তুমি এসেছিলে তবু আস নাই : ড. এলগিন সাহা

0
131

‘যে ফুল না ফুটিতে হল ধরণী হারা। জানি জানি হে প্রভু তা হয়নি হারা’-রবিনের জীবনে ঘটনাটি ঘটেছিল ঠিক এমন। জীবনে প্রথম ভালোলাগা মেয়েটিকে সে তার ভালোবাসার কথাটি বলতে পারেনি। কবি কাজী নজরুল ইসলালের ‘বোবা কান্না’র মতো সেই ক্রন্দন আজও স্মৃতিতে অম্লান হয়ে রক্ষিত হয়ে চলছে। প্রথম ভালোলাগার বিষয়টি সে প্রকাশ করতে পারেনি ঠিকই কিন্তু দ্বিতীয় সুযোগটি হাতছাড়া করতে চায়নি। দ্বিতীয় সুয়োগটি এসেছিল বেশ হঠাৎ করে।
মেট্রিক পরীক্ষার পর রবিনকে নিয়ে তার মা, তার মাসি বাসা বেড়াতে গিয়েছিল ফরিদপুরের রাজবাড়িতে। মাসি বাড়ির পাসের বাসাটি ছিল বাঁশরিদের। বাঁশরির বাবা স্থানীয় গার্লস হাই স্কুলের হেড পণ্ডিত ছিলেন। পাশাপাশি বাসা হওয়ার ফলে, বাঁশরি ও তার মা প্রায় আসত, আমরাও যেতাম, অনেক অলস দুপুর আমি কাটিয়েছি বাগানের দোলনায় দোল খেয়ে। গরমের তীব্রতায় দোলনায় দুলে বাতাস খাওয়া ফাঁকে বাঁশরির সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার সুযোগ মিলে য়ায়। বাঁশরি তখন ক্লাস এইটে পড়ে। ওর ডাক নাম বাঁশি। সবাই ওকে বাঁশি বলে ডাকে। নামটা ওর যথার্থ ছিল। যেমন বাঁশির মতো টিকালো নাক। বাঁশির মতো সুকণ্ঠ ছিল তার। বাঁশি তার মা-বাবার শেষ প্রান্তের ফল। বড় বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে ভারতে। দুটো ভাই পড়াশোনা করে কলকাতায় ওখানে ওদের নিজস¦ বাড়ি আছে। বাঁশিদেরও চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওর বাবা পুরো পেনশনটা নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তাই আর যাওয়া হয়নি। তাই বছরের ওরা দুবার কলকাতায় ছুটি কাটিয়ে আসত। দুর্গাপূজা ও বড়দিনের ছুটি বাঁশিরা কলকাতায় কাটাত। সেদিক থেকে বাঁশি মফস্বলে বেড়ে উঠলেও অনেক সপ্রতিভ ছিল। আচার খাওয়া বাঁশির অভ্যাস ছিল। আচার খেতে খেতে বাঁশির সাথে গল্প হত। বলত একটু খাবেন। আচার আমারও বেশ প্রিয় ছিল। তার পর সুন্দরি কিশোরির আমার মতো উড়তি যুবক কীভাবে এড়িয়ে যাবে। ঢাকার ভালো স্কুলে আমি লেখা পড়া করতাম। এ কথাটি মাসি বেশ উৎসাহের সাথে উচ্চারণ করেছেন। তার ফলে হয়ত আমার মনে হয়েছিল। আমার সম্পর্কে হয়ত বাঁশির একটা কৌতূহল আছে। সে কৌতূহল না বোঝার মতো ক্ষমতা আমার ছিল বৈকি। আমি নিশ্চিতভাবে এতটা বোকা ছিলাম না। তাই কাঁঠালের পাতায় আচার চাটতে চাটতে আমাদের আচার খাওয়া ও গল্প দীর্ঘ হত। রাজবাড়িতে থাকতে মেট্রিকে চারটি লেটার নিয়ে পাসের খবর আমি পাই। মা বাঁশিসহ সবাইকে মিষ্টি খাইয়েছিল। সত্যি বলতে কি পরীক্ষা ভালো দিয়েছিলাম কিন্তু এতটা ভালো ফল আমি আশা করিনি। সকলে খুশি হয়েছিল। মনে হয় বাঁশি ততটা খুশি হতে পারিনি। আমি বলেছিলাম কি বাঁশি, আমার পাসের খবরে, তুমি খুশি হওনি? বাঁশি রক্তিম আভা ছেড়ে উত্তর দিয়েছিল, ‘বলেছিল আপনারা ঢাকা শহরের বাসিন্দার এরপর ভালো কলেজে পড়বেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন এর পরে আমাদের কথা কি মনে থাকবে?’ বলে বাঁশি পালিয়ে গিয়েছিল। বাঁশির গলার স্বর যে ধরে আসছিল তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। দোলনায় বসে আমি দুলছিলাম না বটে। কিন্তু বাঁশির এই কথায় আমার হৃদয় বিষাদভারে দুলেছিল। সঙ্গে সঙ্গে সিন্ধান্ত নিলাম, আর নয় বাঁশিকে আমার ভালোলাগার বিষয়টি অবশ্যই বলতে হবে। ফল প্রকাশের পর ঢাকায় ফেরার তাগিদ বেড়ে গেল। ভালো লাগার কথা আর প্রকাশ করার আর সুযোগ হচ্ছিল না। আমাদের ঢাকায় যাওয়ার প্রস্তুতির খবর পেয়ে বাঁশিও ঘুরঘুর করছিল। বলেছিলাম যাওয়ার আগে একটা ঠিকানা দিও যেখানে আমি তোমাকে চিঠি দিতে পারি। বাঁশি বলেছিল, আমাদের চিঠি লিখবেন কিন্তু ছদ্ম নামে। অধ্যায়টা ওখানে শেষ মুখফুটে ভালো লাগার কথাটি বলা হয়নি বটে তবে আমরা উভয়ে আমাদের ভাবটা একে অপরকে বুঝাতে পেরেছিলাম। কবি ভাষায় ‘হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব’।
ঢাকা এসে ব্যস্ততা এতই বেড়ে গেল যে, বাঁশিকে আর চিটি লেখা হয়নি। মনে মনে বড়ই একটা ইতস্তত ভাব হচ্ছিল। মাস পেরিয়ে গেলে পরেও চিঠি লিখতে অপারগতা আমার, মনকে কুড়ে খাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত মাসিকে একটা চিটি লিখেছিলাম। বাঁশিরা সবাই নিশ্চিত ভালো আছে? ওকে আমার শুভেচ্ছা জানাবেন। ওইটুকুতে বোমা ফাটার মতো অবস্থা হল। মা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অনেক তিরস্কার করেছিল। মা বলেছিল দেখ, এখন পড়াশুনা ছাড়া আর কিছু করবি না। ভালো লেখাপড়া করলে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলে বাঁশির মতো অনেক মেয়ে পাওয়া যাবে। বাঁশি অনেক সুন্দরি। যৌবন কালে আর অনেক সুন্দরি হয়ে উঠবে। তোর চোখে ধরার মতো বয়স হয়েছে ঠিক কিন্তু মনে ধরার মতো তো বয়স হয়নি। মার স্বীকারোক্তি মনে অনেক, শান্তি এনে দিয়েছিল। তার পর অনেক সময় কেটে গেল ঊনসত্তরের গণ আন্দোরনের ঢেউ, নটরডেম কলেজের কঠিন কুইজের ব্যস্ততার মধ্যে কলেজ চালিয়ে যাওয়া দুটো টিউশনি করার পর বাঁশির কথা প্রায় ভুলেই গেলাম। তবুও মাঝে মাঝে নিজের অক্ষমতার কথা স্মরণ করে চুপসে যেতাম। ভাবতাম, আমি তো ব্যাস্ততার অজুহাতে ভুলেছি, বাঁশি তুমি কি আমাকে ভুলেছ? ভাবতাম ‘‘তুমি কি আমায় দেখিছ স্বপন আমারে’’। মাসিকে লেখা চিটির উত্তর আমি পাইনি। সম্পর্কটা তো গড়ে উঠেনি। ভুলে যাওয়ার বিষয়টি তো আর আসছে না। হৃদয়ে বুদ বুদ চিন্তার মতো তা যেন তলিয়ে যেতে থাকল।
নানান ব্যস্ততার মাঝে আমি বাঁশিকে ভুলতে পারিনি ঠিকই। তবে সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের কোনো পক্ষের কোনো কমিটম্যান্ট ছিল না। অলস দুপুরে দোলনায় দোল খেতে খেতে ও বাঁশির দেওয়া আচার চাখতে চাখতে আমাদের একে অপরকে যে ভালো লেগেছিল এটা অস্বীকার করা যাবে না। সে ভালো লাগাটা প্রসারিত হতে না হতে আমি ঢাকায় ফিরে গিয়েছিলাম। যখন কোনো মতেই বাঁশির ভাবনা মন থেকে তাড়াতে পারিনি তখন ‘‘ছাত্র নং অধ্যায়ং নং তপো’’ এটা বিশ্বাস করে পড়াশুনায় মনোনিবাস করতে চেষ্টা করেছি। উনসত্তরের গণ আন্দোলন তখন চলছে। বাঁশির কথা তখন আর ঘন ঘন মনে পড়ে না। অলস দুপুর অথবা গহিন রাতে একাকিত্বে বাঁশির সুন্দর মুখখানা প্রায়ই ভেসে উঠত। গণ আন্দোলনের স্রোত পাকিস্তান সরকারের নির্মমতা, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষ্যমের বিষয়গুলো মনকে আর বেশি সতেজ ও চাঙ্গা করে রেখেছিল। ফলে বাঁশির প্রতিচ্ছবি সেখানে অনেকটা মলিন হয়ে যায়। কলেজের কুইজ (নটেডেম) চাপ, ফাদারদের কড়াকড়ি আমাদেরকে আন্দোলনের মুখে ফেলে দেয়। বাবাকে ডেকে নিয়ে প্রিন্সিপ্যাল বললেন, আপনার ছেলে লেখা-পড়ায় ভালো-আন্দোলন করে কেন জীবনটা নষ্ট করে দিবে? একটু খেয়াল রাখবেন। এতে বাবার যা বোঝার তা বুঝে গেল। আমার ওপর চাপ পড়ল। ইচ্ছা-অনিচ্ছার বিরুদ্ধে লেখা পড়ায় মন দিলাম। টিউশনির সংখ্যা কমিয়ে দিলাম। পরীক্ষার আর বেশি সময় নেই। আদা জল খেয়ে লাগলাম। কেউ কার জন্য ঠেকে থাকে না। ফাদাররা বলেছিল যাদের উপস্থিতি ৮৫% নিচে তাদেরকে পরীক্ষা দিতে দেওয়া হবে না । আন্দোলনের কারণে উপস্থিতির হার তখন শতকারা ৭০% নামিয়ে আনা হলো। আমরা সবাই পরীক্ষা দেওয়া সুয়োগ পেলাম।
পরীক্ষা পাসের পর ব্যস্ত হয়ে উঠলাম কোথায় ভর্তি হব বলে। আমাদের দলের বেশির ভাগ ছেলেরা মেডিক্যালে ভর্তি হল। আমি ইস্ট পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজিতে (বর্তমান বুয়েট) ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম। মেডিক্যাল কলেজের তখনকার দিনে বেশি আড্ডা মেরেছি। মেডিক্যাল কলেজের সিঙ্গারার স¦াদ এখন ও মুখে লেগে আছে। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা সেশন জটের মোকাবেলার জন্য আন্দোলন করল কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় তা কোনোভাবে আপোস করল না। অপেক্ষা আছি কবে ক্লাস শুরু হবে। দিনগুলো বেশ ভালেই কাটছিল-মেডিক্যাল কলেজের ক্যান্টিন ও টিএসসিতে ১.১০ টাকার বিরিয়ানি খাওয়ার সুয়োগ, মধুর ক্যান্টিনে আড্ডা বিশ্ববিদ্যালয় মিছিলে স্লোগানে দিয়ে সরগরম করে তোলা এসব ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। দিন গুলো খারাপ চলছিল না। আমি এখনও সেই দিনগুলোকে মিস করি। মনের পর্দা থেকে বাঁশি প্রায় সরে গিয়েছিল।
এভাবে ২৬ শে মার্চের কালো রাত্রি চলে এল। ঢাকায় পাকিস্তনি সৈন্য হত্যাযজ্ঞ, তা-ব সকলই চাক্ষুুস দেখে ঢাকা ছাড়ার পরিকল্পনা মনে আঁকতে লাগলাম। সুযোগটা খুব সহজে চলে এল। বাবা বললেন তোর ঢাকায় থাকা নিরাপদ নয়, মা বোনকে নিয়ে তোরা রাজবাড়িতে চলে যা। অবস্থা ভালো হলে চলে আসবি। মুহূর্তে কি যেন এক পুলকে নেচে উঠল। ভাবলাম বাঁশির সাথে সম্পর্কটা এবার ঝালিয়ে নেয়া যাবে। মুখের কথা ভালোবাসা আদান-প্রদান হয়নি সত্য কিন্তু ভাবের আদান-প্রদান যা হয়েছিল তাই যথেষ্ট। মার্চ মাস এলে অনেক সময় বিষণতায় আমার মনটা ভরে যায়। যুদ্ধ মানুষকে কেবল দেশান্তরই করে না। যুদ্ধে শত শত মানুষকে প্রাণ দিতে হয়। তেমনি হাজার ও মানুষকে তাদের বাস্তুভিটা ছেড়ে যেতে হয়। সেই হিসাব রাখতে গেলে হাজারটা অমলের গল্প লেখা যাবে। যুদ্ধের পরে যারা দেশে থাকেন তাদের যে শুধু মাত্র যুদ্ধের মাধ্যমে সৃষ্ট শত ক্ষত চিহ্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় তা, নয় কিন্তু নিজ নিজ জীবনে বিচ্ছেদের বেদনা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। মা-বাবা ভাই-বোনদের হারানোর শোক, সম্পত্তি নষ্ট-এই কথা কি কাউকে বলা যায়? একমাত্র সমব্যথিরাই সেই দুঃখ বুঝতে পারে। যুদ্ধ যে শুধু জীবনের মোর ঘুরিয়ে দেয় তা নয় অনের মধুর সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে যায়।
৩০ শে মার্চ ঢাকা ছেড়েছিলাম। বিভিন্ন প্রতিকূলতায় শঙ্কা আর উদ্বিগ্নতা নিয়ে যখন রাজবাড়িতে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা প্রায় ছুঁই ছুঁই। মাসি বললেন, তোরা আসতে পেরেছিস ভালো হয়েছে তোদের জন্য অনেক চিন্তায় ছিলাম। আমাকে দেখে মাসি বললেন, কি রে তুই তো দেখি বেশ সুন্দর যুবক হয়ে উঠেছিস। তা শুনে লজ্জায় গালটি রাঙিয়ে যায়নি বটে। মনটা রাঙিয়েছিল তা আজ অস্বীকার করতে পারি না। আমি অপেক্ষায় ছিলাম কখন বাঁশির সঙ্গে দেখা হবে। চিঠি দিব বলেছিলাম। কিন্তু সে চিঠি আজও দেওয়া হয়নি। কি উত্তর দিব। হট্টগোল শুনে সেই রাতে বাঁশি এসছিল। আমার মা বোনদের সাথে দেখা করে আমার সঙ্গে দেখা না করে চলে গিয়েছে। ভাবলাম অভিমান হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক সেই রাতে আমার আর ঘুম হল না। বাঁশির অভিমান কি বলে ভাঙাবো সেই চিন্তায় বরীন্দ্রনাথের গানটা খুবেই মনে পড়েছিল ‘তুমি এসেছিল তবু আস নাই, জানায়ে গেলে’।
আসার পথে বেশ কিছু চুইনগাম ও চকলেট কিনে ছিলাম পিসাতো বোনদের জন্য। ভাবলাম আচারের বিনিময়ে চকোলেট ও চুইনগাম দিয়ে বাঁশির অভিমানটা ভাঙানো যাবে। চিঠি লেখি নাই তাতে কি হয়েছে। আমি তো নিজে চলে এসেছি। ইতিমধ্যে বাঁশি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছে। তিন বছরে হতে চলল বাঁশিকে দেখি নাই, কি জানি ইতিমধ্যে সেও সুন্দরি যুবতী হয়ে উঠেছে। ওকে দেখবার জন্য মনটা পাগল হয়ে উঠল। এতদিন এই উদ্বেগ একটুও মনে হয়নি। আজ রাজবাড়িতে এসে উদ্বেগের খেলায় মন আনচান করে উঠল। ভোরের অপেক্ষায় জেগে ছিলাম। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তা টের পাইনি। মায়ের কথায় ঘুম ভাঙল, মা বলছিল থাক ওকে ঘুমাতে দে ডিস্টার্ব করিস না। সেই দিনে পড়ন্ত দুপুরে বাঁশির সঙ্গে দেখা হয়েছিল। প্রথম দশর্নে আমি চমকে উঠলাম। কারণ বাঁশি যে অন্যান্যা সুন্দরি হয়ে উঠেছিল তা আমি কখনই কল্পনা করতে পারিনি। বুঝলাম যুবতী মেয়ের সৌন্দর্যই তার সম্পত্তি ও অহংকারের বিষয়। তার অবিমান ভাঙাতে আমার বেগ পেতে হবে বলে ধরে নিলাম। বিধাতা সাংঘাতিকভাবে আমার পক্ষে ছিলেন। বাঁশি উল্টো অভিযোগ করতে গিয়ে নিজে কেঁদেছিল। মাফ চেয়ে তার চোখের জল মুছে দিয়েছিলাম। মনটা শান্তিতে ভরে গেল। যুবক বয়সে আমিও বুঝলাাম এটা শুধু যুবতীর আবেগ নয় বরং যুবতীর সিক্ত ভালোবাসা থেকে উচ্চারিত ভালোলাগার প্রয়াস। অনেক কষ্টে সে দিন আমি আমার অশ্রু আটকে ছিলাম। উপলব্ধি করলাম, যুবতি চোখের অশ্রুতে দেওয়া জবাব, ভালোবাসার দেবীর কাছে নিশ্চতভাবে কার্যকর হয়েছে। ইচ্ছা হচ্ছিল বাঁশির কপালে আলতো করে একটা চুমু দেই। ঠিক সেই মুহূর্তে বাঁশি ছিটকে দূরে সরে গিয়েছিল। পরের দিন দুপুর বেলা বাঁশি বলেছিল এখন এভাবে আর তোমার সাথে দেখা করা চলবে না। ব্যাপারটা জানা জানি হয়ে গেছে। শুধু মাত্র একটু মুহূর্তের একটা ঘটনা আমার জীবনের মোর ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ভুলে গিয়েছিলাম বাবাকে একাকি রেখে এসছি। বন্ধুরা কে কোথায় আছে? দুপুরে স্টেশনে গিয়ে স্থানীয় বন্ধুদের সাথে দেখা হত। তাদের অনেকে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিবে বলে স্থির করেছে। বাঁশিকে সে কথা বলতে, বাঁশি অভিমানভরা কণ্ঠে বলেছিল আমি কে যে আপনি আমার বারণ শুনবেন। তবে এটা আমার ইচ্ছা নয়। আপনি মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেন। ঠিক এই মুহূর্তে এই সিন্ধান্তটা না নিলেও পারেন। বলেছিলাম ঠিক আছে তোমার কথা রাখতে চেষ্টা করব। শুধু মাত্র দুটো দিনের দর্শন। ও ঘটনা মানুষের মন কে কিভাবে পরিবর্তন করে দেয় তা আজ ও আমি বিশ্লষণ করে পাই না। যুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কথাটা মাকেও বলা হয়নি। ৮ই মে তারিখে বাঁশি আমাকে একটা চিরকুট দিল তাতে কলকাতার এক ঠিকানা লেখা, বাঁশি বেশ ধরা গলায় বলল আজই আমাদের শেষ দেখা কাল আমরা কলকতায় চলে যাব। ঠিকানাটা আমার কাকার, ওটাই আমাদের কলকাতার বাড়ি। কলকাতায় এলে অবশ্যই দেখা করবেন। আমি স্থির হয়ে রইলাম। হাতে চিরকুটটি ধরা অবস্থায় আমি নির্বাক হয়েছিলাম। সেটাই বাঁশির সাথে আমার শেষ দেখা। ভালোবাসার সময় যে এত সংক্ষিপ্ত হয় তা আমি কোনোদিন বুঝিনি। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম বাঁশি তুমি অপেক্ষায় থাক আমি অবশ্যই আসব।
৯ তারিখে বাঁশিরা কলকাতায় চলে যায়, ১১ তারিখ পাকিস্তানিরা শুনলাম পদ্মা পাড়ি দিয়ে গোয়ালন্দে এসেছে। ১২ তারিখ সকাল বেলা আমরা রাজবাড়ি ছাড়লাম গন্তব্য কলকাতা। আপাত ঠিকানা ট্রেনে করে কুষ্টিয়া, সে দিন রাতে পাবনা থাকার ব্যবস্থা হলো স্থানীয় এমপির ভাগনা আমাদের খুব সাহায্যে করেছিল। একটা পুরোনো বাড়িতে উঠেছিলাম। প্রিন্স ভাই বললেন এটা সুচিত্রা সেনের বাড়ি। সে বাড়িতে রাত কাটিয়ে পরের দিন সকাল বেলা মা বোনদের জন্য নাস্তা আনতে গেলাম। স্থানীয় একটা স্কুলে অনেকে এসে ঠাঁই নিয়েছে। এক মারোয়ারি আমাকে বলল তুমি কোথা থেকে এসেছ? কোথায় যাবে? বললাম কলকাতা। বলল তোমরা কয়জন? আমি বলল আমি ছাড়া তিন জন ঐ যে একটা সবুজ রঙের বাস দেখতে পারছ, সেটা কলকাতায় যাবে। ভদ্রলোকের কথায় আমি মুগ্ধ হলাম। দৌড়ে গিয়ে মাকে বললাম ৫ মিনিটে নাস্তা সার, একটা বাস ডাইরেক্ট কলকাতায় যাবে। ২০ মিনিটে না পৌঁছালে বাসটা মিস হবে। ১৫ মিনিটে আমরা হাজির। ভদ্রলোক বলল মাঝামাঝি বা শেষের দিকে গিয়ে বস। ১০ মিনিটের মধ্যে বাস ছাড়বে। কলকাতায় আমাদের বাড়ি ঠাকুর পুকুর। আমাদের বাড়ি বললাম এই অর্থে। আমার পিসিরা শিক্ষকতা করে সেই বাড়িটা বানিয়েছিল। তারা কেউ বিয়ে করেনি। ওয়ারিশ বলতে আমি ছিলাম। ঠাকুরপুকুর পৌঁছাতে সে দিন সন্ধ্যা হয়েছিল। পিসিমারা খুবই খুশি। ছোট পিসি বলল, একবার যখন এসে পড়েছিস ঐ দেশে আর ফিরে যাওয়ার দরকার নেই।
কলকাতায় গিয়ে রিফ্যুজি ও রেশন কার্ড করা, তাছাড়া উদ্বাস্তু কারণে যেকোনো উদ্বাস্তু ক্যাম্পের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করাছিল প্রাথমিক কাজ। এরপর হাত খরচের জন্য টিউশনি, বাবার জন্য যোগাযোগ। না ভুল বললাম, ভারত কখনই আমাদের রিফ্যুজি বলেনি। আমাদের বলা হত ইভাকুয়িজ (বাধপঁববং) বিভিন্ন আত্মীয়ের সাথে দেখা-সাক্ষাত করা, ইত্যাদি বিভিন্ন কাজে প্রচ- ব্যস্ত হয়ে পড়ি। দেশে যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়লেও পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে নকশালিদের সাথে যুদ্ধ জড়িয়ে পড়েছিলাম। তখন সি পি এম ও সি পি এম এল (নকশালি) ও তার মাঝখানে ছিল কংগ্রেস। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল বিশেষ করে যুবকদের মাঝে। বিপ্লবের নামে অনেক প্রতিভাবান যুবককে দেখেছি অবলীলায় সমস্ত কিছু ছেড়ে বিপ্লব সফল করার জন্য প্রাণকে বিসর্জন দিয়েছে। প্রতিদিন কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় ক্রসফায়ারের নামে (কথাটি স্বার্থকভাবে ব্যবহার করে) প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ফাঁদে পড়ে কত যুবক যে প্রাণ দিয়েছে তার হিসাব নেই। অবস্থা এমন খারাপ ছিল এক পাড়ার ছেলে অন্য পাড়ায় যেতে পারত না। এমন কোনো দিন ছিল না, যে দিনে ১৫-২০ জন ক্রসফায়ারে জীবন দেয়নি। নকশালিদের যুক্তি ছিল গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা। তাই মারা পড়লে পুলিশেরা শহরে ব্যস্ত থাকবে, সুযোগে তারা গ্রামে গিয়ে তাদের বিপ্লবকে আর সুসংগঠিত করতে পারবে। বাংলাদেশের যুবক হিসাবে আমার পোশাক ও ভাষা ছিল ভিন্ন। ওদের সাহায্য করতে গিয়ে অনেকবার সিআরপি আমাকে ধরে থানায় নিয়ে যেত। জেরার সম্মুখীন হতে হয়েছে। নিজেকে বাঙ্গাল বলে প্রমাণ করতে, আমার তেমন একটা অসুবিধা হয়নি কোনোদিন। তাই পাড়ায় থেকে ভিন্ন পাড়ায় গিয়ে নকশালিদে দুতিয়ালি ও বাহকের কাজ করতে হয়েছিল। এই প্রকার বিভিন্ন বিষয়ে ব্যস্ত থাকার দরুন। বাঁশির কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। কোনো এক অলস দুপুরে বাঁশি এই কলকাতায় আছে বলে তাকে দেখার জন্য মনটা আন-চান করে উঠল।
কলকাতায় আমার বয়সী। যাদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছিল তারা বয়সে ৩-৪ বড় ছিল। বন্ধুদের মধ্যে কিছু নকশালি, সিপিএম, কংগ্রেস অনুসারি ছিল সবই সদ্য ডিগ্রি পাশ করা। কেউ মাস্টার্সে ভর্তি হয়েছিল। সবাই চাকুরি জন্য ব্যস্ত ছিল। তারপর আমার বন্ধুরা চাকুরি জন্য বাইরের যেতে চাইত না। ফলে আমাদের আড্ডটা জমত ভালো, চা দোকানের খুড়োকে উচ্চকণ্ঠে বলতাম খুড়ো দুটোকে তিনটে। এভাবে বেশ চলছিল। বাঁশিকে দেখার ইচ্ছা হওয়াতে, আমার এক বন্ধুকে বললাম, বললাম আমার সাথে একটু বালিগঞ্জে যেতে হবে। কংগ্রেস পন্থি বলে তাকে বলেছিলাম অন্যদের কাছে বলতে চাইনি। রাজনৈতিক হত্যা ও গুমের ভয়ে তারা প্রস্তাবটিকে সরাসরি না করে দিবে। বন্ধুটি আমাকে সহায্যের জন্য এগিয়ে এলে বিষয়টি তাকে খুলে বললাম। ব›ধুটি [পার্থ] বলল আমার এক ভাই ঐ এলাকায় থাকে। তার সাথে কথা বলে একটা দিন ঠিক করব ওকে নিয়ে বাঁশিদের বাসা যাব। বাঁশিদের বাসাটা ছিল। বালিগঞ্জে উত্তর পাড়ায়। পার্থ বলল পরিচিত মানুষ সঙ্গে থাকলে ভয়ের কিছু নেই। কলকাতায় এসেছি প্রায় তিন মাস হতে চলল তার পরেও বাঁশিকে দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। দিনক্ষণ ঠিক করা হল পার্থ’র ভাই দিন তারিখ দিলেই বাঁশিকে দেখতে যাব।
ক্রমে দিনটি ঘনিয়ে আসতে লাগল। বাঁশিকে দেখার কামনায় মন আমার অধির হয়ে উঠতে লাগল। পার্থ বলল এখান থেকে (ঠাকুরপুকুর) বালিগঞ্জ যাওয়ার ডাইরেক্ট বাস নেই। বেহালা থেকে আছে। এটা কোলকাতার লোকদের একটা অভ্যাস। কোনো স্থানকে চেনাতে বললে, তারা বাসের রুট দিয়ে চিনে। নিরুপিত দিন এলে পড়ে বেহালায় গিয়ে নামলাম, তখন প্রায় শেষ বিকেল, পার্থ বলল বাঙ্গাল কাজটি করার আগে, না খাওয়ালে চলবে না। তাই একটা দোখানে গিয়ে দুটো মোগলাই পরাটার অর্ডার দিলাম। বালিগঞ্জ বাজার সামনে পার্থ’র ভাইয়ের দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল। আমরা গিয়ে পৌাঁছাতে শ্যামলের যত অভিযোগ এত দেরি করে কেউ। আর একটু হলে আমি তো চলেই গিয়েছিলাম। যাক বেশি দেরি হবে না। বাসাটা আমি চিনে এসেছি। আমার টিউশনি আছে। তাই দেরি করতে পারব না।
মাথার চুলটা একটু আছঁড়িয়ে নিলাম বন্ধুদের আড়ালে। বাঁশিকে দেখে প্রথমে কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। বাঁশি আমাকে দেখে নিশ্চয় খুশি হবে। গন্তব্য নিকটবর্তী হতেই না হতে দেখলাম মানুষের বেশ ভিড় আনাগোনা। নিজের অজান্তে বলে উঠলাম কি হচ্ছে, এত মানুষের সমারহ কেন। শ্যামল বলল মনে হয় বিয়ে হচ্ছে, বাড়ির বাইরে দাড়াঁতে স্পষ্ট বুঝলাম বিয়ে বাড়ি বটে। শ্যামলকে বললাম শ্যামল দাদা এটা তো সেই বাড়ি ঠিক। পার্থ কি জানি ভেবে না ভেবে বলল, দেখ তোর বাঁশির বিয়ে হচ্ছে কি না। আমার হৃৎপি-টা ফেটে যাচ্ছে। বললাম দেখত কী হচ্ছে। শ্যামল গিয়ে খবর নিয়ে এল, যে বাঁশির বিয়ে হচ্ছে। রাতের প্রথম লগ্নে বিয়ে, কষ্টে অস্পষ্ট কণ্ঠে বললাম, ‘চল ফিরে যাই আর কি দরকার’। পার্থ বলল ইয়ারকি নাকি! তুই দেখা করবি কি না, এটা তোর ব্যাপার আমরা বাপু তোর জীবনের প্রথম প্রেমকে না দেখে নড়ছি না। দেহ ও মন উভয়ে অবস হয়ে আসছিল। পার্থ একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলল বস, তোর হয়ে আমরা দেখা করে আসি। প্রচ- লজ্জা, ক্ষোভ, অপমান ও দুঃখে আমি একেবারে মুষড়ে পড়ছিলাম। আমি ঠাকুরপুকুরের পথে একাই রওনা হলাম।
ড. এলগিন সাহা : লেখক, এনজিও ব্যক্তিত্ব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here