চেতনাই একুশের দ্বীপ শিখা : ড. এলগিন সাহা

0
104

ফেব্রুয়ারি এলেই একুশের ভাবনা আমাকে পেয়ে বসে। শুধু আমাকে নয় ফেব্রুয়ারি তার ইতিহাস ও চেতনা নিয়ে, আমার মতো সবাইকে হয়ত নাড়া দিয়ে থাকে। আসলে একুশ আমাদের মাঝে এক সংস্কৃতির সৃষ্টি করেছে। তাই অনেক সময় একুশের চেতনাকে ছাপিয়ে সমাজে সংস্কৃতিটা প্রাধান্য পায় বেশি।
শীত যাব যাব করেও তার প্রকটতা এখনও থামায়নি ফলে অনেক পরিবারেই শীতের বস্তু সমূহ তুলে রাখার তাগিদটাও শুরু হয়নি। এমন অবস্থায় পাঞ্জাবি-ফতুয়া, পরিধেয় বস্তুসমূহের প্রয়োজনীতা তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। আর কটা দিন মাত্র পায়জামা-পাঞ্জাবী প্রস্তুত না থাকলে অনেকের অনুষ্ঠানের যাওয়াটাই অসম্ভব হয়ে পড়বে। অনেক রাজনীতিবিদ ইতিমধ্যে বই ঘাটাঘাটি শুরু করেছেন। বক্তৃতায় যেন উপযুক্ত কোটেশনটা দেওয়া য়ায়। গতবার একুশের বিভিন্ন সভা-সমিতিতে তিনি যা বলেছিন বিন্দুমাত্র তা মনে নেই। এমনকি যে সমস্ত রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাও যেন মনে পড়ছে না। তাই এবারের বক্তৃতা যেন গতবারের দেওয়া বক্তৃতার চর্বিত চর্বণ না হয়ে যায়। বাংলা ভাষার প্রতি তার যে দরদ ও দখল রয়েছে তা এবারে বক্তৃতায় স্পষ্ট করে তুলতে হবে। যেন বক্তৃতার মাঝে, বাংলা ভাষার প্রতি দরদ ও দখল তিনি প্রমাণ করতে পারেন। অনেকে আবার লেখার অভ্যাস না থাকলেও সাহায্য নিয়ে নিজেই একটা লেখা দাঁড় করে ফেলেন। নিজের বুদ্ধি ও প্রকাশ ঘটিয়ে সবাই আজ বুদ্ধিজীবী সাজতে চায়। লেখাগুলো সমাজে পাঙ্ন্তেয় হচ্ছে কিনা, সে দিকে খেয়াল না রেখে বিরামহীনভাবে লিখে চলেন। ভালো লেখা মনের খোরাক যোগায়। কিন্তু অনেক লেখাই সমূহ পাঠকদের মনে যে পীড়া জমায়। অনেকে সে বিষয়ে খেয়াল রাখে না। (পাঠক আমায় ক্ষমা করবেন যদি ইতিমধ্যে আপনার ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটিয়ে থাকি)।
সম্ভবত সেটা ১৯৬৩ সন। এক ছেলে ছিলেম বিধায় মা আমায় কখনও একা বাইরে যেতে দিতেন না। প্রচ- বায়না ধরেছিলাম এবার প্রভাত ফেরিতে যাবই যাব। মাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলাম আমার বয়সি সবাই প্রভাত ফেরেতি যাচ্ছে। আমি নিজেকে বন্ধুদের কাছে আর ছোট করতে পারব না। এক বন্ধুকে ধরে আনলাম আমার মায়ের সঙ্গে কথা বলার জন্য, শেষ পর্যন্ত দফারফা হলো, বন্ধুটি মাকে কথা দিল সে আমাকে নিয়ে যাব কখনো হাতছাড়া করবে না এবং প্রভাত ফেরি শেষে আমাকে দিয়ে যাবে। তারিখটা ছিল খুব সম্ভবত ১৮। আমার সে কি আনন্দ উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা। সেই আনন্দের শিহরণ আজও আমি উপলব্ধি করি। থাকতাম আমরা ফরাশগঞ্জে, বন্ধুটি যথরীতি দরজায় কড়া নাড়ল রাত ৩ টার সময়। চিৎকার করে বলল কি-রে ঘুমিয়ে আছিস এখনও! মা বললেন, উঠবে! ও তো সারা রাত ঘুমাইনি, মনে আছে, পাজামা-পাঞ্জাবির উপর মা একটা সোয়েটার পরিয়ে দিয়েছিল। আমি পরতে চাইনি মোটেও। কিন্তু মা’র কঠিন ধমকে পরেছিলাম। তখন রাত ৪ টা বাজে, আমরা স্কুলের (সেন্ট গ্রেগরিজ) গেটে জড় হলাম দেখলাম সেখানে আর অনেকে এসেছে। ফুলের তোরা-স্মরণীকা-ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং অমর একুশের গান গাইছে। পথে আসতে শ্যামবাজার, লালকুঠির মোড় ও মুসলিম হাই স্কুলের গেটে স্ব স্ব প্রভাত ফেরির দল অপেক্ষা করছে। তাদের অনেকের সাথে গলায় গামছা দিয়ে হারমনিয়াম বাঁধা ছিল। আনন্দের অতিশয্যে শীতের প্রকোপটা ততবেশি উপলব্ধি করতে পারিনি। জুতো হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে নয় বরং প্রভাত ফেরির সম¥ানকে তুলে ধরার জন্য আমরা সবাই ছিলাম খালি পায়ে। যখন নবাবপুরে রাস্তা দিয়ে যাই তখন বিভিন্ন পাড়া ও গলি থেকে অনুরূপভাবে প্রভাত ফেরির মিছিল এসে যোগ দিচ্ছিল। খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস নেই তাই ইট ও কাঁকড় বিছানো পথে খুবেই কষ্ট হচ্ছিল। শীতে প্রাণ যাওয়ার উপক্রম, মা’র দেওয়া সোয়েটারের জন্য মনে মনে মাকে ধন্যবাদ দিলাম। যখন আমরা সেক্রেটারির ইডেন বিল্ডিয়ের কাছে এসেছি, তখন একুশে ফেব্রুয়ারি গানে চারদিকে গমগম করছিল, সে এক বিশাল বাহিনী। মশালের আলো, সকলের গলা ফাটা গান শীতের প্রকোপ যেন অনেকটা কমিয়ে দিয়েছিল। এতক্ষণ কোনো পুলিশের গাড়ি দেখিনি। এখন দেখি সারি সারি অনেক পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। গতি অনেকটা শ্লথ হয়ে এসেছিল। ঐ পর্যন্ত আসতে যে সময় লেগেছিল, শহীদ মিনারে পৌঁছাতে তার চেয়ে বেশি সময় লেগে গেল। সে এক মহা যজ্ঞের ব্যবস্থা। চারিদিকে কেবল গান আর গান, ব্যানার আর ব্যানার। একদিনে এত দেশাত্ববোধক গান আমি জীবনে আর কোন দিন শুনি নি। জীবনে নিজ পরিবার ছাড়া তখন আর কাউকে ভালোবাসতে শিখিনি। সেদিন প্রথম উপলব্ধি করলাম যে, পরিবার থেকেও বেশি দেশকে ভালোবাসা যায়। কোথা থেকে এত যবক-যুবতী, মেয়ে, বুড়ি ও বুড়ো সকলে এক ঐক্যতানে মিলিত হয়েছিল সম¥ান শ্রদ্ধা জানাতে যারা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিল তাদের উদ্দেশে। ভাষা শহীদের গল্প ও কাহিনী তখনও জানা হয়নি, জেনে ছিলাম অনেক পরে। কিন্ত বাঙালি যে প্রচ- আবেগে একুশকে ভালোবেসে ছিল তা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলাম। একুশের বেদী থেকে বিরামহীনভাবে বক্তৃতা চলছিল। সে দিকে আমার যত-না খেয়াল ছিল তার থেকে বেশি অনুভব করছিলাম বাঙালি জাতির বিশালতা দেখে। এত বড়ো বাঙালি জাতির বিশালতা দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। বাঙালি জাতি স্বাধীনতা উন্মেষকালে এই উপলব্ধিন প্রকাশ ঘটেছিল যা আমাদের সবাইকে অনুপ্রণিত করেছিল। তা না হলে। বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়ত সম্ভব হত না।
একুশের শক্তি বাঙালি জাতিকে যে স্বপ্ন দেখিয়েছিল তা আজ বাস্তবায়িত হয়েছে। একটি ভাষা স্বীকৃতি আদায়ের মধ্যে দিয়ে বাঙালি জাতি তার ঠিকানা প্রস্তত করতে সমর্থ হযেছে। তাই একুশের চেতনার মধ্যে বাঙালি জাতির শুধুমাত্র বিকাশ নয় এর প্রতিষ্ঠা ও বলিষ্ঠতা ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। তাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একুশের চেতনাকে ধারণ ও লালন করতেই হবে। যদি একুশের চেতনা একটি দেশকে স্বাধীন করে থাকে তাহলে কেবল মাত্র এই চেতনাই আমাদের মুক্তির একমাত্র পথ হবে। অর্থ যোগান ও নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঝে মুক্তির পথ নেই। মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে একুশের চেতনা ও দ্বীপশিখাকে অনির্বাণ দ্বীপ শিখার মতো চিরন্তন জ্বালিয়ে রাখা।
[ড. এলগিন সাহা : এনজিও ব্যক্তিত্ব, কলামিস্ট]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here