মুজিবনগরে প্রবাসী সরকার গঠন এবং সরকারের কিছু কার্যাবলী ও অন্যান্য প্রসঙ্গ- মাহবুবুল আলম

0
206

মুজিবনগরে প্রবাসী সরকার গঠন এবং সরকারের কিছু কার্যাবলী ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
মাহবুবুল আলম

 

 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে প্রবাসী বা মুজিবনগর সরকার গঠন এক ঐতিহাসিক ঘটনা এবং ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধও ইতিহাসে আর একটি ঐতিহাসিক দিন। এদিন কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমা তখনও মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দখলমুক্ত। মেহেরপুরের ভবের পাড়া গ্রামের বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে ৫০ জনের অধিক বিদেশি সাংবাদিক দেশীয় সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধা এবং আইনসভার সদস্যের উপস্থিতিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসর আলবদর, আলসামস ও রাজাকার বাহিনী যখন দেশের অভ্যন্তরে ছাত্র-যুবক, মা-বোনদের উপর পাশবিক অত্যাচার চালাচ্ছিল, গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছিল; তখন মুজিবনগরে সরকার গঠিত হওয়ায় জনগণ আশার আলো দেখতে পায়। ছাত্র-যুবকগণ দলে দলে দেশত্যাগ করে ভারতে এবং মুক্তাঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে। মুজিবনগর সরকার মুক্তাঞ্চলে এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় এলাকায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ (ণড়ঁঃয ঞৎধরহরহম ঈধসঢ়) স্থাপন করে। এখানে ছাত্র-যুবকদের সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এদের মধ্যে অনেককে পরবর্তীতে ভারতের সেনাবাহিনী প্রশিক্ষণ প্রদান করে। মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে যুদ্ধ পরিচালনার সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব প্রদান করে।
এই দিন মুজিবনগরে প্রবাসী বাংলাদেশের সরকারের শপথ গ্রহণ করে। এই অনুষ্ঠান আয়োজনে মেহেরপুরের এম, ডি, পি, এ, ডা. আসহাবুল হক, এস, ডি, ও তৌফিক এলাহী চৌধুরী, ঝিনাইদহের এস, ডি, পি, ও মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মেজর আবু ওসমান চৌধুরী প্রমুখ গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নব গঠিত সরকারকে শপথ বাক্য পাঠ এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী এম, এন এ। গার্ড অব অনার অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব প্রধান করেন এস, ডি, পি, ও মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজর”ল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এবং প্রধান সেনা নায়ক এম, এ, জি, ওসমানী ভাষণ দান করেন। নবগঠিত সরকার তৎক্ষণিকভাবে বৈদ্যনাথতলার নামকরণ করেন মুজিবনগর এবং এটিকে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানীও ঘোষণা করেন। এজন্যই পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকার দেশে-বিদেশে মুজিবনগর সরকার নামে পরিচিতি অর্জন করে। বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার বা মুজিবনগর সরকার গঠিত হয়েছিল ১৯৭০-৭১ সালের নির্বাচনে নির্বাচিত কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যগণকে নিয়ে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ ন্যাপ (মো) কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ (ভাসানী), জাতীয় কংগ্রেস দলের নেতাগণকে নিয়ে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয় মুজিবনগর সরকারকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় সাহায্য সহযোগিতা ও উপদেশ প্রদানের জন্য।
মুক্তিযোদ্ধাদের মনোবল ঠিক রাখা এবং বিভিন্ন সেক্টর ও গেরিলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্ব মুজিবনগর সরকার নিষ্ঠার সাথে পালন করে। পাশাপাশি জনগণের মনোবল ঠিক রাখা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণœ রাখার জন্য এই সরকার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, সংবাদপত্র বুলেটিন প্রভৃতির মাধ্যমে প্রচেষ্টা চালায়। স্বাধীন বাংলা বেতারের দেশাত্মবোধক গানগুলো এবং চরমপত্র অনুষ্ঠানিক মুক্তিযোদ্ধা ও জনগণকে উদীপ্ত করে তুলে। মুক্তিযুদ্ধের একটি পর্যায়ে অনেক এলাকা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত ও স্বাধীন হয়। মুজিবনগর সরকার এসব মুক্ত এলাকায় বেসামরিক প্রশাসন গড়ে তোলে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা, লক্ষ্য, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হিংস্রতা ও গণহত্যা এবং পাশাপাশি মুক্তিবাহিনীর সাফল্য বর্হির্বিশ্বে প্রচার করে জনমত সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ও মুজিবনগর সরকার প্রশংসনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় এটি যেন ভুলপথে পরিচালিত হয়-এমন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও চালায় পাকিস্তানি এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী পরাশক্তি আমেরিকা। পাকিস্তানের সাথে আবারো ঐক্যের প্রচেষ্টা চলতে থাকে খোন্দকার মোশতাকের গোপন ইঙ্গিতে।
কিন্তু দৃঢ় ও স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদর নেতৃত্বে এসব চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেয়। মুজিবনগর সরকার সুযোগ্য নেতৃত্বে বাঙালি জাতি অগ্রসর হতে থাকে মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করে স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনার জন্য। বাংলাদেশের ইতিহাসে মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশের সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল অনন্য সাধারণ ঘটনা। এর বিবরণ দিয়েছেন সুসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এভাবেÑ “গাড়িগুলো শেষ পর্যন্ত এসে থামল একটি বিশাল আম বাগানের মধ্যে। এই গ্রামটির নাম বৈদ্যনাথ তলা, জেলা কুষ্টিয়া, মহকুমা মেহেরপুর। কিছু লোক সেখানে দৌড়াদৌড়ি করে চেয়ার সাজাচ্ছে, অধিকাংশই হাতল-ভাঙ্গা চেয়ার, কাছাকাছি গ্রামের বাড়িগুলো থেকে জোগাড় করে আনা জায়গাটি ঘিরে রাইফেল আর এলএমজি হাতে পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ২৫-৩০ জন সৈন্য, তাদের ঠিক আশপাশের গ্রাম থেকে ধেয়ে এসেছে বিপুল জনতা। অস্ত্রধারী সেনাদের বৃত্ত ভেদ করে তারা হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়তে পাড়ছে না বলে অনেকেই আমগাছগুলোতে চড়তে শুর” করেছে। অনুষ্ঠান শুর” হল এগারটার পর। তাজউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজর”ল ইসলাম সবাই এসে গেছেন। তবে যার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় ছিল, তিনি নেই, তিনি আসবেন না। শেখ মুজিব যে কোথায় আছেন তা এখনো জানা যায়নি। তবু অনুপস্থিতি তাজউদ্দিন আহমেদ, এইচ. এম. কামর”জ্জামান এবং এম. মনসুর আলী। বাংলাদেশ সৈন্যবাহিনীর কমান্ডারইন চিফ নিযুক্ত হলেন রিটায়ার্ড কর্ণেল ওসমানী। এর সাতদিন আগেই কলকাতার থিয়েটার রোডের অস্থায়ী মুজিবনগর থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সনদ ঘোষণা করেছিলেন। আজ ১৭ এপ্রিল, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের ঐতিহাসিক দলিলটি পাঠ করলেন চিফ হুইপ ইউসুফ আলী। এদিন শপথ অনুষ্ঠানের পর বাংলাদেশ সারকারের প্রাধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এক প্রেস বিবৃতি দেন।” এতে তিনি বলেন-

Bangladesh is at wer. It has been given no choice butt secure its right of self-determination through a national liberation struggle against the oppression of west Pakistan. … Pakistan is now dead and buried under a mountain of corpses. …Yahiya’s genocide is thus without political purpose. It serves only as the last act in the tragic history of Pakistan Yahiya has chosen to write with the blood of the people of Bangladesh. The genocide and scorched earth before his troops are either most populous country in the world. Its only goal will be to rebuild a new nation from the ashes and carnage left behind by Yahiya’s occupation army.

In our struggle for survival we seek the friendship of all people, the big powers and the small. We now appeal to the nations of the world for recognition and assistance both material and moral in our struggle  for nationhood. ..

This we now present to the world as the case of the people Bangladesh. No nation has a greater right to recognition. no people have fought harder for this right.

ÒJoy BanglaÓ

প্রবাসী সরকারের নিদের্শাবলী
হানাদার পাকিস্তানি পশুশক্তিকে বাংলাদেশের পবিত্র মাটি থেকে হটিয়ে দেবার ও বাঙালিকে শোষণমুক্ত করে একটি নতুন সুখী-সমৃদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃপ্ত শপথ ও ব্রত নিয়ে বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নেতৃত্বে গত ১০ এপ্রিল রাতে স্বাধীন বাংলাদেশ বেতার থেকে বাংলাদেশ সরকার ঘোষণা করা হয়েছে। এ ঘোষণার পর থেকে মুক্তি সংগ্রাম ঠিক পূর্বের মতোই এক সুষ্ঠ গতিতে চলছে। প্রতিটি বাঙালি আজ নিজ নিজ ঘরে প্রতিরোধের দুর্গ গড়ে সঙ্কল্প দৃঢ় থেকে আরও দৃঢ় করে তুলছে।
জনযুদ্ধের আশু সাফল্য অর্জনের সরকার সম্প্রতি কতগুলো নির্দেশ জারি করে। এগুলো হল ঃ
১। প্রতি শহর, গ্রাম, মহল্লায় একজন অধিনায়ক নির্বাচিত করে সমাজ জীবনে শৃঙ্খলা রক্ষা, অসহযোগ, প্রতিরোধ ও দুর্বার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।
২। নিজ নিজ এলাকায় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রবাদির চাহিদা মিটাবার জন্য খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও উৎপাদন বাড়াতে হবে।
৩। চুরি, ডাকাতি, কালোবাজারি ইত্যাদি সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বির”দ্ধে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে।
৫। দৈনন্দিন জীবনে সংযম ও কৃচ্ছ চালিয়ে যেতে হবে। সর্বপ্রকার বিলাসিতা ত্যাগ করে জাতির বৃহত্তর কল্যাণে পারস্পারিক ভ্রাতৃত্বের হাতকে দৃঢ়তর করতে হবে। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার সাথে মুক্তিবাহিনীর সাথে প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে হবে।
৬। গ্রাম, শহর, মহল্লায় নেতা নির্বাচন করে যোগাযোগ ও পণ্য বিনিময়ের ব্যবস্থা করতে হবে। উপরের স্তরে শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকবে প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত সদস্যদের হাতে।
৭। মুক্ত এলাকায় সরকারি-আধাসরকারি কর্মচারীরা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নির্দেশে কাজ করবে। শত্র” কবলিত এলাকায় নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
৮। সকল সামরিক, আধা সামরিক কর্মকর্তা বা অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি কর্মচারীরা নিকটতম মুক্তিসেনা শিবিরে যোগ দেবেন এবং কোন অবস্থাতে শত্র”র সহযোগিতা করবেন না।
৯। যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিশেষভাবে নৌ-চলাচল সংস্থার কর্মচারিরা শত্র”র সাথে সহযোগিতা করবেন না।
স্মরণ কর”ন-আল্লাহ প্রতিশ্র”তি দিয়েছেন- অতীতের চাইতে ভবিষৎ নিশ্চয় সুখকর, বিশ্বাস রাখুন, আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় নিকটবর্তী। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় শেখ মুজিব”
১৭ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে সম্মুখে যুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে কুমিল্লার দুর”ইনে সিপাহী মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল শহীদ হন। ১৮ এপ্রিল শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আব্দুর রাজ্জাক, তোফায়েল আহমেদ, আ. স. ম. আব্দুর রব ও শাজাহান সিরাজ ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্তণনমুক্ত একটি বাহিনী গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই বাহিনীর নাম করণ করা হয়, বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স’ (BLF)| এদিন দিল্লিস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনারের কর্মকর্তা ও কুটনীতিবিদ কে. এম. শাহাবউদ্দিন ও আমজাদুল হক বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য ঘোষণ করেন এবং ভারত সরকারের নিকট রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবুসাঈদ চৌধুরীকে জাতিসংঘের বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি বিদেশেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। ২৪ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের স্বীকৃতি প্রদান করার জন্য বিশ্বের দেশের সরকারের নিকট অনুরোধ জানিয়ে পত্র প্রেরণ করা হয়। ২৫ এপ্রিল মুজিবনগর থেকে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুর” হয়। ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ প্রতিবেশী দেশসমুহের কাছে স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি অস্ত্র সাহায্যের জন্যও অনুরোধ জ্ঞাপন করেন। পাশাপাশি তিনি দেশবাসীকেও মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়ার আহবান জানান এবং বিদেশ কর্মরত ও বসবাসরত বাঙালিদেরকে মুক্তিযুদ্ধে সবধরনের সাহায্য সহযোগিতা প্রদানের আবেদন জানান। মে মাসের শুর”তে মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশের জনগণের প্রতি নিন্মলিখিত ৭ দফা-নির্দেশাবলি জারি করেন। এগুলো হল ঃ-
১। পাকিস্তানি সরকার ও দখলদার বাহিনীকে কোনধরনের সহযোগিতা প্রধান করা চলবে না।
২। পাকিস্তানি সরকারকে খাজনা-ট্যাক্স দেয়া বন্ধ করতে হবে।
৩। ১৮-৩০ বছর বয়স্ক যুবকদের অবিলম্বে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করতে হবে।
৪। কৃষি জমিতে পাট চাষ না করে ধান চাষ করতে হবে।
৫। গণধিকৃত দখলদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নির্মুল করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধাকে সর্বপ্রকারে সহযোগিতা প্রদান এবং দখলদার বাহিনীকে প্রতিপদে বাঁধা দিতে হবে।
৬। সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি বজায় রাখতে হবে।
৭। সকল সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীদের পাকিস্তানি সরকারের অধীনে যোগ না দিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করতে হবে এবং মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
১৪ মে, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ১৮ দফা নির্দেশ জারি করে জনগণের করণীয় কি তা তুলে ধরেন। ১৬-২০ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ, এইচ. এম. কামর”জ্জামান ‘হিন্দুস্থান টাইমস-এর প্রতিনিধির সাথে সাক্ষাৎকারে বলেন, পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাংলাদেশের দখলে থাকা এলাকায় প্রশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। পাকিস্তান সরকারের উচিত বিশ্ববাসীকে মনগড়া মিথ্যা কথা বলে বিভ্রান্ত না করে বাংলাদেশ থেকে তাদের সৈন্য ফিরিয়ে নেয়া এবং এদেশের জনগণের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া। তিনি দৃঢ়কন্ঠে আরো বলেন যে,

Those who accept Bangladesh as their motherland and  are connected with the liberation war our brothers. Those who are playing the role of quislings, whatever their religion, are our enemies, and the enemies of Bangladesh.They shall be tried by people court.

 

২৫ মে, ১৯৭১ তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দল মি. ফণীভূষণ মজুমদারের নেতৃত্বে মুজিবনগর ত্যাগ করেন। সদস্যগণ হলেন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ মহিলা শাখার সাধারণ সম্পাদিকা বেগম সারোয়ার মোর্শেদ এবং প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। প্রতিনিধি দলটি সাপ্তাহব্যাপী নয়াদিল্লিতে ভারতীয় পার্লামেন্টের বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ এবং বেশকিছু প্রদেশের রাজনৈতিক নেতার সাথে উভয় দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেন। ১৮ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ. এইচ. এম. কামর”জ্জামান ৩০ মে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে এক সার্কুলার জারি করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন এবং বলেন যে, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারগুলোকে পূর্ণবাসিত করা হবে।
মে মাসের শেষ দিকে পাকিস্তান সরকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছাড়তে থাকে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঢাকায় ফেরত আনা হবে এবং তাকে দিয়ে বাংলাদেশী জনগণকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা প্রদান এবং পাকিস্তান সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে বলা হবে । তাদের ধারণা এতে বাঙালি জনগণ শান্ত হবে এবং মুক্তিযুদ্ধ থেকে সরে আসবে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে ২ জুন অষষ ওহফরধহ জধফরড় তে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে আহব্বান জানান। এই টেলিগ্রামের কপি ঙওঈ ভূক্ত সকল রাষ্ট্রপ্রধান এবং সউদী বাদশাহ ফয়সল শেখ সাহাব শেখ বিন বাজ এর নিকট প্রেরণ করা হয়। কিন্তু মার্কিন সরকার কর্ণপাত করেনি। ২৮ জুন মার্কিন সরকার ঘোষণা করে যে, অন্যান্য দেশ সাহায্য বন্ধ করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সাহায্য প্রদান কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
১১ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা প্রদান এবং বেসামরিক প্রসাশন চালানোর জন্য ১০ টি জোনাল কাউন্সিল গঠন করা হয়। ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্যদের নিয়ে ৩ টি ব্রিগেড গঠন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এ দিন সেক্টর কমান্ডারদের ৩ দিনব্যাপী বৈঠকও শুর” হয়। ১২ জুলাই প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নিযুক্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি পাকিস্তানের জন্য প্রস্তাবিত সংবিধানে আরবি হরফে বাংলা লেখার প্রস্তাব করে। এছাড়াও এ কমিটি পূর্ব পাকিস্তানে দুই থেকে চারটি প্রদেশ করার প্রস্তাব করে। তাঁদের প্রস্তাবে পাঞ্জাবকে পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ প্রদেশের মর্যাদা দান করা হয়। এই কমিটি পাকিস্তানে হিন্দুদের ভোটাধিকার বিলোপেরও সুপারিশ করে। পাকিস্তানি সেনারা সমগ্র বাংলাদেশের সর্বত্র হত্যা, লুন্ঠন, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ, লুটপাত চালাতে থাকে। ১৩ জুলাই যশোরে পাকিস্তানি সেনারা প্রায় ৩০ হাজার মানুষকে হত্যা করে। ১৭ জুলাই বিকাল ৫:৩০মিনিট বাংলাদেশ মন্ত্রীসভা সিন্ধান্ত গ্রহণ করে যে, এরপর থেকে নিয়মিত প্রতি সোম ও শুক্রবার মন্ত্রিসভার মিটিং বসবে। শুক্রবার-এর মিটিং এ ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক’ অর্থাৎ প্রতিরক্ষা (উবভবহপব) ংবঃ ঁঢ় পর্যালোচনা করে বলা হয় যে, প্রয়োজনে বর্তমান ৫টির স্থলে ৮টি তড়হধষ অফসরহরংঃৎধঃরাব ঙভভরপব স্থাপন করা হবে। ১৮ জুলাই মন্ত্রীপরিষদ মিটিং এ প্রফেসর রেহমান সোবহানকে বাংলাদেশ সরকারের অর্থবিষয়ক দঊহাড়ু ঊীঃৎধ ড়ৎফরহধৎু’ এবং এম. আর সিদ্দিকী এম. এন. কে ঊহাড়ু নিয়োগ করা হয়। ৩১ জুলাই পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াইয়া খান একটি হাস্যকর ও উদ্ভট বক্তব্য প্রধান করে। তিনি বলেন যে, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল ১০% এর বেশী ভোট পাননি। তিনিও তার দলের লোকজন হিন্দুদের ভোটে জয়লাভ করেছিলেন। ১ আগস্ট নিউইয়র্কে বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে একটি কনসার্টের আয়োজন করে আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশী জনগণ। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে এই দ্য’ কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর জজ হ্যারিসন, রবিশঙ্কর ও ওস্তাদ আলী আকবর খাঁ অংশগ্রহণ করেন। ৭ আগস্ট পাকিস্তান সরকার ১৯৭০ সালে নির্বাচনে জাতীয় পরিষদে ঘধঃরড়হষ অংংবসনষু নির্বাচিত আওয়ামী লীগের ৭৯ জনের সদস্য পদ বাতিল ঘোষণা করে। ৯ আগস্ট অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজর”ল ইসলাম বিচার অনুষ্ঠান করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার যে কোন প্রচেষ্টা সম্পর্কে পাকিস্তানি প্রেসিডেন্টকে হুশিয়ার করে দেন। এ দিন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠক সিলেট জেলার ডেপুটি কমিশনার জনাব আব্দুস সামাদকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রানলয়ের সচিব নিয়োগ করা হয়। ১৩ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভা বিষয়ক সচিবগণ আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ে নিয়মিত সাপ্তাহিক সভা একদিন সংক্রান্ত সার্কুলার জারী করা হয়। এতে বলা হয় যে, সচিবগণ আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের জন্য সাপ্তাহে কমপক্ষে একদিন মিলিত হবেন এবং তা হবে প্রতি সোমবার সকাল ৯টায়। ১৫ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি গৌরবজনক অধ্যায় সৃষ্টি করে মুক্তিবাহিনীর দুঃসাহসিক সদস্যগণ। চট্রগ্রামে পাকিস্তানের দুটি সরঞ্জাম ভর্তি জাহাজ এম. ভি আল আব্বাস ও এম. ভি হরমুজ এবং ওরিয়েন্ট বার্জে মুক্তিযোদ্ধারা লিমরেট মাইনের সাহায্য বিষ্ফোরণ ঘটায়। এতে পাকিস্তানিদের প্রায় ২০৫৯৬ টন যুদ্ধোপকরণ নষ্ট হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই দুঃসাহসিক অপারেশনের নাম ‘অপারেশন জ্যাকপট’। ১৬ আগস্ট মংলা বন্দরে বিদেশী জাহাজ এম. এস. টাইটেনিকেও মুক্তিযোদ্ধারা লিমরেট মাইনের বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে ধ্বংস করে দেয়। ১৬ আগষ্ট মুজিবনগর সরকার মি. আব্দুল হান্নান চৌধুরীকে চেয়ারম্যান এবং মি. জে. জি. ভৌমিক ও মি. এস. বড়–য়াকে সদস্য করে একটি কমিশন গঠন করে। বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল থেকে প্রাপ্ত অর্থের যথাযোগ্য ব্যবহার হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখবে এই কমিশন। ২১ আগস্ট সরকার এক আদেশ বলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সিনিয়র লেকচারাল মি. সনৎ কুমার সাহাকে সরকারের ‘পরিকল্পনা সেলে’ অর্থনীতির হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে। এই দিন আন্তঃবিভাগীয় সচিবদের সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানুক্রমে প্রতি সোমবার সকাল ৯টায় সভা প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এবং তারই অফিসে অনুষ্ঠিত হবে। এদিন মুজিবনগর সরকারের তথ্য ও প্রচার বিভাগের ইনচার্জ জনাব আব্দুল হান্নান এম. এন. এ. স্বাক্ষরিত একটি গোপনীয় চিঠিতে বলা হয় যে, সরকারের সব বিভাগের উচিত পুর্ণবাসন মন্ত্রী জনাব এ. এইচ. এম. কামর”জ্জামান স্বাক্ষরিত একটি পরিচয় পত্র নিয়ে ত্রাণ ও পুণর্বাসন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জনাব আখতার”জ্জামান চৌধুরী এম. পি. এ. কে বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ দায়িত্ব প্রদান করে আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও দূরপ্রাচ্যের দেশসমুহের প্রেরণ করা হয়। ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারের কেবিনেট ডিভিশন সচিব স্বাক্ষরিত চিঠিতে মুক্তিযুদ্ধে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য খেতাব প্রধান সংক্রান্ত স্কিম অনুমোদিত হয়। ২৯ আগস্ট ঢাকার বড় মগবাজারে এক অপারেশন চালাতে গিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে আব্দুল হালিম চৌধুরী শহীদ হন। তাকে পরবর্তীতে (মরনোত্তর) ‘বীরবিক্রম’খেতাব প্রধান করা হয়।
১ সেপ্টেম্বর ‘যুব ক্যাম্প’-এর পরিচালক উইং কমান্ডার (বিমানবাহিনী) এস. আর মীর্জা জনাব আব্দুল খালেককে নিয়োগ করেন। ৩ সেপ্টেম্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দী অবস্থায় শিল্পী আলতাফ মাহমুদ নিখোঁজ হন।
৪ সেপ্টেম্বর মুজিবনগর সরকার স্বরাষ্ট্র সচিব আই. জি. আব্দুল খালেককে নিয়োগ প্রদান করেন। অর্থ মন্ত্রনালয় এ দিন রেভিনিউ স্ট্যাম্প ব্যবহার সংক্রান্ত নির্দেশাবলি জারি করে। ৫ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ দেশবাসীর প্রতি বেতার ভাষণ প্রদান করেন। এদিন যশোর ৮ নং সেক্টরে ল্যান্স নায়েক নুর মোহাম্মদ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। পরবর্তীতে তাকে বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব প্রধান করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর প্রত্রিকা প্রকাশনা সম্পর্কে সরাসরি বক্তব্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় প্রকাশ করে। ৬ সেপ্টেম্বর জনাব নূর উদ্দিন আহমদ কৃষি সচিব নিযুক্ত হন।
এভাবেই বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত মুজিবনগর প্রবাসী সরকার তাদের সুনির্দিষ্ট কার্যবলীর মাধ্যমে সঠিক দিক নির্দেশনার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যান। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর প্রবাসী সরকারের অবদান চির ভাষ্কর হয়ে আছে। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন থেকে হতাশার সাথে লক্ষ্য করছি, মুজিবনগর প্রবাসী সরকারের আবস্থাটি দিনে দিনে কেমন জানি ম্লান হয়ে যাচ্ছে। অথচ একবারও ভেবে দেখি না, বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে, তাঁকে প্রবাসী রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করে যে সরকার গঠিত হয়েছিল, সে সরকারই বঙ্গবন্ধুর নামে নয়মাস মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে বাংলাদেশকে স¦াধীন করে তুলেছেন। তাই আমরা যেন কোনদিন এ সরকারের অবস্থানকে কিছুতেই ম্লান হয়ে যেতে না দিই।
[মাহবুবুল আলম : কবি, গল্পকার, নিবন্ধকার ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here