দুঃসময় -খোকন দাস

0
21

 

দুঃসময়
খোকন দাস

লোক দুটো বেটে গাট্টাগোট্টা, গায়ের রঙ বিশ্রি রকমের কালো, চেহারাও বিদঘুটে; নাসেরের দুই হাত পিছমোড়া বাঁধার আগে সাপের মতো হিশ হিশ শব্দ করে হাসে। পায়ে দড়ির ফাঁস লাগিয়ে হেঁচকা টান দেয়ার আগেও হাসে, মেঝেতে ধপাস পড়ে যাওয়ার পর আবারো সেই হাসি; এই হাসি কোন কালেই যেন থামবে না। জায়গাটা একটা বহুতল ভবনের বেজমেন্ট না অন্য কোথাও বোঝা যায় না। লাল প্যান্ট পরা কদমছাঁট চুলের লোকটা দলনেতা, হাবভাবে অন্তত সে রকমই মনে হয়। তার নির্দেশে খর্বাকৃতির দুইজন বস্তা নিয়ে হাজির। অবিরাম চিৎকার করে যায় নাসের, মুখে এক দলা তুলা গুঁজে দেয়ায় গোঙ্গানির শব্দ ছাড়া কিছুই বের হয় না। এতোক্ষণ যাকে দলনেতা মনে হয়েছিল সে আদতে দলনেতা নয়, বোঝা গেল দামি মোবাইল হাতে টকটকে লাল টি-শাটপরা ঢলঢলে ভুঁড়িওয়ালা লোকটা ঢোকার পর। লাল প্যান্টপরা লোকটা ভুঁড়িওয়ালার সামনে এসে দাঁড়ায় মাথা নিচু করে। ভুঁড়িওয়ালা কথা বলে মাত্রাতিরিক্ত উচু গলায়, এই কারণে প্রতিটা কথা দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে।
‘এই মালটাকে রাতেই খতম করে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেবে। নদীতে ফেলার আগে ভুঁড়ি নামিয়ে দেবে।’ Ñ কর্কশ গলায় এই নির্দেশ দেয় ভুঁড়িওয়ালা। লালপ্যান্ট পরা লোকটা নীরবে ঘাড় কাত করে বস্তাওয়ালা দুই জনের দিকে এগিয়ে যায়।
‘বাঁচাও, বাঁচাও, মেরি, প্লিজ আমাকে বাঁচাও’ Ñ প্রাণপনে অবিরাম চিৎকার করে নাসের, এই চিৎকারের মধ্যেই ঘুম ভেঙে যায়। লেপ সরিয়ে দেখে ডিসেম্বরের তীব্র শীতের মধ্যেও শরীর ঘামে ভিজে জবজব। দক্ষিণের জানালার একপাল্লা খুলে দিয়ে এক ঝটকায় যে ঠান্ডা বাতাস এসে চোখে-মুখে লাগে তাতে আরাম বোধ হয়। ইলেকট্রিকের তারের মাঝ খানে আটকে থাকা ¤্রয়িমান চাঁদ দেখেতে দেখতে এমন স্বপ্নের অর্থ খোঁজে নাসের।
কয়দিন আগেও ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় যে হাঙ্গামা, হানাহানি, খেওখেই ছিল নিত্য ঘটনা এখন তার কিছু নেইÑ চারিদিকে দম বন্ধ হওয়া গুমোট নিস্তব্ধতা Ñ যা কিছু অস্থিরতা উপর তলায়। বাঁধাধরা চাকরি, ফরমায়েশি আঁকাআঁকি, বউ-ছেলে-মেয়ে নিয়ে গতানুগতিক সংসার নাসেরের, ওপরতলার তোলপাড়ে তার কি আসে যায়? এইসব আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে দুই সন্তানসহ নিদ্রাচ্ছন্ন মেরির পাশে শুয়ে পড়ে।

দুই
স্বপ্নটা যে একটা অশনি সংকেত ছিল সেটা বুঝলো কয়েক দিন পরে। অফিসে গিয়ে দেখে গেটে মস্ত বড় তালা ঝুলছে; ‘অনিবার্য কারণবশত পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করা হয়েছে’ Ñ এ জাতীয় নোটিশ বড় বড় হরফে লেখা রয়েছে। এই রকম একটা খবর মেরিকে দেয়া হয়নি; আসলে দেয়ার সাহস হয়নি। দুপুরে খেয়েদেয়ে বাসা থেকে বের হয়ে সারাদিন উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘোরি, সন্ধ্যায় শাহবাগে সদ্য বেকার সকর্মীদের সঙ্গে আড্ডা শেষে রাত দশটায় বাসায় ফেরা Ñ এইভাবে কয়েকদিন কেটে যায়। একটা অপরাধবোধ তীক্ষè কাঁটা হয়ে খুঁচিয়ে চলছে অবিরাম; সত্যটা মেরিকে বলা দরকার। দুপুরে চিন্তা করে রাতে বলবে, রাতে চিন্তা করে পরদিন দুপুরে Ñ এই করে করে আরো দুই দিন চলে গেলো। সেদিন দুপুরে খাওয়ার সময় বার দুয়েক চেষ্টার পর কথাটা ঠোঁটের ডগায় নিয়ে মেরির দিকে তাকাতেই মাথা ঝাঁকিয়ে মুখ ঢেকে রাখা অবাধ্য চুল সরাতে সরাতে মেরি বলে, ‘গতকাল সন্ধ্যায় মামার সঙ্গে কথা হয়েছে। মামা বললেন জামাইকে নিয়ে চলে আয়, জামাই আপাতত কিছুদিন আমার ব্যবসা দেখুক। পরে দেখা যাবে কি করা যায়।’
অবাক দৃষ্টিতে মেরির চোখে চোখ রাখতেই মেরি আবার বলতে শুর” করে, ‘তুমি এমন করে চেয়ে কি দেখছ? মনে করেছ আমি তোমার পত্রিকা বন্ধের খবর জানি না, আমি সব খবরই জানি। দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়, যারা ক্ষমতায় আছে তারা সহজে ছাড়বে না। ক্ষমতা হলো এমন জিনিস যেটা স্বেচ্ছায় ছাড়া যায় না। তোমাদের কাগজ বন্ধ হয়েছে, আরো কাগজ বন্ধ হবে, টেলিভিশন বন্ধ হবে। এই অবস্থায় আমাদের সিরাজগঞ্জ চলে যাওয়ায় ভালো। তুমি মত দিলে মামাকে ফাইনাল জানিয়ে দেবো।’
মিনমিনে গলায় নাসের বলে, ‘কিছু দিন চেষ্টা করে দেখি। এতো তাড়াতাড়ি হাল ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না।’
‘চেষ্টা করে দেখতে পার, ফল হবে না। একটার পর একটা মিডিয়া বন্ধ হচ্ছে, দলে দলে সাংবাদিক বেকার হচ্ছে তোমাকে চাকরি দেবে কে? তাছাড়া তুমি তো সাংবাদিকও নয়, পত্রিকার আর্টিস্ট।’
সামান্য কেশে গলা পরিষ্কার করে নাসের বলে, ‘শোন, মানুষের এক দুয়ার বন্ধ হলে অন্য দুয়ার খুলে যায়। এর আগেও তো একবার . . .।
‘এবার কোন দুয়ারই খুলবে না। সে-বার পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পর তিনমাস ঘরে বসে ছিলে। হায়দার ভাই ডেকে নিয়ে তার কাগজে চাকরি দিলো। ঢাকা শহরে তোমার গার্জিয়ান বলতে এক হায়দার চৌধুরী আর চন্দন সরকার। হায়দার ভাই নিজেই বেকার, চন্দনদার চাকরি কবে যাবে তার নাই ঠিক।’
‘তুমি এতো ভেঙে পড়ছ কেন?’
‘আমি ভেঙে পড়ছি না, তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি। আর ভেঙে পড়বো না কি কারণে শুনি? রাত পোহালেই খরচ। ছেলেমেয়ে দুটো ঘুম থেকে উঠেই শুর” করে খাই খাই। বাড়িওয়ালা দশ তারিখ না যেতেই হানা দেয়। কয়দিন পর গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবে। এতো দিনেও ঢাকা শহর তোমার চেনা হয়নি, এখানে কেউ কারো নয়। আর তুমি বলছো ভেঙে পড়ছো কেন?’

তিন
ঘরে আসবাব বলতে বড় একটা ইজেল, পাশে লম্বামতো একটা টুলে রঙ, তুলি, রঙ মোছার নেকড়া। পাশাপাশি একটা স্টিলের আলমারি ও কাঠের শোকেজ। শোকেজের বই আর ক্রোকারিজের দার”ণ সহাবস্থান। এর পাশে কম্পিউটার টেবিল, সামনে একটি বাহারি বেতের চেয়ার। বিভিন্ন আকৃতির কয়েকটা মুখোশ দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে সাঁটানো। পাশের ঘরে একটা সিঙ্গেল খাট, কতোগুলো ছবির ফ্রেম, পুরানো মডেলের একটা রঙিন টিভি। র”মটার সামনে একচিলতে রান্নাঘর, সঙ্গে লাগোয়া বাথর”ম।
মেঝেতে বড় একটা মাদুরে ছেলেমেয়ে দুটো খেলছে। দুই হাতের তালুতে মাথা রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে নাসের। ঘুম থেকে ওঠে কড়া চা খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘ দিনের। নাসেরের মাথার পাশে মেরি কখন একমগ কড়া চা রেখে যায় সেদিকে খেয়ালই নেই। গায়ের রঙের দিক থেকে নাসেরের সঙ্গে মেরির দার”ণ বৈপরিত্ব। চুল উঠে লালছে ফরসা কপালটা বেশ প্রশস্ত, শক্ত-সামর্থ গড়নের শরীর, চেহারায় শিল্পীর ছিরিছাপ্পা বলে কিছু নেই। অপর দিকে গায়ের রঙ কালো হলেও মেরি সুন্দরী, দার”ণ সুন্দরী; দুইপাশ দিয়ে নেমে যাওয়া কোঁকড়ানো ঘন কালো চুলে মুখম-লের অনেকটা অংশ ঢেকে থাকে, মাঝে মাঝে মাথা ঝাঁকিয়ে চুল সরায় মেরি। মাথা ঝাঁকিয়ে চুল সরানোর বিষয়টা নাসেরের খুব পছন্দ। মেরি নামটাও নাসেরের দেয়া, কেতাবি নাম জান্নাতুল ফেরদাউস। পরিবারের বাধা উপেক্ষা করে যে দিন এক কাপড়ে নাসেরের সঙ্গে চলে এলো সে দিনই জান্নাত হলো মেরি। মৃদু অনুযোগ করে মেরি বলেছিল, ‘আমার গায়ের রঙ কালো আমাকে মেরি বলে ডাকছ কেন?’ উত্তরে নাসের বলেছিল, ‘আমি শিল্পী মানুষ আমাকে কালো-সাদার পার্থক্য বোঝাতে চাও, তোমার সাহস তো কম নয়।’
দেয়ালে নাদুসনুদুস একজোড়া টিকটিকি ছোটাছুটি করছে। চিৎ হয়ে শুয়ে নাসের অনেকক্ষণ যাবৎ টিকটিকি দুটোর ছোটাছুটি দেখে। শালারা আছে বেশ মস্তিতে; চাকরির চিস্তা নেই, বাড়ি ভাড়ার চিন্তা নেই অথচ মানুষের কতো চিন্তা। চাকরি পেলে ধরে রাখার কসরত, চলে গেলে আবার খুঁজে পাওয়ার হয়রানি কতো কিছু। এর মধ্যে বড় টিকটিকিটা ছোটটাকে ধাওয়া করে, আবার ছোটটা বড়টাকে ধাওয়া করে। শালা ফুর্তি করছো, হঠাৎ একটা শব্দ। মনের অজান্তে টিকটিকি দুটোর দিকে নাসেরের ছুড়ে মারা তুলিটা দেয়ালে প্রচ- জোরে ধাক্কা খেয়ে এসে পড়ে ছোট মেয়েটার সামনে। নাসের ধড়াক করে শোয়া থেকে বসে পড়ে। মেয়েটা কুড়িয়ে নিয়ে একপা দুইপা করে এগিয়ে আসে। ফোঁকলা দাঁতে হাসতে হাসতে তুলিটা এগিয়ে দেয় বাপের দিকে। নাসের কিছু সময় এমন অসাড় হয়ে বসে থাকে যে হাত বাড়িয়ে তুলিটা নেয়ার শক্তিটা যেন হারিয়ে ফেলেছে। অতি নগণ্য টিকটিকির প্রতি ঈর্ষা এতোটুকু মেয়ের সামনে এই রকম জঘন্যভাবে ধরা পড়বে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি।

চার
ইদানীং দুইটা লোকের কথা মনে পড়লে নাসেরের মাথায় আগুন ধরে যায়, এদের একজন কবি জীবন চৌধুরী, অন্যজন বাড়িওয়ালা। কবি জীবন চৌধুরী ছিলো অধুনালুপ্ত একটা দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক Ñ সেই কাগজে নাসেরও কিছু দিন কাজ করেছিল Ñএই অর্থে কলিগও বলা যেতে পারে। লোকটা বেটে মতো, মাথায় তেল চকচকে টাক, মোটা ফ্রেমের চশমা, রঙিন পাঞ্জাবির নিচে ঢলঢলে ভুঁড়ি Ñ দেখতে একেবারেই বিশ্্ির। ফ্যাসফ্যাসে গলা, এই এক বদঅভ্যাস Ñ কথা বলে অনাবশ্যক জোরে জোরে; উঠতে বসতে নিজেকে জাহির করার ধান্ধা। সারাক্ষণ উঠতি বয়সের মেয়েদের নিয়ে থাকা তার স্বভাব। শিল্পকলা, টিএসসি, চার”কলা, শাহবাগ সর্বত্র তর”ণীবেষ্টিত কবি জীবন চৌধুরী। নাসের মনে মনে ঘৃণা করে লোকটাকে, কিন্তু বুঝতে দেয় না। কবি জীবন চৌধুরী মনে করে নাসের তাকে পছন্দ করে। এই কবি জীবন চৌধুরীই লোকটাকে তার পিছে লেলিয়ে দিয়েছে। শালা একটা বদমাইশের হাড্ডি। কবি জীবন চৌধুরী তাকে কি বুঝালো কে জানে লোকটা মনে করছে ঢাকা শহরে তার ওপরে কোন ভালো আটিস্ট নেই। যতোই তাকে উপেক্ষা করতে চেয়েছে ততোই লোকটা অক্টোপাশের মাতো আষ্ঠেপৃষ্ঠে ধরেছে। সেদিন সকালে গাড়ি নিয়ে বাসায় এসে হাজির।
‘বুঝেছেন নাসের সাহেব, আমার স্যার কতো বড় ক্ষমতাবান মানুষ আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। সেই লোকের সেবা করার একটা সুযোগ পেয়েছি, আর আপনি সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে দিচ্ছেন না। সময় কারো জন্য বসে থাকে না। স্যারের একটা পোট্রেট এঁকে দিতে বলেছি, আপনি আজ কাল করে ঘুরাচ্ছেন, এখন দেখছি আপনি কাজে হাতই দেননি। স্যারের ছবি না এঁকে আঁকছেন কোন মেয়ে মানুষের ছবি।’
ক্ষমতাবান লোকের চামচা লোকটা বেটেখাটো তবে গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফরসা। ছোট করে চুল ছাঁটানো, কানের লতি পর্যন্ত জুলফি মানিয়েছে ভালো। দামি ঘড়ি, দামি কোট-প্যান্ট, শরীর থেকে দামি পারফিউমের মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে। একটা দামি সিগারেট বের করে বাম হাতের তালুতে কয়েকটা টোকা মেরে ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রেখে এক নজরে ঘরের আসবাবগুলো দেখে নেয় তাচ্ছিল্য নিয়ে। একসময় দেয়ালে ঝুলানো মুখোশগুলোর দিকে চোখ আটকে যায়। একটা কৃত্তিম হাসি হেসে বলে, ‘এগুলো ভালো হয়েছে। মুখোশ আমার দার”ণ পছন্দ। ’
কম্পউিটার টেবিলের পাশে রাখা মেরির পোট্রেটের সামনে কিছু সময় স্থির দাঁড়িয়ে থেকে বলে, ‘এটা নিশ্চয় আপনার স্ত্রী, মাশাল্লা অনেক সুন্দরী, অনেক ভালো বউ পেয়েছেন।’
ঠোঁটে ঝুলে থাকা সিগারেটে লম্বা টান দিতে গিয়ে নাসেরের দিকে চোখ পড়তে হেসে বলে, ‘রক্তে সুগার অনেক বেশি, ডাক্তার বলেছেন ছেড়ে দিন, বাঁচতে হলে ছেড়ে দিন। তাই বদ অভ্যাসটা ছাড়ার চেষ্টা করছি। বাঁচতে তো হবেই, বাঁচার জন্যই তো সব। এই যে ন্যায়-অন্যায়, রক্তারক্তি সবই বাঁচার জন্য।’
লোকটার লেকচার শুনে রাগে নাসেরের মাথায় রক্ত উঠে যায়, কিন্তু মুখে হাসি হাসি ভাব বজায় রাখে।
ধবধবে সাদা একটা গাড়িতে উঠে আবার বেরিয়ে এসে হেসে বলে, ‘ প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড, একটা কথা বলব?’
‘নিশ্চয়, নিশ্চয়।’
‘রাগ করে থাকা স্বাস্থের পক্ষে হানিকর। আমি জানি আপনি আমাকে পছন্দ করেন না। আর এই জন্যই রেগে আছেন। এই সমাজে টিকে থাকতে হলে পছন্দ না হলেও অনেক কিছু করতে হয়। রাগ না করে আমার কাজটা দ্র”ত করে ফেলুন। আমি যখন বলেছি কাজ আপনাকে করতেই হবে। থাক সে কথা, বাই দা বাই। আরেকটা কথা বলি, আপনারা যে বলেন অ্যাবস্ট্রাক না কি ছাই, সেটা করা যাবে না, ছবিটা হবে জীবন্ত।’
‘ ঠিক আছে, ঠিক আছে।’
লোকটা গাড়ির গহ্বরে ঢোকার পর কি মনে করে গ্লাস নামিয়ে উটের মতো মাথা বের করে নাসেরকে ইশারায় কাছে ডাকে। নাসের ঝুঁকে পড়ে শোনার চেষ্টা করে।
ফিসফিস করে লোকটা বলে, ‘আপনার বউ আসলেই সুন্দরী।’
এর পর সরি¯্রেিপর মতো আঁকাবাঁকা গলি দিয়ে গাড়িটা সহসা অদৃশ্য হয়ে যায়।
হতবিহ্বল নাসের অনেকক্ষণ গাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
এই দিকে বাড়িওয়ালা লোকটা বেটেমতো, রসিক লোক। ফরশা চকচকে টাক, চিকন গোঁপের নিচে পাতলা ঠোট; সবসময় পানের রসে সিক্ত থাকে। শরীর ঘিরে থাকে মসল্লার একধরনের নেশাধরানো সুগন্ধি। সাদা লুঙ্গির সঙ্গে সাদা কোত্তা, পানের কষ থেকে বাঁচাতে একটু বাড়তি ধরনের সতর্ক থাকেন সবসময়।
‘কি শিল্পী সাব, ভাড়া দিচ্ছেন না ক্যান? তিন মাস একই গান বাজাইতেছি, কানেই তুলছেন না। কেবল বলছেন দেবো দেবো। কোন দিন দেখবো ঘরে তালা দিয়ে চলে গেছেন, তখন আপনারে খোঁজবো কোথায়?’
‘এমন হলে জিনিসপত্র নিয়ে নেবেন।’
‘হা, হা, হা।’
হাসতে হাসতে গলায় পানের কষ ঠেকে কাশি ওঠে, বিশ্রিভাবে পানের কষের ছিঁটা এসে লাগে নাসেরের নাকেমুখে।
‘হাসাইলেন শিল্পী সাব। অনেক দিন পর দিল খুইলা হাসলাম, আপনার ঘরের জিনিস! এগুলো ভাঙ্গারির দোকানে সের দরে বেচন লাগবো। আর কি সব আঁইকা রাখছেন মাথামু-ুহীন। এগুলা দিয়া আমি কি করমু, ধুইয়া পানি খামু? আপনি ঢাকায় পইড়া আছেন ক্যান? সিরাজগঞ্জ না কোনখানে আপনার বাড়ি সেখানে চলে যান। ঢাকায় বসে বসে বউ পোলাপানরে কষ্ট দিচ্ছেন ক্যান? শালায় এক সমস্যা, দেশের সব মানুষ ঢাকায় থাকতে চায়। এক সপ্তার মধ্যে তিন মাসের ভাড়া না দিলে থানায় জিডি করমু, মহল্লায় পঞ্চায়াতে নাশিল করমু।’
‘আপনার যা খুশি কর”ন।’
‘ত্যারা কথা কইতেছেন ক্যান? পত্রিকার আটিস্ট, সাংবাদিকদের সঙ্গে খাতির আছে এর জন্য কেদরানি দেখাইতেছেন? আমার লগে কতো বড় বড় সাংবাদিক উঠাবসা করে জানেন? এলাকার লাল্টু পল্টুর কথা বাদই দিলাম। আলগা ঝাড়ি ছাড়েন, তিন মাসের ভাড়া দিয়া বাসা ছেড়ে দেন। শিল্পী মানুষ, ভাবছি জবানের ঠিক থাকবো, এখন দেখতাছি উল্টা।’

পাঁচ
আজিজ মার্কেটের দ্বোতলায় এক হোটেলে সাইফুল্লার সঙ্গে টেংরামাছ আর পাতলা ডাল দিয়ে ভাত খেয়ে রিকশায় ওঠে নাসের। যাবে কমলাপুর, বন্ধু লিটনের বাসায়; তিন মাস ধরে লিটন লাপাত্তা। রিকশা কদম ফোয়ারা, প্রেসক্লাব দৈনিকবাংলা হয়ে যেতে পারতো, কিন্তু যাচ্ছে মৎস্যভবন থেকে সোজা শিক্ষাভবনের পাশ হয়ে সচিবালয়ের পেছন দিয়ে। দুপুর গড়িয়ে গেছে, রাস্তাঘাটে লোকজনের উপস্থিতি নিতান্তই কম; শুক্রবার-ছুটির দিন এই জন্যও হতে পারে। মাঝবয়সি রিকশা চালক, তবে শরীরের গড়ন মজবুত, মুখভর্তি সাদা-কালো দাড়ি; রিকশা চলছে ঝড়ের গতিতে, তার শরীরের ঘামের উৎকট গন্ধ এসে লাগে নাসেরের নাকে। টেংরামাছের ঝোল, ডাল, লেবুর রস রিকশার ঝাঁকিতে পেটের মধ্যে গড়াগড়ি খায়; কয়েকবার কাঁচা মাছের গন্ধসমেত ঝাঁঝালো ঢেকুর ওঠে। এর সঙ্গে ঘামের গন্ধ, মনে হচ্ছে এক্ষুনি বমি হয়ে যাবে, চরম একটা অসস্তিতে গা রি রি করতে থাকে; বমি হলেই ভালো হতো। সচিবালয়ের গেট ববরাবর রিকশার গতি কমিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে বারবার নাসেরের দিকে তাকায় রিকশাওয়ালা; চোখেমুখে কিছু একটা বলার ব্যাকুলতা, কিন্তু নাসেরের চেহারার সভাবজাত র”ক্ষতা দেখে সাহস পায় না।
‘কিছু বলবেন চাচা?’
‘বলতে চাইছি স্যার, আল্লা ফেরেস্তার মতো লোকটারে এতোদিন কোথায় রাখছিল?’
‘কোন লোকের কথা বলছেন?’
‘আরে বুঝলেন না, আরে বুঝলেন না…।’
‘আপনি কেয়ারটেকার সরকারের কথা বলছেন? এই সরকারকে সমর্থন করছেন?’
‘করবো না কেন? আপনি এটা কি বলেন! কে সমর্থন করছে না? এই দেশে ডা-া ছাড়া হবে না। একটু ঢিলা দিছেন তো অমনি কাঁধে উঠে বসবে। কষে মারবেন সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখলেন তো এই ঢাকা শহরে কতো মারামারি, খুনোখুনি। যেই.. .. ।’
হঠাৎ নাসের রিকশাওয়ালার পিঠে হাত রেখে রিকশা থামাতে বলে; রিকশার গতি কমে এলে লাফিয়ে নেমে শিক্ষাভবনের ড্রেনের পাশে উবু হয়ে বসে বমি করে। ভাত-মাছ-ডাল উগরে দেয়ার পর অসস্তি কিছুটা কমতে থাকে, তবে ঝালে গলা জ¦লে; এই সময় ঠা-া পানি খেতে পারলে ভালো লাগতো।
আবার রিকশা চলতে থাকে, কথা বলতে উদগ্রীব রিকশাওয়ালার আবারো বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে কিছু একটা বলতে চাইছে, তার কথার মজুদ শেষ হয়নি।
‘আপনার শরীর খারাপ স্যার?’
‘না, তেমন কিছু নয়, আপনি কি যেন বলতে ছিলেন?’
‘বলছি স্যার, এই সরকার না এলে খুনাখুনিতে দেশটা শেষ হয়ে যেতো .. . . ।’
‘দেশ’ কথাটা অদ্ভূতভাবে কানে এসে লাগে, দেশ মানে একটা ভূ-খ-, তার ওপর খোলা আকাশ, একটা পতাকা- আর কিছু নয়! জিরো পয়েন্ট এলে রিকশাওয়ালার কথা আবার কানে আসে।
‘শুনেন স্যার, সবাই গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিল্লায়, গণতন্ত্রের আমরা বুঝি কি? গণতন্ত্র কাদের জন্য, আমাদের মতো গরিব মানুষের দেশে গণতন্ত্র মানায় না। আমাদের গণতন্ত্রের দরকার নাই স্যারÑ’
‘এই থামেন, থামেন…।’
লাফ দিয়ে রিকশা থেকে নেমে রিকশাওয়ালার হাতে ভাড়া গুঁজে দিয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকে নাসের। হতবিহ্বল দৃষ্টিতে রিকশচালক বলে, ‘স্যার আপনি না কইলেন কমলাপুর যাইবেন?’
অত্যন্ত শান্ত গলায় নাসের বলে, ‘যাওয়ার কথা ছিল, এখন আর যাবো না। আপনার লেকচার শুনে যাওয়ার ইচ্ছা চলে গেছে।’
কিছু দূর হেঁটে গিয়ে জিরো পয়েন্টের সামনে থামে নাসের, এইখানেই তো নূর হোসেন পুলিশের গুলি খেয়েছিল, গণতন্ত্রের জন্য, মানে দেশের জন্য। পায়ে পায়ে জিরোপয়েন্ট হয়ে গুলিস্তানের দিকে এগিয়ে যায়। রাস্তার ডান পাশজুড়ে নানা রকমের পসরা সাজিয়ে বসেছে হলিডে মার্কেটের হকাররা; হাকডাক, চিৎকার চেচামেচিতে জায়গাটা সরগরম। নাসেরের মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে, হয়তো গায়ে হালকা জ¦র এসে গেছে। এ সময় সমুদ্র গর্জনের মতো হাজার জনতার মিছিল থেকে ওঠে আসা তীব্র ঝাঁজালো শব্দ কানে বাজতে থাকে ‘Ñ নূর হোসেন, জিরো পয়েন্ট, নূর হোসেন, জিরো পয়েন্ট, জিরো জিরো, জি, রো, জি রো, জি, জি জি. ..।’

বেশ কিছু দিন ধরে নাসেরের স্বপ্নের বিষয় পাল্টে গেছে। থকথকে হলুদ কাদার মধ্যে একটা লোক ডুবে যাচ্ছে। প্রথমে লোকটাকে চেনা যায় না। পরে দেখা গেল সেই ঢলঢলে ভুঁড়িওয়ালা লোকটা Ñ যে কিনা তাকে মেরে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিল Ñ সেই লোকটা ডুবে যাচ্ছে, ডুবে যাচ্ছে হলুদ রঙের কাদার মধ্যে। পরপর কয়েকদিন প্রায় একই স্বপ্ন দেখে নাসের। ইজেলে একদফা হলুদ রঙের পোচ দিয়ে রেখেছে একটা ছবি আঁকবে বলে; ঘুম ভেঙে গেলে একগ্লাস ঠা-া পানি খেয়ে মেরির কালো ওড়না দিয়ে ইজেলটা ঢেকে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। এর কিছু দিন পর ইজেলে কমলা রঙের পোজ দেয়; সেদিন স্বপ্নে দেখে সে কমলা রঙের কাদার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে লোকটা, কেউ তাকে টেনে তোলার জন্য এগিয়ে আসছে না। সে দিন সকালে কালো চায়ে চুমুক দিতে দিতে স্বপ্নের কথা মনে মনে নাড়াচাড়া করতে করতে হাসে; হোক না সেটা স্বপ্নে, বদ লোকটার পতনে অদ্ভূত সুখানুভূতি হয় নাসেরের।
কয়েক দিন ধরে মেরিকে এইসব স্বপ্নের কথা বলবে বলবে করেও বলা হয়নি, সেদিন বাক্সপ্যাটরা গুছাতে গুছাতে নাসের অতি আগ্রহ নিয়ে মেরিকে বলে, ‘একটা ঘটনা ঘটেছে, বুঝেছ, মজার ঘটনা?’
‘রাত পোহালে জিনিসপত্র নিয়ে ঢাকা ছেড়ে চলে যাবো- এর চাইতে আর বড় ঘটনা কি আছে? নতুন কোন ঘটনা শুনে কাজ নাই। আমি সাফ বলে দিচ্ছি, তুমি আমাদের রেখে আবার ঢাকায় দৌঁড় দিবা না, যা করবা সিরাজগঞ্জ থেকেই করবা। আর শোন, এই ফ্রেমগুলো রেখে যাচ্ছ কেন?’ Ñ ঝাঝালো গলায় মেরি কথাগুলো বলে।
ভ্র” কুচকে অতি শান্ত গলায় নাসের বলে, ‘সিরাজগঞ্জে এগুলোর কি কাজ?’
একটা মস্ত ব্যাগে কাপড়চোপড় গুছাতে গুছাতে মেরি নিরাসক্তভাবে বলে,‘শিল্পের সব কাজ বুঝি ঢাকায় হয়? যেখানের দরিদ্র মানুষ সেখানে কি শিল্প নেই?’
দুই তিনটা মোড় পেরিয়ে গলিটা যে রাস্তায় গিয়ে মিশেছে তার মাথায় রোয়াওঠা বেওয়ারিশ কুকুরের মতো মাঝারি ধরনের রঙচটা ট্রাকে মালপত্র তোলে দুই জন। শূন্য ঘরটাকে শেষবারের মতো মনোযোগ দিয়ে দেখে নাসের। যে জায়গাটায় শোকেজ ছিল তার আড়ালে দেয়ালে একটা মাকড়ার জাল, একটা বন্দি মাকড়শা জালসমেত বাতাসে দুলছে। বন্দিদশা থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা বা চেষ্টা কোনটাই তার নেই। কয়েক পলক তাকিয়ে নাসের মনে মনে বলে, ‘এই ঢাকা শহরে তুই শালা পড়ে পড়ে মর, আমি গেলাম।’
শোচনীয়ভাবে পরাজিত সৈনিকের মতো মাথা নিচু করে দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে ট্রাকের দিকে এগিয়ে যায় নাসের, পিছে পিছে মেরি। আকস্মাৎ মেরির ডাকে থমকে দাঁড়ায় নাসের। দ্র”ত কয়েক কদম এগিয়ে এসে নাসেরের কানের কাছে মুখ নিয়ে নিচু গলায় মেরি বলে, ‘একটা ঘটনা ঘটেছে।’
অনবরত দেখে আসা স্বপ্নের কথা মনে পড়ে নাসেরের। তাহলে কি মেরিও তার মতো কোন বিশেষ স্বপ্ন দেখতে শুর” করেছে?
‘বাদ দাও ঘটনা ফটনা। ঢাকা শহর ছাড়তে পারলেই বাঁচি।’
আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে মেরি বলে, ‘শোন শোন, রেজাল্ট পজিটিভ এসেছে। তুমি যে বেবি চেক কাঠি দিয়েছে কয়েক দিন আগে আজ সকালে চেক করেছি। পজিটিভ এসেছে। এখন আমাদের কি হবে?’
কোন কথা না বলে নাসের ট্রাকের ড্রাইভারের পাশের সিটে গিয়ে বসে, পাশে মেরি। দানবের মতো শব্দ করে ছুটে চলে ট্রাক, এই শব্দের মধ্যে নাসের কেবল অসংখ্য নবজাতকের কান্না শুনতে পায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here