হযরত পৌলের আর্তনাদ : পাস্টর এ এম চৌধুরী

0
128

হযরত পৌল কীভাবে আর্তনাদ করেছেন আজকের লেখায় সে বিষয়ে আলোকপাত করছি। হযরত পৌল নিজেও বলেছেন যে, তিনি আর্তনাদ করেছেন। তাঁর জীবনে কী আধ্যাত্মিক সমস্যা ছিল এবং এমন কী দুর্বলতা ছিল, যার জন্য তিনি নিজেই দুঃখ পেতেন তা আমরা এই অংশে দেখব। এখানে তাঁর জীবনের ৭ টি সমস্যা নিয়ে আলোকপাত করা হলো যার জন্য তিনি নিজে আর্তনাদ করেছেন। যেমনÑ
১. হযরত পৌল শারিরীকভাবে দুর্বল ছিলেন
অনেকে মনে করেন যে, হযরত পৌল খুব শক্তিশালী ও কর্মঠ ব্যক্তি ছিলেন। এটা সত্য যে, তিনি তা ছিলেন। কিন্তু তিনি অনেক বার দেখিয়েছেন যে, তাঁর শরীর দূর্বল ছিল। কারণ তিনি পূর্বে রোমীয় ৮ : ২৩ আয়াতে বলেছেন যে, দেহের মুক্তির জন্য আমরা অপেক্ষা করছি। তাই প্রথম বিষয় হলো, তিনি শারিরীকভাবে দুর্বল ছিলেন। তিনি বেশি পরিশ্রম করতে পারতেন না, ফলে খুব তাড়াতাড়ি অসুস্থ হয়ে পড়তেন।
নিশ্চয় অধিক পরিশ্রমে আমরাও মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এ ক্ষেত্রে, জীবনে যদি দৈহিকভাবে প্রত্যাশা থাকে যে, আমি এতটুকু পরিশ্রম করব, তবু দেখবেন যে আপনি তা পারছেন না এবং একসময় সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। আমাদের দুর্বল দেহ অনেক সময় দেহের মুক্তির জন্য আর্তনাদ করতে করতে প্রশান্তির অপেক্ষায় থাকে যা বাস্তবিকভাবে সত্য কিন্তু হযরত পৌল রোমীয় ৮ : ২৬ আয়াতে বলেছেন, ‘আমাদের দুর্বলতায় পাক-রূহ আমাদের সাহায্য করেন।’ তিনি এখানে কী ধরনের দুর্বলতার কথা বলতে চাইলেন? প্রথমত দুর্বলতা হলোÑ কীভাবে প্রার্থনা করতে হয় তা আমরা জানি না। আর পাক-রূহ সেরকম দুর্বলতার বিষয়ে আমাদেরকে সাহায্য করেন। দ্বিতীয় দুর্বলতা হলোÑ মোনাজাতে অনেক সময় আমাদের মনোযোগ থাকে না। হযরত পৌলের জীবন কিন্তু অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে গিয়েছিল। লক্ষ্যণীয় যে, অনেক সময় সমস্যায় কি রকম মোনাজাত করা উচিত তা তিনি নিজেই বুঝতেন না। তাছাড়া তাঁর মাংসিক জীবনের বড় দুর্বতা ছিলÑ সন্দেহ। আমাদেরা মাংসিক জীবনেও একই ধরনের সমস্যা আছে। সন্দেহ আমাদের জীবনকে অনেক সময় বিপর্যস্ত পর্যন্ত করে তোলে। সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে তা আমাদের জন্য বয়ে আনে অনাকাক্সিক্ষত নানাবিধ সমস্যা। এই বিষয়ে হযরত পৌল বলেছেন, “যখন তোমাদের নিকটে ছিলাম, তখন আমি নিজেকে দুর্বল মনে করতাম এবং ভয়ে খুবই কাঁপতাম” (১ করিন্থীয় ২ : ৩ আয়াত); ‘মাকিদনিয়া প্রদেশে পৌঁছেও আমাদের দেহ বিশ্রাম পায়নি; সকল দিক হতেই আমরা কষ্ট পেয়েছিÑচারদিকে ছিল গ-গোল আর অন্তরে ছিল ভয়’ ( ২ করিন্থীয় ৭ : ৫ আয়াত)। এটা ছিল হযরত পৌলের আবেগপূর্ণ দুর্বলতা কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি বেহেস্তে এ দুর্বলতা থাকবে না, তবে পৃথিবীতে তা থাকবে।
২. পাপ ত্যাগ করার বিষয়ে দুর্বলতা
‘পাপ-স্বভাব যা চায় তা পাক-রূহের বিরুদ্ধে এবং পাক-রূহ যা চান তা পাপ- স্বভাবের বিরুদ্ধে। পাপ-স্বভাব ও পাক-রূহ একজন অন্যজনের বিরুদ্ধে বলে তোমরা যা করতে চাও তা কর না’ ( গালাতীয় ৫ : ১৭)।
এ আয়াতটি আমাদের একটি আধ্যাত্মিক যুদ্ধ সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, আমরা আমাদের অন্তর দিয়ে যুদ্ধ করছি। এখানে যুদ্ধ ও দ্বন্দ্ব দুটি বিষয়ে বলা হয়েছে। মাংসের বিরুদ্ধে রূহের দ্বন্দ্ব চলছে। অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন যে, এ যুদ্ধ কোথায় চলছেÑবেহেস্তে নাকি দোযখে? এই বিষয়ে উক্ত আয়াতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে, এ যুদ্ধ আপনার আমার অন্তরে চলছে। এখানে দু‘টি বিষয়ে বলা হয়েছে, তা হলোÑ রূহ ও মাংস। এ দুটি-ই আমাদের সাথে বিরাজমান। আর রূহের সাথে মাংসের দ্বন্দ্ব অবিরতই চলছে। আপনি যদি আপন মনে একটু লক্ষ করেন তাহলেই বুঝতে পারবেন যে, আপনার জীবনেও রূহের-স্বভাব এবং পাপের-স্বভাব একে অন্যের বিরুদ্ধে অবিরতই দ্বন্দ্ব করছে। তাইÑআমাদের জীবনের আধ্যাত্মিক সমস্যার কথাবার্তা সব সময় মনে রাখা উচিত। আমরা যে এই পৃথিবীতে আর্তনাদ করছি তা শুধুমাত্র দেহ বা মাংসের দুর্বলতার জন্য নয়, কিস্তু পাপের সাথে রূহের যে যুদ্ধ সেজন্যও আমরা আর্তনাদ করছি।
(১) দুঃখ-কষ্ট বা অত্যাচারের সময় দুর্বলতা
‘এশিয়া প্রদেশে আমরা যে কষ্টে পড়েছিলাম, আমরা চাই, তা যেন তোমরা জানতে পার। সেখানে সহ্যের অতিরিক্ত এমন চাপ আমাদের পড়েছিল যে, বাঁচবার আশা আমরা ছেড়েই দিয়েছিলাম। আমরা ভেবেছিলাম যে, এবার আমরা নিশ্চয়ই মরে যাব’ (২ করিন্থীয় ১ : ৮-৯ আয়াত)।
এখানে হযরত পৌল তাঁর দুঃখ-কষ্ট ভোগের কথা খুবই স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন। বর্ণিত ঘটনার মাধ্যমে তিনি অত্যন্ত দুঃখে যে আর্তনাদ করোছিলেন তা-ই সবাইকে জানাচ্ছেন। আমাদের জীবনেও মাঝে মাঝে সেরকম মুহূর্ত আসে যখন আমরা নির্যাতিত হই বা দুঃখে-কষ্টে থাকি। তখন আমরা অনেক সময় খুবই হতাশ হয়ে পড়ি। খোদার উপর নির্ভরতার কথা পর্যন্ত ভুলে যাই। আমাদের জীবনের জন্য যে তাঁর প্রতিজ্ঞা সে কথা তখন স্মরণ থাকে না। ঐরকম সময়ে আমরা চিন্তা করি, প্রভু কেন আমার জীবনে এত বড় বিপদ আসতে দিলেন। আমরা ভাবি, মনে হয় প্রভু আমাদেরকে ভালোবাসেন না। অনেক সময় আমরা চিন্তা করি যে, হতে পারে আমার কোন পাপের ফলে এ সমস্যা এসেছে। কিন্তু আমরা চিন্তা করতে চাই না, এ সমস্যার মধ্য দিয়ে খোদা আমার জীবনে কি বুঝাতে চান। হযরত পৌলও বিপদের মুহূর্তে অন্তরে আর্তনাদ করেছেন, এই বুঝি মারা যাব। কিন্তু এর পরক্ষণেই তিনি বুঝতে পেরেছেন, যে সমস্যার সম্মুখীন তিনি হয়েছিলেন তা ছিল যেন তিনি আরো বেশি করে খোদার উপর নির্ভর করেন। তাই তিনি বলেছেন, ‘কিন্তু এ অবস্থা আমাদের এজন্য হয়েছিল, যেন আমরা নিজেদের উপর নির্ভর না করে খোদা, যিনি মৃতদের জীবিত করে তোলেন, তাঁর উপর নির্ভর করি। এক ভীষণ মৃত্যুর হাত হতে তিনি আমাদের রক্ষা করেছিলেন এবং এখনও করছেন। আমরা তাঁর উপর এ আশা রাখি যে, তিনি সব সময়েই আমাদের রক্ষা করতে থাকবেন’ (২ করিন্থীয় ১ : ৯-১০আয়াত)।
১) অতীত পাপের বিষয়ে দুর্বলতা
হযরত পৌল ঈসায়ী ঈমানদার হবার পূর্বে যে সমস্ত মন্দতায় জড়িত থেকে পাপপূর্ণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিলেন , তা তিনি ভুলে যেতে পারেননি।
অনেকে আমাদের শিক্ষা দান করেন, যেন আমরা অতীতের সকল পাপ ভুলে যাই এবং তা মনে না রাখি। কিন্তু আমরা জানি, আমাদের দ্বারা অতীতের পাপ সম্পূর্ণভাবে ভুলে যাওয়া সম্ভব হবে না। হযরত পৌলের জীবনে আমরা দেখতে পাই যে, তিনি অনেকবার তাঁর অতীত জীবনের পাপের বিষয়ে স্মরণ করেছেন, যা তিনি ভুলতে পারেননি। তিনি করিন্থীয় জামাতের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘প্রেরিতদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে নীচু, এমনকি প্রেরিত বলে কেহ যে আমাকে ডাকে তার যোগ্যও আমি নই, কারণ খোদার জামাতের উপর আমি অত্যাচার করতাম’ (১ করিন্থীয় ১৫ : ৯ আয়াত)। এখানে তিনি অতীতে যে অন্যায় ও ভুল কাজ করেছিলেন সে সম্পর্কে তাঁর জীবনে যে চেতনা এসেছিল তা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। তাই ইফিষীয় জামাতের উদ্দেশ্যে তিনি যখন উপদেশ দিচ্ছেন, তখন লিখেছেন, ‘খোদার সমস্ত লোকের মধ্যে (পবিত্রগণের মধ্যে) আমার চেয়ে নীচু আর কেহ নেই, তবুও মসীহের যে সম্পদের কথা সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারা যায় না, অ-ইহুদীদের নিকট সে সম্পদের সুখবর জানাবার রহমত খোদা আমাকেই দিয়েছেন’ ( ইফিষীয় ৩ : ৮ আয়াত)।
১ করিন্থীয় খ- লেখার মাত্র কয়েক বছর পর তিনি ইফিষীয় খ- লিখেছিলেন। উপরোক্ত আয়াতের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি যে, এখানে তিনি পূর্বের মতো মনে করেন না যে, তিনি প্রেরিতদের মধ্যে অযোগ্য। প্রথমে তিনি বলেছিলেন যে, তিনি প্রেরিতদের মধ্যে অযোগ্য কিন্তু পরে বলছেন, তিনি পবিত্রগণের মধ্যে নগণ্য। ইফিষীয় খ- লেখার কয়েকবছর পর তিনি ১ তীমথিয় খন্ড লিখেন। এখানে তিনি বলেছের, ‘এ কথা বিশ্বাসযোগ্য এবং সম্পূর্ণভাবে গ্রহণেরও যোগ্য যে, পাপ হতে পাপীদের উদ্ধার করবার জন্যই মসীহ ঈসা দুনিয়াতে এসেছিলেন’ (১ তীমথিয় ১ : ১৫ আয়াত)। এ অংশ দ্বারা তিনি কী বুঝাতে চেয়েছেন তা এর পূর্বের ১৩ আয়াত পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারব। ‘যদিও আমি আগে মসীহের নিন্দা করতাম আর অত্যাচারী ও বদরাগী ছিলাম, তবুও আমাকেই তিনি এ কাজে নিযুক্ত করেছেন। আমার প্রতি তিনি রহম করেছেন, কারণ আমি ঈমান আনিনি বলে আমি না জেনে সেই সমস্ত করতাম’ (১৩ আয়াত)। উল্লেখ্য, গালাতীয় খ-ের দ্বিতীয় রুকুতেও একই বিসয়ে তাঁর উপরোক্ত সাক্ষ্যের বিবরণী লক্ষ্যণীয়।
আমরা দেখতে পাই যে, হযরত পৌল প্রথমে নিজেকে প্রেরিতদের মধ্যে ক্ষুদ্র, এরপর পবিত্রদের মধ্যে নগণ্য এবং পাপীদের মধ্যে অগ্রগণ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি তাঁর অতীত জীবনের অভিজ্ঞতা, মন্দতা ও পাপ সম্পূর্ণভাবে ভুলতে পারেননি। তিনি ম-লীকে তাড়না করেছিলেন, ঈমানদার ভাইদেরকে কষ্ট দিয়েছিলেন এ সমস্ত কথা কখনো ভুলতে পারেননি। আর সে সমস্ত বিষয়ে মনে করে তিনি অন্তরে আর্তনাদ করতেন। তবে তিনি এখনো পাপী আছেন বা খোদার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেননি সে রকম কখনো মনে করেননি। কিন্তু তিনি এভাবে অতীত অযোগ্যতাকে স্মরণ করে নিজেকে খোদার কাছে আরো নীচু ও নম্র করতেন। [চলবে]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here