছ থেকে এল। কচিকণ্ঠের ডাকই বলা যায়। বাবুল অনুমান করে, বেয়াদবটার বয়স কতো হবে? দশ এগারো হতে পারে।
টিটকারীতে অভ্যস্ত বাবুল এরূপ অপ্রীতিকর সত্য সম্ভাষণ গায়ে মাখে না। এমনিতে রাস্তা নির্বাচন ভুল হয়েছে বলে তার প্রথম থেকেই একটা চাপা অস্বস্তি মাথাজুড়ে কাজ করছিল। আর সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে প্রথম কার গলা পেলো ইত্যাদি ব্যাপারগুলিও সে মানে। বাবুল মেনে নিয়েছে তার আজ দিনটা ভাল যাবে না। বিশেষ কিছু গায়ে না মেখে ধীরগতিতে এগুতে থাকে।
ওই শালার আন্ধা। কলা খাবি?
এবার বাবুল চমকে যায়। এটা অন্য গলা। আরো কচি।
সে আফসোস করতে থাকে কেন লাঠিটা ফেলে এল। শুধুমাত্র খেয়ালের বশেই আজ সে লাঠি ছাড়া বের হয়েছে। লাঠি ছাড়া হাঁটতে তার যে বিশেষ অসুবিধা হচ্ছে তা নয় কিন্তু কিছু পথের বেজম্মার এই উৎপাত থেকে বাঁচতে লাঠিটা মাঝে মাঝে ভাল কাজ দেয়।
এসব ক্ষেত্রে যা করে সে নির্বিকার থাকা। কোন ভাবান্তর প্রকাশ না করা। আজও সে তাই করল। যেন কথাগুলি সে শুনতেই পায়নি। অনেকক্ষেত্রে এ পদ্ধতিটি অপরপক্ষকে নিরস্ত করে, ঝামেলা সহজে মিটে যায়। অপরপক্ষের কোন সাড়া না পেলে খেলাটায় মজা হয় না, জমে না, প্রায়ই এখানেই শেষ হয়ে যায়। বাবুল নির্বিবাদে হাঁটে। আজ সে তার লাঠির অভাব খুব বোধ করছে।
আরেকটু পরেই আবারও ঐ ডাকটা শুনলে এবং আরো কাছ থেকে, বাবুলের কেন যেন ক্ষুধাটা চাঙ্গা হয়। পৃথিবীর যাবতীয় কুৎসিত, রুক্ষতা, নির্মমতা তার কাছে ক্ষুধার মতোই এক প্রকট অনুভূতি। যে কোন কুৎসিত আচরণের ক্ষত মুছে ফেলার জন্য যেমন ভাল আচরণের মলম আছে, প্রচন্ড ক্ষুধা পেলে, ক্ষুধায় প্রাণ বের হয়ে যাবার উপক্রম হলে সামান্য কলা ও বনরুটির এমন ক্ষমতা, মুহূর্তে ঐ রাক্ষুসে ক্ষতকে কেমন ধ্বংস করে দেয়। তার কাছে ক্ষুধা তখন এক হাস্যকর অতীত। অথচ কি পরাক্রমে বার বার ফিরে আসে।
বাবুলের শার্টের একটি প্রান্ত ধরে টান দেয় কেউ একজন। টান দিয়েই সে পালায়। অনেকটা কাকের ঠোকরের মত। ছোট পায়ের মৃদু ধুপধাপ শব্দটি মাটিতে সামান্যই কম্পন তোলে। ঐ বালকের একটি পদক্ষেপ পড়ে বাবুলের ডান পায়ে এক গজের মধ্যেই। পালানোর সময় সুরেলা গলায় আগের সম্ভাষণও করে গেল সে।
বাবুলের ক্ষুধাটা তার সারা গায়ে ঝাপিয়ে পড়ে। সাথে সাথে একটি কলার খোসাও। খোসাটি তার ডান পাশের একটু পেছন থেকে উড়ে এসেছে। আঘাতের তীব্রতা বুঝে বলা যায় খুব কাছ থেকে ছুঁড়ে মারা। দূরত্ব কিছুটা দীর্ঘ হলে তার গায়ে আঘাত করার আগে খোসাটি শূন্যে দোল খেতো। কাপড় শুকাতে দেয়ার জন্য টানা দড়ি যেমন মাঝে মাঝে নীচের দিকে ঝুলে থাকে সেইরকম কিন্তু দূর উড়ে আসা বস্তু উপর দিকে ঝুলে আসে। এ খোসাটি এসেছে শূন্যে সরলরেখা এঁকে। অর্থাৎ খুব কাছ থেকে। কিন্তু আঘাত প্রচন্ড নয়, হয়তো কোন শক্তিহীন হাত দিয়ে ছোঁড়া।
বাবুল একটি গালি দেয়। অস্ফুট। তাতে রাগও ঝেড়ে ফেলা গেল আর কেউ না শোনাতে উস্কানির ব্যাপারটিও থাকল না।
সে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করতে থাকে এই ব্যাপারগুলি। তার সামনে ঘটমান বর্তমানকে সে অবলীলায় মুছে ফেলতে পারে যদি তা অন্তত এক সেকেন্ডের অতীত হয়। সে বিশ্বাস করে তার অন্ধ হওয়ার সুবিধা হচ্ছে, সে যে কোন মুহূর্তে তার পছন্দ ও সুবিধাজনক জায়গায় বাস করতে পারে। তার আশপাশের জগৎ নিমিষেই বদলে নিতে পারে শুধু চিন্তার বিষয় পরিবর্তন করে।
দূরে কোথাও ইট ভাঙছে, বিল্ডিং উঠবে। মৃদু শব্দ আসে। আরো দূরে হয়তো গাড়ির হর্ণ। তারপর খানিক নীরবতার পর কাকের ডাক। এই পটভূমিতে সে নিজেকে শহরের যে কোন শান্ত প্রান্তে হাজির করতে পারে অবিশ্বাস্য দ্রুততায়।
কিছু কিছু এলাকার বদনাম থাকে। সে সাইনবোর্ড পড়তে পারছে না, ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে তাও কাউকে বলতে পারে না, আর আশ্চর্য! এসবের কোন গুরুত্বও নেই তার কাছে। তাই যে কোন মুহূর্তে থাকতে পারে যে কোন জায়গায়।
বাবুল রেললাইন পার হবে। অনুমান করে, আর পাঁচ-সাত মিনিট এগুলে একটা দেয়াল, দেয়ালে একটা গেট, গেট পার হয়ে রেললাইন। রেললাইন পার হয়ে একটা বাজার, আরো পাঁচ-সাত মিনিট ডানে হেঁটে সে একটি চায়ের দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই তার বড় ভাই আবুল দোকানের ভিতর থেকে ডাক দেবে। দোকানটি আবুলেরই, তাতে বাবুলের শেয়ার আছে। পারিবারিক সম্পত্তি।
বাবুল রাস্তা ধরে এগুতে গিয়ে একটু ধন্ধে পড়ে যায়। রাস্তা তো নয় যেন ফুটবল খেলার মাঠে হাঁটছে। যেদিকেই যাও, যাওয়া শুদ্ধ। কোন ভুল নেই। সব দিকেই সঠিক পথ। সামনে যাওয়াও ঠিক আবার ডানে বামেও যাওয়াও ঠিক। কোন দিকেই কোন প্রতিবন্ধক নেই। মাথার ভেতরে রাখা মানচিত্রটির উপর চোখ রাখে বাবুল। গভীর মনোযোগে রাস্তা বিশ্লেষণ করতে করতে একটি দেয়ালের সাথে প্রায়ই ধাক্কাই খেয়ে ফেলে। তবুও দেয়াল পেয়ে কিছুটা খুশি হয় সে ।
কিন্তু তার চেয়ে বেশি খুশির জোয়ার বসে তার কাছাকাছি কোন এক জায়গায়। কয়েকটি কচি কণ্ঠের হুল্লোড় ভেসে আসে। কেউ কেউ উল্লাসে ফেটে পড়ে বাবুলের ধাক্কা খাওয়া দেখে।
সামলে নিয়ে বাবুল দেয়াল হাতড়ে দেখে। হ্যাঁ, নতুন নির্মিতই বটে। হাত বুলালে কেমন একটা ধারালো কঠিন অনুভুতিতে গা শির শির করে।
এই আন্ধা, ডানে যা ডানে যা। পথ ওইদিকে।
কচিকণ্ঠ পথ নির্দেশ করে। বাবুল বোঝে তাকেই বলা হচ্ছে। কোন সদয় শিশুর অযাচিত উপকার।
বাবুল ডানে যাবে কি যাবে না করতে করতে ডানে যেতেই হোঁচট খায়। একটি বড়সড় গর্তে পড়তে গিয়েও কোনমতে সামলে নেয়।
হাসি ও ফূর্তিতে গড়াগড়ি খায় শিশু ও বালকেরা।
আন্ধায়ারে ফাথর মার।
বলতে না বলতেই একটি ইটের টুকরা এসে লাগে বাবুলের পায়ে। ডান পায়ের গোড়ালির পাশের হাড় যেন বিদ্ধ করে ফেলে ছুঁছালো ইটের টুকরাটি। ব্যথায় টন টন করে সারা পা। বাবুল পা কিছুটা শূন্যে তুলে একটু ঝাড়ে, টন টন ভাবটা যাতে কিছু কমে।
এক বালকের হাতের নিঁখুত নিশানায় ইর্ষান্বিত হয়ে পড়ে তার অন্য বন্ধুরা। প্রথম ঢিল ছোড়া সফল বালক চ্যালেঞ্চ ছুড়ে দেয়, আন্ধার পায়ের ঠিক একই জায়গায় লাগাতে পারলে বোঝা যাবে হাতের টিপে কে সেরা। লাগাতে না পারলে তার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিতে হবে।
বন্ধুর শ্রেষ্ঠত্ব সহজে স্বীকার করতে নারাজ বালকের দল বিপুল উৎসাহে নিজেদের হাতের টিপের পরীক্ষা দিতে থাকে। বাবুল প্রথমে বিরক্ত ও পরে আতঙ্কিত হয়ে পা উপরে তুলে, নীচে নামায়, শূন্যে ঘোরায়। বালকদের আক্রমণের হাত থেকে পা বাঁচাতে বুদ্ধি খাটিয়ে অনেক কিছুই করে। ওদের টিপ ক্রমাগত ফসতে যেতে যেতে এক সময় ক্রুদ্ধ ও অপমানিত বালকেরা প্রবল আক্রোশে আরো কাছে এসে ঢিল ছুঁড়তে থাকে।
বাবুল ততক্ষণে প্রায় সিঁটিয়ে গেছে দেয়ালের সাথে। পারলে যেন দেয়াল ভেদ করে অপর পাশে গিয়ে ওঠে।
তার কাছাকাছি হুল্লোড় চলছে। ধুপ ধাপ টুং টাং ইটের টুকরা এসে পড়ছে তার মাথার কাছের দেয়ালে, পায়ের কাছের দেয়ালে, ঠিক কানের উপর, হাতের গিরায়, তলপেটের নীচে। বালক ও শিশুরা নিজেদের পছন্দ ও রুচি অনুযায়ী জায়গা বেছে নিয়ে বাবুলের গায়ে হাতের টিপ পরীক্ষা করতে থাকে।
অতিষ্ট হয়ে বাবুল এক সময় গালাগালি শুরু করে। অশ্রাব্য গালাগালি শুনে ওরা যেন বেশ মজা পেয়ে যায়। আনন্দের জোয়ারে ভাসতে ভাসতে আরো কাছাকাছি চলে আসে কয়েকজন। যাদের হাতের টিপ একদমই খারাপ, তারা কাছ থেকে ইট ছোঁড়ার জন্য বা কেউ কেউ আঙুল দিয়ে লক্ষ্য স্থির করে বন্ধুকে ঐ জায়গায় বিদ্ধ করার প্রতিযোগিতায় আহ্বান করার জন্য।
বাবুলের গালাগালি শুনে ওদের উৎসাহের মাত্রা বেড়ে যায়, শুরু হয় তার উপর ইটবৃষ্টির উৎসব। তারপর একসময় বাবুল দিগ-বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সেও হঠাৎ তার আশপাশে পড়ে থাকা ওদের ব্যবহৃত ঢিল কুড়িয়ে নিয়ে শব্দের উৎস লক্ষ্য করে প্রবল আক্রোশে ছুঁড়তে থাকে।
মুহূর্তে ক্যাঁক, কোঁক, উফ কয়েকটি আর্তনাদ ও পলায়নের শব্দের পর বাবুল কিছুটা নিস্তার পায়।
সে প্রায় দৌড়েই দেয়াল ঘেসে বামদিকে আসতে থাকে। অসমান পথে হোঁচট খেতে খেতে, ছোটখাট গর্ত বা জমিয়ে রাখা বালির স্তুপ, নিজে নিজেই গজিয়ে উঠা কোন গাছের চারা কোন কিছুই তার গতি কমানোর জন্য বাধা হয়ে উঠছে না। তার এখন প্রাণ বাঁচানোর দায়। তার মাথাও যেন ঠিক কাজ করে কুলিয়ে উঠতে পারে না। মাথার ভিতর ঝিমঝিমঝিম উচ্চগ্রামের শব্দে মাথার ভেতরের মানচিত্রটিও বুঝি হারিয়ে গেছে। এখন একটিই লক্ষ্য তার। দেয়াল ধরে ধরে ক্রমাগত বামে হাঁটতে থাকা। বুঝে গেছে ওটিই পথ। ওদিকেই ফটক এবং ফটক পার হয়ে রেললাইন, রেললাইন পার হয়ে…
বিকট শব্দে একটি প্রায় সম্পূর্ণ আকৃতির ইট তার মাথার কাছাকাছি দেয়ালের উপর ধুম করে আছড়ে পড়ে টুকরা টুকরো হয়ে গেলে চমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। কুকুরের মত একটি কুঁই কুঁই জান্তব শব্দ বের হয়ে আসে তার নাকমুখ দিয়ে। ইটের খন্ডটি প্রায় পাউডার হয়ে তার নাকে মুখে চোখে ধুলো জমিয়ে ফেলে। সে অস্বস্তিতে দুই হাতে মুখ ঢেকে বসে পড়ে।
এবারে অপরপক্ষের কোন উল্লাসের শব্দ বা গালাগালি নেই। গোঁ গোঁ শব্দে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় আর কোন আওয়াজও বের হয় না বাবুলের মুখ দিয়ে। চিৎকার করে কারো সাহায্য চাওয়া বা বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার করার কথা চট করে তার বুদ্ধিতে কুলিয়ে উঠতে পারে না। অনেকটা মরিয়া হয়েই সে ঝট করে লাফিয়ে উঠে রুখে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নেয়। সে আহ্বান করে কোন শালা তার সাথে লাগতে আসে। সামনে আসুক। মুহূর্তে একটি বাঁশের গুতো এসে লাগে তার তলপেটে। ঝট করে বাবুল ধরে ফেলে বাঁশের প্রান্ত। ধরেই এক হেঁচকা বেমক্কা টান দিলে ওপাশে থাকা আক্রমনকারী সামলাতে পারে না। প্রতিহিংসায় ধক ধক করতে থাকা বাবুল বাঁশ ফেলে সাড়াশির মত দুই হাতে খামচে ধরে কাউকে। তার হাত তখন যেন কোন শিকারীর বর্শা, আঙুল যেন কোন চকচকে ফলা।
স্বল্প ওজনের ঐ আক্রমনকারী টানের চোটে প্রায় উড়ে এসে বাবুলের কোলেই আছড়ে পড়ে। বাশেঁর প্রান্ত ছুড়ে ফেলে মুহূর্তেই বাবুল তাকেই বিশাল থাবায় খামচে ধরে। তার হাতে ঝাপিয়ে পড়ে আহত বাঘের ক্ষিপ্রতা। খামচে ধরতে গিয়েই তার আঙল ডুবে যায় নরম জলজ কোন মাংসের তালে। আশ্চর্য! বাবুল ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, এটা কি! তার হাতে উঠে আসে পিংপং বল আকৃতি কোন গোলাকার রক্তমাংসের থক থক করা পিন্ড। তার হাতের তালুতে দাপাতে থাকা গরম গরম রক্তে ফুটছে এ কোন অংশ শরীরের। শিশু শয়তানটির ঠিক কোন অংশ উঠে এল তার হাতে!
বাবুলের কব্জায় থাকা শয়তানটির দাপানো মুহূর্তে বন্ধ হয়ে গেলে বাবুল তাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সাথে সাথে ছুঁড়ে ফেলে তার হাতের মুঠোর ছুটোছুটি করতে থাকা ভেজা গরম পিংপংটি।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক নারকীয় নীরবতা নেমে এসেছিল বাবুলের চারিপাশেই। ছুঁড়ে ফেলা শিশুর আর্তচিৎকারে যেন পুরো শহর টগবগে মিছিল হয়ে যায়। ভারী গুঞ্জনের গম্ভীর নির্দেশ বাবুলের পা গেঁথে ফেলল মাটিতে।
চারিদিকে পরস্পরের প্রতি লোকজন খবর ছুঁড়ে দেয়, নাহিদের ভাতিজার চোখ তুলে ফেলেছে কে যেন।
নাহিদ কই? তার ভাতিজা কই?
লোক জমতে সময় লাগে না। বাবুলের আর গেট পর্যন্ত যাওয়া হয় না।
হাজার হাত তাকে ঝাপটে ধরে। প্রায় শূন্যে উড়িয়ে নিয়ে চলে কোথাও। শিশু ও বালকের দলের কোলাহল ছাপিয়ে বিভিন্ন বয়সী পুরুষ ও নারীর ঘটনা বিশ্লেষণ ও মন্তব্য উড়তে থাকে বাবুলকে কেন্দ্র করে। বাবুলের এখন কি দশা হবে কল্পনাপারদর্শী অলস মহিলারাও বুঝে উঠতে পারে না। তারা অনেকে স্বয়ং, অনেকে প্রতিনিধি পাঠায় বাবুলের পিছে পিছে। মাঠে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাকে, বিচার হবে।
ফুটবল খেলার মাঠ। গোলপোষ্টের সাথে বেঁধে ফেলা হল বাবুলকে। শত জনতা ভেদ করে বাবুলের পালানোর কোন উপায় নেই। তবু বাঁধা প্রয়োজন। নতুবা বিচার জমে না।
নাহিদের মেজাজ গরম হয়ে গেছে। শূন্যে হাত পা ছোঁড়ে ক্রমাগত। তার বক্তব্য, ক্রিমিনালকে সে কাঁচা চিবিয়ে খাবে। তাকে যেন বাধা দেয়া না হয়। তার বন্ধু তিনু ও জুলু ধরে রেখেছে তাকে। ক্রিমিনালতো হাতের মুঠোর ভিতরেই আছে। আগে বিচার হোক। সব কিছুর একটা সিস্টেম আছে।
মোতালেব চাচা, বিন্দু আংকেল, ফয়েজ ভাই, আমিন চাচা এসে পড়ার সাথে সাথেই বিচারের কাজ শুরু হয়। প্রথমেই বক্তব্য দেবেন মোতালেব চাচা। তিনি ঘটনার কিছ্ইু জানেন না। হৈচৈ এর শব্দে ধড়মড়িয়ে ঘুম ভেঙে লুঙ্গিটা ঠিক মত গিট্টু মারতে মারতে রাস্তা পার হয়ে মাঠে আসার সময় বিন্দুর মুখে যা শুনেছেন।
মোতালেব চাচা তার মসজিদ কমিটি নির্বাচনে তার সৎ ও যোগ্য লোক নির্বাচনের প্রাধান্য বিষয়ে আলোকপাত করবেন ঘোষণা দিয়ে উপস্থিত মুরুব্বী সমাজ তার সাথে ঐক্যমত পোষণ করে কিনা জানতে চান।
বাবুলের ডান কব্জির বাঁধনটা বেশ জোরালো হয়েছে বলে বুঝতে পারছে সে। তার ভীষণ অস্বস্তি হয়, ডান হাতের আঙুলগুলি ভিজে আছে। সতেজ ঘাসে মুছে নেবার সুযোগ পেলে তার জন্য ভাল হতো, এমন বোধ করে সে। সারা গা কেমন শির শির শির শির করছে। কখনো রক্ত ছোঁয়নি বাবুল। সে জানে না রক্তের গন্ধ কেমন। খাসির কাঁচা গোস্তের সাথে লেগে থাকা খাসির রক্তের গন্ধের সাথে মানুষের রক্তের গন্ধে ঠিক অমিলটা কোথায় আজ তার কাছে পরিষ্কার হয়েছে। সে বেশ আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে তার হাতে এক শয়তান পিচ্চির চোখ উঠে এসেছিল। তার আশপাশে শত শত বার বলা হচ্ছে এ কথা। বাবুল এক পলক ভেবে নেয়, তার ভাই অপেক্ষা করতে করতে বিরক্ত হয়ে তাকে গালি দিচ্ছে কিনা, নাকি রাস্তায় এসে বার বার খুঁজে যাচ্ছে।
বাবুল প্রাণপণে চিৎকার করে, আমাকে বিদায় করেন।
মুহূর্তে থেমে যায় শত কন্ঠের কোলাহল।
আমিন চাচার বেশ রাগ হয়। তার আলোচনায় বেমক্কা চিৎকার এসে পড়াতে জনতার মনোসংযোগে বিঘœ ঘটে গেছে।
জনতা বেশ মজা পেয়ে বাবুলকে নিয়ে পড়ে। দুটো চড় থাপ্পড় আর হাসি তামাশার পাত্র হয়ে বাবুল মুহূর্তের মধ্যে মনোযোগের কেন্দ্রে এসে যায়।
নাহিদ আমিন চাচাকে সরাসরিই বলে, কথা সংক্ষেপ করেন।
আমিন চাচা থ’ খেয়ে যায়। সবাই পুরা বক্তব্য দিয়ে গেল আর আমি কথা সংক্ষেপ করবো? আমি? আমি নুুরুল আমিন?
ফয়েজ, বাশার আর সাইফুলের গরমে আমিন চাচা নাহিদকে গালাগালি শুরু করেন। শুয়োরের বাচ্চা হতে শুরু হয়ে কোথায় যেত তার শাসন তা স্থির হবার আগেই নাহিদ তেড়ে আসে। সে প্রথম থেকেই আজ উত্তপ্ত ছিল। আমিন চাচার গায়ে হাত দিয়েও সে ঠিক ধাতে আসে না কি করল। বাশারের সামনে এতবড় কান্ড! সে তৎক্ষণাৎ নাহিদের তলপেটে লাথি মারলে নাহিদ কোঁৎ করে মাটিতে শুয়ে পড়ে। গুঞ্জন থেমে যায়। সবাই উর্ধŸশ্বাসে অপেক্ষা করে কি ঘটে, কি ঘটে। কিছুই ঘটে না। নাহিদ উঠে দাঁড়ায়। হতবিহ্বল নাহিদের দুই বন্ধু হঠাৎ ছুটে কোথায় হাওয়া হয়ে যায়। নাহিদও কেমন ঘোলা চোখে সবাইকে দেখতে থাকে। তার দেখা শেষ হতে সময় লাগে না, তার করিৎকর্মা দুই বন্ধু আরো আট নয় জন নিয়েই মাঠ কাঁপিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে। প্রায় সবার হাতেই বিভিন্ন লোহার জিনিস। মারামারির সময় লুলা বানাতে কাজে লাগে।
নাহিদ নিজেকে ফিরে পেতে সময় নেয় না। সে প্রথমেই বাশারকে খোঁজে। বুদ্ধিমান বাশার বাতাসের সাথে মিশে গেছে।
আমিন চাচা বিশেষ কিছুই বলার সুযোগ পান না।
জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে।
একটি রডের তীক্ষè ফলা এসে ঢুকে যায় তার চোখে। গল গল করে রক্ত ছোটে। দু’জন মাটির সাথে চেপে ধরে আছে তাকে। তিনি প্রাণ ভিক্ষা চাইলেন না চোখ ভিক্ষা চাইলেন উপস্থিত সাহসী কয়েকজন লোকও ঠিক অনুমান করতে পারে না। নাহিদের শক্তিশালী হাতের চাকুর দ্বিতীয় আঘাতে আমিন চাচার বাম চোখ অর্দ্ধেকটাই উঠে এসে গালের সাথে লেগে থেকে ঝুলতে থাকে।
বাবুল ঠিক বুঝে উঠতে পারেনা কি ঘটছে। খুবই তাড়া অনুভব করে সে। তার ভাই না জানি কতবার খুঁজে গেছে রাস্তায়।
সে এবার আগের চেয়ে আরো জোরে চিৎকার করে, আমাকে বিদায় করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here