মুক্তিযুদ্ধের একপেশে অধিপতি ‘বিজয়গাথা’

0
51

বৃহত্তর উত্তরবঙ্গ, সিলেট অঞ্চলের চা বাগান, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ-গাজীপুর-শেরপুর-নেত্রকোণা অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম, উপক’লীয় অঞ্চল সব মিলিয়ে দেশের সকল প্রান্তের আদিবাসী নারী পুরষেরা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন নিম্নবর্গের ঐতিহাসিক দ্রোহী পাটাতন থেকেই। ১৮৫৫ সনে হুল বা সাঁওতাল বিদ্রোহের মাধ্যমে সাওঁতালেরাই পয়লা ব্রিটিশ উপনিবেশকে প্রশ্ন করে গণবিপ্লব সংগঠিত করেছিলেন, রাশিমনি হাজংয়ের নেতৃত্বে হাজং বিদ্রোহ কি আমরাইলছড়া চা বাগানে চা শ্রমিক আদিবাসী নারীরাই প্রথম সংগঠিত হয়ে লড়াই করেছেন পুরুষতান্ত্রিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে। তেভাগা কি টংক আন্দোলনে আদিবাসীরাই জান দিয়ে কৃষিকে রক্ষা করার গণসংগ্রাম তৈরি করেছেন, পরিবেশ-প্রাণবৈচিত্র্য-বন রক্ষায় আদিবাসীরাই বুকের রক্ত ঢেলে বাঁধ কি ইকোপার্ক বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। খাসিয়া বিদ্রোহ, চাকমা বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ, নুপীলান বা মণিপুরী নারীদের বিদ্রোহ, ভানুবিল আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ কি নিত্যদিনের চলমান প্রতিরোধে দেশের বঞ্চিত আদিবাসী জনগণ বারবার দেশের নিম্নবর্গের মুক্তিসনদের নিশান উড়িয়ে প্রশ্ন করছেন অধিপতি ব্যবস্থার কর্তৃত্বকে। কিন্তু ক্ষমতা কাঠামোর বলপ্রয়োগ আদিবাসীদের ঐহিতাসিক প্রতিরোধের ঝিলিককে বারবার মুখ চেপে ধরছে, গলা টিপে ধরেছে, রক্তাক্ত করেছে। সকল চোখরাঙানি আর আড়ালের ভেতরও অদৃশ্য করে রাখা আদিবাসী রক্তদানারাই বহাল রেখেছে জনগণের মুক্তিসংগ্রাম ইতিহাসের টগবগে রক্তস্রোত। যাকে কখনো কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের একপেশে অধিপতি বিজয়গাথায় বরাবরই ইতিহাসের সত্যিকারের রক্তদানার কোনো স্বীকৃতি ও সম্মান জোটেনি। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে নির্মিত দেশের সকল ভাস্কর্য, চলচিত্র, পুস্তক, নাটক, গান, কবিতা, নৃত্য কি চারুকলা সব কিছুই হয়েছে কেবলমাত্র বাঙালি পুরুষেরই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। আমরা কি ভাবতে পারি ‘অপরাজেয় বাংলা’ কি ‘সাবাস বাংলাদেশ’ কি ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ তৈরি হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে একজন চাকমা বা সাওঁতাল বা কোচ বা বর্মণ বা মুন্ডা বা খাসি বা মৈতৈ মণিপুরী নারী পুরুষের অবদানকে বিবেচনা করে? আমরা কি ধারণা করতে পারি প্রান্তিক জাতির একজন মুক্তিযোদ্ধা নারীর আদলে তৈরি হচ্ছে আমাদের কোনো মুক্তিযুদ্ধের ‘জাতীয়’ স্মারকস্তম্ভ ? ‘জাদুঘর সংস্কৃতি’ নিয়ে ঢের বিতর্ক আছে যা আমরা আজকের আলাপে টানছি না, কিন্তু আমরা বিনয়ের সাথে বলতে চাই কেন জাতীয় জাদুঘর এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এখনও পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধকে কেবলমাত্র বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ হিসেবেই পাঠ করাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর বাণী ছড়াচ্ছে : ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর বাঙালির অহংকার’। মুক্তিযুদ্ধ যদি কেবলি বাঙালির অহংকার হয় তাহলে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দেশের প্রান্তিক জাতিদের অস্তি¡ত্ব এবং পরিসরের কি হবে? আমরা আশা করি মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাস কাঠামোর এই ধরনের কর্তৃত্ববাদী ‘অহংকার’ সমূহ একদিন শেষ হবে এবং গরিষ্ঠভাগ জনগণের নিপীড়িত প্রান্তিক অংশের যাপিতজীবনের অহংকারই বাংলাদেশের ইতিহাসের চলমানতা হিসেবে মুক্তি পাবে। মুক্তিযুদ্ধের সকল অদৃশ্য রক্তদানারা মিলেই একদিন গড়ে তুলবে রক্তমাংশের এক আপন বাংলাদেশ, আসুন আমরা সেই যাত্রা শুরু করি।
বাংলাদেশ গণপরিষদের বিতর্ক। বিষয় ঃ সংবিধান-বিল বিবেচনা (দফাওয়ারী পাঠ), খন্ড ২ সংখ্যা ১৩। মঙ্গলবার, ৩১শে অক্টোবর, ১৯৭২
[পাভেল পার্থ :গবেষক ও লেখক। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here