লরেন্স বনোয়ারী এক অকুতোভয় সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা, মিলেনি সনদ

0
624

লরেন্স বনোয়ারী এক অকুতোভয় সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা, মিলেনি সনদ

 

লরেন্স বনোয়ারী এক অকুতভয় সাহসী বীর মুক্তিযোদ্বার নাম। সম্প্রদায় গারো। গারো ভাষায় বীর অকুতোভয় সাহসীকে খা.গ্রাক বলে। খা.গ্রাক বলতে যা বোঝায় তিনি তাই-ই। শুধু তাই নয় যেমনই তেজস্বী তেমনই ধারালো ব্যক্তিত্বের অধিকারী। কিন্তু অবাক ব্যপার হচ্ছে দীর্ঘদিন দৌড় ঝাপের পরও মুক্তিযোদ্ধার সনদ মিলেনি এখনো তার। কোথায় না তিনি গিয়েছেন? মুক্তিযোদ্বা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী খ. ম. মোজাম্মেল হক, মাননীয় কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চোধুরী, মাননীয় মন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান প্রমুখদের সাথে দেখা করেছেন তিনি। উল্লেখ্য মাননীয় মন্ত্রী প্রিন্সিপাল মতিউর রহমানের হাত ধরেই লরেন্স বনোয়ারী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহষ করেছিলেন। অন্যদিকে দলিত শোষিত কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের নেত্রী অগ্নী কন্যা আজকের নন্দিত মাননীয় কৃষি মন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকার বন্দধারা গ্রামে এই হতভাগ্য মুক্তিযোদ্ধার জন্ম হয়েছিল ১৯৫২ সালে এক ধর্নাঢ্য পরিবারে। চার ভাই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট।তার পিতার নাম কেনু ঘাগ্রা ও মাতার নাম মাসমুনি বনোয়ারী।
অগ্নিঝড়া বাঙালীর সেই মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় লরেন্স বনোয়ারী বর্তমান ঝিনাইগাতী উপজেলার আহম্মদ নগর হাই স্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছিলেন। সারা বাংলায় যখন দিকে দিকে বাঙালীর মুক্তির অগ্নি মশাল ও অগ্নি মিছিল দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ছিল তখন আহাম্মদ নগর হাই স্কুলেও সেই ঢেউ এসে লেগেছিল। আর সেই ঢেউ থেকে সেই মুক্তির মশাল হাতে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন লরেন্স বনোয়ারী। মা বাবাকে না বলেই বর্তমান গারোহিলসের রংনাবাগ নামক স্থানে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে চলে গিয়েছিলেন লরেন্স বনোয়ারী। এদিকে তার মা বাবা ছেলের খুঁজে খুুঁজে দিশে হারা। একদিন খোঁজ পেয়ে যান তার ছেলে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণে গেছে। খোঁজ পেয়ে তার মা প্রিন্সিপাল মতিউর রহমানের কাছে আসেন এবং বলেন, তার ছেলেকে সে কোনভাবেই যুদ্ধে যেতে দেবে না। ওদিকে ছেলের জেদ, সে মায়ের আঁচল ধরে হাত পা গুটিয়ে কোনক্রমেই ঘরে বসে থাকবে না। গারো হিলসের বর্তমান ডালু থানার অদুরে ডাবগ্রী গ্রামে মুক্তিযোদ্বাদের রিক্রুট করার জন্য একটি ইয়ুট ক্যাম্প খোলা হয়েছিল। আর এই ক্যাম্পের প্রধান ছিলেন প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান। প্রশিক্ষণ শেষ হবার সাথে সাথে প্রিন্সিপাল মতিউর রহমান লরেন্স বনোয়ারীকে ডেকে পাঠান এবং তাকে তার মার কাছে নিয়ে যান। তার মা ছেলেকে চোখের জলে, দেশের এই ক্রান্ত্রি লগ্নে যুদ্ধে পাঠাতে বাধ্য হয়। কি অবাক কান্ড দেশ মাতৃকার মুক্তির প্রশ্নে তার মায়ের বাধা মায়ের চোখের তার কাছে তুচ্চ মনে হয়েছিল। যুদ্ধে তার প্রথম দায়িত্ব ছিল হালুয়াঘাট থানার জয়রামকুড়া খ্রীস্টিয়ান হাসপাতালের এক কিলো পশ্চিমে একটি কালভার্ট ব্রিজ উড়িয়ে দেয়া। মুক্তিযুদ্ধে তার স্মরণীয় অপারেশন ছিলো নালিতাবাড়ী থানা পাক সেনা ক্যাম্প অপারেশন। একদিন একরাত শ্বাসরুদ্ধকর তুমুল যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পিছু হটে যাবার সময় পাকি সেনাদের ব্রাশফায়ার থেকে তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেচে যান। তারা ফিরে যান ভারতে, তাদের ক্যাম্পে। তারা যাচ্ছিলেন চান্দুবইহাজং উদ্বাস্তুদের ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে (স্থানটি বর্তমান গারো হিলসের ডালু থানার দেড় কিলো পশ্চিমে)। ক্যাম্পের ভেতর দিয়েই রাস্তা। রাস্তার দু’পাশে হাজং বস্তি। এই হাজংরা উদ্বাস্ত হয়েছিলেন ১৯৫০ সালে। পাকিস্থান সরকার কম্যুনিস্ট দমনের নামে বর্বোরোচিতভাবে সেদিন হাজংদের বিতাড়িত করেছিলেন এই দেশ থেকে। আর এখানেই আশ্রয় নেন প্রখ্যাত হাজং নেতা কমরেড বিপিন গুন ও কমরেড জ্যোতি হাজং প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধের সময় আজকের মাননীয় কৃষি মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী কমরেড জ্যোতি হাজং-এর বাড়িতেই অবস্থান করেছিলেন। মুক্তিযোদ্বা লরেন্স বনোয়ারীর ভাষায়, তখন প্রায় সকাল ৮টা আমরা যাচ্ছিলাম্ আমাদের ক্যাম্পে। আমি ছিলাম সবার পেছনে। আমার পড়নে ছিলো সাদা সেন্দেল গেঞ্জি ও লুঙ্গি। কাঁধে স্টেনগান কোমড়ে গুজা দু’টো গ্রেনেট। আজকের কৃষি মন্ত্রী সেদিন আমাকে দেখে, এই ছেলে, এই ছেলে বলে ডাকছিলেন, এবং বলছিলেন- তোমার গায়ে এই সাদা স্যান্ডো গ্যাঞ্জি, তুমি তো টার্গেতে পড়ে যাবে। এই সার্টটা পর বলে একটি ঘিয়ে রঙের সার্ট বের করে দিয়েছিলেন।
এত ঘোরাঘুরি এত কাঠ খড় পোড়ানোর পরও এখনো এই বীর মুক্তিযোদ্ধার কপালে মুক্তিযুদ্ধের সনদ মিলেনি। শুধু কি লরেন্স বনোয়ারী? শুধু লরেন্স বনোয়ারী নয়, এমন অনেক আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন যারা মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে। এইসব মুক্তিযোদ্ধারা রাষ্ট্র ও সরকারের সম্মান ও স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন। বিগত বছর নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার নারী মুক্তিযোদ্ধা তুষি হাগিদক ও মল্লিকা ঘাগ্রা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় থেকে উপজেলায় প্রেরিত মুক্তিযোদ্ধা ফরমে ফর্ম পূরণ করে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু সে আবেদন নাকি রিজেক্টেট হয়েছে। তারা নাকি আবার আপিল করেছেন। হায় হায় সরকার ও রাষ্ট্র এখনো জানে না, আদিবাসীরা নকল হয় না, নকল সাজতে পারে না, কৃত্রিম হয় না, অভিনয় করতে পারে না। এসবই তাদের স্বভাব বিরুদ্ধ।
[ তাপ¯্রাং সরোজ ¤্রং : আদিবাসী লেখক ও গবেষক]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here