একুশে ফেব্রুয়ারি কেন আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রভাষা দিবস হওয়া উচিত?

0
22

পৃথিবীতে প্রায় ছয় হাজার ভাষা আছে বলে শোনা যায়, কিন্তু রাষ্ট্রের সংখ্যা দুই শয়ের বেশি নয়। সুতরাং প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্রে একাধিক ভাষা আছে। ভাষামাত্রেই কোনো না কোনো জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা। জাতিরাষ্ট্রের এই বহুভাষিকতা বা মাতৃভাষাবৈচিত্র্য নিয়ে কেউ কখনো কোনো আপত্তি করেনি। সমস্যার সূত্রপাত হয় যখন রাষ্ট্রের একটি জনগোষ্ঠী সরকারের কাছে তাদের ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানায়। রাষ্ট্র তার সর্ববিধ কাজে যে ভাষাটি বা যে ভাষাগুলোকে ব্যবহার করে সেটিকে বা সেগুলোকে বলা হয় রাষ্ট্রভাষা।
কোনো জনগোষ্ঠী সরকারের কাছে তাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার দাবি জানালে যেকোনও সরকারের প্রথম এবং চটজলদি উত্তর হচ্ছে: ‘কাভি নেহি, শির কুচল দেঙ্গে!’ (পাকিস্তানি শাসকেরা যেমনটা বলেছিল আর কি!) এরপর সেই জনগোষ্ঠীর ক্ষমতা থাকলে তারা মিছিল-মিটিং করে। সরকারও প্রত্যুত্তরে ধরপাকড় করে, গুলি চালায়, যেমনটি হয়েছিল ঢাকায়, ১৯৫২ সালে, শিলচরে, দক্ষিণ ভারতে বা পৃথিবীর আরও অনেক জায়গায়। অবস্থা বেগতিক বুঝলে সরকার রাষ্ট্রভাষার দাবি মেনে নেয়। কিন্তু বিক্ষোভে যদি তেজ না থাকে তবে রাষ্ট্রভাষার দাবি বহুদিনের জন্যে চাপা পড়ে যায়।
রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে সরকার মাত্রেই কেন দমনমূলক আচরণ করে? প্রথমত, একাধিক রাষ্টভাষা ঐক্য ও অখ-তার পরিপন্থী- এ রকম একটি সংস্কার বা কুসংস্কার ঊনবিংশ শতকে জাতিরাষ্ট্রের সূচনা থেকে চালু আছে। যে কোনো সরকার নিয়ন্ত্রণ চায় এবং যে কোনো বৈচিত্র্যই নিয়ন্ত্রণের কাজটাকে কঠিন করে তোলে। দ্বিতীয়ত, যে জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাটি রাষ্ট্রভাষা তারাও নিজেদের বিশেষ সুবিধাটুকু বজায় রাখতে ক্ষমতার নানা রকম কলকাঠি নাড়ে। তৃতীয়ত, সরকারকে খরচ কমানোর কথাও ভাবতে হয়। একটির জায়গায় দুটি ভাষাকে রাষ্টভাষা হিসেবে মেনে নিলে অনুবাদ, মুদ্রণ ইত্যাদি হাজারো খরচ দ্বিগুণ হয়ে যায়। তিনটি রাষ্ট্রভাষা হলে তিনগুণ। চতুর্থত, কোনো জনগোষ্ঠীর ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিলে তার এতটাই সমৃদ্ধি হতে পারে যে সে ভবিষ্যতে স্বায়ত্বশাসন দাবি করতে পারে। যে কোনো ধরনের স্বায়ত্বশাসন রাষ্ট্রের অখ-তার জন্যে ঝুঁঁকিপূর্ণ, কারণ স্বায়ত্বশাসন স্বাধীনতায় রূপ নিতে দেরি হয় না।
রাষ্ট্রভাষার এই সমস্যাটা অবশ্য সাম্প্রতিক কালের। ঊনবিংশ শতকের দিকে জাতিরাষ্ট্র গঠিত হওয়ার আগে ভাষার অধিকার নিয়ে লোকজন একেবারেই মাথা ঘামাতো না। প্রশ্ন হতে পারে: জাতিরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত জনগোষ্ঠীগুলো কেন সুযোগ পেলেই সরকারের কাছে নিজেদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেবার দাবি জানায়? কারণ একটাই এবং কারণটি আগাপাশতলা অর্থনৈতিক। ভাষার সঙ্গে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অঙ্গাঙ্গী জড়িত। প্রতিটি জনগোষ্ঠীই উন্নতি করতে চায়। একের উন্নতি অনেক ক্ষেত্রে অপরের অবনতির উপর নির্ভর করে। কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষা হলে সেই জনগোষ্ঠী এমন অনেকগুলো সুবিধা পেয়ে যায় যেগুলো বাকি জনগোষ্ঠীগুলো পায় না। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি বা দক্ষিণ ভারতের তামিলকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ চাকুরি পাবার জন্যে কষ্ট করে হিন্দি শিখতে হয়। বিহার বা মধ্যপ্রদেশের লোকজনকে এই কষ্টটা করতে হয় না, কারণ হিন্দিটা তারা আগে থেকেই জানে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও হিন্দিভাষীরা বাকিদের তুলনায় ভালো করার কথা।
পাকিস্তান সরকার যদি বাঙালিদের উপর একমাত্র রাষ্ট্রভাষা উর্দু চাপিয়ে দিতে সক্ষম হতো তবে বাঙালিদের কয়েক প্রজন্ম চাকরি-ব্যবসা-শিক্ষা সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে যেত, কারণ নতুন একটি ভাষা শিখে নিতে তাদের সময় লাগতো। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের নেতারা এ ব্যাপারটা ঠিকঠাকমতো বুঝেছিলেন। ৪৮-৫২ সালের রাষ্টভাষা আন্দোলনের কারণটা আগাপাশতলা অর্থনৈতিক, যদিও আবেগ সেই আন্দোলনে অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। এছাড়া বাঙালিদের দাবিও যুক্তিযুক্ত ছিল বৈকি। বাঙালিরা যেহেতু পুরো পাকিস্তানে সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী ছিল, সেহেতু বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি না দিয়ে তাদের প্রতি অবিচার করা হচ্ছিল।
আমজনতার সমৃদ্ধিই যদি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের মূল উদ্দেশ্য হয়, তবে রাষ্ট্র ও সমাজের উচিত, ধাপে ধাপে প্রতিটি মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করা। ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়া মানে সেই ভাষাভাষী মানুষকে স্বীকৃতি দেয়া। কোনো জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা যদি রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায় তবে সেই জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নতির পথে এক ধাপ এগিয়ে যায়। সব মানুষকে, নাগরিককে সমান সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে, যাতে প্রত্যেকেই নিজেকে সমৃদ্ধ করে তুলে সমাজের, দেশের, পৃথিবীর সেবা করতে পারে। যে জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পাচ্ছে না সেই জনগোষ্ঠী নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর তুলনায় কম সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত কোনো একটি গোষ্ঠীর কোনো একটি ক্ষেত্রে কম সুযোগ-সুবিধা পাওয়াটা সংবিধান এবং মানবাধিকারের পরিপন্থী।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে ‘মাতৃভাষা দিবস’ নামটি যথার্থ নয়। সঠিক নাম হওয়া উচিত ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’। মাতৃভাষা হচ্ছে বাতাসের অক্সিজেন বা আকাশের রোদের মতো। মানুষের এই সব স্বাভাবিক অধিকার উপভোগে কোনো রাষ্ট্র কখনও বাধা দিয়েছে বলে শোনা যায়নি। মাতৃভাষার অধিকার হয় না, রাষ্ট্রভাষার অধিকার হয়। কোনো জনগোষ্ঠীকে কখনও মাতৃভাষার দাবি করতে হয়নি, কিন্তু রাষ্ট্রভাষার দাবি পৃথিবীর অনেক জনগোষ্ঠীই করেছে। ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়!’ কথাটায় যতটা আবেগ আছে, ততটা সত্য নেই। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের বাংলা বলার অধিকার কেড়ে নিতে চায়নি। তারা বাংলার রাষ্ট্রভাষা হবার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ মাতৃভাষা নয়, রাষ্ট্রভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনের প্রতীক।
বর্তমান পৃথিবীতে এবং বাংলাদেশে মৌসুমী গণ হাহুতাশের একটি বিষয় হচ্ছে, ভাষার মৃত্যু। ভাষার মৃত্যু নিয়ে হাহুতাশ করার চেয়ে জানা দরকার ভাষার মৃত্যু কেন হয়, ভাষার মৃত্যু কত প্রকার ও কী কী। মানুষের মতো ভাষারও চার ধরনের মৃত্যুর কথা ভাবা যেতে পারে: ১. স্বতঃপরিবর্তন, ২. নির্বাণ, ৩. পুনর্জন্ম এবং ৪. পুনরুত্থান। প্রথম দুই ধরনের মৃত্যুর কথা বৌদ্ধধর্মে বলা হয়ে থাকে। প্রতি মুহূর্তে মানুষের শরীরের পরিবর্তন হচ্ছে। একটি আলোকশিখা স্বতঃপরিবর্তনশীল অগণিত শিখার সমাহার। বাংলা ভাষারও প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা আজ যে ভাষায় কথা বলছি হাজার খানেক বছর পরের বাংলাভাষী সেটা পুরোপুরি বুঝতে সক্ষম হবে না, আমরা যেমন চর্যাপদের ভাষা পুরোপুরি বুঝি না। কোনো ভাষা বলার মতো কমপক্ষে দুজন লোক যদি জীবিত না থাকে তবে সেই ভাষাটির নির্বাণ হয়েছে বলে ধরে নিতে হবে।
হিন্দু ধর্মে মানুষের পুনর্জন্মের কথা বলা হয়। একইভাবে, এক ভাষা মরে গিয়ে অন্য ভাষার জন্ম হতে পারে, যেমন লাতিন মরে গিয়ে ফরাসি বা স্প্যানিশের জন্ম হয়েছে অথবা সংস্কৃত মরে গিয়ে বাংলা বা হিন্দির জন্ম হয়েছে। সেমেটিক ধর্মগুলোতে মৃত্যুর পর শেষ বিচারের জন্যে মানুষের পুনরুত্থান হয়। ভাষার পুনরুত্থানের একটিমাত্র উদাহরণ আছে পৃথিবীতে এবং কাকতালীয়ভাবে উদাহরণটি আছে সেই সেমেটিকদের দেশেই: ইসরায়েলে দুই হাজার বছর আগে মৃত হিব্রু ভাষাকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়েছে সরকারি প্রচেষ্টায় এবং জনগণের আগ্রহে। তবে এই পুনরুত্থানের কথাটি আংশিক সত্য, কারণ যে হিব্রুভাষা মরে গিয়েছিল হাজার বছর আগে সেই ভাষাটির পুনর্জন্ম হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত জার্মানির ইহুদিদের মাতৃভাষা ইদ্দিশের বাক্যকাঠামোর উপর হিব্রু শব্দ বসিয়ে নতুন করে ইসরায়েলে সরকারি উদ্যোগে নতুন এক হিব্রুভাষা সৃষ্টি হয়েছে।
ভাষাসৃষ্টির আদিকাল থেকে পুরোনো ভাষার যেমন মৃত্যু হচ্ছে, তেমনি নতুন ভাষারও জন্ম হয়ে চলেছে। সংরক্ষণ নয়, ভাষাকে বাঁচাতে হবে, কারণ একটি ভাষার শব্দকোষ ও ব্যাকরণে সেই ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা, জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি নিহিত থাকে। ভাষার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এই অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিগুলোও হারিয়ে যায়। কিন্তু কোনো ভাষাকেই চিরদিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। কোনো ভাষাই হাজার বছরের বেশি বাঁচে না। চর্যাপদের বাংলার মৃত্যু হয়েছে, শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের বাংলাও বেঁচে নেই, আজকের প্রমিত বাংলা বা বাংলার অন্য উপভাষাগুলো ধীরে ধীরে মারা যাবে। কিন্তু তাই বলে হাজার বছর পরে বাংলা অঞ্চলের মানুষ কি ভাষাহীন থাকবে? না, তারা কথা বলবে নতুন কোনো বাংলায়।
ভাষার মৃত্যু দুই রকমের হয়: স্বাভাবিক ও অস্বাভাবিক। কোনো জনগোষ্ঠী যদি তাদের মাতৃভাষা ছেড়ে অন্য কোনো ভাষা শিখতে শুরু করে তবে কয়েক প্রজন্মেই তাদের মাতৃভাষাটির মৃত্যু হতে পারে। এটা ভাষার অস্বাভাবিক মৃত্যু। ভাষার অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ একান্তই অর্থনৈতিক। অনেক বাবা-মায়ের মনে এমত কুসংস্কার আছে যে শিশু একাধিক ভাষা শিখলে তার মস্তিষ্কের উপর চাপ পড়বে বা দুটি ভাষা শিখতে গেলে কোনোটিই ঠিকমতো শেখা হবে না। প্রকৃতপক্ষে শিশুদের পক্ষে অবলীলায় একাধিক ভাষা খুব ভালোভাবে শেখা সম্ভব। যাই হোক, গারো বা মারমা পিতামাতারা মনে করতেই পারেন যে তাদের ছেলেমেয়েরা আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজি এবং রাষ্ট্রভাষা বাংলাতো শিখছেই, এর উপর আবার বাবা-মায়ের মাতৃভাষা তাদের উপর চাপিয়ে লাভ কি। গারো বা মারমা ভাষা শিখেতো কোনো অর্থনৈতিক ফায়দা নেই। ঠিক এই কারণে বিদেশে বহু বাঙালি পরিবার তাদের ছেলেমেয়েদের বাংলা শেখার উপর জোর দেয় না। চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিক্ষিত পরিবারগুলোতে বহু শিশু চট্টগ্রামের ভাষা বলতে পারে না, কারণ তাদের বাবা-মা মনে করেন চট্টগ্রামের ভাষা শিখে কোনো লাভ নেই। প্রধানত অর্থনৈতিক কারণে আমরা প্রত্যেকে ইংরেজি শিখতে চাই, অনেকে ফরাসি, জার্মান, চীনা, জাপানিও শিখতে চাই। আমরা কেউই পাশের দেশের বর্মী ভাষা বা নিজের দেশের গারো বা মারমা ভাষা শিখতে আগ্রহী নই, কারণ এতে আমাদের কোনো আর্থিক ফায়দা নেই।
একুশে ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’-এর স্বীকৃতি পাওয়াতে যারা প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আহ্লাদে আটখানা হয়ে থাকেন, তারা ভাষার মূল সমস্যাটাই বোঝেন না, অথবা বুঝেও তারা না বোঝার ভান করেন যাতে জনগণকে ধোঁকা দেওয়া যায়। নিছক আবেগ, সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে কোনো ভাষাকে বাঁচানো যায় না। একটি ভাষাকে বাঁচাতে হলে সেই ভাষাটিকে কমবেশি সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, সুলতানী ও ব্রিটিশ আমলে বাংলা ভাষার সামাজিক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এবং পাকিস্তানি আমলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশক অতিক্রান্ত হবার পরেও বাংলাভাষা এখনও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা পায়নি। যেহেতু গারো বা মারমার মতো ভাষাগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা নেই সেহেতু ভাষাগুলোর এই মৃত্যুঝুঁঁকি বাংলার তুলনায় শতগুণ বেশি। পৃথিবীর বহু শত ভাষা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। রাষ্ট্রের ন্যূনতম মনোযোগ পর্যন্ত পায় না পৃথিবীর বহু ভাষা। কোনো ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃত হবার অর্থ হচ্ছে, ভাষাটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা পাওয়া। এর পরে আসে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন, যার উপর ভাষাটির জীবন-মরণ নির্ভর করবে।
ভাষা নিয়ে কাজ করে এমন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তি ও নীতিনির্ধারকেরা এই সহজ সত্যগুলো আমলে নেন কিনা বা আদৌ বোঝেন কিনা জানি না। ভাষার মৃত্যু নিয়ে যারা শঙ্কিত তারাও ভাষাকে বাঁচানোর কোনো উপায় বাৎলাতে পারেন না। ভাষার নমুনা সংগ্রহের কাজটা সোজা এবং এ কাজে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুদান পাওয়া যায়, সুতরাং তারা নমুনাই সংগ্রহ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও গত বছর তার এক বক্তৃতায় ‘হারিয়ে যাওয়া’ মাতৃভাষার স্ক্রিপ্ট ও নমুনা সংগ্রহের কথা বলেছেন। নিছক নমুনা সংগ্রহ করে কি ভাষাকে বাঁচানো যাবে? মা মারা যাওয়ার আগে ছবি দেয়ালে টাঙানোর চেয়ে মৃতপ্রায় মায়ের সেবা করাটাই কি বেশি জরুরি ছিল না? যাদুঘরে গজদন্ত প্রদর্শন করে হস্তী প্রজাতিকে সংরক্ষণের দাবি যদি কেউ করেন, তবে তিনি ভাবের ঘরে চুরি করছেন। নিছক ভাষার নমুনা আর পোস্টার সংগ্রহের ছেলেখেলা করে বছরের পর বছর ধরে জনগণের অর্থের অপচয় করা যাবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না। জাদুঘর ও ইনস্টিটিউটের তফাৎটা পর্যন্ত আমাদের নীতিনির্ধারকেরা ভুলে বসে আছেন। স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে কোনো মুমূর্ষু ভাষার ব্যাকরণ বা শব্দকোষ তৈরি করেও সেই ভাষার মৃত্যু ঠেকানো যায় না। অবশ্য ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণা হিসেবে এ ধরনের কাজের মূল্য অনস্বীকার্য যদি সে কাজগুলো ফরমায়েশী না হয় এবং পেশাদার ভাষাতাত্ত্বিকদের দিয়ে করানো হয়।
আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের আসল দায়িত্ব হওয়া উচিত বাংলাদেশের এবং পৃথিবীর প্রতিটি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পাবার পথে অগ্রসর হতে সাহায্য করা। বাংলা একাডেমির দায়িত্ব হওয়া উচিত বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠার লক্ষে কাজ করা। সর্বোপরি, ভাষাবিষয়ক নীতিনির্ধারক, কর্মকর্তা এবং ভাষা নিয়ে অন্তত ফেব্রুয়ারি মাসে হলেও একটু মাথা ঘামান এমন যে কাউকে বুঝতে হবে যেকোনো ভাষাকে বাঁচাতে হলে সেই ভাষাভাষী মানুষের কথা আগে ভাবতে হবে। মানুষ বাঁচলে তবে তো তার ভাষা।
[শিশির ভট্টাচার্য্য : অধ্যাপক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here