‘সিনেমা বা চলচ্চিত্র’ আর আগের মতো নেই

0
49

চলচ্চিত্র দেখতে হয় চোখ দিয়ে আর অনুধাবন করতে হয় শরীর-মন-অনুভূতি-বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান দিয়ে। বেশির ভাগ দর্শকই চায় চলচ্চিত্রে একটি জমজমাট কাহিনি, নাচ-গান-কৌতুক বিনোদনপূর্ণ দৃশ্য-শব্দের ব্যঞ্জনায় দ্বন্দ্ব-সংঘাত-বিরহ শেষে মিলনের ঘনঘটায় চিত্তের সন্তুষ্টি। আর প্রযোজক-পরিচালক চান তাঁদের সৃষ্ট শিল্পপণ্যটি দর্শক-ভোক্তাদের দেখিয়ে, অর্থাৎ বিক্রি করে লগ্নিকৃত পুঁজি ফিরিয়ে তবে লাভবান হতে।

বর্তমানে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে চরম মন্দাবস্থা বিরাজ করছে নানা কারণে। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী আকর্ষণীয় গল্পের অভাব, সৃজনশীল নির্মাতার অভাব, প্রেক্ষাপটের অভাব, পুঁজির অভাব, আর্থসামাজিক-পারিপার্শ্বিক অস্থিরতা এবং সিনেমা হলের পরিবর্তে বিভিন্ন মাধ্যমে (টিভি চ্যানেল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, মুঠোফোন, ইউটিউব, ডিভিডি, পেনড্রাইভ, টুইটার, ডিশ লাইন প্রভৃতি) ছবি দেখার সুযোগ। দর্শকেরা আর আগের মতো সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখে না। ফলে ছবি নির্মাণ বাবদ লাখ লাখ, এমনকি কোটির বেশি লগ্নি অর্থ ফেরত আসছে না। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে ২০১৮ সালের ঈদুল আজহা উপলক্ষে কয়েকটি মুক্তিপ্রাপ্ত ছবির মধ্যে হার্টবিট প্রযোজিত, ওয়াজেদ আলী সুমন পরিচালিত এবং বাংলাদেশ-ভারতের তারকা-কুশলীদের সমন্বয়ে নির্মিত মনে রেখো একটি।

‘সিনেমা বা চলচ্চিত্র’ আর আগের মতো নেই। নেই আগের মতো সেই ছবি এবং পরিচালনাও। তাই মনে রেখো দেখার সময় চলচ্চিত্রের সব ব্যাকরণ ভুলে যেতে হয়। পর্দায় ঘটনা যত এগোতে থাকে, ততই ভয়ংকর সব দৃশ্যের সমাবেশ ঘটতে থাকে। বাস্তবতা ও শিল্পবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতাও উধাও হতে থাকে। টেন্ডারবাজি, মাস্তানি, গুন্ডামি, জোরপূর্বক আটকে রাখা, প্রতিহিংসা, চিৎকৃত সংলাপ, হাইবিট মিউজিক, ব্যান্ড পার্টির তালে তালে মারপিট, কলেজে লেখাপড়ার নামে আড্ডাবাজি, জোরপূর্বক প্রেম নিবেদন, ক্লাসে মাস্তানি ইত্যাদি চলতেই থাকে। ছবির আখ্যানভাগে একদিকে রয়েছে ঠিকাদার আশরাফ চৌধুরীর (সাদেক বাচ্চু) ছেলে লাকী। আসলে লাকী তার মৃত ভাই আসাদ চৌধুরীর পুত্র। অন্যদিকে রয়েছে টেন্ডারবাজি মাস্তান সরদার হিপ্পু (মিশা সওদাগর) ও তার ছোট ভাই সোহেল। লাকী ও সোহেলের নজর পড়ে ধনীর কন্যা কলেজছাত্রী মুনমুনের (মাহি) ওপর। দুজনই তার প্রেম পেতে চায়। মূলত দেখা যায়, ‘প্রেম’ নিয়েই যত দ্বন্দ্ব-সংঘাত, মারপিট-হত্যাকাণ্ড ঘটে মনে রেখো ছবিতে।

মূলত মারপিটনির্ভর এ ধরনের ছবিতে বোধ হয় পরিচালকের কিছু করার থাকে না সমন্বয়ের ভূমিকা পালন করা ছাড়া। বিভাগীয় নির্দেশকেরা কাহিনি ও সংলাপ লেখেন, শিল্পীরা অভিনয় করেন, মারপিট করেন, নাচ-গান হয়, ক্যামেরাম্যান চিত্র ধারণ করেন, সংগীতকার-শব্দধারকেরা মিউজিক বা শব্দ পাঞ্চ করেন আর সম্পাদক তা জোড়া লাগান। কাজেই এ ধরনের আলোকচিত্রিত বা ‘ফটোগ্রাফ থিয়েটারের’ মধ্যে চলচ্চিত্রের ভাষার অন্বেষণ করা বৃথা।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, গল্প বা কাহিনি হচ্ছে একটি ছবির ‘প্রাণ’। কিন্তু মনে রেখোতে সেই প্রাণটিই নেই। এ ধরনের প্রেম ও মারপিট মাধ্যম কাহিনির সঙ্গে দর্শকেরা একাত্ম হতে পারে না। তারা তামিল, তেলেগু, হিন্দি ছবিতে এর চেয়ে ভালো উপাদানসমৃদ্ধ বিষয় দেখে থাকে নানা মাধ্যমে। কাজেই মনে রেখোর কাহিনি দর্শকের মনে দাগ কাটে না। এর দৃশ্যরূপ, শব্দ ও সংগীতের গ্রন্থনা, অভিনয়, মারপিট, সংলাপ অস্বাভাবিক, অবাস্তব ও অসহনীয়। ছবির শুরুতে যে মারপিটের শুরু হয়, শেষ দৃশ্য পর্যন্ত তা অক্ষুন্ন থাকে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here