হৃদয়ে ২৬ শে মার্চ, হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধ : নাহিদ বাবু

0
359

১৯৪৭ সালে দেশভাগের মাধ্যমে ১৪ আগস্ট পাকিস্তান ও ১৫ আগস্ট ভারত নামে দুটি  আলাদা রাষ্ট্র গঠন করা হয়। ১১শ মাইল দূরে থাকার পরেও পূর্ব বাংলার মানুষ ভেবেছিল তারা সুখে-শান্তিতে পশ্চিমাদের অধিনে থাকবে। মুসলিম পরিচয় দিয়ে। তারা ধারণটা পাল্টিয়ে যেতে আর বেশি দেরি হয়নি। প্রথমে তারা দখল করতে চাইল বাঙালিদের হাজার বছরের মায়ের ভাষা বাংলাকে স্বাধীনতার আগে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য  জিয়া উদ্দিন আহম্মেদ বলেছেন, স্বাধীন বাংলার উর্দুু হবে স্বাধীন বাংলার রাষ্ট ভাষা। ভাষাবিদ ডক্টর শহীদুল্লহসহ এদেশের বুদ্ধিজীবীরা এর তীব্র প্রতিবাদ ও বিরোধীতা করেন। পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী,  পূর্ব বাংলার প্রতিনিধি, তিনি আরবি হরফে বাংলা লেখা প্রচলন করেন। ১৯৪৮ এর ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণ পরিষদে বাংলাকে অন্যতম ভাষা হিসাবে দাবি তোলেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি, খাজা নাজিম উদ্দিন, গণপরিষদের সহসভাপতি তমিজ উদ্দিন খান দাবি নাকচ করে দেন।

এ ঘটনার প্রতিবাদ গোটা বাংলা ফুঁসে ওঠে। ১১ মার্চ পূর্ব বাংলায় ১৪৪ দ্বারা জারি করে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের লাটি চার্জ করে। এতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী আন্দোলনকারীদের সাথে ৮ দফার একটা চুক্তিস্বাক্ষর করেন। তিনি বলেন উর্দুর পাশাপাশি বাংলাও রাষ্ট্রভাষার মর্য়াদা পাবে। ১৯৪৮ সালের ২১ ও ২৪ মার্চ জিন্নাহ ও  পাকিস্তানের গর্ভনর জেনারেল আলাদা-আলাদা সভায় বলেন উর্দু একমাত্র উর্দুই হবে  পাকিস্তানের  রাষ্ট্রভাষা। এতে আগুনের মতো ছড়িযে পড়ে ভাষা আন্দোলনকারীরা। এরেই মধ্যে আততায়ীদের হাতে নিহত হন প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি। তার স্থলে ক্ষমতায় পান খাজা নাজির উদ-দৌলা ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি। তিনিও জিন্নাহর মতো বলেন, স্বাধীন বাংলার উর্দুু হবে রাষ্ট ভাষা। এবার ধৈর্যের বাধ ভেঙে যায়। বাঙালিরা ৪ ফেব্রুয়ারি সারা দেশে ধর্মঘট পালন করেন। চলতে থাকে লাগাতার আন্দোলন। ২০ ফেব্রুয়ারি ছিল বাজেট অধিবেশন, একে কেন্দ্র করে সারা দেশে ১৪৪ দ্বারা জারি করা হয়। আন্দোলনকারীরা এই কারফিউ ভাঙার সিন্ধান্ত নেয়। সে মোতাবে আন্দোলনকারীরা ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণপরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বিকাল ঠিক ৩ টা ৩০ মিনিটে পুলিশ হঠাৎ করে গুলি চালায়, সাথে সাথে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সালাম, রফিক, জব্বার, শফিক সহ নাম না জানা অনেক বীর শহীদ। ২২ শে ফেব্রুয়ারি এই আন্দোলন গণ আন্দোলনে রূপ  নেয়। পরবর্তীতে গণপরিষদ বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়।

পরবর্তীতে মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গড়ে উঠে আওয়ামি-মুসলিম লীগ। ১৯৫৪ সালে মাওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক মিলে গঠন করেন যুক্তফ্রন্ট। ১৯৫৮ সালে ফিল্ডমাশাল আইযুব খান  সাময়িক আইন চালুর মাধ্যমে তার ক্ষমতা পাকা করেন। ১৯৬৫ সালে পাক-পাকিস্তান যুদ্ধের  ফলে পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হয়ে যায়। আমাদের  বাচাঁর দাবি নিয়ে, শেখ মজিব ১৯৬৬ সালের ২৩ শে মার্চ ৬ দফা দাবি তোলেন। তখন মুজিব সহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দেওয়া হয়। আসামিদের  জেলে দেওয়া হয়। বিশেষ করে  জহরুল হক, ফজলুক হককে ক্যান্টমেন্ট আটক করে নির্যাতন করা হয় এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুজ্জোহাকে সেনাবাহিনী হত্যা করায় পরিস্থিতি অবনতি হতে থাকে। এরই মধ্যে আইযুব  বিরোধী আন্দোলন সারা বাংলায় সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৯ সালে ২৫ শে মার্চ  বেতারে ভাষণের মধ্যে দিয়ে তিনি বিদায় নেন।

তার পর আসেন সেনা শাসক ইয়াহিয়া খান। তিনি এসে শুরু করেন দমন পীড়ন, নির্যাতন, অবনতি হতে থাকে আইন শৃঙ্খলার, দ্রব্যমূল্য উর্র্ধ্বগতি, কৃষি, বাণিজ্য। ১৯৭০ সালের ১১ নভেম্বরের ভয়াভয় সাইক্লোনে লাখ লাখ মানুষ মৃত্যু হয়। এমন পরিস্থিতিতে পাওয়া যায়নি পশ্চিমাদের কোনো সহযোগিতা । বাঙালি মনে করলেন আর নয় ছদ্মবেশি শত্রুদের সাথে বসবাস। তাদেরই ফলাফল ১৯৭০ এর ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের জাতীয়  নির্বাচনে পূর্ব বাংলার ১৬৯ টি আসনের মধ্যে আওয়ামিলীগ লাভ করে ১৬৭ টি। এভাবে তারা সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করে। ১৯৭১ সালের ২৩ শে জানু জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন শেখ মুজিবুর রহমান ভোটাদের অভিনন্দন ও এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি বিভিন্ন ভারসাম্যের কথা তুলে ধরেন, বেকার সমস্যা সমাধান, ভৃমিহীনদের ভূমিদান, আদিবাসীদের জন্য সমান অধিকারর, সংখ্যালঘুদের আর অত্যাচার হবে না খাদ্য  নিশ্চয়তার দিক তুলে ধরেন। কিন্তু পশ্চিমা জুলফিকার আলি ভূট্টোর ষড়যন্ত কারণে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে তিনি বিলম্ব করেন। পশ্চিমা মনে প্রাণে  চাইতেন ক্ষমতা যেন পূর্ব পাকিস্তানের লোকদের হাতে না আসে। ১৯৭১ সালের ২ শে মার্চ নির্বাচনের ২ মাসের পর জাতীয় অধিবেষণ আহ্ববান করা হলেও কিন্তু সেই অধিবেশন  ভেঙে দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরো ঘোলা হয়।

৭ই মার্চ ১৯৭১  বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান  রের্সকোস ময়দানে লাখ লাখ মানুষের সামনে  শুনিয়ে দিলেন স্বাধীনতার বার্তা। সেই ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বললেন, ‘তোমাদের কাছে যা কিছু আছে তা নিয়ে শএুর বিপক্ষে ঝাড়িয়ে পড়, মনে রাখ রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আর ও দিব ,তবুও এ দেশকে স্বাধীন করে ছাড়ব …ইনশআল্লাহ। কিন্তু পশ্চিমাদের নীল নকশা তো তখন থেমে থাকেনি। তারা চিন্তা করেছিল কীভাবে বাঙালিকে দমিয়ে রাখা যায়, তাদের চিন্তা-ভাবনার ফলস্বরূপ  ২৫ শে মার্চ ভয়াল রাতে ঢাকা শহরের ঘুমন্ত নিরস্ত্র  বাঙালির ওপর ঝাপিয়ে পড়ে, অপারেশন সার্চ লাইট নামে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। ২৫শে মার্চ রাতকে এই জাতি চিহ্নিত করেছে ইতিহাসের সবচেয়ে তমসাচ্ছন্ন রাত হিসেবে। এই রাতে নিরস্ত্র ও নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বন্দী হওয়ার পূর্বে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তাই তো ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা সংগ্রামের  ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় জীবনের বিস্তীর্ণ উপত্যকার অসংখ্য রক্তস্রোতের সৃষ্টি করে, চূড়ান্ত পর্যায়ে তার সম্মিলিত প্রবাহ ১৬ই ডিসেম্বরে সমাজ জীবনের দুকূল ছাপিয়ে একটি নতুন দেশ  সৃষ্টি। ২৬শে মার্চকে তাই এ জাতি স্মরণ করে আত্মশক্তির প্রতীক রূপে। এটিই আমাদের গৌরবময় ইতহাস, ঐতিহ্য। আজকের এই দিনে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি ওই সব কৃতী সন্তানদের , যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, দেশকে ভালোবেসে, জীবনের শেষ রক্তটুকু বিলিয়ে দিয়েছে, তাঁদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই, যাঁদের পূতপবিত্র রক্তে সিক্ত হয়ে আমাদের  স্বাধীনতা। আমাদের স্বার্বভৌমত্ব আর  বাংলাদেশ জন্মলাভ করেছে যেন আমরা পরাধীনতার গ্লানিমুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে পথ চলতে পারি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here