মহান বিজয় দিবসের বিশেষ লেখা মহান মুক্তিযুদ্ধে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অবদান মিথুশিলাক মুরমু

0
394

মহান বিজয় দিবসের বিশেষ লেখা

মহান মুক্তিযুদ্ধে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অবদান
মিথুশিলাক মুরমু


স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ২৮শে মার্চ, ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে একটি জাতীয় দৈনিককের সচিত্র সংবাদ ছিলো ‘যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে অভিজাত গির্জা ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবিতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়’ (দৈনিক প্রথম আলো)। বলা হয়, ‘এ সময় গির্জায় বাংলাদেশের মানুষের সুখ-সমৃদ্ধি কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।’ লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবি ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রার্থনাকেন্দ্র। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর জাতীয় দিবসে এখানে বিশেষ প্রার্থনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও প্রার্থনা অনুষ্ঠানে দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন হাইকমিশনার এম এ হান্নান এবং হাইকমিশনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে অনেক খ্রিষ্টিয়ান প্রবীণ ব্যক্তিদের সাথে আলাপনে জেনেছি, মুক্তিযুদ্ধকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মন্ত্রিপরিষদ, মুক্তিযোদ্ধাসহ সাহায্যকারী দেশ এবং ব্যক্তিবর্গের জন্য হাঁটু গেড়ে চোখের জলে প্রার্থনা করেছেন। শরণার্থী শিবিরেও রাবিবারিক উপাসনায় মিলিত হতেন, পরিবারে সম্মিলিতভাবে প্রার্থনা করেছেন; যেন স্বর্গীয় ঈশ^র আহত, শহীদ কিংবা নির্যাতিতদের সহায় হোন, বিপদ-সংকুল থেকে রক্ষা করেন। যারা এই মানবতাবিরোধী কর্মকা-ে জড়িত ছিলেন, তাদের হৃদয় যেন পরিবর্তন করেন; তারা যেন সুমতি ফিরে পান। খ্রিষ্ট বিশ^াসীরা দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করেছেন, পিতা ঈশ^র তাঁর নির্দিষ্ট সময়েই সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ করেছেন। আমার দেশের খ্রিষ্ট বিশ^াসীরা এখনও সর্বদাই দেশ ও জাতির মঙ্গল কামনা করে প্রতিদিন সকাল-বিকেল প্রার্থনা উৎসর্গ করেন। কোনো বিশেষ দিন উদযাপন কিংবা অনুষ্ঠান হলে স্বতন্ত্রভাবে রাষ্ট্রনায়ক, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রীবর্গ, সাংসদ এবং রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের জন্য স্বর্গীয় প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা এবং শক্তি যাচনা করে থাকেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশকে সত্যিতে রূপায়িত করতে উজ্জীবীত করুন।

মহামান্য পোপ ফ্রান্সিস বাংলাদেশ সফর (নভেম্বর ৩০-ডিসেম্বর ২, ২০১৭) উপলক্ষে প্রদত্ত বাণীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছিলেন, ‘১৯৭১ সালে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বহু মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ চলাকালে বহু অসহায় এবং গৃহহারা মানুষ তাঁদের গির্জা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে এই সম্প্রদায়ের নাগরিকদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ মাতৃভূমির প্রতি তাঁদের অপরিসীম ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।’ ১৯৭১ খ্রি. মুক্তিযুদ্ধে এদেশের অনেক খ্রিষ্টান প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা (খ্রিষ্টান ত্রাণ ও পুনর্বাসন সংস্থা, দু’টি কলেজ, ৫০টি হাইস্কুল, ২৬৫টি প্রাইমারী স্কুল, ১২টি হাসপাতাল), অসংখ্য গির্জা ও খ্রিষ্টান গৃহ বহু সংখ্যক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বেসামরিক ব্যক্তিকে আশ্রয়দানসহ যথাসাধ্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। তাছাড়া পাক সেনাবাহিনীর আক্রমণ থেকে পলায়নপর লক্ষ লক্ষ লোককেও খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়দান করা হয়। আবার এসব জায়গাতেও চলেছে বর্বর নির্যাতন। এক সাধারণ হিসেবে এই সময় জানা যায়, খ্রিষ্টান মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা ১,৭৮২ জন; শহীদের সংখ্যা ২,০১৩ জন। এ স্থলে খ্রীষ্টান রমণী যারা পাক হানাদার বাহিনীদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে, তাদের সংখ্যা না উলে¬খ করাই ভালো। তবে পুরো মুক্তিযুদ্ধে খ্রীষ্টানদের অর্থ সহযোগিতা ছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে। খ্রীষ্টানদের এই শহীদদের মধ্যে ৮ জন পুরোহিত, নারী, পুরুষ, যুবক এবং ৬৩০ জন শিশুর তথ্য জানা যায়। আর আমাদের খ্রিষ্ট সম্প্রদায়ের অবদানের কথা রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা দু’এক লাইনেই উচ্চারণ করে শেষ করে থাকেন। আমরা প্রত্যাশা করি, রাষ্ট্র সকল মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়ে যেমন সচেতন হবেন, অনুরূপভাবে শহীদদের মর্যাদাদানের বিষয়টিও বিবেচনা করবেন। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশে প্রতিটি ব্যক্তি যেন সঠিকভাবে মূল্যায়িত হয়, এটিই দেশবাসীর কামনা। তৃতীয় শ্রেণীর ‘খ্রিষ্টধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’র সপ্তদশ অধ্যায়ে বর্ণিত ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে খ্রিষ্টান শহীদ’-এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সকল ধর্মের মানুষ যোগ দিয়েছিল। সবাই তখন দেশকে মুক্ত করার চিন্তা করেছে। কে কোন ধর্মের, তা কেউ চিন্তা করেনি। চিন্তা করেছে শুধু কীভাবে পাকিস্তানিদের পরাজিত করা যাবে। কীভাবে আমাদের প্রি দেশটাকে মুক্ত করা যাবে। …অন্যদের মতো খ্রিষ্টানরা দুইভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কেউ কেউ সরাসরি যুদ্ধ করেছেন, আবার কেউ কেউ আড়ালে থেকে অংশগ্রহণ করেছেন। অন্তত ২৪ জন খ্রিষ্টান এই যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, তাদের মধ্যে তিনজন পুরোহিত রয়েছেন। পুরোহিতদের নাম হলোÑ ফাদার উইলিয়াম ইভান্স, সিএসসি, ফাদার লুকাস মারা-ী এবং ফাদার মারিও ভেরোনেসি এসএক্স। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক ধর্মপল্লীতে ফাদার, ব্রাদার ও সিষ্টারগণ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও সেবা দিয়েছেন। টাকা-পয়সা দিয়ে সহায়তা করেছেন। যারা ঘরবাড়ি হারিয়েছিল, তাদেরকে তাঁরা ধর্মপল্লীতে বা স্কুলে আশ্রয় দিয়েছিলেন। অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্নাবান্না করে দিতেন বা খাবার পৌঁছে দিতেন।’

স্বাধীনতার দীর্ঘ বছর পরেও আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার গ্রামের মারিয়া হালদার শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি পাননি। স্থানীয় রাজাকাররা গৌরনদী কলেজের ক্যাম্পে থাকা পাকহানাদারদের জানানোর পরে পাক সেনারা ক্ষিপ্ত হয়ে ফ্রান্সিসকে খোঁজার জন্য দুটি স্পিডবোটযোগে দুপুরের দিকে তাদের খ্রিষ্টান পল¬ীতে হানা দেয়। ফ্রান্সিস হালদারের অপরাধ মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। পাকসেনারা তাদের পল¬ীতে ঢুকেছে এ কথা জেনেই মারিয়া তার ৩ পুত্র ও ২ কন্যাকে নিয়ে বাড়ির পাশের বাগানে লুকিয়ে থাকে। পাকসেনারা ফ্রান্সিসকে না পেয়ে মারিয়ার স্বামী সমূয়েল হালদার, ১৩ বছরের ছেলে মুকুল হালদার, ভাশুর হরলাল হালদার, নরেন্দ্রনাথ হালদার, ভাশুরের ছেলে টমাস হালদার, অগাষ্টিন হালদার, বিমল হালদার, দানিয়েল হালদার ও সুকুমার হালদারকে স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যায় পার্শ্ববর্তী বাকাল হাটের কাছে। সেখানে নিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে একে একে ৯ জনকেই পাকিস্তানীরা গুলি করে হত্যা করে। পাকবাহিনীর বুলেটে শহীদ হন মারিয়ার স্বামী সমূয়েল হালদারসহ সাতজন। প্রাণে বেঁচে যান মারিয়ার বড় ছেলে মুকুল হালদার ও ভাশুর ছেলে সুকুমার হালদার। ’৭১-এর স্মৃতি গণকবরটিও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। অপর ঘটনাটি-যশোর গির্জায় সংঘটিত হয়। ১৯৭১ খ্রি. ৪ঠা এপ্রিল রেডক্রসের পতাকা, বুকে ঝোলানো রেডক্রসের ব্যাজ সব কিছুকে অবজ্ঞা করে পাকিস্তানী বাহিনীর অস্ত্র সমেত যশোর ক্যাথলিক চার্চে ঢুকে সাতজনকে গুলি করে হত্যা করে। এই সাতজনকেও শহীদ মর্যাদা প্রদান করা হয়নি। এরা হলেন- ফাদার মারিও ভেরোনেসি (৫৮), স্বপন বিশ্বাস (২৫), অনিল সরদার (৪৬), প্রকাশ বিশ্বাস (৫০), পবিত্র বিশ্বাস (১৫), ফুলকুমারী তরফদার (৫০) ও ম্যাগদালেনা তরফদার (৩০)। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী পরেশ সরদার (অনিল সরদারের সন্তান)-এর বর্ণনার চিত্রটি এরূপ ‘ক্যাথলিক চার্চের ফাতিমা হাসপাতালে যুদ্ধাহতদের চিকিৎসার তদারকির দায়িত্ব পালন করতেন ফাদার মারিও। এখানে কয়েক হাজার মানুষ প্রাণভয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। আমাদের পরিবারও সে সময় চার্চে আশ্রয় নেয়। বিকেল ৪টার দিকে হানাদাররা গালি দিতে দিতে চার্চে প্রবেশ করে। বাবা আমাকে ঘরে ঢুকিয়ে ধরে রাখেন। জানালা দিয়ে আমি দেখি, ফাদার মারিও দুই হাত উঁচু করে এক সেনার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাঁকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে গুলি করা হয়। এরপর দেখি, স্বপন বিশ্বাসও দুই হাত উঁচু করে রয়েছেন। তাঁকেও গুলি করা হয়। এরপর হানাদাররা আমাদের ঘরের দিকে আসতে থাকে। ভয়ে আমি গির্জাঘরের পেছনে গিয়ে আশ্রয় নিই। মা ম্যাগদালেনা সরকার আমার ভাইবোনকে নিয়ে পুকুরপাড়ে কলাবাগানে আশ্রয় নেন। হানাদাররা ঘরের দরজা লাথি দিয়ে ভেঙে বাবাকে গুলি করে হত্যা করে। এক পর্যায়ে আমার সামনেই পবিত্র বিশ্বাসকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। টালির ঘরে মহিলারা ছিলেন। তারা প্রাণভিক্ষা চান এবং কান্নাকাটি করেন। তখন ওই মহিলাদেরও গুলি করে হত্যা করা হয়। পরদিন ফাদাররা মিলে ফাতিমা হাসপাতাল প্রাঙ্গণে ফাদার মারিওকে এবং বাকি ছয়জনকে চার্চ চত্বরে গর্ত করে করব দেওয়া হয়।’ যারা দেশের জন্য সামান্যতম অবদান রাখতে দিয়ে মৃত্যু বরণ করেছেন, তারা কি শহীদের মর্যাদা পেতে পারে না? স্বাধীন বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪৫ বছর অতিক্রম করে চলেছে কিন্তু রূঢ় সত্য যে, আমরা আজো গণকবর চিহ্নিতকরণ এবং শহীদদেরও যথাযথ সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি।

৪.
মহান মুক্তিযুদ্ধে অনেক ফাদার, রেভারেন্ড, মিশনারী, সিস্টার ও খ্রিষ্টিয়ান বিশ্বাসী স্বতঃর্স্ফতভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ফাদার ইউজিন হোমরিক, ফাদার এডমন্ড গেডার্ট, ফাদার বেঞ্জামিন লাবে, বিশপ বে¬য়ার, রেভা. ম্যাকবেথ, রেভা. জিম ম্যাককিনলী, রেভা. আর.টি.বাকলী, জ্যাবিল জেকব্স্, মার্ক টাকার, লেসলী ওয়েংগার, ডা. ভিগো অলসেন, ডা. ডন কেচাম, নিউটন সডি, ফাদার কান্তন, রেভা. হেরালাড উইলিয়াম নিখলিন, ফাদার জেকোমিলি, ফাদার পিনোস, ফাদার বেরোনেসী, ফাদার মারিও ভেরোনিসি, মাদার তেরেসা, পি.এ সাংমা, ফাদার উইলিয়াম বি. টিম, শহীদ ফাদার ইভান্স, ওডারল্যা-, ফাদার মারিও রিগন-এর নাম বার বার উচ্চারিত হলেও নিভৃতিচারী কয়েকজনের নাম আড়ালেই থেকে গেছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের গৌরবদৃপ্ত ঘটনাগুলো সংক্ষিপ্তভাবে উলে¬খ করার প্রয়াস চালিয়েছিÑ ১৯৭১ খ্রি. মুক্তিযুদ্ধের সময় নরওয়ের প্রথিতযশা সাংবাদিক অডভার মুনকস গার্ড আসেন রাজশাহীতে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিলো বাংলার মুক্তিকামী মানুষ ও যুদ্ধপরিস্থিতির সংবাদ নরওয়েবাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া। যুদ্ধকালীন নয় মাস রাজশাহীতে অবস্থান করে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষের প্রতি পাক-বাহিনীর বর্বরতার প্রতিবেদন নরওয়ের পত্রিকায় প্রেরণ করেন। পাক বাহিনীর পৈশাচিকতা আচরণ তার মনে গভীর রেখাপাত করেছিলো। স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বাংলাদেশকে নরওয়ের স্বীকৃতি প্রদানেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অডভার মুনকস গার্ড রাজশাহী মিশন হাসপাতালের তৎকালীন সুপারিনটেনডেণ্ট ডা. ইউ এন মালাকারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ১৯৭৯ খ্রি. নরওয়ের ক্রিস্টিয়ানস্যান্ড সিটি এবং রাজশাহী সিটির মধ্যে ভ্রাতৃপ্রতীম সম্পর্ক সৃষ্টি করে ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন যা আজো অব্যাহত রয়েছে। বন্ধুত্বের স্মারক হিসেবে বিগত ২৪শে অক্টোবর ২০১১ খ্রি. জাতিসংঘ দিবস ও স্যা- সিটির আনভিলিং সেরিমনিতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপিত হয় বাংলাদেশ পরিচিত ম্যুরাল। ম্যুরালটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের জাতীয় চার নেতা, মুক্তিবাহিনী এবং পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের চিত্রসহ বিভিন্ন চিত্র স্থান পেয়েছে। দুই অংশে বিভক্ত মোট ১১০৫ বর্গফুটের ম্যুরালের ১০০০ বর্গফুটে আছে মূলচিত্র ও ১০৫ বর্গফুটে আছে চিত্রের শিরোনাম। ম্যুরালটি উদ্বোধন করেছিলেন তৎকালীন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের মাননীয় মেয়র এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। এটি উন্মোচনের মাধ্যমে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ ম্যুরাল স্থাপিত হলো। আরেক নওয়েজিয়ান মিশনারী রেভা. কম কে মিশনারী কাজে নিয়োজিত ছিলেন সিলেট-মৌলভীবাজার-হবিগঞ্জ অঞ্চলে। তিনিও এই অঞ্চলের খ্রিষ্ট বিশ্বাসীদের জীবন, জানমাল রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর বদন্যতায় সেদিন পাকিস্তানী সেনাদের হাত থেকে স্বর্গীয় সুবোধ সরকার, স্বর্গীয় সুষমা সরকার, সন্ধ্যা সরকার, স্বর্গীয় প্রদীপ সরকার(কাজল), ফিলিপ সরকার (হিরু), মাইকেল সরকার (পান্না) ও মৃদুল সরকার জীবন ফিরে পেয়েছিলেন। ফাদার এল. ডবি¬উ সি. রিগবী মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বরিশালে ছিলেন। তিনি মুক্তিকামীদের সাহায্য ও সহযোগিতা করতেন। যুদ্ধের ডামাডোলে ব্রিটিশ হাইকমিশনার বরিশাল পরিদর্শনে গমন করলে ফাদার তাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে কৌশলে সবই জানিয়ে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ হাইকমিশনার অবগত হয়েছিলেন বরিশাল অঞ্চল তথা পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বরতা সম্পর্কে। তিনি একটি স্বহস্তে লিখিত রিপোর্ট প্রদান করেছিলেন, যেখানে পাক বাহিনীর বর্বরতা এবং বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরেছিলেন।

স্বাধীনতার চার দশক পরেও ভবের পাড়া খ্রিষ্টিয়ান গ্রামের সুভাষ মলি¬ক মানবেতর জীবন যাপন করছে। মুজিবনগর ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এই সত্তরার্ধো সুভাষ মলি¬ক স্বাধীনতার স্তম্ভকে আগলে রেখে চলেছেন। বিনা পারিশ্রমিকে দীর্ঘ দুই যুগ মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নের কাজ করে যাচ্ছেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক দর্শনাথীদের সম্মুখে বাংলাতে কখনো ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে স্মৃতিসৌধের নির্মাণ শৈলীর বর্ণনা করে থাকেন। দর্শনার্থীদের ভালোবাসায় প্রদত্ত অর্থেই এক প্রকার চলে যায় সংসার। টানা-পোড়নের সংসারে স্ত্রী আন্না মলি¬ক, কন্যা চিত্রা মলি¬ক রয়েছে। মৃত. অনিল মলি¬কের সন্তান সুভাষ মলি¬ক সরকারের সহানুভূতি ও সহযোগিতার প্রত্যাশায় স্থানীয় প্রশাসন, এম.পি; মন্ত্রীদের ধর্ণা দিয়েছেন কিন্তু কেউ-ই তার প্রতি মহত্বতা প্রকাশ করেনি। তারপরও দৃঢ়তার সাথে বলে থাকেন, ‘সরকার আমাকে কোনরকম অনুদান দেয়নি। সরকার কিছু একটা করে দিলে জীবন চালানো সুবিধা হতো, কিন্তু কিছু না করে দিলেও আমি যতদিন বাঁচবো স্মৃতিসৌধের কাজ করে যাব।’ অনেক খ্রিষ্টিয়ান মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীনতার পর সার্টিফিকেট না নিয়ে ফিরে গেছেন আপন ভূমিতে। দেশকে ভালোবেসে, দেশের মানুষকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করেছে ঠিকই কিন্তু জীবন যুদ্ধের পরাজিত সৈনিক হিসেবে নিরবে-নিভৃতে জীবন যাপন করে চলেছে। তাঁরা পাননি কোনো স্বীকৃতি কিন্তু দেশবাসীকে করেছিলেন উজ্জীবীত।

১৯৭১ বাংলাদেশ বিমানের সিপাই ছিলেন রামচরণ দাস। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশমাতৃকার টানে ঝাঁপিয়ে পড়েন মহান মুক্তিযুদ্ধে। ৮ মাস যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ২০ নভেম্বর আসেন স্ত্রী রাণী দাস আর একমাত্র মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে। কে জানত এই আসাই তার জীবনের শেষ আসা। ২৩ নভেম্বর রাজাকার বাহিনীর সহায়তায় অন্য ৯ জনের সঙ্গে তাকেও মিরনজিল্লা সিটি কলোনির বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়।
আর ফিরে আসেনি রামচরণ দাস। পরবর্তীতে আর লাশও পাওয়া যায়নি। রামচরণ দাসের বিধবা স্ত্রী রানী দাস (৭০)। এখন বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কেউ বাসায় গেলেই তার মধ্যে আতঙ্ক। কেন আবার কে এসেছে কোন অৎুহাতে। দীর্ঘ বছর তাকে তাড়া করে ফিরেছে এই যন্ত্রণা। এ সুদীর্ঘ সময়ে রানী দাস তার একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন তার সংসার চলে মেয়ের ওপর নির্ভর করে। তার স্বামীই নয়, বাবা লালু দাসও শহীদ হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। এত কিছুর পরও তাকে থাকতে হচ্ছে পরের মুখাপেক্ষী হয়ে। এই যন্ত্রণা সারাক্ষণ তাকে তাড়া করে ফেরে। একাত্তর সালের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল সর্বস্তরের মানুষ। রামচরণ দাসের মতো আরোও অনেক দলিত অংশগ্রহণ করেন। শুধু ঢাকাতেই তাদেরও অন্তত ১০ জন শহীদ হয়েছেন। রামচরণ ছাড়া অন্য নয় জন শহীদ হলেনÑ মাহাবীর লাল সামুন্দ, আনোয়ার লাল, নান্দু লাল, ঈশ^র লাল, ঘাসিটা লাল, খালবাল, নান্দা লাল, লাল্লু হেলা ও শংকর হেলা। শুধু এরাই নন, রাজধানীর ওয়ারী সিটি কলোনির একজন এবং নগর বেলতলী চৌধুরী বাজার এলাকার রমেশ দাসও শহীদের তালিকায় নাম লেখান। কিন্তু এই দলিত সম্প্রদায়ের লোকেরা পায়নি শহীদের মর্যাদা। কোনো শহীদ পরিবারের জন্য বরাদ্দ হয়নি মুক্তিযোদ্ধা ভাতা কিংবা অন্য কোনো ধরনের ভাতা। শহীদ খালবাল দাসের পুত্র জীবন দাস জানান, তার বাবা পিডব্লিউডিতে চাকুরি করতেন। ওই ভয়াল রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তার বাবাকে ধরে নিয়ে যায়। আর ফিরে আসেননি তিনি। জীবন দাসের অভিযোগ সরকারি কোনো সহানুভূতি কখনো না পাওয়ায় তারা আর কোনো সরকারের কাছেই যাবেন না। তিনি তার পৈতৃক চাকরির জন্র অনেক দেন দরবার করেও কোন ফল বয়ে আনতে পারেননি। শহীদ ঘাসিটা দাসের পুত্র নুরেশ দাস। জানালেন, তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হলেও তার স্বীকৃতি নেই। তাদের সংসার এখন চলে না চলার মতো। কিন্তু কোনো সরকারি উদ্যোগ নেই। মিরনজিল্লার বাসিন্দা মহেশলাল রাজু বলেন, দলিত মুক্তিযোদ্ধার পরিবার কিছুই পায় না। দলিতদের শহীদ হিসেবে মর্যাদা পাওয়ার অধিকার নেই। প্রতি বছর ২২ নভেম্বর তারা দিবসটি পালন করেন শহীদ দিবস হিসেবে। এখানে ওই ১০ শহীদের উদ্দেশে তৈরি হয়েছে এশটি শহীদ মিনার। সম্পূর্ণ নিজেদের অর্থায়নে এই শহীদ বেদিতে তারা ২২ নভেম্বর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন। বাংলাদেশ হরিজন ঐক্যপরিষদের সভাপতি ও মিরণজিল্লার বাসিন্দা কৃষ্ণালাল বলেন, অনেকবার বিভিন্ন সরকারের কাছে, সরকারের মন্ত্রী, এমপি, আমলাদের কাছে অনেক ধরণা দিয়েও এই মহল্লার শহীদদের নাম তালিকাভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
পাকবাহিনীর হাত থেকে দ্বিতীয় জীবন পাওয়া সিলেটাঞ্চলের সুনীল সরকার নিজে কথা ও সুর দিয়ে এই স্বাধীনতার গানটি গেয়েছিলেনÑ
‘তোরা কে কে যাবি আয় বঙ্গবন্ধুর নায়
মোস্তফা ধরেছে হাল হাসিম বৈঠা বায়।।
ও ভাইরে ভাই ১১ খানা তক্তা দিয়া
নাও খানা গড়াইয়া
তাতে ৬ খানা গোড়া যে লাগায়
ঈমান করেছে মাস্তুল সবুজ নিশান দেখা যায়।।
ও ভাইরে ভাই নৌকায় মাঝখানেতে একটি দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।
সেথায় মানিক চৌধুরী দাঁড়াইয়া মানিক মিয়া
দাঁড়াইয়া জারি গান গায়।।’
[মিথুশিলাক মুরমু : লেখক ও আদিবাসী গবেষক]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here