সম্পাদকীয়

0
64

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বাঙালিদের জীবনে আসছে নতুন বর্ষ ২০১৮। ২০১৭-র ঘটবে স্বাভাবিক পরিণতি। আমাদের জীবনে রেখে যাবে অনেক স্মৃতি। সে স্মৃতি আনন্দ-বেদনার, পাওয়া-না-পাওয়ার এবং আশা-নিরাশার সংমিশ্রণ। অনেক আকাক্সক্ষার অপূর্ণতার সে স্মৃতি। তাই নতুন বছরের শুরুতে সবারই কামনা অপূর্ণ বিষয়গুলো পূর্ণতা পাবে নতুন বছরে।

 

আবারো আমাদের মাঝে এলো আরো একটি নতুন বছর। আজ নতুন সূর্যের উদয় ঘটবে তা হবে ২০১৬ সালের প্রথম দিনের নতুন সূর্য। দেশ-বিদেশে নববর্ষ নিয়ে নানা বর্ণালি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। আর একটি বছরের সমাপ্তি তো অনেকাংশেই একটি ইতিহাসের সমাপ্তি। নববর্ষের নতুন প্রভাত। নতুন বছর মানে নতুনের আবাহন। নতুন করে স্বপ্ন দেখা। জীর্ণ ও পুরাতনকে বিদায় জানানো এবং নতুন বছরের শুভাগমনে দেশ-জাতির সমৃদ্ধি কামনা করা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও সব রকম ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊধর্্েব থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গড়ে উঠুক সহযোগিতা ও সহমর্মিতার মেলবন্ধন এ প্রত্যাশা করা। গড়ে উঠুক সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ এটাও চাওয়া। দেশের সর্বত্র শান্তি বিরাজ করুক। নতুন বছরে এসবই আমরা একান্তভাবে কামনা করছি।

অনেক স্বপ্ন ও সম্ভাবনা নিয়ে প্রতি বছর পহেলা জানুয়ারি আমাদের মাঝে আসে। যেমন আসে পহেলা বৈশাখ। এ দুটি বিশেষ দিনকেই আমরা বরণ করে নিই। একটির মধ্যে নিহিত রয়েছে আন্তর্জাতিকতা, অন্যটি আবহমান বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে ধারণ করে বাঙালি হৃদয়ে আবর্তিত হয়। নতুন বছরে নতুন দিন আসে, আমরা জাগ্রত হই। নতুন জীবনের জয়গান গেয়ে অন্তত ওই দিন উজ্জীবিত হই। উল্লাসেও ফেটে পড়ি। আনন্দ-উল্লাসের পাশাপাশি আমরা অঙ্গীকার করি, নতুন বছরে নতুনভাবে চলতে। সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গীকার এর মধ্যে প্রধান হয়ে ওঠে। ব্যক্তিচরিত্র বদলেরও অঙ্গীকার করি আমরা। এসবই বিগত বছরের ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে নতুনভাবে, স্বচ্ছ ও সঠিকভাবে পথচলার অঙ্গীকার। প্রাসঙ্গিক কারণেই প্রশ্ন ওঠে, আমরা কি আমাদের ব্যক্তিচরিত্র ঠিক করতে পারছি? আর ব্যক্তিচরিত্র ঠিক না হলে জাতীয় চরিত্র কিভাবে ঠিক হবে।

নতুন বছরে দেশের প্রতিটি মানুষের জীবন সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক, দেশ ও জাতির সুনাম আন্তর্জাতিক পরিম-লে আরো বিস্তার লাভ করুক এ প্রত্যাশা আমাদের। আমরা চাই বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা, আবেগ ও অনুভূতিকে যথাযথ মূল্যায়ন করে দেশটির অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন ও রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনতে সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে।

আমরা গণতন্ত্র বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার কথা মুখে বলে বলে ফেনা তুলি, কিন্তু গণতন্ত্রচর্চা করি না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি গণতন্ত্রচর্চায় বলিষ্ঠ ভূমিকা না থাকে, তবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে কী করে। প্রত্যাশা করি, নতুন বছর হোক গণতন্ত্রচর্চার বছর, অর্থনৈতিক উন্নয়নের বছর। ব্যক্তিচরিত্র বদল ও আত্মসমালোচনা ও আত্মমূল্যায়নের বছর। নতুন বছরে নতুন করে সম্ভাবনা তৈরি হয়, আবার উবে যায়। আবার সম্ভাবনা তৈরি হয়, আবার উবে যায়। এ তৈরি হওয়া এবং উবে যাওয়ার মধ্যেই আমাদের দিনযাপনথ বেঁচে থাকা।

আমরা প্রতিটি নতুন বছরে স্বপ্ন ও সম্ভাবনার বীজ বুনি, এ বীজ আবার অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। হতাশাগ্রস্ত হয়েও আমরা আবার আশায় বুক বাঁধি, নতুন করে স্বপ্ন দেখি। গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন, অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন। একটি সুষ্ঠু, সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গঠনের স্বপ্ন। কিন্তু আমাদের স্বপ্ন বার বার হোঁচট খায়, চোরাবালিতে আটকে যায়, মাঠে মারা যায়। আমরা মুখ থুবড়ে পড়ি। আমাদের জাগিয়ে তোলার যেন কেউ নেই। সবাই আমাদের আশার বাণী শোনায়। চারদিকে কথার ফুলঝুরি শুনে শুনে আমরা একবার আশায় বুক বাঁধি, আবার আশাহত হই।

আমরা ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই। যে বাংলাদেশ গড়ার জন্য বর্তমান সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং বিগত অনেক ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। যে বাংলাদেশের জন্য বাঙালি এত সংগ্রাম, সাধনা ও আত্মত্যাগ করেছে, রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছে। একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে, লাখ লাখ মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছে। এত ত্যাগ-তিতিক্ষা, এত রক্তের বিনিময়ে একটি স্বাধীন বাংলাদেশ পাওয়া, সে দেশ স্বনির্ভর হতে পারবে না, ঘুরে দাঁড়াবে নাথ এটা বিশ্বাস করতে চাই না।

উল্লেখ্য, সত্তরের দশকে পুরোপুরিই সাহায্যনির্ভর থাকা দেশটি নব্বইয়ের দশকে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে শুরু করে। সাহায্যনির্ভর বাংলাদেশ বাণিজ্যনির্ভর বাংলাদেশের দিকে যাত্রা শুরু করে। আর বর্তমানে দেশটির বৈদেশিক সাহায্য জিডিপির ২ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে রপ্তানি আয় অনেক বেড়ে হয়েছে ২০ শতাংশের এবং রেমিট্যান্স ১০ শতাংশের বেশি। সাহায্যনির্ভর থেকে বাণিজ্যনির্ভর হওয়াটাও স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪৪ বছরের অন্যতম অর্জন। আমরা আরো আশাবাদী এ কারণে যে, আজ থেকে ৪৪ বছর আগে রিক্ত হস্তে যাত্রা শুরু করেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতি। যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, স্বজন হারানো মানুষের আহাজারি, অভাব-অনটনে জর্জরিত সাড়ে ৭ কোটি মানুষের এ দেশে সে সময়ে ছিল না সচল কোনো শিল্পকারখানা। রাজকোষ ছিল একেবারেই শূন্য। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ছিল একেবারে শূন্যের ঘরে। অথচ রিজার্ভ এখন ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। সে শূন্য থেকে মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম, সংগ্রাম আর নিষ্ঠার মাধ্যমে দেশ আজ মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তিল তিল করে গড়ে ওঠা অর্থনীতিই এখন বাংলাদেশের নিজস্ব শক্তি ও প্রেরণা। যে শক্তির প্রশংসা বিদেশি অনেকেই করছেন।

দেশে বিরাজমান সমস্যাগুলো দূর করে ভিশন ২০২১-এর সফল বাস্তবায়ন করতে হবে আমাদের। বর্তমান সরকার যে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখছে, বাস্তবায়ন করতে হবে তারও। আর এ জন্য শিল্পবান্ধব ও কৃষিবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কেননা অপার সম্ভাবনাময় সুবিশাল মানবসম্পদ তথা যুবসমাজ আমাদের রয়েছে। এদের কাজে লাগাতে হবে।

দেশের শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদরাই পারেন এ দেশকে প্রথমে একটি মধ্য আয়ের দেশে এবং পরে উন্নত দেশে পরিণত করতে। দেশ ও জাতির মঙ্গলে তাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত দেশপ্রেম জাগ্রত হোক, খুলে যাক সম্ভাবনার নতুন দুয়ারথ নতুন বছরে এ প্রত্যাশাই করছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here