সংরক্ষিত আসন : এবারের আদিবাসী কোটাটি উত্তরবঙ্গের

0
31

উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা গণনার সংখ্যায় অপেক্ষাকৃতভাবে আধিক্য হলেও রাজনৈতিক সচেতনতা, ঐক্য এবং অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বরাবরই পিছিয়ে রয়েছেন। সর্ব উত্তরে পঞ্চগড় থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় দু’ডজন জেলাতে বসবাস করে সাঁওতাল, উরাঁও, মাহালী, মু-া, কোল, পাহান, তুরি, রাজোয়াড, ভুঁইয়া, ভুঁইমালি, কর্মকার, মালো, পাহাড়িয়া, রায়, সিংসহ ত্রিশার্ধো আদিবাসী জনগোষ্ঠী। এই পিছিয়েপড়া অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠী মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি সংগ্রাম, আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী নারীদের ছোট ছোট অবদানকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। উত্তরাঞ্চলের নারীরা অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত না হলেও মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও রান্নাবান্না করে খাওয়ানো, সংবাদ সংগ্রহ করা এবং সন্দেহজনকদের সম্পর্কে তথ্যাদি জেনে মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবেশন করেছেন। আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে জেনেছি, মায়েরা যুদ্ধকালীন সময়ে তাদের যুব সন্তানদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছে, যেন তারা মাতৃভূমিকে শত্রু সেনাদের হাত থেকে মুক্ত করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মায়েদের এরূপ দৃঢ়চেতা মনোভাব সন্তানদেরকে উজ্জীবীত করেছে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে। এইজন্যেই কয়েক’শ আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা সশস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
বিগত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছে একাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একাদশতম নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের আর্দশ লালন-পালনকারী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসীন হয়েছে। ইতোমধ্যেই পবিত্র সংবিধান অনুযায়ী সাংসদ ও মন্ত্রী পরিষদ শপথ গ্রহণ করে দেশ পরিচালনার দায়িত্বভারও স্কন্ধে নিয়েছেন। নব গঠিত বর্তমান সরকার সংবিধান অনুযায়ী মহিলা সংরক্ষিত আসনের জন্য মনোনয়ন এবং চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে চলেছে। আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি, উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীরাও সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য ফরম সংগ্রহ করেছে। এই তালিকায়Ñ আননচেয়িতা মারা-ী (সহযোগী অধ্যাপকÑজগদল আদিবাসী স্কুল এ্যান্ড কলেজ), মিসেস ইমেল্ডা মারা-ী। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মিসেস রঞ্জনা বর্মন ফরম সংগ্রহের কথা জেনেছি। অপরদিকে অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিজড়া সম্প্রদায় থেকেও কেউ কেউ ফরম সংগ্রহ করে সংরক্ষিত আসনের প্রত্যাশা করছেন। আননচেয়িতা মারা-ী বলেছেন, ‘সংরক্ষিত নারী আসনে সাংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীসহ সব সম্প্রদায়ের অবহিলেত নারীদের জন্য সততার সঙ্গে কাজ করে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে চাই।’ রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমার অগ্রজ আননচেয়িতা মারা-ী আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা ধামুইরহাট উপজেলায় অবস্থিত ‘জগদল আদিবাসী স্কুল ও কলেজ’-এর একজন শিক্ষক। বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকাল থেকেই মিসেস মারা-ীর রাজনৈতিক তৎপরতা ছিলো অন্যদের চেয়ে বেশ ঘনিষ্ঠতা। ক্যাম্পাসে আদিবাসী ছেলেমেয়েদের ভর্তি, আবাসিক হলগুলোতে জায়গা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কার্যাবলীতে তার যে বিচরণ ছিলো, সেটি আমাদেরকে উদ্দীপ্ত করতো। বিশ^াস করি, সেই ধারাবাহিকতায় ধামুইরহাট উপজেলার মহিলা আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
রাজনৈতিক ময়দানে উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী নারীরা পার্বত্য চট্টগ্রাম কিংবা ময়মনসিংহ অঞ্চলের নারীদের চেয়ে ঢের ঢের পিছিয়ে রয়েছেন। বোধ করি, মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা, প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা, দেশপ্রেম কিংবা অন্যত্র স্থানান্তর না হওয়ার সুবিধাদি ইত্যাদির জন্যে এই অঞ্চলের নারীরা সাহসিকতার সাথে লড়াই করে চলেছেন। আমরা লক্ষ করেছিÑআদিবাসী নারীরা সাংগঠনিক তৎপরতা ও কার্যসূচি প্রণয়ন করে নিজেদেরকে মেধা ও মননের বিকাশ এবং দক্ষতায় উপযুক্ত হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে সমর্থ হয়েছে। শুধু সাংগঠনিক ক্ষেত্রে নয়Ñফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় জাতীয় পর্যায়ে স্থান পাকাপোক্ত করে দেশের পক্ষে সর্বশক্তি দিয়ে লড়ছেন। তুলনামূলকভাবে সমতল অঞ্চলের আদিবাসী নারীদের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক তৎপরতার দৈন্যতা, বিচ্ছিন্নতা, ঐক্যহীনতায় সর্বদা নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করে থাকে। শুধু শুধু নারীদেরই নয়Ñ অত্র অঞ্চলের আদিবাসী পুরুষদের শক্তিশালী সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা ধর্মীয় সংগঠনের দৃষ্টান্ত বিরল। আদিবাসী নারী-পুরুষদের বঞ্চনার কথা, প্রাপ্তি-প্রত্যাশার কথা, সুখ-দুঃখ কিংবা অধিকারের কথাগুলো আদিবাসীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের কাছে স্থানীয় প্রশাসন কিংবা সাংসদগণ যথাযথভাবে উত্থাপন করতে পারেন না বলে প্রতীয়মান হয়েছে। আর আদিবাসী নারীরা ঘরে-বাইরে, বিশেষ করে যখন মাঠের কাজে গমন করে থাকেন; তৎকালে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী কর্তৃক ধর্ষণ, শ্লীলতাহানী কিংবা মানসিকভাবে অপদস্তের শিকার হয়ে থাকেন। আমরা পেরে উঠি না যে, এহেন কাজ যারা করে থাকে, তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। এরা স্থানীয়ভাবে যেমন ক্ষমতাবানদের আশির্বাদপুষ্ট, তেমনি অর্থনৈতিকভাবেও শক্তিশালী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কান পর্যন্ত কোনোদিনই সংবাদ পৌঁছাইনি বলে ন্যায় বিচার সম্পাদিত হয়নি বলে নারীরা বিশ^াস করেছেন। আদিবাসী নারীরা নিজেদের হৃদয়ের অব্যক্ত কথা, স্বপ্নের কথা, দেশগড়ার ক্ষেত্রে সহভাগিতার কথাগুলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দরজা পৌঁছাতেই সংরক্ষিত আসনের প্রার্থনা করেছেন। রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতার অংশী হলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং নিজেদের মধ্যের দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠে একটি শক্তিশালী সংগঠন ও কার্যসূচি দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাংগঠনিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি পেত।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রার্থনা জানাই, ইতিপূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে রাখাইন জনগোষ্ঠীর নেত্রী এথিন রাখাইন সংরক্ষিত আসনে আসীন হয়েছেন। এবার দয়া করে উত্তরবঙ্গের দিকে দৃষ্টিপাত করুন, উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা অনেক অসহায়, নারীরা আরো অনগ্রসর এবং অবহেলিত। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নারীরা পুরুষদের পাশাপাশি থাকলে সামনের পথচলা আরো মসৃণ ও কণ্টকমুক্ত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংরক্ষিত আসনে উত্তরবঙ্গের আদিবাসী নারীদের সুযোগ দান করে বাধিত করবেন।
[ মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী গবেষক ও লেখক।]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here