আন্দোলনের বর্ষপূতিঃ জয়পুর-মাদারপুর সাঁওতাল পল্লী -মিথুশিলাক মুরমু

0
252

আন্দোলনের বর্ষপূতিঃ জয়পুর-মাদারপুর সাঁওতাল পল্লী
বিগত বছর নভেম্বর ৬ তারিখ পর থেকে এ যাবত কমপক্ষে সাত বার পূর্বজয়পুর-পশ্চিম জয়পুর, মাদারপুর সাঁওতাল পল্লী পরিদর্শন করেছি। প্রতিবারই গ্রামগুলোর অজস্র নারী-পুরুষের সাথে মতবিনিময় করেছি। নিহত পরিবারের নিকটজন, আহত ব্যক্তিগণ এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তরা সরকারের কাছে বার বার চোখের জলে আর্জি জানিয়েছে, যেন তাদের প্রতি কৃপাদৃষ্টি দেওয়া হয়। মাঠে-ঘাটে খেটে খাওয়া মানুষের অবয়ব দেখলে কখনোই মনে হবে না, তারা সরকারের বিরুদ্ধে, প্রশাসনের আইনের উর্দ্ধে উল্ফন দেখিয়েছে। সহজ-সরল এবং একান্ত অনুগতভাবেই আবেদন জানিয়েছিল বাপ-দাদা জমিতে তারা যেন চাষাবাদ করার সুযোগ পেতে পারে কিন্তু পরবর্তীকালে স্থানীয় চিহ্নিত নেতাদের ইন্ধনেই আদিবাসীরা লাইনচ্যুত হয়েছেন। যেহেতু অধিগ্রহণকৃত/রিকুইজিশনকৃত জমি স্থানীয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠী আদিবাসী সাঁওতাল, মাহালী, উরাঁও, মুসলমান, হিন্দুদের চোখের সামনেই ধান,গম, আলু, সরিষা, আখ দেদারসে চাষাবাদ করে যাচ্ছে। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতেই ২৮শে মে, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে মো. মনিরুল ইসলাম, সার্ভেয়ার, উপজেলা ভূমি অফিস, গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা যে প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন, সেটিতে পাওয়া যায়, ‘নালিশী জমি গত ২০১৩-২০১৪অর্থ বৎসরের ২৯ (উনত্রিশ) মাসের জন্য ইজারা/লীজ প্রদানের মাধ্যমে রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড ভোগ দখলে আছেন। উল্লেখ্য যে, উক্ত লীজ/ইজারাকৃত জমিতে ধান, তামাক, গম, পাটসহ বিভিন্ন শাকসবজির চাষাবাদ হচ্ছে।’ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর গোপনীয় শাখা গাইবান্ধা পক্ষে আলেয়া খাতুন ২১ জুন, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিবেদন (স্মারক নং-০৫.৫৫.৩২০০.০৩০.০০.০০১.১৫-৪১) জমা দিয়েছিলেন। তিনি মতামতে উল্লেখ করেছিলেন, ‘রংপুর সুগার মিলের কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, আবেদনকারীদের বক্তব্য এবং দাখিলকৃত কাগজপত্রাদি ইত্যাদি পর্যালোচনায় আবেদনকারীদের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং রংপুর সুগার মিল কর্তৃপক্ষ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের বোর্ড সভার সিদ্ধান্তের আলোকে লীজ-কার্যক্রম পরিচালনা এবং ইক্ষু ও অন্যান্য ফসল আবাদ করে আসছেন।’ সহকারী কমিশনার (ভূমি) গাইবান্ধা ৯.৮.২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের প্রতিবেদনেও (সূত্র-স্মারক নং ১। উঃভঃঅঃ/গোবিন্দ/২০১৫-৬১১, তারিখ ২১/০৩/২০১৫ খ্রিঃ। ২। স্মরক নং ৩১.৫৫.৩২০০.০৩১.০৬.০১২.১৫-৪৬০, তারিখ ০৯/০৪/২০১৫) লক্ষ্য করা যায় ‘সরেজমিন তদন্তকালে এ্যডমিনিষ্টেটিভ অফিসার রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধা জানান যে, ইতোপূর্বে উক্ত প্রতিষ্ঠানের অধিগ্রহণকৃত জমির পরিমাণ ১৮৪২.৩০ একর এর মধ্যে আনুমানিক ১৫০২.০০ একর জমি উক্ত প্রতিষ্ঠান শুরু হইতে পর্যায়ক্রমে অদ্যবধি পর্যন্ত লীজ প্রদান করে আসছেন, এবং অবশিষ্ট ৩৪০.০০ একর (প্রায়) জমি মধ্যে স্টাফ কোয়ার্টার, রাস্তাঘাট, পুকুর হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ১৫০২ একর জমি ২০১৩-২০১৪ অর্থ বৎসর ২৯ মাসের জন্য লীজ দেওয়া জমিতে ধান, তামাক, গম, পাটসহ বিভিন্ন শাকসবজির চাষাবাদ হচ্ছে এবং উক্ত লীজকৃত ১৫০২.০০ একর জমির মধ্যে আগামী বৎসরে ৭৫৮.০০ একর (প্রায়) জমিতে ইক্ষু চাষের পরিকল্পনা করেছেন, একই বৎসর ৭০০.০০ একর জমিতে স্বল্প মেয়াদী আবাদের পরিকল্পনা করেছেন এবং ৪৪.০০ একর (প্রায়) জমি নিচু শ্রেণী। নালিশী ১৮৪২.৩০ একর জমি বর্তমান সময়কাল পর্যন্ত ইজারা/লীজ প্রদানের মাধ্যমে রংপুর সুগার মিলস লিমিটেড ভোগ দখলে আছে, এবং বাংলা ১৪২১ সন পর্যন্ত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ আছে মর্মে জানায়।’
১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই জুলাই তারিখে পাকিস্তান ই-াষ্ট্রিয়াল ডেভেলপমেণ্ট কর্পোরেশন এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক/পূর্ব পাকিস্তান সরকার-এর মধ্যে যে চুক্তিপত্রের মেমোরে-াম (দলিল), সেটিতে ৭টি চুক্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ‘৫. প্রাদেশিক সরকার পরীক্ষা-নীরিক্ষা করিতে পারবে যদি কোন প্রশ্ন ওঠে। উল্লেখিত এ্যাকুইজেশন (ফরমায়েস) সম্পত্তির ব্যাপারে তার উল্লেখিত উদ্দেশ্য সংক্রান্তে যদি কোন আপত্তি না আসে। কিন্তু পরীক্ষা-নীরিক্ষার সময় যদি প্রকাশ পায় উক্ত সম্পত্তি এ্যাকোয়ার (অর্জন করা) করা হইয়াছে। প্রকৃত উদ্দেশ্যের বিপরীত। তখন উল্লেখিত কর্পোরেশন উক্ত সম্পত্তি প্রাদেশিক সরকার বরাবর ফেরত দিতে পারিবে। মুক্তি পাওয়ার জন্য এবং পূর্ব অবস্থায় ফিরে যেতে পারবে। উল্লেখিত আইনের ৮ ধারার বিধানমতে এবং কর্পোরেশনকে সমস্ত খরচ প্রদান করিতে হইবে এবং ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে, সম্পত্তির মুক্তি এবং ফেরত দিতে। ৬. প্রাদেশিক সরকার সম্পত্তি এ্যাকোয়ার করিবার পরে কর্পোরেশনের দখলে সম্পত্তি থাকিবে এবং সে উদ্দেশ্যে সম্পত্তি এ্যাকোয়ার (অর্জন করা) করা হইয়াছে সে উদ্দেশ্য ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করিতে চাহিলে সরকারের নিকট হইতে লিখিত আদেশ লইতে হইবে। ৭. যদি কোন আপত্তি বা বিষয়ের উপর মতনৈক্য দেখা দেয়। এই চুক্তি থাকার উপরে তখন সরকারের নিকট অবগত করাইতে হইবে। সরকার আপাততঃ পক্ষদ্বয়ের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিলে সরকার যাহা সিদ্ধান্ত দিবে তাহা উভয়পক্ষ মানিতে বাধ্য থাকিবে।
জয়পুর-মাদারপুর সাঁওতাল পল্লীর আদিবাসীরা ১০ই এপ্রিল ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আবেদন জানিয়েছিলেন। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, “গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ৫নং সাপমারা ইউনিয়নের রামপুর, সাপমারা,মাদারপুর, নারাংগাবাদ ও চকরাহিমপুর মৌজার ১৮৪২.৩০ ভূমি রংপুর (মহিমাগঞ্জ) সুগার মিলের জন্য অধিগ্রহণ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার। অধিগ্রহণের ফলে ১৫টি আদিবাসী গ্রাম ও ৫টি বাঙালী গ্রাম উচ্ছেদ হয়। এ নিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান ই-াষ্ট্রিয়াল ডেভেলপমেণ্ট কপোরেশন এবং পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র হয় ১৯৬২ সালের ৭ জুলাই। উক্ত চুক্তিপত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘… ১৮৪২.৩০ একর সম্পত্তি ইক্ষু ফার্ম করার জন্য লওয়া হইল। উক্ত সম্পত্তিতে ইক্ষু চাষের পরিবর্তে যদি কখনো কি কোনো সময় অন্য কোন ফসল উৎপাদিত হয় অর্থাৎ যে উদ্দেশ্যে সম্পত্তি অধিগ্রহণ করা হইয়াছে, সেই উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না করিয়া অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয় এবং তাহা প্রকৃত উদ্দেশ্যে বিপরীত হয় অথবা এই রকম ঘটনা ভবিষ্যতে ঘটিলে এই অবস্থায় পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান ই-াষ্ট্রিয়াল ডেভেলপমেণ্ট কর্পোরেশন অধিগ্রহণকৃত ১৮৪২.৩০ একর সম্পত্তি সরকার বরারব ফেরত (সারে-ার) প্রদান করিবেন। দেশের সরকার বাহাদুর উক্ত সম্পত্তি গ্রহণ করিয়া পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়া (রেসটোরেশন) যাইতে পারিবেন।’ অধিগ্রহণের পর বেশ কিছু জমিতে আখ চাষ হয় এবং আখ ব্যবহার করে চিনিও উৎপাদিত হতে থাকে। কিন্তু চিনিকল কর্তৃপক্ষের দুনীর্তি ও অব্যবস্থাপনার দরুণ ৩১ মার্চ ২০০৪ সালে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। চিনিকল কর্তৃপক্ষ নানাভাবে অধিগ্রহণকৃত জমি প্রভাবশালীদের কাছে লিজ দিতে শুরু করে। অধিগ্রহণের চুক্তি লংঘন করে কেবলমাত্র আখচাষের জন্য বরাদ্দকৃত জমিতে ধান, গম, সরিষা ও আলু চাষ শুরু হয়। এমনকি বাণিজ্যিক তামাক ও হাইব্রিড ভুট্টা আবাদের মাধ্যমে থাকে অধিকাংশ জমি। …প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয় যে, জমিতে ইক্ষু চাষের পরিবর্তে ধান, গম, আলু, পটল, হাইব্রীড ভুট্টা, যব ইত্যাদি ফসল চাষ হচ্ছে। কিন্তু এখনো নিজ ভূমি থেকে উদ্বাস্তু জমি হারানো মানুষেরা জমি ফিরে পাননি, কাটাচ্ছেন মানবেতর জীবন।…মাননীয় দেশনেত্রী আপনি এদেশের জনদরদী গরীব মেহনতি মানুসের নেত্রী। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আপনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের প্রতি আদিবাসীসহ গরীব কৃষক শ্রমিক জনতার আস্থা ও বিশ্বাস আছে। তাই আপনার প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে নি¤েœাক্ত দাবিসমূহ পেশ করছিÑ
১. অবিলম্বে রেসটোরেশান দ্বারা ১৮৪২.৩০ একর বাপ-দাদার জমি ফেরত দিতে হবে;
২. সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে লুটেরা ও দুনীর্তিবাজ চিনিকলের কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার করতে হবে;
৩. বেআইনিভাবে জমি দখল ও লীজের মাধ্যমে লুটপাটের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করতে হবে;
৪. ভুমিদস্যু ও দালালদের প্রতিহত করতে হবে।”
আদিবাসীরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে নিজেদের অবস্থান এবং স্থানীয় চিনিকল কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা তুলে ধরতে চেয়েছেন। আদিবাসীদের এই আর্থিক দুর্বলতার সুযোগে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা দাবার কোর্টে ঘোড়ার চাল চালিয়েছেন। আইনের ফাঁক দিয়ে রাঘব বোয়ালরা বেরিয়ে গেলেও বোকা সাঁওতালসহ আদিবাসীরা রাজরোষের মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে আদিবাসীদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে গেছেন অধিগ্রহণকৃত/রিকুইজিশনকৃত জমির প্রতিটি কোণা সরকার ফিরিয়ে দিতে বাধ্য।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উত্তরবঙ্গ সফরে গাইবান্ধায় পৌঁছেছিলেন কিন্তু আদিবাসীদের কথা একটিবারের জন্যেও উচ্চারণ করলেন না, অবহেলিত, বঞ্চিত ও উপেক্ষিত আদিবাসীরা বড় কষ্ট পেয়েছেন। জয়পুর-মাদারপুর গ্রামের আদিবাসীরা টিএনও’র হাত থেকে খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ অস্বীকার করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধকে সর্বাধিক সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন । মাননীয় শেখ হাসিনাকে তারা ভালোবাসে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ভালোবাসে তার হৃদয়ের বিশালতার জন্য। প্রবীণ দু’একজন বলছিলেন, আমৃত্যু আমরা আওয়ামী লীগকে সমর্থন, ভোট দিয়ে যাবো। সরকার আমাদের জন্য বিপরীত কিছু করলেও কমিণ্টমেণ্ট থেকে আমরা কখনোই বিচ্যুত হবো না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাই, দয়া করে আদিবাসীদের অব্যক্ত কথাগুলো শ্রবণ করুন, তাদের প্রতি সদয় হোন, মাথা গোঁজার ঠাই করে দিন।
‘সময় পেরিয়ে যাবে জ্বলে জ্বলে নিভে যাবে মোম
শ্রদ্ধায় ছড়ানো ফুল শুষ্ক হবে পানির অভাবে
ক্ষোভ আর শান্তির কণ্ঠের তীব্রতা যাবে ক্ষয়ে
তবু নির্ভয়তা’র জ্বালানো শিখা গণগনে করে তুলবে আমাদের হৃদয়
পানিহীন শুষ্ক ফুল তাজা হবে আমাদের অশ্রুধারায়…’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here