মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার ‘স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে’ ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) মোখলেছুর রহমান, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা

0
372

মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার
‘স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে’
ওয়ারেন্ট অফিসার (অব.) মোখলেছুর রহমান, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা

[ওয়ারেন্ট অফিসার মোখলেছুর রহমান একজন যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার মাছিহাতা ইউনিয়নের ফুলবাড়ীয়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সেকশন কমান্ডার হিসেবে ৩ নং সেক্টরের অধীন মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন তৎকালীন মেজর কে এম শফিউল¬াহ (বীর উত্তম)। সম্প্রতি ৭ মার্চের ভাষণ, ১৯ মার্চের প্রথম প্রতিরোধ, ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইত্যাদি নানা বিষয়ে সাপ্তাহিক বিবর্তনের পক্ষ থেকে নায়েম লিটুর সাথে দীর্ঘ আলাপ হয়। তারই নির্বাচিত অংশ পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হলো। মহান বিজয় দিবস সংখ্যায় আলাপের প্রথম কিস্তি প্রকামের পর এ সংখ্যায় শেষ কিস্তি প্রকাশিত হলো।]

 

গত সংখ্যার পর
২২ মে নায়েক মোজাম্মেল ও দুই সিপাহীকে আমার সাথে দিয়ে পাঠানো হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া আখাউড়ার রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য। আমরা ঐ দিনই ৮টি এন্টিট্যাংক মাইন নিয়ে কাছাইট গ্রামের লোকমান মিয়ার বাড়িতে পৌঁছাই। সেই দিন রাত্রে লোকমান মিয়ার সহযোগিতায় তিনটি মাইন ভাদুঘর গ্রাম ও সুহাতা গ্রামের মাঝখানে রেলওয়ের ব্রিজের নিকটে পুঁতে রাখি। পরের দিন লোকমান মিয়ার সহায়তায় বাসুদেব ও ভাতশালা গ্রামের মাঝখানের রেল লাইনের উপর আরো তিনটি মাইন পুঁতে আসি। পুঁতে আসার কয়েক ঘণ্টা পর জানতে পাই ভাতশালার মাইনগুলো ওই এলাকার চেয়ারম্যান রাজাকার আফু মিয়া পাকবাহিনীকে সাথে নিয়ে উঠিয়ে ফেলেছে। রাজাকার আফু মিয়ার তথ্যমতে আমাদেরকে ধরার জন্য কাছাইট গ্রামের রাজাকার হুমায়ুনকে সাথে নিয়ে পাকবাহিনী লোকমান মিয়ার বাড়িতে রাত্রে হানা দেয় এবং আমাদেরকে প্রায় ঘিরে ফেলে। আমরা খবর পাওয়ার সাথে সাথে রাতের অন্ধকারে ঝোপের ভিতর দিয়ে সেখান থেকে কোনোমতে পালাতে সক্ষম হই। পরে পাশের আটলা গ্রামের হামুদ মিয়ার ভাই রোকন মিয়ার একটি ঘরে গোপনে আশ্রয় নেই। ভোরে আমরা রোকন মিয়ার ঘরে নাস্তা করার সময় জানতে পাই লোকমান মিয়াকে পাক বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে এবং আধ ঘণ্টার মধ্যে পাক বাহিনী আমাদের ধরার জন্য আটলা গ্রামের দিকে আসছে। কালবিলম্ব না করে আমরা সেখান থেকে দৌড়ে, বিল সাঁতরে সিংগারবিল বাজারে পৌঁছি। বিকালে জানতে পারি আমাদের আশ্রয় দেয়ার অপরাধে পাকবাহিনী আটলার ওই বাড়িটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং ছয় জনকে গুলি করে হত্যা করে।
২৭ মে ভুল¬া গ্রামের পশ্চিম পাশে আমাদের দুটি সেকশনের প্রতিরক্ষা পজিশন ছিল। ভুল¬া গ্রামের পশ্চিম পাশে একটি ছোট নদী ছিল যার নাম হরেশপুর নদী। নদীর পূর্ব পাড়ে ছিল আমাদের পজিশন এবং পশ্চিম পাড়ে ছিল একটা বড় বটগাছ। বটগাছের ৫০ গজ দক্ষিণে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি। ওই বাড়ির পেছনে একটি খোলা মাঠ ও ৪-৫ ফুট উঁচু পাটক্ষেত। ঐ বাড়ি ও বটগাছের পেছন থেকে ৩০ মে আনুমানিক বেলা ৩টায় পাকবাহিনী আমাদের উপর স্থল আক্রমণ করে। আমরাও ব্রাশ ফায়ার করতে থাকি। ফায়ার এতটা নিখুঁত হয়েছিল যে প্রায় সব পাক সেনা পড়ে যায়। আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম কৃষকরা আহত নিহতদের টেনে নিচ্ছে আর খানসেনাদের চলাচলে পাটখেত নড়ছে। তখন পাক বাহিনীর অন্য একটি দল পেছন ঘুরে উত্তর দিক থেকে আমাদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। আমরা ভয়ানক বিপদে পড়ে সাহয্যের আবেদন পাঠাই এবং আমাদের উপর আক্রমণের খবর পেয়ে মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে হাবিলদার জব্বার ও কাদের পাটোয়ারীসহ আরো অনেকে দক্ষিণ দিক থেকে অর্থাৎ পাইকপাড়া গ্রামের পাশ থেকে তুমুল কভারিং ফায়ার দেন। যার ফলে পাক বাহিনীর কবল হতে কোনরকমে রক্ষা পাই, – যা আমার চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। পাকবাহিনীর গোলার আঘাতে ওই ভুল¬া গ্রাম ধূলিস্মাৎ হয়ে অনেক সাধারণ মানুষ মারা যায়। বহু ঘরবাড়ি, গরু, ছাগল ও সম্পদ বিনষ্ট হয়।
পরে আমাদের কোম্পানি, মোকন্দপুর, ধর্মগড়, মনতলা এলাকায় প্রতিরক্ষা গড়ে তোলে। সেখান হতে আমরা রেইড অ্যাম্বুশ-এর মাধ্যমে পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ অব্যাহত রাখি। ওই এলাকায় পাকবাহিনী অর্তিকত হামলা চালালে আমরা জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের কলকলিয়ার চা বাগানের পাশে ক্যাম্প স্থাপন করি। কলকলিয়া ক্যাম্প হতে আনুমানিক ১০ জুন ভোর বেলা আমরা ৪ নং কোম্পানি মঙ্গলপুর চৌমুহনী হাই স্কুল এলাকায় পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষার উপর অতর্কিত আক্রমণ চালাই। সেখানে আমরা ফায়ারের সাহায্যে পাকবাহিনীর বাংকারগুলি ধ্বংস করি। এতে পাক বাহিনীর অনেকে হতাহত হওয়ায় তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ঐ সময় আমাদের কোম্পানির নেতৃত্ব দেন মেজর মঈনুল হোসেন চৌধুরী। আমার প¬াটুন কমান্ডার ছিলেন ওয়াজেদ আলী বারকি। আমি ছিলাম ১ নং সেকশন কমান্ডার আর ২ নং সেকশন কমান্ডার ছিলেন নায়েক তাজুল ইসলাম। তা ছাড়া ৩ নং সেকশন কমান্ডার ছিলেন নায়েক হাফিজুর রহমান। আমাদের আরো দুইটি প¬াটুনের নেতৃত্ব দেন সুবেদার মমিন ও কাদের পাটোয়ারী।
ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ-এর নেতৃত্বে ১৭ জুন বহেরা গ্রামের চৌরাস্তায় পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষার উপর আমরা অতর্কিত হামলা চালাই। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। এক পর্যায়ে পাকবাহিনী আমাদের চারদিকে ঘিরে ফেলে। সেখানে প্রায় ৮ ঘণ্টার মতো আটকা পড়ি এবং তাদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধ করি। এতে ল্যান্স নায়েক দুলু মিয়া (বিডিআর) গুরুতর আহত হয়। আমাদেরকে উদ্ধার করার জন্য তৎকালীন সেক্টর কমান্ডার শফিউল¬াহ ক্যাপ্টেন নাসিম-এর কোম্পানিকে নিয়ে আক্রমণ চালান। আক্রমণের ফলে আমরা পাকবাহিনীর ঘেরাও থেকে বের হতে সক্ষম হই।
১২ সেপ্টেম্বর সকালে ক্যাপ্টেন হেলাল-এর নেতৃত্বে আমরা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে মোকন্দপুর রেলওয়ে স্টেশনের দক্ষিণ-পশ্চিম অর্থাৎ রেললাইনের পশ্চিমাংশে অবস্থিত পাকবাহিনীর একটি প্রতিরক্ষার উপর অতর্কিত হামলা চালাই। ওই আক্রমণে আমরা ১০৬ মিলিমিটার আরআর-এর ৩৬ পাউন্ড ওজনের ৪টি গোলা ব্যবহার করে পাকবাহিনীর বাংকারগুলি ধ্বংস করি। এতে পাক বাহিনীর একজন জেসিওসহ ৮ জন সৈন্য নিহত ও অনেক সৈন্য আহত হয়। আমাদের একটি দলে ছিলেন সিএইচএম কাদের পাটোয়ারী, নায়েক আবদুল হক, সিপাহী আশরাফ ও আবদুল বারী। আরেকটি দলে ছিলেন হাবিলদার চাঁন মিয়া, হাবিলদার শফি, নায়েক মোহন মিয়া ও নায়েক হাফিজ। অন্য দলে ছিলেন হাবিলদার ওয়াজেদ আলী বারকি, নায়েক মোখলেছুর রহমান, নায়েক তাজুল ইসলাম, নায়েক রওশন আলী। তা ছাড়াও আমাদের সাথে আরও ৪৬ জন সৈনিক ছিলেন।
১৩ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত্রে মোকন্দপুর এলাকায় ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ-এর নেতৃত্বে আমরা পাকবাহিনীর একটি চলন্ত ট্রেন ডিনামাইটের সাহায্যে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দেই এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের সাহায্যে ফায়ার অব্যাহত রাখি। এর ফলে পাকবাহিনীর একজন লে: কর্ণেল ও একজন ক্যাপ্টেন সহ প্রায় ৩০ জন সৈন্য নিহত হয় ও আরো অনেকে গুরুতর আহত হয়। সেটি ছিল পাকবাহিনীর অন্যতম বড় পরাজয়। উক্ত আক্রমণে যারা গুরুত্বপূর্ণ ও সাহসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে আমিসহ ছিলেন হাবিলদার ওয়াজেদ আলী বারকি, হাবিলদার শফিক (কমান্ডো), নায়েক রওশন আলী, নায়েক তাজুল ইসলাম, নায়েক মোহন মিয়া, সিপাহী ফজলুল করিম ও আরো ৮ জন সিপাহী। সেপ্টেম্বর মাসের শেষে মনতলা ধর্মঘর এলাকায় পাকবাহিনীর একটি প্রতিরক্ষার উপরও আমরা অতর্কিত আক্রমণ চালাই এবং এতে পাক বাহিনীর অনেক সৈন্য নিহত হয়।
ভারতের ধুরানাল ক্যাম্প হতে ধর্মগড় চৌরাস্তার নিকটে স্কুলের পাশে অবস্থিত পাকবাহিনীর একটি প্রতিরক্ষার উপর কয়েকদিন রেকি করে ২৮ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে আমরা পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালাই। ঐ আক্রমণে আমাদের সেক্টরের ২টি কোম্পানি অংশগ্রহণ করে। একটির কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন আবদুল মতিন। আরেকটি অর্থাৎ আমার কোম্পানির নেতৃত্ব দেন ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ। তা ছাড়া ঐ আক্রমণে আমাদের মোটর আর্টিলারি ফায়ার দিয়ে সাপোর্ট দিয়েছিলেন মোটর প¬াটুন কমান্ডার হাবিলদার আবদুল জব্বার। ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে আকাশ খুবই অন্ধকার ও মেঘলা ছিল এবং সেই সাথে পুরো এলাকাটি ছিল কর্দমাক্ত। সে জন্য আক্রমণ চালাতে আমাদের কমান্ডার লেভেলে সকলকে টর্চ লাইট ব্যবহার করতে হয়। টর্চ লাইটের মাথায় আমরা কাপড় ব্যবহার করি যাতে শত্রুপক্ষ দূর থেকে আলো দেখতে না পায়। সে ক্ষেত্রে টর্চ লাইটের ইশারা ইঙ্গিতের মাধ্যমে আমাদের মধ্যে নির্দেশ আদান প্রদান হয়েছিল। ঐ আক্রমণটি ছিল খুবই ফলপ্রসূ। কারণ যখন আমরা আক্রমণ শুরু করি তখন প্রচুর বৃষ্টি ও আঁধারে পাক বাহিনী আমাদের গতিবিধি কিছুই আঁচ করতে পারে নি। আমাদের ফায়ারের শব্দে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। আমরা যখন আক্রমণ শেষ করে ফিরে যাব ভাবছি ঠিক সে সময়ে পাকবাহিনীর একটি দল পেছন দিক থেকে প্রচুর ট্রেসার ফায়ার করে পুরো এলাকা আলোকিত করে। এতে আমাদের উইথড্র করতে বেশ কষ্ট হয়েছিল।
অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে ধর্মগড়, গোবিন্দপুর গ্রামের মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় পাকবাহিনীর আরো একটি প্রতিরক্ষার উপর ব্যাপক আক্রমণ চালিয়ে তাদের প্রতিরক্ষাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে অনেক অস্ত্র, গোলাবারুদ উদ্ধার করি। এই যুদ্ধে অনেক পাক সৈন্য হতাহত হয়। আমাদের সঙ্গে থাকা একজন ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছিলেন। ৩০ অক্টোবর আমরা ক্যাপ্টেন হেলাল মোর্শেদ-এর নেতৃত্বে ফেনীর পরশুরাম এলাকায় আক্রমণের জন্য মেজর জাফর ইমাম-এর রাজনগর ক্যাম্পে পৌঁছাই। ২ নভেম্বর ঐ এলাকায় রেকি করার সময় মাইনের আঘাতে হাবিলদার আব্দুল জাব্বার-এর একটি পা উড়ে যায়। ৩ নভেম্বর রাতে পরশুরাম এলাকায় পাকবাহিনীর প্রতিরক্ষার ভেতরে ইনফেলট্রেশন করে ঢুকে পড়ি। শেষ রাত্রে তাদের উপর আক্রমণ চালিয়ে সম্পূর্ণভাবে পরাভূত করে পাকবাহিনীর জীবিত ও আহত প্রায় একশ-র উপরে সৈন্য আটক করি। ৪ নভেম্বর সকালে আমার সেকশনের পজিশন ছিল একটি পুকুরের পাড়ে। ওটা ছিল অনন্তপুর গ্রামের পূর্ব পাশে ও রেলওয়ে লাইনের পশ্চিম পাশে। পরের দিন ভোর পাঁচটার দিকে আমি দেখতে পাই পাকবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন-এর নেতৃত্বে পাঁচজন সৈনিক রেলে ট্রলির মাধ্যমে রেশন নিয়ে যাচ্ছে। তৎক্ষণাৎ সাথের সবাইকে অবহিত করি। আমরা সময়ক্ষেপণ না করে রকেট লাঞ্চারের মাধ্যমে ফায়ার করি এবং ঘটনাস্থলে তারা নিহত হয়। ঘটনার পর ঐ দিন পাকবাহিনীর বিমানগুলো আমাদের উপর উপযর্ুুপরি আক্রমণ চালাতে থাকে। এতে আমার সেকেন্ড-ইন-কমান্ডার ল্যান্স নায়েক আবদুল লতিফ গোলার আঘাতে শহীন হন। অবশেষে আমরা পরশুরাম এলাকায় পাকবাহিনীকে পরাভূত করি। তা ছাড়াও মুন্সীরহাট, কালীর বাজার, ফেনী এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আমরা মুক্ত করতে সক্ষম হই।
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা নিজ সেক্টরে অর্থাৎ ৩ নং সেক্টরে ফিরে আসি। ৩ ডিসেম্বর শেষ রাতে আমরা আজমপুর সিংগারবিল এলাকায় পাকবাহিনীর উপর আক্রমণ করি। সেই আক্রমণে আমাদের লে. বদিউজ্জামান শহীদ হন। তা ছাড়াও আমার পাশে থাকা হাবিলদার আশরাফ আলী ও ৭ জন সৈনিক শহীদ হন। সেই এলাকায় আমরা ডিফেন্সে থাকি পাঁচ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
৬ ডিসেম্বর আমরা মনতলা, হরেশপুর এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি। ৭ ডিসেম্বর তারিখে আমাদের ডান পাশে থাকা ১১ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর নাসিম চান্দুরা বিরামপুর এলাকায় গুরুতর আহত হন। পরে আমরা সরাইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লালপুর দিয়ে রায়পুরা আসি। রায়পুরায় একদিন অবস্থান করে নরসিংদী হয়ে সোনারগাঁও এলাকার পোড়াবাড়ী গ্রামে অর্থাৎ ডেমরা নদীর পূর্ব পাশে প্রতিরক্ষা নিই। ১৪, ১৫ ও ১৬ ডিসেম্বরের ২.৩০ মিনিট পর্যন্ত সেই এলাকায় প্রতিরক্ষায় থাকি। পরে ডেমরা নদী পার হওয়ার পর আমাদের নিকট পাক বাহিনীর একটি ব্যাটালিয়ান আত্মসমর্পণ করে। ঐ পাকবাহিনীর ব্যাটালিয়ানকে নিয়ে ঢাকার দিকে রওয়ানা হই। বিকাল ছয়টার দিকে টিকাটুলি দিয়ে ঢাকা স্টেডিয়ামে পৌঁছাই। ঐ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকে আগুন জ্বলছিল। সে আগুন নিভানোর জন্য আমাদের এক প¬াটুন সৈন্য সেখানে নিয়োগ করা হয় এবং সেই আগুন আমরা আয়ত্তে আনি। পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশি¬ষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে আমরা ব্যাংকের দায়দায়িত্ব বুঝিয়ে দিই। আমরা জানতে পারি যে, আমাদের পূর্বের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল এম এইচ খান ঢাকা জেলখানায় বন্দি আছেন। তখন আমরা তাকে জেলখানা থেকে মুক্ত করে আনতে যাই। আমাদের যাওয়ার খবরে জেলখানার কর্মকর্তা কর্মচারী সবাই ভেগে যায়। বাধ্য হয়ে অনুমতি নিয়ে গুলি করে জেলখানার তালা ভেঙে ফেলি। তখন দুর্বার স্রোতের মতো বন্দীরা বের হতে থাকে। শেষে আমরা অফিসারদের দেখা পাই।
প্রশ্ন: পাকিস্তানী বাহিনি তো দক্ষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত ছিল, কখন কিভাবে বুঝলেন পাকিস্তানী সৈন্যদের সাথে আপনার জিততে পারবেন?
মো. র. : পাকিস্তানী সেনাবাহিনি চাকুরির খাতিরে যুদ্ধে করছিল। আর আমাদের জীবন মরণ, পরিবার রক্ষা, দেশ রক্ষা। মাতৃভূমি রক্ষা। আমরা জিতব না, এমন হতেই পারে না।
প্রশ্ন: পাকিস্তানি সেনা আর আপনাদের কৌশলগত পার্থক্য কী ছিল?
মো. র. : এ মাটি আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল। গেরিলা ও নিয়মিত উভয় যুদ্ধেই তাদের চেয়ে দিন দিন এগিয়ে গেছি আমরা।
প্রশ্ন: স্বাধীনতার ৪০ বছর পর স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার হচ্ছে এ বিষয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া?
মো. র. : দেশ পাপমুক্ত হচ্ছে। এ বিচার বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
প্রশ্ন: ৪৮ বছর পর এসে কি মনে হয় আপনার যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছেন তা কতটা সফল, কতটা ব্যর্থ?
মো. র. : এটা ভাবি না। তখনকার প্রেক্ষিতে যা করণীয় ও সঠিক তাই করেছি। দেশকে মাতৃভূমিকে হায়েনার হাত থেকে রক্ষা করেছি। আমার সন্তানরা একটি স্বাধীন দেশে বেড়ে উঠছে। তাদের একটি স্বাধীন দেশ দিয়েছি। এক জীবনে এর চেয়ে বেশি আর চাওয়া পাওয়া কি থাকতে পারে।
প্রশ্ন: তরুণ সমাজের প্রতি আপনার কোনো বক্তব্য?
মো. র. : আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। বাবারা তোমরা তা রক্ষা করো। সমাপ্ত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here