জৈতুন পর্বতে বিশ্বাসঘাতকতা

0
88

প্রভু যীশু যিহুদা কর্তৃক বিশ্বাসঘাতকতার ফল ভোগ করেছিলেন জৈতুন পর্বতে। এমনকি তার নিজস্ব পূর্ব পুরুষ দায়ুদও একই অবস্থার সম্মুখীন হন এই পর্বতে। যদি আপনি জৈতুন পর্বতের স্থানটি নির্ণিয় না করতে পারেন, তা হলো জেরুশালেম মন্দিরের পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত। বেশ কয়েকবার এই গুরুত্বপূর্ণ স্থানের উল্লেখ আছে বাইবেলে [যিহেস্কেল ১১ : ২৩] হয় এই নামে নতুবা অন্য নামে উল্লেখ আছে। এই জৈতুন পর্বত থেকে যীশু স¦র্গে আহরণ করেছেন। আবার তিনি এই পর্বতেই নেমে আসবেন। [সখেরিয় ১৪ : ৪]

রাজা দায়ুদ

জৈতুন পর্বতের প্রথম উল্লেখ দেখতে পাই রাজা দায়ুদের ইসরাইলে রাজত্বকালে। তার ছেলে সোলায়মান নবী ঈ¯্রাইলিওদের হৃদয় চুরি করে ন্যায্যতার নামে রাজা দায়ুদের বিদ্রোহ করেছিলেন [ ২য় সামুয়েল ১৫ : ১-৬]। অতঃপর অবশালোম হেব্রনে নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা করলেন। [২য় সমু ১৫ : ১০] এবং তিনি রাজা দায়ুদের পরামর্শকদের অহিথিপলকে ডেকে পাঠান [২য় সমু ১৫ : ১২], ১ম বংশাবলি ২৭ : ৩৩। যখন দায়ুদ অবশালোমের ওই বিশ্বাসঘাতকতার কথা শুনলেন। তিনি বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। তিনি তার অনুগত রাজ পরিবারের সবাইকে নিয়ে জেরুশালেমের পূর্ব দিকে পালিয়ে গেলেন [২য় সমু; ১৫ : ২৩] দেশের সকলেই তখন উচ্চ স্বরে কেঁদেছিল এবং সকলেই নদী পার হয়ে রাজার সাথে মিলিত হয়েছিল। রাজাও নিজে কিদ্রেন নদী পার হয়ে মিলিত হলেন, পার হয়ে প্রান্তরের দিকে চলে গেলেন।

কিদ্রেন উপত্যকা

কিদ্রেন উপত্যকা থেকে তাকালে জেরুশালেমের পূর্ব দিকের গেট চোখে পড়বে। কিদ্রোন উপত্যকা মরিয়া পর্বতকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। এই মরিয়া পবর্তেই জেরুশালেম নির্মিত হয়েছিল। [২য় সমু ১৫ : ৩০-৩১]
তাই রাজা দায়ুদ যেখান থেকে জৈতুন পর্বত ওপরে উঠেছে সেখান থেকে পূর্ব দিকে চলে গেলেন, তিনি যাচ্ছিলেন আর কাঁদছিলেন। তার মাথা মোড়ানো ছিল কিন্তু পা ছিল খালি। তার সাথিরাও একইভাবে চলছিলেন। তখন কেউ একজন রাজা দায়ুদকে বললেন, ‘‘অবশালোমের সাথে একজন ষড়যন্ত্রকারী হচ্ছেন অহিথিপল” রাজা দায়ুদ বললেন, ‘‘হে প্রভু আমি প্রার্থনা করি তুমি অহিথিপেলের সমস্ত পরার্মশ মূর্খতায় পরিণত কর ”
শুধু মাত্র দায়ুদের ছেলে তার বিপক্ষে যাননি তার পরামর্শদাতা অহিথিপোলও গিয়েছিলেন। অহিথিপেলের পরামর্শটা সেসময় এমন ছিল যে মানুষকে তিনি বুঝিয়েছেন তার পরার্মশ এসেেছ ঈশ্বর থেকে তাই অহিথিপলের সমস্ত পরামর্শ দায়ুদ ও ঈশ^রের পক্ষ থেকে বলে ধরে নিয়েছিলেন।
দায়ুদ সম্ভবত অহিথিপোলের বিশ্বাসঘাতকতা ব্যথা দূর হয়ে গেলে গীতসংহিতা ৫৫ : ৯ লিখেছিলেন। বিশেষ করে অহিথিপলের বিষয়ে শোনার পর তিনি যা বলেছিলেন [দ্বি; সমুয়েল ১৫ : ৩১]
গীত ৫৫ : ৯, দায়ুদ বলেছিলেন প্রভু উহাদিগকে ধ্বংস কর ওদের জিহ্বা সমূহ বিভাগ করে। কেননা আমি শহরে মাত্র ধ্বংস ও দুর্দশা দেখেছি।
এটা আমাদের শত্রুদের কাছ থেকে আসেনি, হলে তা সহ্য করতে পারতাম। এটা এসেছে এমন এক লোকের কাছ থেকে যে আমার সাক্ষাতে ঘৃণ্য কাজ করে ও নিজেকে আমার সাক্ষাতে উচ্চীকিত করে। তাহলে আমি নিজেকে তার কাছ থেকে লুকাতে পারতাম। কিন্তু সে লোক আমার সমকক্ষ ও আমার পরিচিত বন্ধু, আমরা একই সাথে সুমধুর উপদেশ গ্রহণ করতাম এবং কাঁটা যুক্ত পথে আমরা হেঁটে ঈশ্বরের গ্রহে প্রবেশ করতাম। [গীত ৫৫ : ১২-১৪]
আমার প্রিয়তম বন্ধু আমার সঙ্গে খেয়েছে। আমিও ওকে বিশ্বাস করতাম। কিন্তু এখন সেও আমার বিরুদ্ধে গিয়েছে। [গীত ৪১ : ৯]
দায়ুদ অহিথিপলের সাথে রুটি বিভাগ করে খেয়েছেন, যেমনি যীশু ও ইস্কোরতীয় যিহুদার সঙ্গে খেয়েছেন। তাঁরা যখন খাচ্ছেন সেই সময় যীশু বললেন, ‘আমি তোমাদের সত্যি বলছি, তোমাদের মধ্যে একজন আমাকে শত্রুর হাতে তুলে দেবে।’ এতে শিষ্যরা খুবই দুঃখ পেয়ে এক একজন করে যীশুকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, ‘প্রভু, সে কি আমি?’ তখন যীশু বললেন, ‘যে আমার সঙ্গে বাটিতে হাত ডোবালো, সেই আমাকে শত্রুর হাতে সঁপে দেবে। মানবপুত্রের বিষয়ে শাস্ত্রে যেমন লেখা আছে, সেইভাবেই তাঁকে যেতে হবে। কিন্তু ধিক্ সেই লোক, যে মানবপুত্রকে ধরিয়ে দেবে। সেই লোকের জন্ম না হওযাই তার পক্ষে ভালো ছিল। যে যীশুকে শত্রুর হাতে ধরিয়ে দিতে যাচ্ছিল, সেই যিহূদা বলল, ‘গুরু সে নিশ্চয়ই আমি নই?’ যীশু তাকে বললেন, ‘তুমি নিজেই তো একথা বলছ।’ [মথি ২৬ : ২১-২৫]
এই কথা বলার পর যীশু খুবই উদ্বিগ্ন হলেন, আর খোলাখুলিই বললেন, ‘আমি তোমাদের সত্যি বলছি, তোমাদের মধ্যে একজন আমাকে ধরিয়ে দেবে।’ শিষ্যরা পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগলেন, আদৌ বুঝতে পারলেন না কার বিষয়ে তিনি বলছেন। যীশুর শিষ্যদের মধ্যে একজন ছিলেন যাকে যীশু খুবই ভালবাসতেন, তিনি যীশুর গায়ের ওপর হেলান দিয়ে ছিলেন। শিমোন পিতর এই শিষ্যকে ইশারা করলেন এবং যীশুকে জিজ্ঞেস করতে বললেন যে উনি কার সম্পর্কে বলছেন। তখন তিনি যীশুর বুকের ওপর ঝুঁকে পড়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রভু, সে কে?’ যীশু বললেন, ‘আমি রুটির টুকরোটি বাটিতে ডুবিয়ে যাকে দেব সে-ই সেই লোক।’ এরপর তিনি রুটির টুকরো ডুবিয়ে শিমোন ইস্কোরয়োতের ছেলে যিহূদাকে দিলেন। যিহূদা রুটির টুকরোটি নেওযার পর শয়তান তার মধ্যে প্রবেশ করল। এরপর যীশু তাকে বললেন, ‘তুমি যা করতে যাচ্ছ তা তাড়াতাড়ি করো যাও।’ কিন্তু যাঁরা তাঁর সঙ্গে খাবার টেবিলে খেতে বসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেউই বুঝতে পারলেন না তিনি কেন তাকে একথা বললেন। কেউ কেউ মনে করলেন, যিহূদার কাছে টাকার থলি আছে, তাই হয়তো যীশু তাকে বললেন, পর্বের জন্য যা যা প্রযোজন তা কিনে আনতে যাও; অথবা হয়তো গরীবদের ওর থেকে কিছু দান করতে বলছেন। যিহূদা রুটির টুকরোটি গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গে বাইরে চলে গেল। তখন রাত হয়ে গেছে। [যোহন ১৩ : ২১-৩০] যীশু যিহুদা যেভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন, তিনি পূর্ব থেকে তা জানতেন। জীবনে সত্য বহন করেছিলেন, কেননা এসব ঘটনার তিনি মানস চক্ষে দেখেছেন।

জৈতুন পর্বতে দুঃখ ভোগ
এই প্রার্থনার পর যীশু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে কিদ্রোন উপত্যকার ওপারে চলে গেলেন। সেখানে একটি বাগান ছিল। যীশু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে সেই বাগানের মধ্যে ঢুকলেন। যীশু তাঁর শিষ্যদের নিয়ে প্রায়ই সেখানে আসতেন। এইজন্য যিহূদা সেই স্থানটি জানত। এই যিহূদা যীশুর সঙ্গে প্রতারণা করেছিল। [যোহন ১৮ : ১-২] গেৎসিমানি বাগানটা ছিল জৈতুন পর্বতের পাদদেশে, ছবিতে অনেট চার্চকে স্পষ্ট দেখাযায় যা জেরুশালেমের বাইরে থেকে তোলা এবং চারিদিকে জীৎ বৃক্ষর মেলা।
লূক ও মথির বিবরণে এ বিষয়ে বিষাদভাবে লেখা হয়েছে। তাই আমি উভয় পুস্তক থেকেই উল্লেখ করছি।
এরপর তিনি তাঁর নিয়ম অনুসারে জৈতুন পর্বতমালায় চলে গেলেন। শিষ্যরা তাঁর পেছন পেছনে চললেন। সেই জায়গায় পৌঁছে তিনি তাঁদের বললেন, ‘প্রার্থনা কর যেন তোমরা প্রলোভনে না পড়।’ পরে তিনি শিষ্যদের থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনা করতে লাগলেন। তিনি বললেন, পিতা যদি তোমার ইচ্ছা হয় তবে এই পানপাত্র আমার কাছ থেকে সরিয়ে নাও। হ্যাঁ, তবুও আমার ইচ্ছা নয়, তোমার ইচ্ছাই পূর্ণ হোক!’ এরপর স্বর্গ থেকে একজন স্বর্গদূত এসে তাঁকে শক্তি জোগালেন। নিদারুণ মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে যীশু আরও আকুলভাবে প্রার্থনা করতে লাগলেন। সেই সময় তাঁর গা দিয়ে রক্তের বড়ো বড়ো ফোঁটার মতো ঘাম ঝরে পড়ছিল। প্রার্থনা থেকে উঠে তিনি শিষ্যদের কাছে এসে দেখলেন, মনের দুঃখে অবসন্ন হয়ে তারা সকলে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তিনি তাঁদের বললেন, ‘তোমরা ঘুমাচ্ছ কেন? ওঠ, প্রার্থনা কর যেন প্রলোভনে না পড়।’ [ লুক ২২ : ৩৯-৪৬]
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here