ছারপোকা :নাহিদ বাবু

0
68

এক পল্লী গ্রামের ছেলে রাসেল। যে গ্রামে ছিল না আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া। বিদ্যৎ ব্যবস্থা ছিল না, রাস্তাঘাটগুলো ছিল কাঁচা। ছিল না কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা বিনোদনের ব্যবস্থা। ফুটবল বিশ্বকাপ খেলা দেখার জন্য গ্রামের মানুষকে যেতে হত পাঁচ কিলোমিটার দূরের শহরে। তারপরেও গ্রামে আনন্দ-উল্লাসে ভরপুর ছিল। সবার মনে যেন রং লেগে থাকত। এমন পরিবেশেই রাসেলের বেড়ে উঠা। রাসেল ছিল বাবা-মায়ের আদরের বড়ো সন্তান। পরিবারে অভাব-অনাটন থাকলেও আনন্দের অভাব ছিল না। রাসেল দেখতে যতটা সুন্দর ছিল, ততটাই ছিল চঞ্চল ও মেধাবী। মাত্র সাড়ে তিন বছর বয়সেই গ্রামের স্কুলে যাওয়া শুরু করে। অত্যন্ত মেধাবী ছিল বলে খুব সহজে স্যারদের নজরে যায়। গ্রামের মানুষের ভালোবাসার একটি নাম রাসেল। কারও কোনো প্রয়োজন হলে সবার আগে রাসেলকে ডাকত। অন্যের উপকারে রাসেলের কোনো জুড়ি নেই। বছর শেষে সবাই খোঁজ নিত। রাসেলের রেজাল্ট কী? এবার কত রোল করেছে? তার পজিশন ঠিক আছে তো? সবার বিশ্বাস রাসেলের ছাড়া অন্য কারো রোল এক হতে পারে না। কিন্তু একবার ঘটে অঘটন। বার্ষিক পরীক্ষার সময় রাসেল খুবই অসুস্থ হয়। এমন অবস্থায় তাকে পরীক্ষা দিতে হয়। অসুস্থ থাকার কারণে পরীক্ষা ভালো দিতে পারেনি। যথারীতি পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণা করা করা হলো। কিন্তু রাসেলের রোল এবার পিছিয়ে এক থেকে হলো তিন। সবাই খেপে গেল, ভাবলো রাসেলকে কৌশলে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপর রেজাল্ট চ্যালেঞ্জ করার সময়। সবাই খাতা দেখার পর চুপ মেরে বিদায় নেয় স্কুল থেকে। সবার ভালোবাসা ও পরোপকার করে, একটু একটু করে বুকে অনেকগুলো স্বপ্ন নিয়ে রাসেলের বড়ো হওয়া। গ্রামের স্কুল পেরিয়ে শহরের স্কুল, কলেজে পড়ে। রাসেলের স্বপ্ন সে বড়ো হয়ে একজন মস্ত বড়ো অফিসার হবে। যেখান থেকে গরীর অসহায় লোকদের সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারবে। এদিকে স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য রাসেল তীব্র প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, অন্য দিকে অভাব অনটনের কারণে তার লেখা পড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম। তার বাবা গ্রামের একজন সাধারণ কৃষক আর মা গৃহিণী।
কৃষির যে অবস্থা, তার ওপর বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ-খরায় ফসলি জমি পুড়ে ছারখার, বন্যায় সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া। কৃষকদের পক্ষে দাঁড় হওয়ার তো কোনো সুযোগই নেই, তার ওপর চাষাবাদ চলে সনাতন পদ্ধতিতে। এছাড়া তাদের একটা গরুর খামার আছে। তার পরেও যেন পরিবারে অভাব লেগেই থাকত। রাসেল ছাড়াও তার ছোট ভাইবোনেরা লেখা পড়া করত।
রাসেল উপলব্ধি করল লেখা পড়া বাঁচাতে হলে তাকে কিছু করতে হবে। পরিবারকে সাহায্য না করতে পারলেও নিজের খরচটা তাকে মেটাতে হবে। তার নিজের জন্য না হলেও পরিবারে প্রতি তার কর্তব্য থেকে কিছু করা দরকার। বাবাকে একটু হলেও সাহায্য করতে হবে। না হলে পরিবারের পক্ষে তার লেখা-পড়ার খরচ যোগাড় করা সম্ভব না। রাসেলের মুখের সেই মিষ্টি হাসিটা কোথায় যেন হারিয়ে যেতে লাগল, যখন তার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলো। সবাই তাকে বোঝাল এবার অনেক হয়েছে একটু পরিবারের দিকে মনোযোগ দে। বড়ো ছেলে বলে কথা। ছোট ভাইদের দিকে একটু মনোযোগ দে। ছেলের এমন অবস্থা দেখে রাসেলের মা অনেক কষ্ট পেল। রাসেলকে বারবার তার মা জিজ্ঞাস করে, বাবা তোর কী হয়েছে? মানসিকভাবে রাসেল ভেঙে পড়ে এটা ভেবে যে, দারিদ্রতার কাছে সে হেরে যাচ্ছে। রাসেল অনেকটা ভাবগম্ভীর্যতা নিয়ে তার মাকে বলে, সে লেখা-পড়া চালিয়ে যেতে চায়। তার মা তাকে বুঝায় বাবা লেখা-পড়া করে কি হবে? আমাদের তো অনেক টাকা নেই, আমরা তো আর টাকা দিয়ে তোকে চাকুরি নিয়ে দিতে পারব না। তার চেয়ে বরং তুই তোর বাবাকে সাহায্য কর। না হলে ব্যবসা-বাণিজ্য কিছু একটা কর। আমরা তোকে কিছু টাকা ম্যানেজ করে দিই। রাসেলের কথা যেন কেউ বুঝতে চায় না। রাসেল তার জেঠাতো ভাইকে বলে, ভাই আমি লেখাপড়া করতে চাই! আমি অনার্স-মাস্টার্স পড়তে চাই চাকুরি করার জন্য নয় জ্ঞানার্জনের জন্য পড়তে চাই। তার ভাইটি ছিল শিক্ষিত। তাকে বলে রাসেলের কাজ হয়। সে তার মা বাবাকে বোঝাতে সক্ষম হয়। ইতিমধ্যে রাসেলের এইচএসসি রেজাল্ট বের হয়। অনেক ভালো ফলাফল করে। তার ইচ্ছা এখন পাবলিক ভার্সিটিতে পড়বে। সেভাবে প্রস্তুত হতে থাকে। কয়েকটি পাবলিক ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দেয়। কিন্তু অনেক ভাল ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার পরেরও তার সুযোগ হলো না। মনে হয় ভাগ্য তার সঙ্গে নেই। না হলে কেন এমন হচ্ছে তার সঙ্গে। তার পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যাল পড়ার জন্য আবেদন করে। তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হলেও ভর্তি পরীক্ষা দিতে হত। যথারীতি ভর্তি পরীক্ষা দিল। কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়া। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে জেলা পর্য়ায়ে একটি ভাল সরকারি কলেজে তার চান্স হয়।
অনার্সে সে একটা ভালো সাবজেক্ট পেয়ে যায়, কিন্তু তার পরেও সে সন্তুষ্ট নয়, কারণ তার ইচ্ছা ছিল কোনো পাবলিক ভার্সিটিতে পড়বে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তা সম্ভব হয়নি। এ দিকে একটু একটু করে সময় চলে যায়, তারপর আসে তার প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা, কিন্তু কোনোরকম প্রস্তুতি ছাড়া পরীক্ষা দেওয়ার ফলে, অনার্স প্রথম বর্ষে কাক্সিক্ষত ফলা-ফল অর্জন করতে পারেনি। এতে একটু হলেও সে বিরক্তবোধ করে নিজের ওপর।
এভাবে চলতে থাকে রাসেলের জীবন সংগ্রাম, জীবনের পথ চলা। এরই মধ্যে একটা নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটে তার জীবনে। সে একটা মেয়ের প্রেমে পড়ে যায়। অথচ এই রাসেলই মনে করত যাদের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই তারাই তো প্রেম করবে। রাসেল বলত ভাই আমার অনেক কাজ আছে, প্রেম করার মতো সময় নেই। কিন্তু সেই রাসেলই প্রেমে পড়ে যায়।
মেয়েটার নাম সুমনা। সুমনা ও রাসেলের পরিচয় একটি অনুষ্ঠানে। প্রথম দেখায়, সুমনার নজর রাসেল কাড়লেও, সুমনা রাসেলের নজর কাড়তে পারেনি। ফেসবুকের মাধ্যমে তাদের সম্পর্ক গড়ায়। প্রথমে তারা বন্ধু হিসাবে কথা বললেও শেষ পর্যন্ত একটা সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। সুমনার সাথে রাসেলের পরিচয় যখন রাসেল অনার্স ১ম বর্ষ। তাদের মধ্যে পরিচয়, ফোনে কথা এবং একসময় ভাব। ভাব থেকে ভালোবাসার সৃষ্টি। সুমনা অনেক মেধাবী, অনেক সুন্দর, আলালের ঘরের দুলালি। সুমনা ও রাসেলের সম্পর্কের কথা তাদের পরিবার-পরিজন জানত। সবাই বলত রাসেল লেখা পড়া শেষ হলে তাদের সম্পর্কের ইতি ঘটবে। তাদের সম্পর্কটা এতটাই মধুর ছিল যে একজন অন্য জনের সঙ্গে একটু কথা না বলে থাকতে পারত না। যদিও বা রাসেলকে অনেক ব্যস্ত থাকতে হয়। নিজের লেখা-পড়া, টিউশনি, পরিবার নিয়ে। এভাবে ভালোই চলতেছিল সুমনা ও রাসেলের সম্পর্ক। তারা দুজন ভাবলো, অনেক হয়েছে দুজন তো একটু দেখা সাক্ষাত করতে পারি? সেই চিন্তা থেকে তারা দুজন বেছে নিল ফেব্রয়ারি মাসের ১১ তারিখকে।
সেই দিনটির জন্য সুমনা কতটা প্রস্তুতি নিয়েছিল আমার জানা নেই! কিন্তু রাসেল অনেক বেশি অগ্রহের সঙ্গে এসেছিল দূর থেকে দেখা করার জন্য। আসার পর তার একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়। দেখা করতে এসেও সুমনা প্রথমে দেখা না দিয়ে, দূর থেকে সুমনা রাসেলকে আগে দেখে। সেই দেখাতে সুমনার আর একবার ভালো লাগে। ভালো লাগার কারণে হয়ত বা সে দিন, সুমনা রাসেলের সাথে দেখা করেছিল। না হলে হয়ত বা অন্য কিছু ঘটত! অনেক কিছু বুঝে শুনে রাসেল নীরবে সুমনার সঙ্গে সময়গুলো হেসে হেসে কথা বলে কাটিয়ে দেয়। রাসেল মনে মনে ভাবে, চলে যেতে পারলেই হয়। আর কোনোদিন সুমনার সাথে যোগাযোগ করবে না।
কিন্তু উল্টা ঘটে। সুমনা আর ছাড়বে না, যতই রাসেল ছাড়তে চায় না কেন! রাসেলকে সুমনার অনেক ভালো লেগেছে, সে তো আর তাকে ছাড়বে না। সেদিনের সব ঘটনার জন্য সুমনা রাসেলের কাছে ক্ষমা চায়। রাসেল সুমনাকে ক্ষমা করে দেয়। এদিকে রাসেলের ফাইনাল পরীক্ষা চলে আসে। এদিকে সুমনার এইচএসসি পরীক্ষা চলে আসে। সুমনা চায় রাসেলের পরীক্ষার পর তাকে বিবাহ করবে। রাসেল সুমনাকে বোঝানের চেষ্টা করে। ফাইনাল পরীক্ষা শেষ না কারে, তার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব না। সুমনা এদিকে রাসেলকে বিবাহের জন্য চাপ দেয়। হঠাৎ একদিন রাসেল জানতে পারল সুমন রাসেল ছাড়াও আর একটি ছেলের সাথে কথা বলে। ছেলেটির নাম হিমু। রাসেল তো পুরো অবাক। সে ভাবতে লাগল, এ হতে পারে না। এটা কখনই সম্ভব না? তারপর রাসেল সুমনার সাথে একেবারে যোগাযোগ বন্ধু করে দেয়। সুমনার ফোন রিসিভ করে না। রাসেল শুধু একটাই কথা বলেছে, সুমনা পারলি আমার সাথে এমন করতে। সুমনা প্রতি উত্তরে আবেগভরা কণ্ঠে বলে, ‘সে শুধু আমার বন্ধু’। একজন অপরিচিত অচেনা ছেলে তার নাকি বন্ধু। আবার তার মুখে হিমুর প্রসংসা শুনে রাসেল তো অবাক। ইতিমধ্যে রাসেল হিমুর সাথে ফোনে কথা বলে নিশ্চিত হয় হিমু হচ্ছে তার আর একজন বয়ফ্রেন্ড। এমন অবস্থায় সবকিছু চিন্তা করে রাসেল তার ভালোবাসাকে বিসর্জন দেওয়ার চিন্তা করে। সে সিন্ধান্ত নেয় সে নিজকে সুমনার কাছ থেকে অনেক দূরে সরে যাবে। সুমনার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এদিকে এমন অবস্থা দেখে সুমনার ভুল ভাঙে, রাসেলের সাথে কোনো যোগাযোগ না করতে পেরে, কোনো উপায় না পেয়ে, রাসেলদের বাসায় চলে আসে হঠাৎ করে। পূর্ব থেকে দুই পরিবারের মধ্যে একটু সম্পর্ক ছিল, রাসেলের মা সুমনাকে দেখে একটু অবাক হয়ে বলে, মা তুমি যে হঠাৎ করে। তাও আবার এত রাতে? কী হয়েছে তোমার? কোনো সমস্যা হয়েছে? সুমনা কোনো উত্তর না দিয়ে রাসেলের মা-বাবাকে বলে, সে রাসেলকে বিয়ে করবে। কিন্তু রাসেল তো কোনোভাবে সুমনা বিশ্বাস করতে পারছিল না। একটু দূরে রাসেলের হাত টেনে নিয়ে যায় জোর করে সুমনা অনেক কান্না করা আর কথা দেয় সে আর কোনোদিন হিমুর সাথে কথা বলবে না। কোনো যোগাযোগ করবে না। রাসেলের একটু মায়া হয়। সুমনার এমন অবস্থা দেখে। কিন্তু সুমনার সাথে ঘটে যাওয়া কোনো কিছু রাসেল তার পরিবারকে জানাল না। উভয় পরিবার সিন্ধান্ত নিল, রাসেলের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলে। কিছু একটা হবে।
এদিকে পাড়া-প্রতিবেশীরা রাসেলকে সব সময় বলত, কি রে! রাসেল পরীক্ষা শেষ হল। চাকুরি-বাকরি কিছু একটা কি হবে?
ফাইনাল পরীক্ষার কিছু সময় পূর্বে একটু ভালো রেজাল্ট করার জন্য, রাসেল সব কিছু থেকে নিজকে বিরত রাখেল, প্রাইভেট-টিউশনি করা বাদ দেয় এমনকি সুমনাকেও বেশি সময় দেয় না। সুমনাকে সে বুঝাতে চাইল আর তো কয়েকটা দিন পর আমরা তো এক হচ্ছি। তোমারও তো সামনে ভর্তি পরীক্ষা আর আমার ফাইনাল পরীক্ষা তাই সব কিছু বাদ দিয়ে আস আমরা লেখা-পড়াই মন দেই। এদিকে রাসেল পরীক্ষা দেয়। একটা ভালো ফলাফল পায়। তার সিজিপিএ অনেক ভালো হয়। সুমনাও একটা পাবলিক ভার্সিটিতে চান্স পায়। তখন পর্যন্ত সব কিছু রাসেলের অনুকূলে ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে, সবকিছু এলোমেলে হয়ে যায়। ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার কারণে সুমনার স্বপ্নও বাড়তে থাকে। আর রাসেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সে একেবারেই রাসেলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে। রাসেল কিছু বুঝে উঠার আগে, তার সাজানো বাগানে এক হুতুম পেঁচা বাসা বাঁদে। সুমনাকে হারানোর ব্যথা, অন্যদিকে সদ্য স্নাতক পাস করা এক বেকার। সব মিলে রাসেল আর স্বাভাবিক জীবনে থাকতে পারে না। তার পরেও সে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে। রাসেলের মনে একটা কথা বারবার মনে পড়তে থাকে। সুমনা তাকে বলেছিল, রাসেল তুমি আমাকে অনেক ভালোবাস তাই না? দেখিও একদিন আমি তোমাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাব। অনেক কথার মধ্যে হয়ত বা সুমনা একটা সত্য কথা বলেছিল।
নাহিদ বাবু : তরুণ লেখক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here