বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার

0
477

বীর মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার
‘‘পাকিস্তানীদের বাঙালি বিদ্বেষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তার প্রকাশও ঘটছিল বন্দুকের ভাষায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে গিয়েছিল, সমঝোতার কোনো পথ খোলা ছিল না। তখন আমরা বুঝলাম মুক্তিযুদ্ধে যাবার সময় হয়ে গেছে’’
ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) মোখলেছুর রহমান, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা

ওয়ারেন্ট অফিসার মোখলেছুর রহমান একজন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার মাছিহাতা ইউনিয়নের ফুলবাড়ীয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সেকশন কমান্ডার হিসেবে ৩ নং সেক্টরের অধীন মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন মেজর কে এম শফিউল¬াহ (বীর উত্তম)। সম্প্রতি ৭ মার্চের ভাষণ, ১৯ মার্চের প্রথম প্রতিরোধ, ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইত্যাদি নানা বিষয়ে সাপ্তাহিক বিবর্তনের পক্ষ থেকে নায়েম লিটুর সাথে দীর্ঘ আলাপ হয়। তারই নির্বাচিত অংশ পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো। মহান বিজয় দিবস সংখ্যায় আলাপের প্রথম কিস্তি প্রকাশিত হলো।

প্রশ্ন: ১৯ শে মার্চ ১৯৭১ এ জয়দেবপুর প্রতিরোধে আপনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত…
মোখলেছুর রহমান: ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুর” হবার পূর্ব মুহূর্তে আমি ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪ নং কোম্পানির ১২ নং প¬াটুনের ১ নং সেকশন কমান্ডার হিসেবে জয়দেবপুরে কর্মরত ছিলাম। স্বাধিকার আন্দোলন ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন চূড়ান্তরূপ ধারণ করছিল ঠিক সেই মুহূর্তে বাঙালি সামরিক অফিসার, সৈন্য ও জোয়ানদের নিরস্ত্র করার জন্য পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী গোপন পাঁয়তারা করছিল। তাদের দুরভিসন্ধি বাঙালি সৈন্য হিসাবে আমরা আঁচ করতে সক্ষম হই। এরই পরিপ্রেক্ষিতে হঠাৎ ১৯ মার্চ শুক্রবার বেলা ১১টায় আমার কোম্পানি কমান্ডার, তৎকালীন মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী আমাকে জানান যে, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট হতে ব্রিগেড কমান্ডারসহ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট আসছে আমাদের অস্ত্র জমা নেওয়ার জন্য। পাঞ্জাব রেজিমেন্টের প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করার লক্ষ্যে মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী তৎক্ষণাৎ আমাকে আদেশ দেন, ‘তোমরা এক প্লা¬াটুন সৈন্য সিভিল ড্রেসে অস্ত্র গোলাবার”দ নিয়ে সিভিলিয়ানদের সাথে যোগ দিবে এবং রাস্তায় প্রতিরোধ গড়ে তুলবে যাতে কোনো অবস্থাতে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আরবাব খানের নেতৃত্বে সৈন্যরা জয়দেবপুর রাজবাড়ীতে পৌঁছতে না পারে।’
সেই আদেশ মোতাবেক আমরা ওই এলাকার তৎকালীন এমপি সামসুল হক-এর নেতৃত্বাধীন সিভিলিয়ানদের সাথে যোগ দিয়ে জয়দেবপুর চৌরাস্তা হতে জয়দেবপুর বাজার রেল গেইট পর্যন্ত রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করি। ফলে বেলা ১২টার পরে পাকবাহিনী ও আমাদের মধ্যে ফায়ারিং শুর” হলে এক মারাত্মক রণক্ষেত্রের সৃষ্টি হয়। এতে পাকবাহিনীর অনেক সৈন্য আহত ও নিহত হয়। আমাদেরও অনেকে সেই যুদ্ধে আহত হন। পাক সেনাদলকে আমরা সম্পূর্ণভাবে পরাভূত করি যার ফলে তারা আর রাজবাড়ী পৌঁছতে পারে নি। ঐ দিনেই আমরা পাকবাহিনীর বিপক্ষে যুদ্ধের জন্য মানসিক ও শারীরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। ওই সংকটাবস্থায় আমাদের ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভারপ্রাপ্ত কমান্ডিং অফিসার মেজর কে এম শফিউল্লাহর নেতৃত্বে ঐ ব্যাটালিয়ানের যুদ্ধ পরিকল্পনা ও পরিচালনার কার্যাদি বাস্তবায়িত হয়। পরে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট দ্বারা গঠিত ৩ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারও হয়েছিলেন।
আপনি কত নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন?
মো. র. : ৩ নং সেক্টরে

 কিভাবে জানলেন যে মুক্তিযুদ্ধে যাবার সময় এসেছে?
মো. র. : বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চেও ভাষণ শুনে আমরা কয়েকজন অনুধাবন করি বাংলাদেশকে স্বাধীন করার সময় এসে গেছে। এর আগে দেশজুড়ে চলা পাকিস্তানীদের সহিংসতা, প্রতিদিন নিরস্ত্র জনতার উপর গুলি চালানো আমাদের মর্মাহত করেছিল। পাকিস্তানীদের বাঙালি বিদ্বেষ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তার প্রকাশও ঘটছিল বন্দুকের ভাষায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে গিয়েছিল, সমঝোতার কোনো পথ খোলা ছিল না। তখন আমরা বুঝলাম মুক্তিযুদ্ধে যাবার সময় হয়ে গেছে।

আপনার যুদ্ধে যাবার প্রেক্ষাপট?
মো. র. : মূলত ১৯ মার্চ আমরা যুদ্ধে গেছি। ৭ মার্চ আমাদের জীবনের একটি মহা গুর”ত্বপূর্ণ দিন। এদিন আমরা পরিষ্কার দিক-নির্দেশনা পাই। প্রেক্ষাপট আগেই তৈরি ছিল। তাতে আগুণ লাগে ১৯ মার্চ যেদিন পাকিস্তানীরা আমাদের ২য় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করতে চাইল।
লক্ষ জনতা এদিন ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিল। বিষয়টা আর ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল না। এদিন আমরা পাকিস্তানী সেনাদেও সাথে সরাসরি সংঘর্ষে জড়াই। এরপর আর যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো রাস্তাও খোলা ছিল না আমাদের জন্য।
  ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীনতার ডাক দিলেন তখন আপনার কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল?
মো. র. : এ কথা আগেই বলেছি। বাংলাদেশের মানুষ এ ডাকের জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমাদের মনের কথাই বঙ্গবন্ধুর ভাষণে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল। আমরা স্বস্তি পেয়েছিলাম। এটাই আমরা চেয়েছিলাম।
 আপনার বয়স তখন কত ছিল?
মো. র. : ৩২ বছর।
 মুক্তিযুদ্ধ কতটা রাজনৈতিক ছিল?
মো. র. : এটা ছিল সর্বাত্মক যুদ্ধ। জাতিগত, রাজনৈতিক ও সামরিক।
 ১৯ মার্চ পরবর্তী ঘটনা প্রবাহটা কী ছিল? যদিও তখন আপনি সেনাবাহিনীতে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে ট্রেনিংয়ের কোনো প্রক্রিয়া ছিল কি? কোন কোন স্থানে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ন হয়েছিলেন? মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন সময়ে আপনার কোনো বিশেষ অভিজ্ঞতা?
মো. র. : এ প্রশ্নের জবাব হবে দীর্ঘ। অনেক কথা মনে পড়ছে। অনেক স্মৃতি জমে আছে মনের কোনায়।
২৩ মার্চ মঙ্গলবার সকাল ১০টায় চট্টগ্রাম হতে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার আমাদের ইউনিটে এসে আমাদের সাথে মতবিনিময় করে সান্ত¡না দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, পাকবাহিনী আমাদের উপর আক্রমণ করবে না এবং আমরা যেন আমাদের অস্ত্র অস্ত্রাগারে জমা রেখে ব্যারাকে ফিরে যাই। আমরা ওই মুহূর্তে তার কোনো কথায় কর্ণপাত না করে মেজর শফিউল¬াহ, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী ও ক্যাপ্টেন নাসিমের পরিকল্পনা ও নির্দেশ অনুযায়ী আমাদের কার্যকলাপ অব্যাহত রাখি। তখন তিনি আমাদের তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার লেঃ কর্নেল এম এইচ খান (মাকসুদুল হোসেন খান) কে কনফারেন্সের কথা বলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট ১৪ ডিভিশন হেডকোয়ার্টারে নিয়ে যান। ঐ দিন বিকালের মধ্যে আমরা আমাদের ব্যক্তিগত সোর্সের মাধ্যমে জানতে পারলাম আমাদের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল এম এইচ খান সেখানে বন্দি অবস্থায় আছেন। পরদিন সকালে আমাদের ব্যাটালিয়ানের কমান্ডিং অফিসার হয়ে আসেন লে. কর্নেল রকিবউদ্দিন আহম্মেদ। তিনি একটি পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন। আমাদের হয়ে যেন কাজ করতে না পারেন এজন্য তাঁর পরিবারকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আটকে রেখে আমাদের কাছে পাঠিয়েছিল পাকবাহিনী। তিনি আমাদের কমান্ডিং অফিসার হলেও ঐ সময় আমরা তার কোনো আদেশে কর্ণপাত করি নি। আমরা আমাদের পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী মেজর শফিউল¬াহ, মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী, ক্যাপ্টেন এসএসএম নাসিম, ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমান, ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরী, লে. জি এম হেলাল মোর্শেদ, লে. সৈয়দ ইব্রাহিম, লে. আব্দুল মন্নান ও মেজর নুর”ল ইসলাম শিশু-র নেতৃত্বে আমাদের কার্যকলাপ অব্যাহত রাখি। ঐ সময়ে আমাদের যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা হলেন ক্যাপ্টেন এএসএম নাসিম (বীর বিক্রম), (বর্তমানে লে. জেনারেল, অবসরপ্রাপ্ত), মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী (বীর বিক্রম), ক্যাপ্টেন জিএম হেলাল মোর্মেদ খান (বীর বিক্রম), ক্যাপ্টেন এজাজ আহমেদ চৌধুরী (বীর বিক্রম), এবং ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমান (বীর বিক্রম), এরা সকলেই বর্তমানে মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত।
২৩ মার্চ ১৯৭১, ব্রিগেডিয়ার মজুমদার-এর সাথে মিটিং-এর পরে আমারা পরিকল্পনা নিয়েছিলাম যে রাজেন্দ্রপুরের আর্মস এমিনেশন ডিপো আমাদের আয়ত্বে আনতে হবে। পাশাপশি ৪৮ জন সৈনিকের একটি টিম বছাই করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন সুবেদার তোফায়েল আহমদ, আমি মোখলেছুর রহমান, নায়েক তাজুল ইসলাম, নায়েক হাফিজ, নায়েক মোহাম্মদ আলী, নায়েক আব্দুল হক, নায়েক মোজাম্মেল হক, হাবিলদার মঙ্গল মিয়া ও অন্যরা। এদের দায়িত্ব ছিল অর্ডার পাওয়ার সাথে সাথে রাজেন্দ্রপুরের আর্মস এমিনেশন ডিপো নয়টা দলে ভাগ হয়ে দখল করা। ওখানে সাতটি পোস্টে বেলুচ রেজিমেন্টের ৯০ জন সৈন্য পাহারায় ছিল। ২৫ মার্চ রাত ১২ টার পর আমরা অর্ডার পাই। তখন আমরা ডিপো এলাকায় পৌঁছে যাই। অয়ার কর্টারের সাহায্যে আমরা তার কেটে ভেতরে ঢুকি। ভোর রাত চারটার সময় আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ করি। তখন ঘুমন্ত প্রায় ৩২ জন বেলুচ রেজিমেন্টের সৈন্য আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ভোর ৫ টায় আমরা বেটেলিয়ান হেড কোয়ার্টারে সংবাদ দেই যে, রাজেন্দ্রপুরের আর্মস এমিনেশন ডিপো আমদের আয়ত্ত্বে। এটা ছিল পাকবাহিনীর উপর আমাদের দ্বিতীয় আপারেশন। এ সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে আমাদের ২ নং কোম্পানিকে রাজেন্দ্রপুরের আর্মস এমিনেশন ডিপো রক্ষায় পাঠানো হয় এবং আমাদের রেস্টে আনা হয়। উল্লেখ্য রাজেন্দ্রপুর থেকে দখল করা আর্মস এমিনেশন দিয়ে পরে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথমস্তরে নয়টি সেক্টর গঠিত হয়। এই সকল আর্মস এমিনেশন দিয়ে দীর্ঘ নয় মাস বীর মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করেন। এই অস্ত্রগুলিই ছিল তাদের মূল সহায়ক।
পর ২০ মার্চ হতে ২৫ মার্চ পর্যন্ত আমরা ক্যান্টনমেন্ট এবং ঢাকার সম্পূর্ণ খোঁজ-খবর সংগ্রহ করতে থাকি এবং যুদ্ধের জন্য ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। আমাদের সেকেন্ড ইন কমান্ডার তৎকালীন মেজর শফিউল¬াহর নেতৃত্বে ২৬ মার্চ আমাদেরকে ভারি অস্ত্রশস্ত্রসহ ময়মনসিংহ এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আবার ওই দিনই বিকালে মেজর নূর”ল ইসলামের নেতৃত্বে ৩ নং কোম্পানিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় টাঙ্গাইল শহর এলাকায়। তা ছাড়া ২ নং কোম্পানিকে নিযুক্ত করা হয় রাজেন্দ্রপুর আর্মস অ্যামিনেশন ডিপো এলাকায়। রাজেন্দ্রপুর ডিপো হতে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবার”দ ট্রেনে করে ময়মনসিংহে নিয়ে যাওয়ার জন্য ময়মনসিংহের তৎকালীন ডিসি হাসানকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশমতো তিনি ময়মনসিংহ হতে সম্ভব সমস্ত রেল ওয়াগন ও ইঞ্জিন রাজেন্দ্রপুরের উদ্দেশে পাঠিয়ে দেন। ওয়াগন ও ইঞ্জিনগুলি রাজেন্দ্রপুর ডিপোতে পৌঁছলে ঐ এলাকার এমপি সামসুল হক ও আজিমুদ্দিন মাস্টারের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ অস্ত্র গোলাবার”দ রাজেন্দ্রপুর ডিপো হতে ট্রেনে ওঠানোর জন্য আমাদেরকে সাহায্য করেন। এদিকে ক্যাপ্টেন নাসিম-এর নেতৃত্বে একটি শত্তিশালী প¬াটুন টঙ্গি এলাকায় পাঠানো হয় যাতে ঢাকা হতে পাকবাহিনী আমাদের উপর কোনো আক্রমণ করতে না পারে। ২৭ মার্চ মজুদ অস্ত্র গোলাবার”দ রাজেন্দ্রপুর হতে ২ নং কোম্পানিসহ ওইসব ট্রেনের সাহায্যে ময়মনসিংহে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
২৭ মার্চ বেলা ২টার পর আমাদের অর্ডার শুনানো হয়Ñ জয়দেবপুর এলাকা ছেড়ে যুদ্ধের জন্য অন্যত্র যেতে হবে এবং সবাই যার যার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও কাপড় চোপড় নিজ নিজ কক্ষে রেখে যাবে, যাতে করে যুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র, সরঞ্জামাদি ও গোলাবার”দ সাথে করে নেওয়া যায়। সেই দিন আমি আমার কক্ষের একটি বাক্সে ১৯৬৫ সালে জমাকৃত বিশ হাজার টাকা মূল্যের ২০ বছর মেয়াদী পোস্টাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের চখও-৩৩০গউ নং পলিসির কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় কাপড় চোপড় রেখে যাই। তা ছাড়াও আমার ব্যক্তিগত অতি শখের এসবিবিএল স্পেনের তৈরি একটি বন্দুকও অস্ত্রাগারে রেখে যাই। সে দিন আমার মতো অনেক মুক্তিপাগল বীর সৈনিকেরা তাদের ব্যক্তিগত অনেক কিছু রেখে যান। যুদ্ধের জন্য সেদিন আমি সাথে করে নিয়েছিলাম একটি এসএমজি, দুইটি পিস্তল ও পর্যাপ্ত পরিমাণ গোলাবার”দ।
ঐ দিন ২৭ মার্চ সন্ধ্যায় জয়দেবপুরে আমাদের আরও একটি নির্দেশ থাকে- সেটা ছিল বেতার যন্ত্রের সংকেত; এক হতে সাত গণনার সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি অফিসার, সেজিও এবং সৈনিকদেরকে গুলি করে হত্যা করতে হবে এবং সময় অপচয় না করে শ্মশান এলাকায় পৌঁছে যেতে হবে। আমার গ্র”পের অন্য চার জন হলেন, নায়েক আ. লতিফ, নায়েক সেকান্দার আলী এবং সিপাহী রিয়াজ। আমাদের দায়িত্ব ছিল জয়দেবপুর রাজবাড়ীর সামনের অফিসার মেস। ঐ মেসে ৪ জন পাক সেনা অফিসার ছিল। যাতে তারা পালাতে না পারে সে জন্য গুলি করে তাদের হত্যা করা, কিন্তু সংকেত বাজার পূর্বেই রাজবাড়ীতে গোলাগুলি শুর” হয়ে যায়। এমতাবস্থায় বাধ্য হয়ে আমাদেরকে অফিসার মেসে ব্রাশ ফায়ার করতে হয়। এতে পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন রিয়াজ খান গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আমার সামনে। ঠিক ঐ মুহূর্তে মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী ও সুবেদার গিয়াস একটি জিপের উপরে ভারী মেশিনগান বসিয়ে প্রথম গেইট হতে অফিসার মেসের দিকে ব্রাশ ফায়ার করতে করতে সামনের দিকে আসছিলেন এবং ফায়ারগুলি আমার মাথার উপর দিয়ে ম্যাসে আঘাত করছিল। আমি বারবার চিৎকার করে বলছিলাম আমরা নিচে পজিশনে আছি। কিন্তু তারা তা শুনতে পান নি। কিছুক্ষণ পরে সুবেদার গিয়াস আমার আওয়াজ শুনতে পান এবং ফায়ারিং বন্ধ করে নির্দেশ দেয় যে, আমাদেরকে চলে আসতে হবে। তখন আমি আমার সাথী কাউকে সেখানে দেখতে না পেয়ে কালবিলম্ব না করে একটা মাঝারি ধরনের দেওয়াল পার হয়ে একা রাজবাড়ীর পুকুরের ঢালুতে চলে যাই এবং পরে শ্মশান এলাকায় পৌঁছি। ওই সময়টা আমার জন্য খুবই বিপজ্জনক ছিল। শ্মশান এলাকায় পৌঁছে কাউকে না পেয়ে আমি হাঁটতে শুর” করি। পথিমধ্যে আমি ল্যান্স নায়েক মজিবুর রহমানকে পাই। সে আমাকে নিয়ে পাক সুবেদার আইয়ুব খানের বাসায় যায়। সেখানে পাক সুবেদার আইয়ুব খানকে না পেয়ে তার পরিবারের সবাইকে গুলি করে হত্যা করি এবং আসার পথে বিহারি দুটি কন্ট্রাক্টরকে পেয়ে তাদেরও গুলি করি। পরে আমরা জয়দেবপুর বাজার এলাকায় আসি। কিছুক্ষণ পর সুবেদার মেজর নুর”ল হক ও ক্লার্ক মোল¬া হাসান একটি পিকআপ নিয়ে বাজারে এলে আমাদেরকে দেখে গাড়িতে তোলেন এবং ঐ গাড়িতেই আমরা মধুপুর জঙ্গলে পৌঁছাই। মধুপুর জঙ্গল এলাকায় তখন পাকিস্তানি বাহিনীর অনেক সৈন্য অয়ারলেস সেট নিয়ে ট্রেনিং অবস্থায় ছিল। আমরা তাদেরকে ঘেরাও করলে তারা সহজে আত্মসমর্পণ করে, আক্রমণ করার দরকার হয় নি। তাদের কাছ থেকে অনেক শক্তিশালী অয়ারলেস সেট ও কয়েকটা জিপগাড়ি উদ্ধার করি যা পরে আমাদের খুব কাজে লেগেছিল।
২৮ মার্চ বিকালে আমরা টাঙ্গাইল হয়ে ময়মনসিংহের উদ্দেশে রওনা হই। ২৯ মার্চ আমরা ময়মনসিংহ সার্কিট হাউজ এলাকায় পৌঁছাই এবং সেখানে রাত্রি যাপন করি। ৩০ মার্চ দিবাগত রাত্র ১২.০১ মিনিটে আমরা ময়মনসিংহ বিডিআর ক্যাম্পে আক্রমণ করে ইস্ট পাকিস্তানের মোজাহিদ ট্রেনিংয়ের জন্য রক্ষিত অনেক অস্ত্র গোলাবার”দ উদ্ধার করি এবং বিডিআরের বাঙালি সৈনিকদেরকে সাথে করে পুনরায় সার্কিট হাউজ এলাকায় ফিরে আসি। এখানে উলে¬খ্য যে, ময়মনসিংহ হতে ট্রেন যোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার পূর্বে আমাদের ব্যাটালিয়ান কমান্ডার মেজর শফিউল¬াহ পরিকল্পনা করেছিলেন ঢাকা আক্রমণ করার। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্যাপ্টেন মতিউর রহমান-এর নেতৃত্বে ২০০ সৈনিকের একটি বহর পাঠিয়ে দেওয়া হয় নরসিংদী, পাঁচদোনা ও ঘোড়াশাল এলাকায়। তাছাড়া আরেকটি বহর ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ-এর নেতৃত্বে ভৈরব ব্রিজ এলাকায় পাঠানো হয়। তবে আমরা কিশোরগঞ্জ এলাকায় পৌঁছানোর পর মেজর খালেদ মোশাররফ ব্রাহ্মণবাড়িয়া হতে আমাদের ব্যাটালিয়ান কমান্ডার মেজর শফিউল¬াহ সাহেবের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং মেজর শফিউল¬াহ সাহেবকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য অনুরোধ জানান। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে মুক্ত অঞ্চল ঘোষণা করে তারা তাদের দুইজনের সমন্বয়ে সৈনিকদের পুনর্গঠন করে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। ঐ সিদ্ধান্ত মোতাবেক ক্যাপ্টেন মতিউর রহমানকে পেছনে ফিরে আসতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
পরদিন ১ এপ্রিল বেলা ১১টার সময় ময়মনসিংহ হতে ট্রেন যোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উদ্দেশে রওনা হই। কিশোরগঞ্জ পৌঁছানোর পর আমাদের উপর পাকবাহিনীর বিমান আক্রমণ শুর” হয়। সেখানে আমরা ট্রেন হতে নেমে পড়ি। ঐ রাত্রেই আবার কিশোরগঞ্জ হতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে চলে যাই। ২ এপ্রিল মঙ্গলবার রাত দুইটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেল স্টেশনে পৌঁছাই। ৩ এপ্রিল বুধবার আমাদের ১ নং কোম্পানিকে ক্যাপ্টেন নাসিম সাহেবের নেতৃত্বে ভৈরব, আশুগঞ্জ এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে ৪ নং কোম্পানিকে মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া (দক্ষিণ ও পশ্চিমে গোকর্ণ ঘাট) এলাকায়, ২ নং কোম্পানিকে সরাইল এলাকায় এবং ৩ নং কোম্পানিকে ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে সিলেটের শমসেরনগর এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আমার কোম্পানি কমান্ডার মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরীর নির্দেশ মতে ওই দিনই আমি আমার সেকশনে একটি ভারি মেশিনগান নিয়ে চলে যাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দক্ষিণে তিল¬াকপীর ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায়। আমার সঙ্গে ছিল নায়েক মোজাম্মেল ও আরো অনেকে। ৭ এপ্রিল বিকালে ক্যাপ্টেন আইনুদ্দিন ঐ এলাকার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাকবাহিনীর বিমানগুলি ৪ এপ্রিল হতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উপর আক্রমণ চালালে সেখানে আমাদের সিপাহী মহসিন শহীদ হন।
৮ এপ্রিল আমাদেরকে ভারি মেশিনগানসহ লালপুর এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে আমরা ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত অবস্থান করি। ১৪ এপ্রিলে আমাদের উপর পাকবাহিনীর স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর যৌথ আক্রমণ শুর” হলে আমরা সকাল হতে বেলা ১১টা পর্যন্ত তাদের আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকি। এক পর্যায়ে আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যুহ ভেঙে পড়ে। এ অবস্থায় লে. মান্নান আমাদের প্রতিরক্ষা ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ পাঠান। তখন আমরা সুবেদার মনির হোসেনের নির্দেশে আশুগঞ্জের দিকে ক্যাপ্টেন নাসিম-এর কোম্পানির সাথে যোগ দেওয়ার জন্য দৌঁড়াতে থাকি। পথভ্রষ্ট হয়ে আমরা মেঘনা নদীর পাড়ের দিকে চলে যাই। সেখানে জানতে পারি পাকবাহিনীর সাথে ক্যাপ্টেন নাসিম-এর নেতৃত্বাধীন আমাদের বাহিনীর তুমুল মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে। সেই সংঘর্ষে সুবেদার সিরাজসহ আরো ৪ জন সৈনিক শহীদ হন। তা ছাড়া ক্যাপ্টেন নাসিম-এর কোম্পানি ও আশুগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা পিছনে চলে গেছেন আর সেখানে পাকবাহিনী অবস্থান করছে। কিছু সিভিলিয়ান এসে বললো, আপনারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে চলে যান। তখন আমরা ঐ এলাকার দুইজন লোক নিয়ে বিকাল বেলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছাই এবং আমাদের কোম্পানির সাথে মিলিত হই। ওই দিন ১৪ এপ্রিল রাত্রে লে. মান্নান-এর সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হতে সাহাবাজপুর ব্রিজের পূর্বপাশে রাজা পাইরাকান্দি গ্রামে পুনরায় প্রতিরক্ষা গড়ে তুলি। পাকবাহিনীর স্থল ও বিমান আক্রমণ তখনও এলাকায় অব্যাহত ছিল। ১৬ এপ্রিল হতে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত আমরা তা প্রতিহত করি। ২৩ এপ্রিল পাকবাহিনীর সাথে তুমুল সংঘর্ষ হলে সন্ধ্যার পর আমরা একটু পিছু হটে রামপুর ব্রিজ হতে চান্দরা বাজার এলাকায় প্রতিরক্ষা গড়ি। উল্লেখ্য যেখানে প্রতি কোম্পানিতে দুটি মেশিনগান থাকে সেখানে আমাদের কাছে প্রতি প্লাটুনে দুটি করে হেভি মেশিনগান ছিল। এর ফলে পাক বাহিনী আমাদের হাতে যথেষ্ট মার খায় এবং তাদের প্রথম আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হই। এখানে ৭০ জন পাক সেনা নিহত হয় এবং প্রায় শতাধিক আহত হয়েছিল। ১০ মে পর্যন্ত চান্দরা ও মাধবপুর এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাকবাহিনীর সাথে আমাদের যুদ্ধ হয়। মে মাসের ১৪ তারিখে পাকবাহিনী আমাদের উপর অতর্কিত হামলা করলে চান্দরা ও মাধবপুর এলাকায় আমাদের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। ঐ হামলায় পাকবাহিনীর সৈন্যরা হতাহত হয় এবং আমাদের হাবিলদার মোহাম্মদ রফিক শহীদ হন। পরে আমরা ভুল¬া, পাঁচগাঁও, হরেশপুর ও পাইকপাড়া এলাকায় নতুন করে প্রতিরক্ষা গড়তে বাধ্য হই। সেখান হতে আমরা চান্দরা, মাধবপুর, শাহবাজপুর, সাতগাঁও এলাকায় রেইড এ্যাম্বুস আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকি। ঐ সময় আমাদেরকে দুঃসাহসী নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ ও মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী।
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]

২২ মে নায়েক মোজাম্মেল ও দুই সিপাহীকে আমার সাথে দিয়ে পাঠানো হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়ার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য। আমরা ঐ দিনই ৮টি এন্টিট্যাংক মাইন নিয়ে কাছাইট গ্রামের লোকমান মিয়ার বাড়িতে পৌঁছাই। সেই দিন রাত্রে লোকমান মিয়ার সহযোগিতায় তিনটি মাইন ভাদুঘর গ্রাম ও সুহাতা গ্রামের মাঝখানে রেলওয়ের ব্রিজের নিকটে পুঁতে রাখি। পরের দিন লোকমান মিয়ার সহায়তায় বাসুদেব ও ভাতশালা গ্রামের মাঝখানের রেল লাইনের উপর আরো তিনটি মাইন পুঁতে আসি। পুঁতে আসার কয়েক ঘণ্টা পর জানতে পাই ভাতশালার মাইনগুলো ওই এলাকার চেয়ারম্যান রাজাকার আফু মিয়া পাকবাহিনীকে সাথে নিয়ে উঠিয়ে ফেলেছে। রাজাকার আফু মিয়ার তথ্যমতে আমাদেরকে ধরার জন্য কাছাইট গ্রামের রাজাকার হুমায়ুনকে সাথে নিয়ে পাকবাহিনী লোকমান মিয়ার বাড়িতে রাত্রে হানা দেয় এবং আমাদেরকে প্রায় ঘিরে ফেলে। আমরা খবর পাওয়ার সাথে সাথে রাতের অন্ধকারে ঝোপের ভিতর দিয়ে সেখান থেকে কোনোমতে পালাতে সক্ষম হই। পরে পাশের আটলা গ্রামের হামুদ মিয়ার ভাই রোকন মিয়ার একটি ঘরে গোপনে আশ্রয় নেই। ভোরে আমরা রোকন মিয়ার ঘরে নাস্তা করার সময় জানতে পাই লোকমান মিয়াকে পাক বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে এবং আধ ঘণ্টার মধ্যে পাক বাহিনী আমাদের ধরার জন্য আটলা গ্রামের দিকে আসছে। কালবিলম্ব না করে আমরা সেখান থেকে দৌড়ে, বিল সাঁতরে সিংগারবিল বাজারে পৌঁছি। বিকালে জানতে পারি আমাদের আশ্রয় দেয়ার অপরাধে পাকবাহিনী আটলার ওই বাড়িটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং ছয় জনকে গুলি করে হত্যা করে।
২৭ মে ভুল¬া গ্রামের পশ্চিম পাশে আমাদের দুটি সেকশনের প্রতিরক্ষা পজিশন ছিল। ভুল¬া গ্রামের পশ্চিম পাশে একটি ছোট নদী ছিল যার নাম হরেশপুর নদী। নদীর পূর্ব পাড়ে ছিল আমাদের পজিশন এবং পশ্চিম পাড়ে ছিল একটা বড় বটগাছ। বটগাছের ৫০ গজ দক্ষিণে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি। ওই বাড়ির পেছনে একটি খোলা মাঠ ও ৪-৫ ফুট উঁচু পাটক্ষেত। ঐ বাড়ি ও বটগাছের পেছন থেকে ৩০ মে আনুমানিক বেলা ৩টায় পাকবাহিনী আমাদের উপর স্থল আক্রমণ করে। আমরাও ব্রাশ ফায়ার করতে থাকি। ফায়ার এতটা নিখুঁত হয়েছিল যে প্রায় সব পাক সেনা পড়ে যায়। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম কৃষকরা আহত নিহতদের টেনে নিচ্ছে আর খানসেনাদের চলাচলে পাটখেত নড়ছে। তখন পাক বাহিনীর অন্য একটি দল পেছন ঘুরে উত্তর দিক থেকে আমাদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। আমরা ভয়ানক বিপদে পড়ে সাহয্যের আবেদন পাঠাই এবং আমাদের উপর আক্রমণের খবর পেয়ে মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে হাবিলদার জব্বার ও কাদের পাটোয়ারীসহ আরো অনেকে দক্ষিণ দিক থেকে অর্থাৎ পাইকপাড়া গ্রামের পাশ থেকে তুমুল কভারিং ফায়ার দেন। যার ফলে পাক বাহিনীর কবল হতে কোনরকমে রক্ষা পাই, – যা আমার চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। পাকবাহিনীর গোলার আঘাতে ওই ভুল¬া গ্রাম ধূলিস্মাৎ হয়ে অনেক সাধারণ মানুষ মারা যায়। বহু ঘরবাড়ি, গর”, ছাগল ও সম্পদ বিনষ্ট হয়।
পরে আমাদের কোম্পানি, মোকন্দপুর, ধর্মগড়, মনতলা এলাকায় প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে। সেখান হতে আমরা রেইড অ্যাম্বুশ-এর মাধ্যমে পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ অব্যাহত রাখি। ওই এলাকায় পাকবাহিনী অর্তিকত হামলা চালালে আমরা জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের কলকলিয়ার চা বাগানের পাশে ক্যাম্প স্থাপন করি। কলকলিয়া ক্যাম্প হতে আনুমানিক ১০ জুন ভোর বেলা আমরা ৪ নং কোম্পানি মঙ্গলপুর চৌমুহনী হাই স্কুল এলাকায় পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষার উপর অতর্কিত আক্রমণ চালাই। সেখানে আমরা ফায়ারের সাহায্যে পাকবাহিনীর বাংকারগুলি ধ্বংস করি। এতে পাক বাহিনীর অনেকে হতাহত হওয়ায় তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ঐ সময় আমাদের কোম্পানির নেতৃত্ব দেন মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী। আমার প¬াটুন কমান্ডার ছিলেন ওয়াজেদ আলী বারকি। আমি ছিলাম ১ নং সেকশন কমান্ডার আর ২ নং সেকশন কমান্ডার ছিলেন নায়েক তাজুল ইসলাম। তা ছাড়া ৩ নং সেকশন কমান্ডার ছিলেন নায়েক হাফিজুর রহমান। আমাদের আরো দুইটি প¬াটুনের নেতৃত্ব দেন সুবেদার মমিন ও কাদের পাটোয়ারী।
ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ-এর নেতৃত্বে ১৭ জুন বহেরা গ্রামের চৌরাস্তায় পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষার উপর আমরা অতর্কিত হামলা চালাই। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুর” হয়। এক পর্যায়ে পাকবাহিনী আমাদের চারদিকে ঘিরে ফেলে। সেখানে প্রায় ৮ ঘণ্টার মতো আটকা পড়ি এবং তাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করি। এতে ল্যান্স নায়েক দুলু মিয়া (বিডিআর) গুর”তর আহত হয়। আমাদেরকে উদ্ধার করার জন্য তৎকালীন সেক্টর কমান্ডার শফিউল¬াহ ক্যাপ্টেন নাসিম-এর কোম্পানিকে নিয়ে আক্রমণ চালান। আক্রমণের ফলে আমরা পাকবাহিনীর ঘেরাও থেকে বের হতে সক্ষম হই।
১২ সেপ্টেম্বর সকালে ক্যাপ্টেন হেলাল-এর নেতৃত্বে আমরা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে মোকন্দপুর রেলওয়ে স্টেশনের দক্ষিণ-পশ্চিম অর্থাৎ রেললাইনের পশ্চিমাংশে অবস্থিত পাকবাহিনীর একটি প্রতিরক্ষার উপর অতর্কিত হামলা চালাই। ওই আক্রমণে আমরা ১০৬ মিলিমিটার আরআর-এর ৩৬ পাউন্ড ওজনের ৪টি গোলা ব্যবহার করে পাকবাহিনীর বাংকারগুলি ধ্বংস করি। এতে পাক বাহিনীর একজন জেসিওসহ ৮ জন সৈন্য নিহত ও অনেক সৈন্য আহত হয়। আমাদের একটি দলে ছিলেন সিএইচএম কাদের পাটোয়ারী, নায়েক আবদুল হক, সিপাহী আশরাফ ও আবদুল বারী। আরেকটি দলে ছিলেন হাবিলদার চাঁন মিয়া, হাবিলদার শফি, নায়েক মোহন মিয়া ও নায়েক হাফিজ। অন্য দলে ছিলেন হাবিলদার ওয়াজেদ আলী বারকি, নায়েক মোখলেছুর রহমান, নায়েক তাজুল ইসলাম, নায়েক রওশন আলী। তা ছাড়াও আমাদের সাথে আরও ৪৬ জন সৈনিক ছিলেন।
১৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত্রে মোকন্দপুর এলাকায় ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ-এর নেতৃত্বে আমরা পাকবাহিনীর একটি চলন্ত ট্রেন ডিনামাইটের সাহায্যে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেই এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সাহায্যে ফায়ার অব্যাহত রাখি। এর ফলে পাকবাহিনীর একজন লে: কর্ণেল ও একজন ক্যাপ্টেন সহ প্রায় ৩০ জন সৈন্য নিহত হয় ও আরো অনেকে গুর”তর আহত হয়। সেটি ছিল পাকবাহিনীর অন্যতম বড় পরাজয়। উক্ত আক্রমণে যারা গুর”ত্বপূর্ণ ও সাহসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে আমিসহ ছিলেন হাবিলদার ওয়াজেদ আলী বারকি, হাবিলদার শফিক (কমান্ডো), নায়েক রওশন আলী, নায়েক তাজুল ইসলাম, নায়েক মোহন মিয়া, সিপাহী ফজলুল করিম ও আরো ৮ জন সিপাহী। সেপ্টেম্বর মাসের শেষে মনতলা ধর্মঘর এলাকায় পাকবাহিনীর একটি প্রতিরক্ষার উপরও আমরা অতর্কিত আক্রমণ চালাই এবং এতে পাক বাহিনীর অনেক সৈন্য নিহত হয়।
ভারতের ধুরানাল ক্যাম্প হতে ধর্মগড় চৌরাস্তার নিকটে স্কুলের পাশে অবস্থিত পাকবাহিনীর একটি প্রতিরক্ষার উপর কয়েকদিন রেকি করে ২৮ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে আমরা পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালাই। ঐ আক্রমণে আমাদের সেক্টরের ২টি কোম্পানি অংশগ্রহণ করে। একটির কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন আবদুল মতিন । আরেকটি অর্থাৎ আমার কোম্পানির নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ। তা ছাড়া ঐ আক্রমণে আমাদের মোটর আর্টিলারি ফায়ার দিয়ে সাপোর্ট দিয়েছিলেন মোটর প¬াটুন কমান্ডার হাবিলদার আবদুল জব্বার। ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে আকাশ খুবই অন্ধকার ও মেঘলা ছিল এবং সেই সাথে পুরো এলাকাটি ছিল কর্দমাক্ত। সে জন্য আক্রমণ চালাতে আমাদের কমান্ডার লেভেলে সকলকে টর্চ লাইট ব্যবহার করতে হয়। টর্চ লাইটের মাথায় আমরা কাপড় ব্যবহার করি যাতে শত্র”পক্ষ দূর থেকে আলো দেখতে না পায়। সে ক্ষেত্রে টর্চ লাইটের ইশারা ইঙ্গিতের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে নির্দেশ আদান প্রদান হয়েছিল। ঐ আক্রমণটি ছিল খুবই ফলপ্রসূ। কারণ যখন আমরা আক্রমণ শুর” করি তখন প্রচুর বৃষ্টি ও আঁধারে পাক বাহিনী আমাদের গতিবিধি কিছুই আঁচ করতে পারে নি। আমাদের ফায়ারের শব্দে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। আমরা যখন আক্রমণ শেষ করে ফিরে যাব ভাবছি ঠিক সে সময়ে পাকবাহিনীর একটি দল পেছন দিক থেকে প্রচুর ট্রেসার ফায়ার করে পুরো এলাকা আলোকিত করে। এতে আমাদের উইথড্র করতে বেশ কষ্ট হয়েছিল।
অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে ধর্মগড়, গোবিন্দপুর গ্রামের মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় পাকবাহিনীর আরো একটি প্রতিরক্ষার উপর ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে তাদের প্রতিরক্ষাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে অনেক অস্ত্র, গোলাবার”দ উদ্ধার করি। এই যুদ্ধে অনেক পাক সৈন্য হতাহত হয়। আমাদের সঙ্গে থাকা একজন ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছিলেন। ৩০ অক্টোবর আমরা ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ-এর নেতৃত্বে ফেনীর পরশুরাম এলাকায় আক্রমণের জন্য মেজর জাফর ইমাম-এর রাজনগর ক্যাম্পে পৌঁছাই। ২ নভেম্বর ঐ এলাকায় রেকি করার সময় মাইনের আঘাতে হাবিলদার আব্দুল জাব্বার-এর একটি পা উড়ে যায়। ৩ নভেম্বর রাতে পরশুরাম এলাকায় পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষার ভেতরে ইনফেলট্রেশন করে ঢুকে পড়ি। শেষ রাত্রে তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে সম্পূর্ণভাবে পরাভূত করে পাকবাহিনীর জীবিত ও আহত প্রায় একশ-র উপরে সৈন্য আটক করি। ৪ নভেম্বর সকালে আমার সেকশনের পজিশন ছিল একটি পুকুরের পাড়ে। ওটা ছিল অনন্তপুর গ্রামের পূর্ব পাশে ও রেলওয়ে লাইনের পশ্চিম পাশে। পরের দিন ভোর পাঁচটার দিকে আমি দেখতে পাই পাকবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন-এর নেতৃত্বে পাঁচজন সৈনিক রেলে ট্রলির মাধ্যমে রেশন নিয়ে যাচ্ছে। তৎক্ষণাৎ সাথের সবাইকে অবহিত করি। আমরা সময়ক্ষেপণ না করে রকেট লাঞ্চারের মাধ্যমে ফায়ার করি এবং ঘটনাস্থলে তারা নিহত হয়। ঘটনার পর ঐ দিন পাকবাহিনীর বিমানগুলো আমাদের উপর উপযর্ুুপরি আক্রমণ চালাতে থাকে। এতে আমার সেকেন্ড-ইন-কমান্ডার ল্যান্স নায়েক আবদুল লতিফ গোলার আঘাতে শহীন হন। অবশেষে আমরা পরশুরাম এলাকায় পাকবাহিনীকে পরাভূত করি। তা ছাড়াও মুন্সীরহাট, কালীর বাজার, ফেনী এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আমরা মুক্ত করতে সক্ষম হই।
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা নিজ সেক্টরে অর্থাৎ ৩ নং সেক্টরে ফিরে আসি। ৩ ডিসেম্বর শেষ রাতে আমরা আজমপুর সিংগারবিল এলাকায় পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ করি। সেই আক্রমণে আমাদের লে. বদিউজ্জামান শহীদ হন। তা ছাড়াও আমার পাশে থাকা হাবিলদার আশরাফ আলী ও ৭ জন সৈনিক শহীদ হন। সেই এলাকায় আমরা ডিফেন্সে থাকি পাঁচ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
৬ ডিসেম্বর আমরা মনতলা, হরেশপুর এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি। ৭ ডিসেম্বর তারিখে আমাদের ডান পাশে থাকা ১১ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর নাসিম চান্দুরা বিরামপুর এলাকায় গুর”তর আহত হন। পরে আমরা সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লালপুর দিয়ে রায়পুরা আসি। রায়পুরায় একদিন অবস্থান করে নরসিংদী হয়ে সোনারগাঁও এলাকার পোড়াবাড়ী গ্রামে অর্থাৎ ডেমরা নদীর পূর্ব পাশে প্রতিরক্ষা নিই। ১৪, ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বরের ২.৩০ মিনিট পর্যন্ত সেই এলাকায় প্রতিরক্ষায় থাকি। পরে ডেমরা নদী পার হওয়ার পর আমাদের নিকট পাক বাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ান আত্মসমর্পণ করে। ঐ পাকবাহিনীর ব্যাটালিয়ানকে নিয়ে ঢাকার দিকে রওয়ানা হই। বিকাল ছয়টার দিকে টিকাটুলি দিয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে পৌঁছাই। ঐ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে আগুন জ্বলছিল। সে আগুন নিভানোর জন্য আমাদের এক প¬াটুন সৈন্য সেখানে নিয়োগ করা হয় এবং সেই আগুন আমরা আয়ত্তে আনি। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশি¬ষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে আমরা ব্যাংকের দায়দায়িত্ব বুঝিয়ে দিই। আমরা জানতে পারি যে, আমাদের পূর্বের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল এম এইচ খান ঢাকা জেলখানায় বন্দি আছেন। তখন আমরা তাকে জেলখানা থেকে মুক্ত করে আনতে যাই। আমাদের যাওয়ার খবরে জেলখানার কর্মকর্তা কর্মচারী সবাই ভেগে যায়। বাধ্য হয়ে অনুমতি নিয়ে গুলি করে জেলখানার তালা ভেঙে ফেলি। তখন দুর্বার স্রোতের মতো বন্দীরা বের হতে থাকে। শেষে আমরা অফিসারদের দেখা পাই।
পাকিস্তানী বাহিনি তো দক্ষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছিল, কখন কিভাবে বুঝলেন পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে আপনার জিততে পারবেন?
মো. র. : পাকিস্তানী সেনাবাহিনি চাকুরির খাতিরে যুদ্ধে করছিল। আর আমাদেও জীবন মরণ, পরিবার রক্ষা, দেশ রক্ষা। মাতৃভূমি রক্ষা। আমরা জিতব না, এমন হতেই পাওে না।
পাকিস্তানি সেনা আর আপনাদের কৌশলগত পার্থক্য কী ছিল?
মো. র. : এ মাটি আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল। গেরিলা ও নিয়মিত উভয় যুদ্ধেই তাদের চেয়ে দিন দিন এগিয়ে গেছি আমরা।
স্বাধীনতার ৪০ বছর পর স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার হচ্ছে এ বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া?
মো. র. : দেশ পাপমুক্ত হচ্ছে। এ বিচার বাংলাদেশকে বিশ্বেও দরবাওে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

 ৪৮ বছর পর এসে কি মনে হয় আপনার যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছেন তা কতটা সফল, কতটা ব্যর্থ?
মো. র. : এটা ভাবি না। তখনকার প্রেক্ষিতে যা করণীয় ও সঠিক তাই করেছি। দেশকে মাতৃভূমিকে হায়েনার হাত থেকে রক্ষা করেছি। আমার সন্তানরা একটি স্বাধীন দেশে বেড়ে উঠছে। তাদের একটি স্বাধীন দেশ দিয়েছি। এক জীবনে এর চেয়ে বেশি আর চাওয়া পাওয়া কি থাকতে পারে।

 তর”ণ সমাজের প্রতি আপনার কোনো বক্তব্য?
মো. র. : আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। বাবারা তোমরা তা রক্ষা করো।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here