মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন, ইচ্ছা এবং আমাদের প্রত্যাশা

0
146

সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগ ৬৯ পেরিয়ে পর্দাপণ করেছে ৭০-এ। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ জুন পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাত্রা শুরু করে। জন্মলগ্নে দলটির নাম ছিল ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ কিন্তু তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব প্রাপ্তির পরই ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ২১ অক্টোবর দলের নামকরণের পরিবর্তন আনেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় নামকরণ হলো ‘আওয়ামী লীগ’, তিনি সাম্প্রদায়িকতা থেকে বেরিয়ে দলের দর্শন ও স্বপ্ন বুননে অসম্প্রদায়িকতা, সৌহার্দ, সম্প্রীতির মেলবন্ধনের সেতু তৈরি করলেন। বঙ্গবন্ধু জীবনভর অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, সৌহার্দ, সম্প্রীতি এবং মানবকল্যাণ কাজে নিবেদিত হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ পূর্তিতে সরকার ও দেশবাসী প্রস্তুতি গ্রহণ করতে চলেছেন, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাকে সত্যিকার অর্থে ক্ষুধা-দারিদ্রমুক্ত, শান্তি ও সম্প্রীতির বেলাভূমিতে পরিণত করতে। মহান নায়কের দুটি স্বপ্নের কথা জেনেছিÑ ক. বাংলার স্বাধীনতা; খ. শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। শত সহস্র বছরের অত্যাচারের যাতাকল, নির্যাতন ও বৈষম্যের বেড়াজাল থেকে মুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে এদেশের মানুষের প্রার্থনার উত্তর স্রষ্টা শেখ মুজিবকে প্রেরণ করেছেন। ‘মহানুভব মুজিব’ গ্রন্থের প্রণেতা ড. ডেনিস দিলীপ দত্ত উল্লেখ করেছেন, “মুজিব নামটি পবিত্র কোরআনের সুরা হুদের পঞ্চম রুকু থেকে নেওয়া হয়েছে। মুজিব শব্দটির বাংলা অর্থ হলো ‘উত্তরদান’। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির যে ফরিয়াদ বাংলার মুসলমান, বাংলান হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ এবং বাংলার খ্রিষ্টানেরা মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে করেছিল, মহান স্রষ্টার কাছ থেকে সেই ফরিয়াদের জবাব হলো মুজিব বা ‘আল্লাহর উত্তরদান’।”
বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল গণসংবর্ধনায় ইতিহাসের ধারাবাহিকতার কথা উচ্চারণ করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, ‘আমার রাজনীতি হচ্ছে শোষিত বঞ্চিত মানুষের জন্য। আদর্শ নীতির সঙ্গে আপোশ করি নাই, করবও না। বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে। তাতে যদি জীবন চলেই যায়, আপত্তি নেই। …আমি দেশের মানুষের সেবক। জনগণের জন্য কাজ করতে এসেছি। এর বাইরে আমার চাওয়া-পাওয়া নেই। জাতির পিতার সোনার বাংলার স্বপ্ন বাস্তবায়নই লক্ষ্য। …আমার প্রতিটি মুহূর্ত দেশের মানুষের জন্য, জনগণের জন্য কাজ করি। কোনো উৎসবে যাই না। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই, আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমার কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। শুধু একটি জিনিস দেখতে চাইÑ বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে উঠেছে।’ আপনি বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেই এতো সহজ-সরল হৃদয়ে জনসাধারণের কথা বলতে পারছেন, কারণ হৃদয়ের ঔদার্য, বিশালতা, স্বপ্নকে ধারণ এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করার যে দৃঢ় মনোবল, মানসিকতা ও আকাক্সক্ষা থাকে; সেটি আপনার প্রতিটি উচ্চারণেই প্রতিধ্বনি হয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ‘সোনার বাংলা’ গড়তে সোনার মানুষের দরকার হয়। সোনা অর্থাৎ খাঁটিÑ যেখানে কোনো খাদ থাকবে না। থাকবে না আঞ্চলিক বৈষম্য, জাতিগত বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য; বাঙালী-আদিবাসী, হিন্দু-খ্রিষ্টিয়ান, বৌদ্ধ-বাহাই কিংবা শিখ ধর্মাবলম্বী ইত্যাদি। সবাই এক স্রষ্টার সৃষ্টি মানুষ হিসেবে যদি অপরকে বিবেচনা করতে না পারি, তাহলে বৈষম্যের সূত্রপাত বা বীজই মহীরুহে পরিণত হবে। আমরা মানুষ, আমরা বাংলাদেশী এটিই আমাদের বড় পরিচয়। আমাদের ভালো লাগে, আপনি যখন দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলে থাকেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।’ একজন সত্যিকার সোনার মানুষ কখনোই ধর্মের বিষয়ে উচ্চবাচ্য করেন না; বরং যে যার ধর্ম পালনে, রীতিনীতি মেনে চলতে উৎসাহিত ও উদ্যোগ গ্রহণে পাশে থাকবেন। সোনার বাংলা স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জীবদ্দশায় সম্প্রীতির উদাহরণ সৃষ্টিতে অন্য নেতাদের চেয়ে অগ্রগণ্যই ছিলেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি সচেতনভাবেই বলেছেন, ‘আমি দেশের মানুষের সেবক। জনগণের জন্য কাজ করতে এসেছি।’ খ্রিষ্টিয়ান ধর্মের মূল কেন্দিভূত চরিত্র যীশু খ্রিষ্ট শিষ্যদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘…কেহ যদি প্রথম হইতে ইচ্ছা করে, তবে সে সকলের শেষে থাকিবে ও সকলের পরিচারক হইবে।’ আপনার সেবা করার দর্শন আমাদেরকে চমৎকৃত করেছে। যারা সেবক হবেন, তারা মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছবেন, মানুষের সুখে-দুঃখে, অভাব-কষ্টে, আনন্দ-বেদনায়, রোগ-শোকে-পীড়ায় কখনো নিজের কথা চিন্তা করবে না। ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-এ ঢুকতেই আপনার বাক্যের দিকে আকর্ষিত হয়েছি, আমার চিকিৎসা আমার দেশেই যেন হয়। এই যে সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে এসে চিকিৎসা নেওয়ার মনো আকাক্সক্ষা এটি সচরাচর চোখে পড়ে না। আপনার দূরদৃষ্টি দেশবাসীকে মোহিত করেছে। যারা মানুষের সেবক হবেন, যারা দেশের সেবক হবেন; তাদেরকে অবশ্যই সমালোচনার তীর সহ্য করতে হবে; কারণ সেবকরা হয়ে থাকেন নিরহঙ্কার, নিলোর্ভী এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত। সেবক-এর সেবার প্রতিদান স্রষ্টা তাঁর নির্দিষ্ট সময়ই প্রদান করে থাকেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি সেবক হিসেবে যে কাজ করেছেন, তারও কতক চিত্র আমরা পেয়েছি। আপনি বর্ণনায় বলেছেন, ‘…এই নৌকায় ভোট দিয়ে বাংলাদেশের জনগণ মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার অধিকার পেয়েছে। এই নৌকায় ভোট দিয়েছে বলেই দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। নৌকায় ভোট দিয়েছে বলেই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এই নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছিল বলেই বাংলাদেশ উন্নত হয়েছে। আজকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে পেরেছি। এই নৌকায় ভোট দিয়েছে বলেই আমরা পরমাণু বিদ্যুৎ ক্লাবে পৌঁছাতে পেরেছি। নৌকায় ভোট দিয়েছে বলেই দারিদ্র্য হার ২২ ভাগে নামিয়ে এনেছি, দারিদ্র্য আরও কমে আসবে।…’ যারা দেশ থেকে জনগণ থেকে নেওয়ার প্রত্যাশা করেন, সত্যিকার অর্থে তাদের দ্বারা ‘সোনার বাংলা’ রূপায়ন পরিকল্পনা বালির বাধের সমতূল্য। দেশত্যাগ করে পুনরায় ফিরে এসেছেন ‘বাবার স্বপ্ন পূরণ করতেই’ মাতৃভূমিতে। ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে দলের দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন; আওয়ামী লীগের ৭০ বছরের পথচলায় নৌকার হাল শক্ত হাতে ধরেছেন দীর্ঘ ৩৭টি বছরই। শক্ত হাতেই স্বপ্ন ছোঁয়া যায়, বাস্তবে সফল করা যায়।
আওয়াম থেকে আওয়ামী। আওয়ামী শব্দের অর্থ জনগণ, এটির আরো দুটি অর্থ রয়েছেÑ জনতা ও জাতীয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি সরকার প্রধান, দেশের জনগণ আপনার সঙ্গে রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘সোনার বাংলা’ স্বপ্ন দিয়ে গেছেন। লালিত স্বপ্নকে জনগণের হাতে পৌঁছাতে, সুফল ভোগ করতে এবং নিরন্তর চলমান হতে আপনাকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। আপনার সুযোগ্য নেতৃত্বেই আমরা কাক্সিক্ষত স্বপ্নের রাজ্যে পৌঁছাতে পারবো।

[মিথুশিলাক মুরমু : আদিবাসী গবেষক ও লেখক]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here