বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ : বিদেশি সুহৃদেরা সোহরাব হাসান

0
43

বিজয়ের মাসে
মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ : বিদেশি সুহৃদেরা
সোহরাব হাসান

একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিস্ময়কর এক ঘটনা। স্বাধীনতাকামী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ওপর সংখ্যালঘু শাসকগোষ্ঠীর এ রকম নৃশংস গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার এই মরণপণ লড়াইয়ে আমরা যেমন বিশ্বের বিবেকবান লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের যেমন অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছি, তেমনি এ কথাও অসত্য নয় যে কতিপয় শক্তিধর রাষ্ট্র অত্যাচারী পাকিস্তানি শাসকদেরই পক্ষ নিয়েছিল। সেই দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভারত ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অকুণ্ঠ সমর্থন আমাদের উজ্জীবিত ও প্রাণিত করেছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর বৈরিতা ও বিরোধিতায় আমরা যারপরনাই পীড়িত ও ব্যথিত হয়েছি।
আজকের প্রজন্ম ধারণা করতে পারবে না যে একাত্তরে কতটা প্রতিকূল পরিবেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম পরিচালিত হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসে লাখো-কোটি মানুষ ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হন এবং অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা ভোগ করেন। প্রায় এক কোটি নারী-পুরুষ ও শিশু দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্ত্ত মানুষের সংখ্যা ছিল আরও বেশি। পাকিস্তানের বিপুল অস্ত্রের সম্ভার এবং প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর বিপরীতে আমাদের সম্পদ ছিল সীমিত, অস্ত্র ছিল অপ্রতুল। এসব সত্ত্বেও গোটা জাতি ইস্পাত দৃঢ় ঐক্যের কারণে আমরা জয়ী হয়েছিলাম। আমাদের যুদ্ধ ছিল সত্য ও ন্যায়ের।
ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, সেই স্নায়ুযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেবল পাকিস্তান নয়, প্রায় সব দেশে স্বৈরশাসকদের রক্ষায় অর্থ ও অস্ত্র জুগিয়েছে। আর সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামনে রেখেই মুক্তির লড়াই চলেছে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশে দেশে। নিপীড়িত জনগোষ্ঠী শোষণমুক্তির স্বপ্ন দেখেছে। হয়ত এখনও দেখছে হয়ত অন্যভাবে, ভিন্ন পরিসরে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তার উদ্দেশ্য নিয়ে এখন অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে হয়ত সেই প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক নয়। এখানে একটি কথা বলা জরুরি যে ভারতের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক না কেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ স্বাধীনতা চেয়েছিল এবং তাদের সেই স্বাধীনতার স্পৃহাকে স্তব্ধ করে দিতেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সমগ্র জনগোষ্ঠীর ওপর অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল।
পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সময়ে একাত্তরের অনেক বিদেশি সুহৃদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছে; ব্যক্তিগত আলাপে, সাক্ষাৎকারে কিংবা বক্তৃতা-বিবৃতিতে জানতে পেরেছি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের অসামান্য ভূমিকার কথা। তাঁদের মধ্যে আছেন মার্কিন কূটনীতিক আর কে ব্লাডের পুত্র পিটার আর ব্লাড, সুইডিশ সাংবাদিক সেভেন স্টমবার্গ, ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য পিটার শোর, ভারতের মুক্তিযুদ্ধকালীন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, ভারতীয় সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার, ধারাভাষ্যকার দেবদুলাল বন্ধ্যোপাধ্যায়, পাকিস্তানের কবি ও মানবাধিকার কর্মী আহমেদ সেলিম, রাজনীতিক বি এম কুট্টি প্রমুখ। তাঁদের অবিস্মরণীয় ভূমিকা আমরা কখনই ভুলতে পারব না।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সফল করতে এ দেশের মানুষ মরণপণ লড়াই করেছেনÑএ কথা যেমন সত্য, তেমনি অসত্য নয় অজস- বিদেশি নাগরিক আমাদের সেই যুদ্ধে সহায়তার হাত বাড়িয়েছেন। তাঁদের সেই অবদান ও ভূমিকা জানতে পারলে আমাদের নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে।
এ নিয়ে লেখালেখি হয়েছে অনেক আগে থেকেই। তখনও বাংলাদেশ সরকার এসব বিদেশি নাগরিককে সম্মানে ভূষিত করেনি। এ কারণে কয়েকটি লেখায় সম্মাননা জানানোর বিষয়টি ঘুরে ফিরে এসেছে। আর রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা কজনকেই বা স্মরণ করতে পেরেছি? হয়তো কয়েক হাজার। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহায়তা করেছেন বিশ্বের নানা প্রান্তের অজস- সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি ঘটনামাত্র নয়, আমাদের জাতীয় জীবনের মহত্তম অর্জন। এই মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে যেসব বিদেশি নাগরিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন, ভূমিকা রেখেছেন; তাঁদের কথা আমরা স্মরণ করব। এ স্মরণ সেসব মহৎপ্রাণ মানুষের জন্য জরুরি নয়; জীবনের একটি কালপর্বে তাঁরা তাঁদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সেই দুঃসময়ে যাঁরা আমাদের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিলেন, তাঁদের মনে রাখা আমাদের জন্য খুবই জরুরি।
রাষ্ট্র হিসেবে ভারত, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে সর্বাত্মকভাবে সহায়তা করেছে। আবার যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং মুসলিম বিশ্বের প্রায় সব দেশ বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তা সত্ত্বেও সেসব দেশের লেখক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক, আইন প্রণেতারা পৃথিবীর অপর প্রান্তে অবস্থিত এই দেশটির জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাদের দুঃখ, দুর্দশা ও বেদনা উপশমে সচেষ্ট হয়েছেন। সেদিন মানবতার আহবানে সাড়া দিয়ে মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ ছুটে আসেন পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী শিবিরে; লিখেন অবিস্মরণীয় কবিতা সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি শরনণার্থী শিবির ঘুরে দেশে ফিরে মার্কিন জনগণের কাছে তুলে ধরেন বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা; একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তানি শাসকবর্গকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে এবং পাকিস্তানে সব ধরনের সহায়তা বন্ধেরও দাবি জানিয়েছিলেন।
আমরা ভুলে যেতে পারি না যে সেই দুঃসময়ে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি নাগরিকও সামরিক জান্তার নির্যাতনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। যাদের মধ্যে আছেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, আই এ রহমান, আহমেদ সেলিম, গাউস বক্স বিজেঞ্জো বিএম কুট্টি প্রমুখ।
আমরা কি ভুলে যাব বিশ্বের লাখো-কোটি সাধারণ মানুষের কথা, যাঁরা কায়মনোবাক্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন এবং ধিক্কার জানিয়েছেন পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতাকে। আমরা কি স্মরণ করব না বিবিসি সাংবাদিক মার্ক টালির নাম, যিনি এ দেশের যেকোনো রাজনৈতিক নেতার চেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করে। আমরা কি স্মরণ করব না আবদুল লতিফ খতিবকে, মহারাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেও যিনি বাংলাদেশকে মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যিনি ছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে এক সাহসী কলমযোদ্ধা। আমরা কি স্মরণ করব না মার্কিন প্রামাণ্য চলচ্চিত্রকার লেয়ার লেভিনকে, যিনি বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘুরে ঘুরে জয় বাংলা নামে একটি ছবি তৈরি করেছিলেন (পরে ওই ছবিকে অবলম্বন করে তারেক মাসুদ ও ক্যাথেরিন মাসুদ নির্মাণ করেন মুক্তির গান)। আমরা কি স্মরণ করব না মার্কিন লেখক রবার্ট পেইনকে, যিনি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে অবলম্বন করে একাধিক বই লিখেছেন।
আমরা কি স্মরণ করব না পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্টের নেতা জ্যোতি বসুকে, যিনি বিধানসভায় ঘোষণা করেছিলেন, ‘একটি জাতিকে মিলিটারি দিয়ে পিশে মারা যায় কিন্তু তার উত্থানকে ঠেকানো যায় না’। আমরা কি স্মরণ করব না, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন চন্দ্র সিংহকে, যিনি ষাটের দশকেই হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের সুহৃদ ও সহযোদ্ধা। আমরা কি স্মরণ করব না নাম না-জানা অসংখ্য সুহৃদকে, যাঁরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। আমরা কি মনে রাখব না সেই দুঃসময়ের বন্ধুদের? যদি আমরা মনে না রাখি, সেটি হবে চরম অকৃতজ্ঞতা।
আজ নতুন প্রজন্মকে জানাতে হবে ১৯৭১ সালের মরণজয়ী যুদ্ধে কারা আমাদের পক্ষে ছিল, কারা বিপক্ষে ছিল। জানাতে হবে বাঙালি হয়েও কারা বাঙালিদের মুক্তিসংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল, কারা সেদিন পাকিস্তানিদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল। একটি জাতির মুক্তিযুদ্ধ একটি দিন, ঘোষণা বা সামরিক ফরমানের মধ্যে আবদ্ধ থাকে না, তা ছড়িয়ে থাকে সমগ্র জাতির অস্তিত্বে এবং বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বরে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here