তরুণ বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বুঝবেন যেভাবে মিলিয়ে নিন আপনার সাথে

0
53

কিছু রোগ যা এক সময় বয়স্কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল; তবে এখন তা যে কোনো বয়সের মানুষকেই আক্রান্ত করছে। হার্টের রোগ সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখন যে কোনো বয়সের মানুষই হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারেন। একজন সুস্থ মানুষও হঠাৎ করে হৃদরোগে আক্রান্ত হতে পারেন। এর নানা কারণ থাকতে পারে। নিয়মিত শরীরচর্চা করে বা সুস্থ জীবনযাত্রা করেও অনেক সময় এর প্রতিরোধ সম্ভব নয়।

অনেক সময়ে লুকানো কয়েকটি ফ্যাক্টর এক্ষেত্রে কাজ করে। মধ্য ৩০-এ হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে যে বিষয়গুলো, তা কোনো মতেই এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। বয়স বাড়লে তা আরও মারাত্মক আকার নিতে পারে। কোন লক্ষণ দেখে বুঝবেন হার্টের রোগের ঝুঁকি আছে, তা জেনে নিন।

ক্লান্তি : আপনার কি সব সময় ক্লান্ত লাগে? অনেকক্ষণ ঘুমানো বা বিশ্রাম নেয়ার পরও নিজেকে ফ্রেশ মনে হয় না? সারা দিনের ক্লান্তি আপনাকে তাড়া করে বেড়ায়, যার ফলে আপনি কাজে মন দিতে পারেন না? এমন হলে তা হালকাভাবে নেবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

দমে ঘাটতি : একটু বেশি খাটনি বা শারীরিক কসরত করলেই কি দমে ঘাটতি হয়? যদি এমনটা নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

বুকে ব্যথা : কামড় দেয়ার মতো বুকে ব্যথা অনুভব করেন? বুকের ঠিক মাঝে এ অসহ্য ব্যথা কখনও হয়? এর পাশাপাশি কোনো একটি হাতে ব্যথা হয়? এমন হলে দেরি করবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

স্থূলতা : জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন হলে স্বাস্থ্যের নানা পরিবর্তন হয়। বাজারের খাবার, রেডি করা খাবার ও কম শারীরিক কসরত শরীরকে মোটা করে দেয়। এ থেকে ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেসার থেকে শুরু করে হৃদরোগের আশংকা কম বয়সে বেড়ে যায়।

উদ্বেগ : কোনো একটি ঘটনা বা অনেক ঘটনা সম্পর্কে মনের মধ্যে উদ্বেগ বহুদিন ধরে থাকলে হার্টের অসুখ হওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা নয়।

ঘুমের ঘাটতি : জীবনে নানা সমস্যা, কর্তব্য পূরণের চাপ, কাজের চাপ ইত্যাদি নানা কিছুর মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হয়। কেউ কেউ খুশি মনে এসব করেন, কারও ক্ষেত্রে এসবে অবসাদ ও দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। এসবই হার্টের গোলমাল বাঁধায়।

দাঁতে ময়লা : দাঁতের ওপর ব্যাকটেরিয়ার হলুদ আস্তরণ অনেকের জমে যায়। একইসঙ্গে মুখে দুর্গন্ধ হয়। এমন হলে অবহেলা করবেন না। হার্টের সঙ্গে মুখের ভেতরের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।[১]

তরুণদের হার্ট অ্যাটাক বাড়ছে কেন?

বর্তমানে কেবল প্রবীণদের নয়, তরুণদেরও হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ হতে দেখা যায়। এর কারণ কী। এ বিষয়ে কথা বলেছেন ডা. এম এ বাকী। বর্তমানে তিনি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।

প্রশ্ন : আগে দেখা যেত হার্ট অ্যাটাক প্রবীণদের হতো। এখন কি তরুণদের ক্ষেত্রেও পাচ্ছেন?

উত্তর : আগে হয়তো বেশি বয়সে সমস্যা হতো। আমরা যখন চিকিৎসা শাস্ত্রের পড়েছি, আমাদের বইয়ে লেখা ছিল হার্টের রক্তনালির রোগগুলো পঞ্চাশ দশকের রোগ। তবে এখন বিভিন্ন পরিবেশগত কারণে, খাদ্যাভ্যাসের কারণে, অত্যধিক পরিশ্রমে এটি হয়।

করনারি আর্টারি ডিজিস বা ইসকেমিক টার্ম ডিজিস অনেকের কাছে পরিচিত। এই রোগগুলো কিন্তু একদিনে হয় না। এবং এই রোগগুলোর পেছনে যে কারণগুলো আছে, একে আমরা করনারি আর্টারি ডিজিসের ঝুঁকি বলি। এই ঝুঁকির পেছনে কিন্তু প্রেসার, ডায়াবেটিস, ধূমপান, কোলেস্টেরল, জেনেটিক কিছু কারণ এবং যখন কোলেস্টেরলের প্রশ্ন আসবে তখন সেডেন্টারি জীবনযাপন, দৈহিক কাজকর্ম কম, হাঁটাচলা কম, ওজন- এই বিষয়গুলো খুব বেশি জড়িত হার্টের রক্তনালি ব্লকের পেছনে। এখন আপনি চিন্তা করেন আমাদের সভ্যতা, শিল্পায়ন, সমৃদ্ধি এসবের সবকিছুরই কিছু অভিশাপ আছে। শহরের যে আধুনিক জীবন-যাপন সেটা হৃদবান্ধব নয়।

সে জন্য আপনি খেয়াল করে দেখেন নগরায়নের জন্য শারীরিক কার্যক্রম পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। আগে যেমন স্কুলে যেতে হলে একজন ছাত্রকে অন্তত এক মাইল হেঁটে যেতে হতো। এখন তো হাঁটার সুযোগ নেই। গাড়িতে চড়ে যাচ্ছে। এখন পাড়া-মহল্লায় সে রকম মাঠ নেই। নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন কারণে সন্তানদের আমরা সেভাবে মাঠে দিচ্ছি না। সেভাবে কোনো পার্ক নেই যে আপনি বিকেলে গিয়ে খেলাধুলা করবেন। সুতরাং ছোটবেলা থেকে শারীরিক কার্যক্রম কিন্তু অনেক কমে যাচ্ছে। বাচ্চারা তাদের অবসর সময় মাঠে ব্যবহার হতো সেটা এখন হচ্ছে না। কিন্তু এই যে মাঠে ঘাটে ঘোরাঘুরি, রাস্তায় হাঁটাহাঁটি এগুলোর শারীরিক কিছু উপকারিতা ছিল। শিশুরা কিন্তু এগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর কিন্তু স্বাস্থ্যগত উপকার আছে। এখন কিন্তু খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হচ্ছে। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের প্রভাব শিশুর ওপর গিয়ে পড়ছে, কিশোরের ওপর গিয়ে পড়ছে। শেষ পর্যন্ত যুবকের ওপর গিয়ে পড়ছে। আগে যেমন শাকসবজি, মাছ এর ওপর একটি চাপ ছিল, এখন রান্না করার সময়ের অভাবে হয়তো কম খাওয়া হচ্ছে। সহজ লভ্য খাবারগুলো খাওয়া হয়। মুরগি বা গরুর মাংসের ওপরে আমরা বেশি বেশি ঝুঁকে যাচ্ছি। এমনকি বাইরের ফাস্টফুডের দিকেও আমাদের ঝোঁক বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের বাচ্চাদের আমরা ছুটির দিনে বলি চলো বাইরে খাই। এতে আমরা এমনিতেই ফাস্টফুডের দিকে ঝুঁকে পড়ছি।

এই খাদ্যাভ্যাসগুলোতে কিন্তু ধীরে ধীরে হার্টের রক্তনালিতে ব্লক হওয়ার যে উপাদানগুলো, কোলেস্টেরল উচ্চ পরিমাণ হওয়ার, শারীরিক ব্যায়াম কমে যাওয়া- এগুলোর যে আধিক্য শরীরের ওপর পড়ছে, ধীরে ধীরে ব্লকের যে একটি উদ্দীপক সেটা কিন্তু ছোটবেলা থেকে শুরু হচ্ছে। পরে দেখা যাচ্ছে ২৫-৩০ বছর বয়সে সমস্যা হয়ে যাচ্ছে। অনেক সময় ত্রিশের নিচে হার্ট অ্যাটাকের রোগী পাচ্ছি। যেটি আগে থাকত না। এত অল্প বয়সে আমরা পেতাম না।[২]

অল্প বয়সেও হার্ট অ্যাটাক হয়!

৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের ঘটনা বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়ছে। তাই বয়স কম বলে নিশ্চিন্তে বসে থাকার অবকাশ নেই।

জন্মগত হৃদ্‌রোগ, রক্তনালির সংকোচন বা রক্তনালির রোগ, জিনগত ত্রুটি ইত্যাদি কম বয়সে হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া অল্প বয়সে মুটিয়ে যাওয়া, রক্তে চর্বির আধিক্য, কম বয়সে উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া, ধূমপানের অভ্যাস, মানসিক চাপ অল্প বয়সে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অস্বাস্থ্যকর খাবারে আসক্তি, কায়িক পরিশ্রম একেবারেই না করা, রাত জাগা, মাদকাসক্তি ইত্যাদি তরুণ প্রজন্মের হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়।

মনে রাখবেন, আপনার বয়সেই অনেক নারী-পুরুষ হার্ট অ্যাটাকের কারণে আকস্মিক মৃত্যুর শিকার হয়েছেন। তাই গোড়া থেকেই সচেতন হোন, নিজের যত্ন নিতে শিখুন, সুশৃঙ্খল জীবনযাপনে সচেষ্ট হোন।

১. আগে যা-ই করে থাকুন না কেন, ধূমপানকে চিরতরে না বলে ফেলুন।

২. পেটের মেদ বাড়তে দেবেন না। এশীয় পুরুষদের জন্য সঠিক ভুঁড়ির মাপ হচ্ছে ৯০ সেন্টিমিটার, আর এশীয় নারীদের জন্য ৮০ সেন্টিমিটার। এর বেশি হলেই ঝুঁকি বাড়ে। উচ্চতা অনুযায়ী ওজন ঠিক রাখুন। বাড়তি মেদ ঝেড়ে ফেলতে সচেষ্ট হোন।

৩. যত ব্যস্ততাই থাকুক, প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ মিনিট হাঁটা, ব্যায়াম, সাঁতার, জগিং, সাইকেল চালানো বা খেলাধুলা করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এর বাইরেও যথাসম্ভব কায়িক শ্রমের জন্য বাগান করুন, নিকট দূরত্বে হেঁটে যাওয়া-আসা করুন, লিফট ব্যবহার না করে সিঁড়ি ব্যবহার করুন, সন্তানদের সঙ্গে খেলাধুলা করুন, বাড়ির বিভিন্ন কাজে সাহায্য করুন। অফিস থেকে ফিরেই টেলিভিশন বা কম্পিউটার নিয়ে বসবেন না।

৪. বাড়তি লবণ বাদ দিন। সঙ্গে বাদ দিন অতিরিক্ত তেল-চর্বিসমৃদ্ধ খাবার, ফাস্টফুড, গরু-খাসির মাংস, কোমল পানীয় ইত্যাদি। প্রচুর সবজি, ফলমূল, মাছ, দুধ খান।

৫. নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন। বছরে একবার রক্তের শর্করা ও চর্বি মেপে দেখুন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

৬. রাত জেগে কাজ করবেন না। সুস্থ হার্টের জন্য প্রতিদিন অন্তত সাত ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন ঘুম চাই। অতিরিক্ত কাজের চাপ নেবেন না। মাঝে মাঝে কাজ থেকে ছুটি নিয়ে পরিবার ও বন্ধুদের সময় দিন।[৩]

হার্ট অ্যাটাক থেকে বাঁচতে হলে

১. আপনি যদি হৃদরোগে আক্রান্ত না হয়ে থাকেন তাহলেও কি আপনার খাদ্যাভ্যাস নিয়ে চিন্তা করতে হবে? উত্তর – হ্যাঁ, হবে। শরীরের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অভ্যাসটি হলো প্রাকৃতিক নিয়মবহির্ভূত খাদ্য গ্রহণ করা।

একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমাকে সবসময় যেসব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় সেগুলো হলো- খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও হৃদরোগের মধ্যে সম্পর্কটা কি? মানুষ কি খাচ্ছে, কিভাবে শরীর চর্চা করছে এ বিষয়ে চিন্তা করার কি কোনো প্রয়োজন আছে? হার্টের সুস্থতার জন্য কি ধূমপান ছেড়ে দেয়া উচিত?

আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি ভারতীয় উপমহাদেশের হৃদরোগের ঝুঁকির সম্মুখীন শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ পারিবারিক সূত্রে এ রোগ পেয়েছে। নিজের কোনো গাফিলতি কিংবা দোষ না থাকা সত্ত্বেও এ দলের মানুষের লিপিড প্রোফাইল (রক্তে কোলেস্টেরল, লিপোপ্রোটিন ও ট্রাইগ্লিসারিনের মাত্রা) বেশি। তাদের ডায়াবেটিক আছে। অথবা তারা হাইপারটেনশনে ভোগে। তারা হয়ত ধূমপান করে না, খাদ্যাভ্যাস ভালো এবং নিয়মিত ব্যায়ামও করে।
তবুও জন্মগত ও পারিবারিক কারণে অথবা শিশুকালীন কোনো সমস্যার কারণে এরা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হতে পারে। এ শ্রেণীর মানুষের হার্ট অ্যাটাক থেকে রক্ষা করতে চিকিৎসা শাস্ত্রের জ্ঞানে আমাদের বেশি কিছু করার নেই।

আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা নিয়মিত মাত্রাছাড়া মদপান করে। যাদের ধূমপানের রেকর্ড ভয়াবহ, দেখলে মনে হয় চিমনি দিয়ে নিত্য ধূঁয়া বেরুচ্ছে। আজীবন আজেবাজে খাবার খেয়ে তারা জীবন কাটিয়ে দেয়। তারপরও তাদের হার্টে কিছুই হয় না। শতকরা ২৫ ভাগ মানুষ এমন সৌভাগ্যবান। এদের কিছুই হয় না। এদের মারতে হলে গুলি করেই মারতে হবে। হৃদরোগ বিবেচনায় এরা আসলেই অত্যন্ত ভাগ্যবান।

আমরা ডাক্তাররা মূলত অবশিষ্ট ৫০ ভাগ মানুষ নিয়েই বেশি আগ্রহী। যারা তাদের জীবনযাত্রার প্রতি মনোযোগী। যারা সতর্ক হয়ে হার্ট অ্যাটাক এড়িয়ে থাকতে চান। ধূমপান, খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, যোগব্যায়াম, মেডিটেশন সংশ্লিষ্ট পরামর্শ আমরা এই ৫০ ভাগ মানুষকে দিতেই আগ্রহী। যাতে তারা সুস্থ থাকেন। কিংবা হার্ট অ্যাটাককে বিলম্বিত করতে পারেন।

২. প্রকৃতির রহস্যের শেষ নেই। আমাদের পক্ষেও এ রহস্যর পুরোটা বোঝা অসম্ভব। কারা যে উপরে উল্লেখ করা প্রথম ২৫ ভাগ, নাকি দ্বিতীয় ২৫ ভাগ নাকি অবশিষ্ট ৫০ ভাগের মধ্যে পড়ছেন তা আমরা নিশ্চিতভাবে বুঝতে পারি না। বর্তমানে যেসব ডাক্তারি পরীক্ষা রয়েছে তার মাধ্যমে এ বিষয়টি আগে থেকে নির্ণয় করার কোনো সহজ উপায় নেই। এ কারণেই সবচেয়ে ব্যবহারযোগ্য পথটি হলো উপরে বর্ণিত অবশিষ্ট ৫০ ভাগের সদস্য বিবেচনা করে এইসব মানুষের জীবনধারায় আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসার চেষ্টা করা।
হৃদরোগে আক্রান্ত না হয়েও হৃদরোগ নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করার কারণ কি? এর কারণ হলো ইউরোপিয়ানদের তুলনায় ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তিন গুণ বেশি। ভারতীয় উপমহাদেশের অধিবাসীদের মধ্যে তরুণরা অল্প বয়সেই হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হতে পারে। সাধারণভাবে, পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান তার বাবাকে হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসার কথা। তবে, আমার পেশাজীবনে আমি বেশিরভাগ সময়ই এর ঠিক উল্টো ঘটনাটি ঘটতে দেখেছি। হার্ট অ্যাটাকের ঘটনাটি এখন ভয়ঙ্কর পর্যায়ে গেছে। আমি যখন যুক্তরাজ্যে হার্টের রোগীদের নিয়ে ডাক্তারি করেছি তখন আমার রোগীদের গড় বয়স ছিল ৬৫ বছর। আর ভারতে এটা হচ্ছে ৪৫ বছর। এর সঠিক কারণ কি সেটা নির্ণয় করাটা খুবই কঠিন। তবে মনে হয়, ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাস করাটাই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকির একটি প্রধান কারণে পরিণত হয়েছে।

৩. মানুষের শরীর মাংস জাতীয় খাদ্য গ্রহণের জন্য উপযুক্ত নয়। আমাদের দাঁতের গঠনপ্রণালি শাকসবজি ও ফল খাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। আমাদের পরিপাকতন্ত্র মাংস হজম করার জন্য উপযুক্ত নয়। প্রকৃতি আমাদের শরীরকে সরাসরি তেল বা চিনি হজম করার জন্যও তৈরি করেনি। প্রকৃতি জানত যে, আমাদের শরীরে তেলের প্রয়োজন আছে। সেজন্য প্রকৃতি তেল জাতীয় উপাদানসম্পন্ন বাদাম তৈরি করেছে। যথেষ্ট পরিমাণ বাদাম খেয়েই আমরা আমাদের দেহের প্রয়োজনীয় তেলের চাহিদা মেটাতে পারি।

আমরা এখন যে অবস্থায় চিনি খাই প্রকৃতি হয়ত সেরকমটি চায়নি। এজন্য প্রকৃতিতে আখ ও মিষ্টি ফল রয়েছে। যাতে মানবশরীরের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য দরকারি চিনি আছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রকৃতি আমাদের সামান্য কুবুদ্ধিও দিয়েছে, যার কারণে আমরা বাদাম থেকে তেল, আখ থেকে চিনি তৈরি করা শুরু করি। ফলে প্রাকৃতিক তেল চিনির বদলে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে গাঢ় হয়ে যাওয়া তেল ও চিনি আমরা হজম করতে বাধ্য হচ্ছি।

পাশাপাশি মানুষের মস্তিষ্ক বিপণন কৌশল ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। চতুর বিজ্ঞাপন দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে প্রাপ্ত তেলগুলোর মধ্যে একটি তেলকে অন্যটির চেয়ে ভালো বলে ব্যাপক প্রচারণাও শুরু করে দিয়েছে।

অবশেষে আমরা অপ্রাকৃতিক কৃত্রিমভাবে তৈরি করা ঘন তেল ও চিনি খাচ্ছি। ফলে কি নিরামিষাশী, কি মাংসভোজি কেউ আর হার্টের রোগ থেকে মুক্ত থাকছে না। আমি অনেক নিরামিষাশীদের দেখেছি যারা হৃদরোগে অত্যন্ত বাজেভাবে আক্রান্ত।

৪. এটাও সত্য নয় যে, যারা মোটা তাদেরই হৃদরোগ হবে। আপনারা যদি হৃদরোগ হাসপাতালের একটি ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন যেখানে বাইপাস হয়েছে এমন রোগীদের রাখা আছে তাহলে দেখবেন যে, সেখানে মোটা মানুষের সংখ্যা খুবই কম। বরং দেখা যাবে যে তাদের বেশিরভাগই হালকা-পাতলা গড়নের মানুষ। সুতরাং, হালকা-পাতলা, চিকন স্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া মানে এই নয় যে, আপনি হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি থেকে পরিত্রাণ পেয়েছেন। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, আমি স্থূলতাকে কোনো সমস্যা হিসেবে দেখছি না। সেটাও একটি বিরাট সমস্যা। ভাজা পোড়া খাওয়া ও উচ্চ শর্করা জাতীয় খাদ্য আমাদের জন্য একেবারেই ভালো নয়। কারণ এগুলো রক্তে সুগারের মাত্রা অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি করে। রক্তশিরার ক্ষতি সাধন করে।

আমি নিজে চাপাতির (পাতলা রুটি) সঙ্গে সামান্য একটু ভাত খাই। যদিও এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ করেছে আমার জানা নেই, যেখানে বলা হয়েছে যে ভাতের চেয়ে রুটি বা চাপাতি ভালো। আমার পরামর্শ হলো প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও ফল খান। খাদ্যতালিকা থেকে যথাসম্ভব মাংস পরিহার করুন। মাছ ও মুরগি খাওয়া যায়। তবে, ভাজা মাছ ও ভাজা মুরগি পরিহার করা উচিত। নিজ খাদ্যাভ্যাসে তেলের পরিমাণ যথাসম্ভব কমানোর চেষ্টা করুন। প্রচুর পানি খান। পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি না খাওয়ার কারণে অনেকের কিডনিতে পাথর হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি গ্রহণের মাধ্যমে কিডনিগুলোকে সুরক্ষিত করা সম্ভব। এছাড়াও, এমন অনেক তত্ত্ব মেলে যেখানে বলা হয়েছে যথেষ্ট পরিমাণ পানি পান না করলে শরীরের ওজন হ্রাস করাও সম্ভব নয়।
আপনি যে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি খাচ্ছেন সেটা বোঝার উপায় কি? এর সবচেয়ে সহজ উপায় প্রস্রাবের রং খেয়াল করা। যদি প্রস্রাব পানির মতো সাদা হয় তাহলে বুঝতে হবে যে, শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পেয়েছে। প্রসাবের রং ভিন্ন হলে বুঝতে হবে যে শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শরীরের হৃৎপিণ্ড ও কিডনি যতদিন স্বাভাবিক থাকবে আপনি ততদিন প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে পারবেন।

সবার প্রতি আমার পরামর্শ হলো পরিমিত খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। খাবার বিষয়কে আনন্দের বিষয় হিসেবে নেয়া উচিত না। কেবল খাওয়ার আনন্দে খাওয়া উচিত না। দিনে তিন বেলা খাওয়া উচিত। সকালে পর্যাপ্ত নাস্তা, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবার। এর মাঝে ইচ্ছে করলে ফলের রস ও স্যান্ডউইচ খেতে পারেন। একই সঙ্গে ব্যায়াম করা উচিত। জিম বা শরীর চর্চা কেন্দ্রগুলোতে গিয়েই ব্যায়াম করতে হবে এমন কোনো বাধ্য-বাধকতা নেই। তবে, প্রতিদিন কমপক্ষে আধ-ঘণ্টা হাঁটা দরকার। অন্তত ততক্ষণ হাঁটা উচিত যতক্ষণে আপনি ঘেমে উঠেন। যাতে আপনি সর্বদা সুস্থ, স্বাভাবিক থাকতে পারেন এবং নিজ হৃৎপিণ্ডকে রক্ষা করতে পারেন।[৪]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here