মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাস প্রবলভাবে জাত্যাভিমানী

0
38

মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাস প্রবলভাবে জাত্যাভিমানী

মনস্তাত্ত্বিক ও সাংবিধানিক শরীর সব কিছু মিলিয়েই রাষ্ট্র জাত্যাভিমানী। এক উপনিবেশিক অপরত্বের চাপ ও আঘাত জোর করে জনগণের মজ্জায় প্রবেশের উপুর্যপরি হামলা চালায় রাষ্ট্র। তাই আমাদের মনে করানো হয়, রাষ্ট্রে ‘জাতি’ বলতে কাউকে বোঝায় আর ‘উপজাতি’ বলতে কাউকে বোঝায়। এই বোঝা না বোঝানোর মাপকাঠি যে কেবলমাত্র শরীর, চামড়ার রঙ আর চেপ্টা নাক গোছের কিছু নয় তা আমরা জানি। জানি এর সাথে ভূগোল, বসতির মাপ, ক্ষমতার সম্পর্ক, শ্রেণীবিভাজনের সূত্র, প্রকৃতির সাথে সম্বন্ধ, সম্পদের মালিকানার ধরন, প্রাণসম্পদের উৎস এরকম অনেক কিছুই জড়িত। নিমিষেই তাই লুট হয়ে যায় প্রান্তিক জাতির অস্তিত্ব, পরিসর ও সম্পদের সীমানা। দখল হয়ে যায় ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া। এই বাঙালি রাষ্ট্রে বাঙালি বাদে অপরাপর আর সকল জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস প্রক্রিয়াকেই তাই প্রান্তিক ও আড়াল করা হয়। বাংলাদেশের কোচ-হাজং-ডালু-বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী-মৈ তৈ মণিপুরী-লালেং-চাকমা-ত্রিপুরা-রাখাইন-ম্রাইনমা-খাসি-মান্দি-বানাই-খাড়িয়া-মাহালি-লুসাই-ম্রো-পাংখো-কড়া-কডা-বম-মুন্ডা-লেঙাম-সাঁওতাল-কোল-ওঁরাও-ভূমিজ-দেশোয়ালি-কর্মকার-হদি-রাজবংশী-ক্ষত্রিয়-পাহাড়িয়া-মুসহর-রাজোয়ার-বর্মণ-পাঙন-চাক-তঞ্চংগ্যা-খুমি-খিয়াং-কন্দদেরকেই অধিপতি বাঙালি রাষ্ট্র আমাদের কাছে কখনো ‘উপজাতি’, কখনো ‘আদিবাসী’, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, ট্রাইবাল, এথনিক মাইনরিটি, ইনডিজিনাস পিপল, এবঅরিজিনাল, নৃ-গোষ্ঠী, নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী এরকম নানান নামে পরিচয় করায়। তাদের মোট জনসংখ্যা কোথাও বলে বারো লাখ আর কোথাও বলা হয় তিরিশ লাখ। কোথাও দেখানো হয় জাতি সংখ্যা ২৭ আবার কোথাও দেখানো হয় ৪৫ বা তারও বেশী। অধিকাংশ ক্ষেত্রে জাতিসত্তা বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করার জন্য ‘সাংস্কৃতিক সীমানা’ এবং জাতিগত সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে বিবেচনা করা হয়। আজকের আন্তজার্তিক রাজনৈতিক পরিসরের কেন্দ্রীয় বিবেচনা গুলোও এইসব ‘জাতি’, ‘জাতীয়তাবাদ’, এবং ‘জাতি-রাষ্ট্র’ প্রত্যয়গুলোকে ঘিরেই। অনেকেই বলে থাকেন, এইসব ধারনা ও চিন্তা উৎপত্তিগতভাবে সম্পূর্ণত ইউরোপীয় এবং ‘আধুনিক’। জাতির রাষ্ট্রত্ববোধের সাথে মিশে যাওয়ার চেতনাকেই জাতীয়তাবাদীরা প্রবল করে এবং রাষ্ট্রে চিহ্নিতকরণের অধিপতি দাপট জিইয়ে রেখে জনগণের গণমুক্তির দ্রোহকে বারবার বিচ্ছন্ন ও বিপন্ন করে তুলে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশও এই তথাকথিত আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের জাত্যাভিমানী প্রকল্পের বাইরে নয়। তাই রাষ্ট্রের চলমান ইতিহাস গ্রন্থন প্রক্রিয়া, কি ইতিহাস উপস্থাপন প্রক্রিয়া সবকিছুই প্রবলভাবে বাঙালি জাত্যাভিমানকে প্রকাশ করে তুলে। কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান যা তৈরি করা হয়েছিল টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের ভেতর, যেখানে মান্দি(গারো) ও কোচ-বর্মণ আদিবাসীদের সংখ্যাধিক্য, সেই সংবিধানে রাষ্ট্রের জনগণের জাতিগত বহুপাক্ষিক সীমানার প্রান্তিক পরিসরগুলোকে স্বীকৃতি ও মর্যাদা দেয়া হয়নি। সংবিধান প্রণেতাদের মনোজগতে রাষ্ট্র যে সীমানা চিহ্নিত করে দিয়েছিল, সংবিধান শরীর পেয়েছে যে অধিপতিশীল মনোজাগতিক প্রক্রিয়ায় সেখানে জনগণের স্থানিক অস্তিত্ব ও ইতিহাসকে গুরুত্ব দেয়া সম্ভব হয়ে উঠেনি বা উঠানোর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। উপনিবেশিক মনোজাগতিক কায়দায় গড়ে উঠা জাতিরাষ্ট্রের সংবিধান এই জনপদের চৈতন্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাই রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য জাতীয়তার একটি একক সীমানা পরিধি চূড়ান্ত করে দিয়েছিল। রাষ্ট্রের প্রথম সংবিধানে দেশের সকল নাগরিকের জাতীয়তা নির্দিষ্ট করা হয়েছিল ‘বাঙালি’ হিসেবে, পরবর্তীতে যা ‘বাংলাদেশী’ করার মাধ্যমে রাষ্ট্রের সকলেরই জাতীয়তার সীমানার নিজস্ব পরিসর হারায়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিমালার একটি ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ যা ১৯৭৬ সনে সংবিধান থেকে বাদ দেয়া হয়। ১৯৮৮ সনে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ‘ইসলাম’ ঘোষিত হয়। তথাকথিত আধুনিক রাষ্ট্রের এই প্রকল্প একই সাথে গণমানুষের বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় সম্পর্ককে অস্বীকার করে এবং সংখ্যাধিক্যের জাত্যাভিমানকে প্রকাশ করে প্রান্তিক জাতিসত্তার সাথে রাষ্ট্রের একধরনের বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। জনগণের যাপিতজীবনের সুরক্ষা ও র্সাবভৌমত্বকে আড়াল করে নিরাপত্তার নামে চোখ রাঙানি এবং বন্দুক বাহাদুরির প্রশ্রয় রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ক্ষমতা চর্চারই অংশ। যে ক্ষমতা চর্চার ভেতর দিয়ে উধাও ও ছিনতাই হয়ে যায় নিপীড়িত মানুষের বিপ্লবী খতিয়ান। পশ্চিমের আঠার শতকীয় সমাজ-নৃবিজ্ঞানীদের অপর জাতি গবেষণা ও এথনোগ্রাফ রচনার ভেতর দিয়ে এবং ব্রিটিশ শাসকের মাধ্যমে ট্রাইবাল শব্দটি এই জনপদে বহুল ব্যবহৃত হয়। সাঁওতাল হুলের (সাঁওতাল বিদ্রোহ ১৮৫৫) সময় ব্রিটিশরা বিদ্রোহী সাঁওতালদের “ অপরাধী ট্রাইব” হিসেবে পরিচয় করাত। হাজংদের টংক আন্দোলনের সময় হাজং বিপ্লবীদের ‘বিধর্মী কম্যুনিষ্ট ’ বলে গালি দেয়া হত, হাতিখেদা আন্দোলনের সময় হাজংদের বলা হত ‘রাজা অবাধ্য’। লোধা/শবর আদিবাসীদের সবসময় ব্রিটিশরা বলত ‘ক্রিমিনাল ট্রাইব’। উপনিবেশিক-বৈষম্যমূলক-কর্তৃত্ববাদী এই অপর করে রাখার ‘ট্রাইবাল’ শব্দটিই বাংলায় পরবর্তীতে ‘উপজাতি’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। আর এই উপজাতি ধারনা বহাল থাকে আমাদের রাষ্ট্রের আইন-নীতিমালা-পাঠ্য পুস্তকসহ রাষ্ট্রীয় প্রচার ও উদ্যোগ উন্নয়নের সকল মনস্তত্বে। ব্রিটিশ আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০ অনুযায়ী শাসিত হয় এবং পরবর্তীতে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন’১৯৯৮ অনুসারে প্রান্তিক জাতি অধ্যূষিত এ অঞ্চল উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। রাষ্ট্রের সকল পাঠ্যপুস্তকে ‘উপজাতি’ শব্দের সাথে কোথাও কোথাও আদিবাসীও যুক্ত করা হয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত বাংলাপিডিয়াও উপনিবেশিক ‘উপজাতি’ শব্দটি রেখেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে রাজশাহী-রাঙ্গামাটি-খাগড়াছড়ি-নেত্রকোণাতে আদিবাসীদের জন্য যেসব সাংস্কৃতিক একাডেমী বা ইনস্টিটিউট করা হয়েছে, সেখানেও উল্লেখ করা হয়েছে, উপজাতীয় সাংস্কৃতিক/কালচারাল একাডেমী/ইনস্টিটিউট। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো ১৯ এপ্রিল ২০০৬ তারিখের একটি চিঠিতে আবারো রাষ্ট্র ‘জাতীয়তার’ প্রশ্নে প্রান্তিক জনগনের উপর তার বলপ্রয়োগের বাহাদুরি বজায় রাখতে ‘উপজাতি’ প্রত্যয়টিই ব্যবহার করার নির্দেশ জারি করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে কেন আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রান্তিক করা হয়েছে এটি স্পষ্ট করার জন্যই আমরা উপরের আলাপ বাহাস গুলো সেরে নিচ্ছি। কারন রাষ্ট্রের অধিপতি ইতিহাস প্রক্রিয়া এবং ক্ষমতা কাঠামোর ইতিহাস নির্মাণ প্রকল্পের মনস্তত্ত্ব জানা বোঝা না থাকলে প্রচলিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কি কায়দায় আদিবাসী ও মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্ককে গায়েব করে প্রবলভাবে জাত্যাভিমানী বাঙালি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্মাণ করে তা বোঝার ক্ষেত্রে প্রশ্নহীন ফারাক থেকেই যায়। আলাপের এইখানটাতে আমরা ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ গণপরিষদে উত্থাপিত একটি সংসদীয় বির্তকের খানিক অংশকে হাজির করছি। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কি কায়দায় জাত্যাভিমানী গণপরিষদের এই বির্তকে তা রাখঢাকহীনভাবে স্পষ্ট হয়েছে এবং রাষ্ট্রের এই জাত্যাভিমানী মনস্তত্ত্ব কিভাবে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য পরিচয় ও চিহ্নিতকরণের অনিবার্য বৈধতা তৈরি করে তাও এই সংসদীয় বির্তকে উত্থাপিত হয়েছে।

জনাব আবদুর রাজ্জাক ভুঁইয়া : মাননীয় স্পীকার সাহেব, আমি প্রস্তাব করছি যে,
সংবিধান বিলের ৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিুোক্ত অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হোক ঃ
“৬। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকদের বাঙ্গালী বলিয়া পরিচিত হইবেন।”
শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা : মাননীয় স্পীকার সাহেব, জনাব আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন যে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙ্গালী বলে পরিচিত হবেন। মাননীয় স্পীকার সাহেব, এ ব্যপারে আমার বক্তব্য হল, সংবিধান বিলে আছে, “বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে।” এর সঙ্গে সুস্পষ্ট করে বাংলাদেশের নাগরিকগণকে বাঙ্গালী বলে পরিচিত করবার জন্য জনাব আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়ার প্রস্তাবে আমার একটু আপত্তি আছে যে, বাংলাদেশের নাগরিকত্বের যে সংজ্ঞা, তাতে করে ভালভাবে বিবেচনা করে তা যথোপযুক্তভাবে গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করি। আমি যে অঞ্চল থেকে এসেছি, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে বাস করে আসছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙ্গালীদের সঙ্গে লেখা পড়া শিখে আসছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। সব দিক দিয়েই আমরা একসঙ্গে একযোগে বসবাস করে আসছি। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা, চৌদ্দ পুরুষ —— কেউ বলে নাই, আমি বাঙ্গালী। আমার সদস্য-সদস্যা ভাই-বোনদের কাছে আমার আবেদন, আমি জানি না, আজ আমাদের এই সংবিধানে আমাদেরকে কেন বাঙ্গালী বলে পরিচিত করতে চায় ……….।
জনাব স্পীকার ঃ আপনি কি বাঙ্গালী হতে চান না?
শ্রী লারমা : মাননীয় স্পীকার সাহেব, আমাদিগকে বাঙ্গালী জাতি বলে কখনো বলা হয় নাই। আমরা কোনদিনই নিজেদেরকে বাঙ্গালী বলে মনে করি না। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাশ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদেরকে বাংলাদেশী বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙ্গালী বলে নয় ।
………… (সংশোধনী পাশ হয়ে যায়) …………

আর এভাবেই রাষ্ট্রের বাঙালি জাত্যাভিমান বাঙালি বাদে রাষ্ট্রের অপরাপর জাতিদের ইতিহাস ও অস্তিত্ব নানান কায়দায় প্রশ্নহীনভাবে আড়াল করে রাখে। ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে দেশের বাঙালি কি অপরাপর প্রান্তিক জাতির নারী-পুরুষেরা অংশ নিলেও মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে প্রান্তিক জাতিদের কোনো স্বীকৃতি ও পরিচয় তৈরি হয়নি আজো। রাষ্ট্রের চলতি কায়দায় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় রাষ্ট্র সেইসব আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের ঐতিহাসিক জাতিগত পরিচয় গায়েব করে নিজে নিজেই একটি পরিচয় দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের জাতিগত অস্বীকৃতি কোনো নয়া ঘটনা নয়, এটি এই অধিপতি ক্ষমতাকাঠামোর এক ঐতিহাসিক প্রকল্প, যা আমরা আলাপের শুরুতেই খানিকটা টেনে এনেছি। আলাপের শুরুতে আমরা বাংলাদেশের তিন এলাকার তিন জাতির তিন জন নারী ও পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার বিবরণ টেনেছি। এরা তিনজনের একজন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, একজন নিখোঁজ এবং একজন এখনও জীবিত আছেন। বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও দেশের বাঙালি মুক্তিযোদ্ধরাই মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত স্বীকৃতি ও সংবর্ধনা প্রকল্পে চিরকাল অস্বীকৃত থাকেন আর সেখানে এই তিন আদিবাসী স্বীকৃতি পাবেন কি পাবেন না এই নিয়ে আজকের আলাপটি তোলা হয়নি। আজকের আলাপটি মূলত: তোলা হয়েছে প্রচলিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কিভাবে প্রান্তিক জাতির মুক্তিযোদ্ধারা পরিচয় ও অস্তিত্বহীন থাকেন সেই জায়গাতে কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়ার জন্য। মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত অধিপতি ইতিহাস কাঠামো শেষমেষ যদিও বা একজন প্রান্তিক বাঙালি নারী মুক্তিযোদ্ধাকে স্বীকৃতি দেয় তখন কিন্তু তাকে বাঙালি ভিন্ন অন্য কোনো জাতিগত পরিচয়ে পরিচয় করায় না। আমরা আলাপের জন্য মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি বীরপ্রতীকের প্রসঙ্গটি টানছি। তারামন বিবিকে যদিও চলমান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রথমদিকে বিবেচনা করেনি কিন্তু যখন তাঁকে ‘খুঁজে পাওয়া গেল’ বা অধিপতি ইতিহাস প্রকল্পের মর্জি হল তাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ করার তখন কিন্তু তারামন বিবির জাতিগত পরিচয় ‘কোচ’ বা ‘কোল’ বা ‘মুন্ডা’ বা ‘খুমি’ বা ‘বর্মণ’ বা ‘খাসিয়া’ হয়ে যায়নি বা রাষ্ট্র তারামন বিবির জাতিগত পরিচয় ‘বাঙালি’ ভিন্ন অন্যকিছু মানতে নারাজ। কারন রাষ্ট্র মনস্তাত্ত্বিক ভাবে মনে করে, রাষ্ট্রের তারামন বিবিদের বাঙালি ছাড়া আর কোনো পরিচয় নেই বা পরিচয় থাকতে পারে না। আমরা আজকের আলাপে মুক্তিযুদ্ধের এই প্রচলিত অধিপতি ইতিহাস চর্চা এবং বলপ্রয়োগকারী প্রকল্পকেই প্রশ্ন করতে চাই একজন নিগৃহীত আড়ালের তারামন বিবিকে ইতিহাসের অদৃশ্যমানতা ( আমাদের মনে রাখা জরুরী এই অদৃশ্যমানতাও রাষ্ট্রই তৈরি করে বহাল রেখেছে) থেকে তুলে এনে যখন তার যাপিতজীবনকে অস্বীকার করে রাষ্ট্রের নিজস্ব অধিপতি চিহ্নিতকরণের দাপট অনুযায়ী তার জাতিগত পরিচয় ও সীমানা নির্ধারণ করা হয় তখন তারামন বিবির ঐতিহাসিক সর্ম্পকের সীমানা খানখান হয়ে রক্তাক্ত হয়ে উঠে। কারন তারামন বিবির নিজেরও আছে নিজেকে পরিচয় করানোর নিজস্ব অধিকার। রাষ্ট্র বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা বা মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাস প্রকল্প যা মানতে চায় না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে দেশের আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধারা ঠিক একই কায়দায় বরাবর নিজেদের জাতিগত পরিচয় ও সীমানা হারিয়েছেন। একজন সুশীল মুন্ডাকে তাই কখনো বানানো হচ্ছে সুশীল বুনো, কখনো সর্দার, কখনো আদিবাসী আবার কখনো বাঙালি হিন্দু। একজন কাকেত হেন্ইঞতা মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে প্রশ্নহীন কায়দায় হয়ে যাচ্ছেন কাকন বিবি, মেঘলাল বর্মণকে কখনো বানানো হচ্ছে কোচ কখনো বাঙালি হিন্দু কখনোবা ক্ষত্রিয়। মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে যদিও এদের স্বীকৃতি মিলছে কিন্তু সেই স্বীকৃতিই তাদেরকে আবারো অধিপতি ইতিহাস কাঠামো আড়াল ও অস্তিত্বহীন করে ফেলছে। কারন এরা তিনজনেই তাদের নিজস্ব মুন্ডা, খাসিয়া ও বর্মণ জাতির অস্তি¡ত্ব হারিয়ে রাষ্ট্রের মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসে ‘বাঙালি’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। সম্প্রতি যখন জাতিসংঘ আদিবাসী বর্ষ, দুটি আদিবাসী দশক, প্রতি বছরের ৯ আগস্ট আন্তজার্তিক আদিবাসী দিবস ঘোষণা করেছে এবং জাতিসংঘে আদিবাসীদের জন্য একটি স্থায়ী ফোরাম গঠিত হয়েছে তাই আবার ‘আদিবাসী প্রত্যয়টিকে’ উন্নয়নের একটি প্যাকেজ ইস্যু করে বেশকিছু উন্নয়নবাদী ‘আদিবাসী দরদ’ চালু হয়েছে। কিন্তু এইসব ‘আদিবাসী উন্নয়ন দরদ’ কোনোভাবেই আদিবাসীদের নিপীড়িত যাপিতজীবনের দ্রোহ থেকে অধিপতি ব্যবস্থার চিহ্নিতকরণের দাপটকে প্রশ্ন করতে পারছে না বা করতে চাচ্ছে না। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রচলিত ইতিহাসের চলমানতা একজন মুন্ডা কি কোল কি সাঁওতাল কি মান্দি কি চাকমা কি ওরাও কি ত্রিপুরাদের ঐতিহাসিক দ্রোহ ও দাহ থেকে বিরাজিত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে না। অথচ এটিই জরুরী, রাষ্ট্রের কি বাঙালি কি প্রান্তিক জাতির কেউ তার ইতিহাস এবং অস্তিত্বের চলমানতা কিভাবে কি প্রক্রিয়ায় দেখতে চান এবং উপস্থাপন করতে চান এটি তাদের সকলেরই নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্তের বিষয়। রাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত দেশের প্রান্তিক জনগণের জীবনযাপন ও উপস্থাপনের এই নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি।

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here