জেন দর্শন হলো মানব চেতনার ইতিহাসে এক অনন্য বিষয় ওশো ভাষান্তর : অজিত দাশ

0
69

জেন কোনো দর্শন নয়। জেনকে কোনো দর্শন বলে ধরে নিলে শুরুতেই ভুল হবে। দর্শন হলো এমন কিছু যা মনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। জেন হলো এমন কিছু যা মনের উর্ধ্বে। জেন হলো মনকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রক্রিয়া। তুমি শুধু মনের দ্বারা তা বুঝতে পারবে না। মন তাতে ক্রিয়া করবে না।
একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে জেন হলো মনহীন। এটা কোনো বেদান্ত দর্শন নয়। বেদান্ত দর্শন তুমি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারবে। জেন বৌদ্ধ মতবাদও নয়। বৌদ্ধ মতবাদও একটি দর্শন।
জেন হলো একটি বিরল প্রস্ফুটন চেতনার ইতিহাসে এটি একটি অদ্ভুৎ বিষয়। জেন হলো বুদ্ধ এবং লাও জু’র সন্মিলিত অভিজ্ঞতা। যেহেতু বুদ্ধ ভারতীয় ইতিহাসেরই একটি অংশ এবং তাঁর যোগাযোগের ভাষাও ছিল দর্শন সেহেতু তাঁকে বুঝতে পারা সহজ। এবং তুমি যদি সব অধিবিদ্যা সম্পর্কিত প্রশ্নগুলোকে গুরুত্ব না দাও তবুও তাঁকে বুঝতে পারা সহজ এবং যৌক্তিক। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতাগুলো মনের সাথে সম্পৃক্ত নয়। তিনি একটি ঋণাত্মক দর্শনের মাধ্যমে তোমার ভিতরের দর্শনকে অপসারিত করতে চেষ্টা করছেন। একবার যদি একটি কাঁটা দিয়ে আরেকটি কাঁটা তোলা হয় তারপর দুটো কাঁটাই অপ্রয়োজনীয়।
বুদ্ধের মতবাদ চীনে গিয়ে আরো সমৃদ্ধ এবং সুন্দর হয়ে গিয়েছে। একটি নতুন রূপ নিয়েছে। সেখানে লাও জু তাঁর ‘টাও’ অভিজ্ঞতাকে একেবারেই একটি অদ্ভুৎ উপায়ে প্রকাশ করেছেন। যখনি বুদ্ধসাধকরা ‘টাও’সাধকদের সাথে দেখা করেছেন তারা একে অপরকে মন দিয়ে নয় হৃদয় দিয়ে বুঝতে পেরেছেন। ধীরে ধীরে টাও এবং বুদ্ধ সাধকদের একত্রে মিলে থাকার কারণে একটি ভিন্ন বিষয়ের সৃষ্টি হয়েছে আর সেটি হলো জেন। জেন হলো বুদ্ধ এবং লাও জু’র মিলিত ফসল। মিলিত সৌন্দর্য। এরকম মেলবন্ধন পূর্বে কখনো আর হয়নি ইতিহাসে।
জেন না বুদ্ধবাদী, না লাও জুবাদী। ঐতিহ্যবাহী বুদ্ধ ভিক্ষু এবং লাও জু সাধকরা জেনকে বাতিল করে দিয়েছে। তাদের উভয়ের জন্য জেন’কে মনে হয়েছে অদ্ভুৎ। কিন্তু যাদের প্রকৃতপক্ষে সমাধি নিয়ে আগ্রহ আছে তাদের জন্য জেন একটি অভিজ্ঞতা।
জেন শব্দটি এসেছে ‘ধ্যান’ শব্দ থেকে। বুদ্ধ সেই সময়ে পালি ভাষায় ধ্যানকে উচ্চারণ করতেন ‘ঝেন’ আর সেখান থেকে জেন শব্দটির সৃষ্টি। সংস্কৃত ধ্যান থেকে ঝেন। তারপর ঝেন থেকে জেন।
জেন বুঝতে হলে অবশ্যই তোমার মধ্যে দর্শনকে বোঝার একটি প্রচেষ্টা থাকতে হবে। তোমাকে গভীর সমাধিতে প্রবেশ করতে হবে। আর সমাধি তাহলে কী? সমাধি হলো মন থেকে মনহীন অবস্থানে পৌঁছানো। আর মনহীন অবস্থা হলো বিশুদ্ধ সচেতনতা। কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা নয় বরং সচেতনতার মাধ্যমে অভিজ্ঞতার আলোকেই জেনকে বুঝতে হবে।
যে মুহূর্তে তুমি মনের উর্ধ্বে প্রবেশ করবে দেখবে হঠাৎ করেই তুমি অনেক হতে এক হয়ে গেছ। মন হলো হাজারো প্রতিফলনের সমষ্টি কিন্তু সচেতনতা একটাই। আর সেই একতাই হলো ঈশ্বর। পরম সত্য। নির্বাণ।
জেন এটাই বলছে মনহীনতা। তুুমি যদি সেটিকে ঈশ্বর বল তাহলে মানুষ নানা রকমভাবে সেটির কল্পনা এবং আকৃতি করতে তৈরি করতে থাকবে। তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে সে সেটিকে নির্মাণ করার চেষ্টা করবে যা সত্য থেকে অনেক দূরে সরে যাবে।
বাইবেল বলছে ঈশ্বর মানুষকে তাঁর নিজের মতো করে তৈরি করেছে। এটা সত্য নয়। বরং মানুষ তাঁর নিজের মত করে ঈশ্বরকে তৈরি করে নিয়েছে। এটা অনেক বেশি সত্য। ঈশ্বরের ধারণা মানবকেন্দ্রিক।
জেন মানবকেন্দ্রিক সকল পরিভাষাকে পরিত্যাগ করেছে। জেন ঈশ্বর কিংবা ব্রহ্ম এরকম কোনো শব্দ ব্যবহার করে না। যদিও এটা সর্বোৎকৃষ্ট দার্শনিক পরিভাষা শেষমেষ এটা তো দর্শনই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here