মুক্তিযুদ্ধের অদৃশ্য রক্তদানা মুক্তিযুদ্ধের অধিপতি ইতিহাসে বাংলাদেশের আদিবাসীদের প্রশ্নহীন প্রান্তিকতা- পাভেল পার্থ

0
315

মুক্তিযুদ্ধের অদৃশ্য রক্তদানা
মুক্তিযুদ্ধের অধিপতি ইতিহাসে বাংলাদেশের আদিবাসীদের প্রশ্নহীন প্রান্তিকতা
পাভেল পার্থ

‘একটি দেশে নানা ধরণের, নানা বর্ণের, নানা ভাষাভাষী গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় বাস করতে পারে। কিন্তু যে পরিচয় তার সব পরিচয়কে ছাপিয়ে ওঠে তা হল তার দেশের পরিচয়। চাকমা, মারমা, সাঁওতাল, গারো , রাখাইন-এ রকম বিভিন্ন ধরনের জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে আছে। কিন্তু তাদের বড় পরিচয়, তারা সকলেই বাংলাদেশের অধিবাসী। এই পরিচয় তাদের গর্ব, এই পরিচয় তাদের অহংকার।’
(সূত্র: বাংলাদেশের উপজাতীয় সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনযাত্রা বিশেষ প্রদর্শনী ১৪০০ সালের বিশেষ স্মরণিকার ভূমিকা থেকে, বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘর, ১৯৯৪)

“বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙ্গালী বলিয়া পরিচিত হইবেন”
(গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান, ৬নং অনুচ্ছেদ, ১৯৭২ এবং সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী ২০১১)

 

 

মাঠ অভিজ্ঞতা : ১ : সুশীল মুন্ডা > সুশীল সর্দার > সুশীল বুনো > আদিবাসী সুশীল?

দুনিয়ার সবচে’ বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সীমানা ঘেঁষে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধূমঘাটে একদা গড়ে উঠেছিল রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী। ধূমঘাটেই সর্দারপাড়ায়(মুন্ডা গ্রামে) ১৯৪৮ কি ১৯৫০ সনে যখন রাষ্ট্রীয় প্রজাস্বত্ত্ব আইন চালু হয়ে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ হচ্ছে তখনি জন্ম নেন সুশীল মুন্ডা। ১৯৭০ সনে তিনি স্থানীয় ঈশ্বরীপুর ইউনাইটেড হাইস্কুলে (বর্তমান নাম ঈশ্বরীপুর সোবহান উচ্চ বিদ্যালয়) দশম শ্রেণীতে পড়তেন। একজন ভাল ফুটবল খেলোয়ার হিসেবে তার বেশ নাম ডাক ছিল। ১৯৭১ সনে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলের নেতৃত্বে ৯ নং সেক্টরের নৈকাঠি ক্যাম্পে তিনি যুদ্ধ করেন। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের প্রান্তিক জাতিদের ভেতর কেবলমাত্র তার নামই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কিছূটা জানা গেলেও তার সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। ধূমঘাটে বর্তমানে ২৫ পরিবার মুন্ডা কোনো রকমে বেঁচেবর্তে আছেন। সুশীল মুন্ডার কাকাত ভাই ধূমঘাট মুন্ডা পাড়ার প্রবীণ কৃষক যাদব মুন্ডা (৬৫) জানান, এই এলাকায় সব জমি জিরাতই ‘হাতকাটা’ সম্পত্তি। এগুলো জংগল কেটে আমরাই বের করেছিলাম এককালে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সব জমি জিরাত দখল হয়ে গেছে। ১৩০৩ বাংলা সনে ভারতের বীরভূম, উড়িষ্যা, রাঁচী, ছোটনাগপুর থেকে জংগল কাটার জন্য জমিদার আমাদের পালা করে নিয়ে আসে। আগে আমাদের জমির মাপ বিঘাতে ছিল, ১৩৪২ সনে দেশে অনেক অভাব হয়, অভাবের সময় অনেক জমি আমরা হারাই। ১৯৫০ ইংরেজী সনে জমিদার চলে গেলে আমাদের জমির মাপ বিঘা থেকে একর হয়ে যায়। আমরা একরের মাপ বুঝতাম না কিন্তু বাঙালিরা আমাদের জমি একরের মাপে নিতে শুরু করে। সুশীল মুন্ডার মা রহমনী মুন্ডা ছিলেন একজন কর্মঠ প্রাণবন্ত নারী, সুশীলের বাবা বিপিন মুন্ডা তখন ছিলেন ধূমঘাট মুন্ডা পাড়ার সর্দার (পঞ্চায়েত প্রধান)। সুশীল মুন্ডারা ৫ ভাই এবং ৩ বোন। মুক্তিযুদ্ধের পর সুশীল মুন্ডার ২ ছেলে এবং ১ মেয়ে তারা সবাই বাংলাদেশ থেকে ভারতের উত্তর চব্বিশ পরগণার ঘুমটি গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হন, কারন বাঙালিদের জন্য মুন্ডাদের জমি জিরাত কিছুই আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। সুশীল মুন্ডার সম্পর্কে জানার জন্য শ্যামনগর উপজেলার আতরজান মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ, যমুনা নদী বাঁচাও আন্দোলনের সংগঠক এবং শ্যামনগরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থের লেখক আশেক-ই-এলাহীর কাছে গেলে তিনি প্রথমেই নিজেকে একজন ‘মৌলবাদ বিরোধী’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের’ মানুষ হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি বলেন, ১৯৭১ সনের ১৯ আগস্ট শ্যামনগর থেকে মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের তাড়ায় এবং ১৯ নভেম্বর শ্যামনগর মুক্ত হয়। শ্যামনগরের মুক্তিযোদ্ধরা এখনও স্বীকৃতি পাননি, এখনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সঠিকভাবে মূল্যায়ণ করা হয়নি। সুশীল মুন্ডা আর আমরা একই স্কুলে পড়তাম, তখন তারা (মুন্ডারা) ‘সর্দার’ নামেই পরিচিত ছিল। সুশীল ‘আদিবাসী’ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় নি। তাদের অবস্থা এখনকার চেয়ে অনেক স্বচ্ছল ছিল। মুন্ডাদেরকে তখন বাঙালি হিন্দুদের ভেতরেই কিছুটা নিম্নবর্ণের ভাবা হত। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের শ্যামনগর উপজেলা ডেপুটি কমান্ডার জনাব এম এ মজিদের সাথে এ নিয়ে আলাপ হলে তিনি প্রথমেই বলেন, … ও আদিবাসী সুশীল। আমি তাকে বলি, ১৯৭১ সনেও কি আপনারা তাকে (সুশীল) ‘আদিবাসী’ হিসেবেই জানতেন? তিনি বলেন, না না না ‘আদিবাসী’ তো এখন বলছে, আমরা তাকে বুনো সুশীল বুনো বলেই ডাকতাম। তবে সুশীলের নাম আছে মুক্তিযোদ্ধা গেজেটে, সেখানে তার নাম আদিবাসী বা মুন্ডা নামে নাই, গেজেটে তার নাম আছে সুশীল সর্দার হিসেবে। সাতক্ষীরা জেলা থেকে প্রায় ৬০ কি.মি. দূরে (ধূমঘাটে পাকা সড়কের উপর সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি সড়ক নির্দেশনায় ৫৮ কি.মি. লেখা আছে) শ্যামনগরের ৮ নং ঈশ্বরীপুর ইউনিয়নের ধূমঘাট এলাকায় যাই। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কৃষ্ণপদ মুন্ডার কথামত আমরা ‘নিলু মিস্ত্রীর মোড়ে’ যাই। ভ্যান থেকে নিলুর মোড়ে নেমে এলাকার স্থানীয় প্রবীণ ও মাঝবয়েসী বাঙালি মুসলিম পুরুষদের জিজ্ঞেস করি, এখানে ‘মুক্তিযোদ্ধা সুশীল মুন্ডার’ বাড়িটা কোথায়? একটা ছোটখাট ভীড় জমে গেলেও ‘মুক্তিযোদ্ধা সুশীল মুন্ডা’ কথাটিকে কেউ বুঝতে পারছিলেন না। আমরা পরে মুন্ডা, বুনো, সর্দার, আদিবাসী সব গুলো পরিচয় বলতে থাকি এবং শেষমেষ একজন স্থানীয় বাঙালি হিন্দু নারীর সহযোগিতায় ধূমঘাট মুন্ডা পাড়া খুঁজে পাই। দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রতিটি মুন্ডা গ্রামে যাওয়ার কোনো রাস্তা না থাকলেও ধূমঘাটে ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে, কাদাডোবানো পথে কারো ঘরের দেয়াল ধরে কোনোমতে সেখানে যাওয়া যায়। গ্রামের রাস্তায় নানান বয়স ও লিঙ্গের একটা ভীড় জমে যায় মুন্ডা গ্রামে, …হ্যাঁ এটাই সুশীল মুন্ডার এলাকা, ও যুদ্ধ করেছিল। ধূমঘাট মুন্ডা গ্রামে এখন আর কোনো পঞ্চায়েত ও গ্রামপ্রধান নেই। গ্রামের প্রবীণ কৃষক অতুল মুন্ডা (৭০) জানালেন, সুন্দরবন এলাকায় মুন্ডাদের ভেতর ‘কৌওড়িয়া’, ‘রাজপুত’, ‘ভূতকোয়ার’ এই তিনটি গোত্র আছে। সুশীলও কৌওড়িয়া গোত্রের। ভারত থেকে যখন আমাদের নিয়ে আসা হয় তখনও আমাদের পরিচয় ছিল মুন্ডা, পরে আমাদের জংগল কাটার কাজ দিল বলে লোকে ডাকল ‘বুনো’, বুনো মানে আমরা বনে থাকি সাপ-ব্যাঙ-শামুক খাই এটিই সবাই ভাবত। আমাদের জায়গা হল কোনো গ্রামের এক প্রান্তে যেখানে কোনো রাস্তাঘাট নেই, কারন আমাদের সাথে কারো জলচল ছিল না, আমাদেরকে বানানো হল অস্পৃশ্য ও নিচুজাতের লোক। অথচ আমরাই বাঘের মুখে জান দিয়ে, কুমীরের কামড় খেয়ে, সাপের ছোবল খেয়ে জমিদারের জন্য জংগল কেটে জমি ‘আবিষ্কার’ করলাম। আজ সুন্দরবনের আশেপাশে যত জমি দেখা যায়, যাতে এখন লবনপানির ঘের হয়েছে তার বারোআনা জমি আমরা মুন্ডারাই বের করেছি। জানি আগের জন্মমুল্লুকে আর ফিরার কপাল হবে না, যেখানে থাকি সেটাই জন্মমুল্লুক। মুক্তির সময় তাই জান দিয়ে চেষ্টা করেছি ধরে রাখতে এই জন্মমুল্লুক, সুশীলকে আমরাই যুদ্ধে পাঠিয়েছি। মুন্ডাদের ভেতর যেকোনো কাজে পঞ্চায়েত ও সমাজের অনুমতি লাগে, এই বাংলাদেশকে এই জন্মমুল্লুককে বাঁচাতে মুন্ডা সমাজের অনুমতি ছিল। তা না হলে সব মুন্ডারাই বর্ডার ধরে ধরে আবারো রাঁচী কি বীরভূম চলে যেতে পারতো। কিন্তু কেন যে বাঙালিদের অনেকেই আমাদেরকে সহ্য করতে পারল না এবং এখনও পারে না আমরা বুঝতে পারি না। মুন্ডা নাম থেকে বুনো নামটি ব্রিটিশদেরই সময়েই । ১৯৫০ এর দিকে জমিদারি উঠে গেলে মুন্ডাদের জমি মুন্ডারা ছাড়া অন্য কারো কাছে বিক্রি করার কোনো নিয়ম ছিল না, নিয়মমত এটি এখনও নেই। কিন্তু বাঙালিরা আমাদের চাপ দিল জুলুম করল। বলল, মুন্ডা কি বুনো এইসব চলবে না এখন থেকে আমাদেরকে নামের পরে ‘সর্দার’ লিখতে হবে। সেই থেকে ‘সর্দার’ নামে আবার একটি নতুন পরিচয় তৈরি হল আমাদের। বাঙালি হিন্দু কি মুসলমান সব জাতের ভেতর ‘সর্দার’ পদবী আছে বলে আমাদেরকেও লিখতে হল ‘সর্দার’। তখন আর আমাদের জমি কেড়ে নেয়া বা কিনে নেয়ায় কোনো ঝামেলাই থাকল না। এখন আবার চার-পাঁচ বছর হয় শুনছি আমাদের আগের সেই ‘মুন্ডা’ নামটিই নাকি ঠিক, পাশাপাশি চালু হয়েছে আদিবাসী জাত। জাত পাত বুঝি না, জানি এটাই জন্মমুল্লুক, জন্ম হলেও এখানে মরতে হলেও এখানে আর লড়তে হলেও এখানে, পালিয়ে গিয়ে বা লুকিয়ে থাকলে কোনো লাভ হবে না। ধূমঘাট গ্রাম থেকে জানা গেল সুশীল মুন্ডা ভেটখালী গ্রামের পরিমল মন্ডল, সুখেন মিস্ত্রীদের সাথে একই মুক্তিবাহিনী হয়ে যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু সুশীল মুন্ডার শেষমেষ কি হয়েছিল তা কোনোভাবেই স্পষ্ট জানা যায়নি। তিনি মারা গেছেন না কি জীবিত আছেন এটি কেউ বলতে পারে না। ধূমঘাট মুন্ডাপাড়া থেকে জানা যায়, ১৯৭৬ সালের ( তারা বলেছেন শেখ মুজিব মারা যাবার পরের বছর) মাঘ-ফাল্গুন মাসে সুন্দরবনের ভারতীয় এলাকায় মধু কাটতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে তিনি নিহত হন তবে তাঁর লাশ পাওয়া যায়নি। আবার শ্যামনগরের কেউ কেউ বলেছেন তিনি ভারতে গিয়ে সম্ভবত মারা গেছেন, আবার কেউ কেউ বলেছেন তিনি সুন্দরবনে গিয়ে নিখোঁজ হন।

 

মাঠ অভিজ্ঞতা : ২ : কাকেত হেন্ইঞতা > নূরজাহান > খাইস্যা মুক্তিবেটি > কাঁকন বিবি > আদিবাসী নারী মুক্তিযোদ্ধা ?

কাকেত হেন্ইঞতা। আশি বছরের এই মহিয়সী মুক্তিসেনা আজ আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধার মতনই কষ্টে আছেন। ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ৫নং সেক্টরের লক্ষীপুর ক্যাম্পের হয়ে তার দায়িত্ব পালন করেন। প্রথমদিকে মুক্তিসেনাদের দেখাশোনা, খাবার ও অস্ত্র যোগান দেয়ার পাশাপাশি যুদ্ধকালীন গুরুত্বপূর্ণ খবরাখবর মুক্তিসেনাদের পৌঁছানোর দায়িত্ব নেয়ার পর প্রায় বিশটিরও বেশি সম্মুখ যুদ্ধে তিনি অংশ নেন। তৎকালীন ৫নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলীর তত্ত্বাবধানে মহব্বতপুর, কান্দারগাঁও, বসরাই-টেংরাটিলা, বেনিংগাঁও-নূরপুর, পূর্ববাংলাবাজার, সিলাইড় পাড়, দোয়ারাবাজার, টেবলাই, তামাবিল এলাকায় সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন কাকেত। ১৯৭১ সালে আগস্ট মাসে পাকহানাদার বাহিনীর আগমন ঠেকানোর জন্য মুক্তিযোদ্ধারা জাউয়া সেতু উড়িয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কাকেত গভীর রাতে কলার ভেলায় জেলে নারীর ছদ্মবেশে মাইন ও গোলাবারুদ নিয়ে জাউয়া সেতুর কাছে পৌঁছে মুক্তিসেনাদের সংকেত পাঠান এবং উড়িয়ে দেন জাউয়া সেতু। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকবাহিনী তাকে আটক করে এবং ভয়াবহ নির্যাতন চালায়, তার সারা শরীরে লোহার শিক ঢুকিয়ে দেয়া হয়। তবুও দেশের স্বাধীনতার জন্য তিনি একটিবারের জন্যও মাথা নত করেন নি কোনো অত্যাচার ও দুঃশাসনের কাছে। বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের মেঘালয় সীমান্তবর্তী হাওর জেলা সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার জিরারগাঁও এলাকায় তিনি ‘খাসিয়া মুক্তি বেটি’ হিসেবেই পরিচিত। কাকেতরা ছিলেন পাঁচ ভাই বোন। পিতা নিহা এবং মাতা কা মেলি হেন্ইঞতার দ্বিতীয় মেয়ে কাকেত। বড় বোনের নাম কা পাল হেন্ইঞতা, ভাইয়েরা হলেন উইট হেন্ইঞতা, উপাইয়াইন হেন্ইঞতা, উটাল হেন্ইঞতা। অল্প বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে মেঘালয়ের এক খাসিয়া পরিবারে জন্ম নেয়া কাকেত হেন্ইঞতা ছোট বয়সে চলে আসেন সীমান্তবর্তী বর্তমান বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজার এলাকায় তার বড় বোন কা পাল হেন্ইঞতার বাড়ীতে। দোয়ারাবাজার এলাকায় ধীরে ধীরে শৈশব পেড়িয়ে তরুণ বয়সে বিয়ে করেন পাঞ্জাবী সীমান্তরক্ষী আবদুল মজিদ খানকে। তখন পাকিস্তান আমল। বিয়ের পর মুসলিম পরিবারে তার নাম দেয়া হয় নূরজাহান। বিয়ের কয়েক বছরের মাথায় তার পাঁচ সন্তান জন্ম নেয়ার পর আবদুল মজিদ খান ঘর সংসার ফেলে চলে যান। পরবর্তীতে তার সাথে বিয়ে হয় সাইদ আলীর। দ্বিতীয় স্বামীও তাকে ফেলে নিরুদ্দেশ হয়ে পুনরায় বিয়ে করে আলাদা ঘর সংসার করেন। তারপরপরই ১৯৭১ সালে তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রামে একজন নির্ভীক বীর যোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। পারিবারিক সহায় সম্পত্তি, জমি জমা না থাকায় কোনোমতে একটা মুদি দোকান দিয়ে, অন্যের বাড়ীতে কাজ করে সংসারটাও চালিয়ে নেন কাকেত। মুক্তিযুদ্ধের পর দীর্ঘ সময়ব্যাপী কেউ খোঁজ নেয়নি তার, তখন প্রায় ভিক্ষা করেই দিন কাটতো তার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ৫নং সেক্টরের হয়ে প্রায় ২০টিরও বেশী সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেয়া এই মহীয়সী মুক্তিযোদ্ধার কথা ১৯৯৭ সালে সংবাদপত্রের মাধ্যমে দেশবাসী জানতে পারেন। স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে কাকেত নামটি ‘কঠিন ও অপরিচিত’ মনে হওয়ায় সাংবাদিকরা তাঁর নাম দেন কাকন বিবি। কাকেত হেন্ইঞতা থেকে নূরজাহান, পরবর্তীতে দেশব্যাপী তিনি কেবলমাত্র কাকন বিবি নামেই পরিচিত হয়ে উঠেন। স্থানীয় মানুষেরা ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় তাঁকে ডাকে ‘খাসিয়া মুক্তি বেটি’। ১৯৯৯ সালে দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকা তাঁকে ১৯৯৮ সালের গুণীজন সম্মাননা প্রদান করে। দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকা পরবর্তীতে তাঁেক প্রতিমাসে একটি নিয়মিত আর্থিক ভাতার ব্যবস্থা করলেও পরে তা বন্ধ হয়ে যায়। কাকেতের পাঁচ সন্তানের ভেতর তাঁর একমাত্র জীবিত কন্যা সখিনা বিবি বিয়ে করেছেন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার জিরার গাঁওয়ের আব্দুল রফিককে। মূলত: তিনি এখন মেয়ের সংসারেই থাকেন, এখনও অভাব আর দূ:খ-দুর্দশার ভেতর দিয়েই প্রায় সময়টাতেই অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে থাকেন।

 

মাঠ অভিজ্ঞতা : ৩ : মেঘলাল বর্মণ > মান্দাই মেঘলাল > মেঘলাল কোচ > মেঘলাল ক্ষত্রিয় হিন্দু > আদিবাসী মেঘলাল ?

দেশে মধুপুর ও ভাওয়াল গড়েই এককালে বিস্তৃত ছিল বৈচিত্র্যময় শালবন। আর এই শালবনভূমিতেই মান্দি, কোচ, বর্মণ, ক্ষত্রিয়-মান্দাই, ডালু, হদি, হাজং আদিবাসীরা গড়ে তুলেছিলেন স্পর্ধিত সভ্যতা। ভাওয়াল গড়ের গাজীপুর জেলার গাজীপুর সদর উপজেলার কাউলটিয়া ইউনিয়নের বাউপাড়া গ্রামে বর্মণ পরিবারে জন্ম নেন মেঘলাল বর্মণ। মেঘলাল বর্মণের মা বেচরানী বর্মণ এবং বাবা মাথুরাম বর্মণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেঘলাল বর্মণ কাদের সিদ্দিকীর সাথে ১১ নং সেক্টরের হয়ে যুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সনে যুদ্ধচলাকালীন সময়ে টাঙ্গাইল জেলার পাথরঘাটা এলাকায় পাকিস্থানী বাহিনীর সাথে তিনি সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেঘলালকে বর্মণ জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, হিন্দু ক্ষত্রিয় মান্দাই হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। গণ্য করা হয়েছে বাঙালি হিসেবেই, আজ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চলতি কায়দার গ্রন্থিত ইতিহাসে তিনি বাঙালি হিন্দুদের ভেতর একট সম্প্রদায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here