দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া

0
65

সাজেক ভ্যালি
ভ্রমণ পিপাসুষদের কাছে ক্রমশই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে সাজেক ভ্যালি। রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে অবস্থিত এ পর্যটন কেন্দ্রটি। সাজেক ভ্যালির অবস্থান রাঙামাটি জেলার সর্বউত্তরের মিজোরাম সীমান্তে। সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা, দক্ষিণে রাঙামাটির লংগদু, পূর্বে ভারতের মিজোরাম, পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দীঘিনালা। সাজেক বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো ইউনিয়ন, যার আয়তন ৭০২ বর্গমাইল। সাজেক নামক নদী হতে সাজেক ভ্যালির নামকরণ করা হয়েছে।
রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলা থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে সাজেকের পুরোটাই পাহাড়ে মোড়ানো পথ। ভৌগোলিক অবস্থান রাঙ্গামাটিতে হলেও যাতায়াতের সহজ পথ খাগড়াছড়ি হয়ে। খাগড়াছড়ি থেকে সাজেকে ৩ ঘণ্টা সময় লাগে। এখানে সাজেক বিজিবি ক্যাম্প অবস্থিত। সাজেকের বিজিবি ক্যাম্প বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উঁচুতে অবস্থিত বিজিবি ক্যাম্প। সাজেক রুইলুইপাড়া এবং কংলাক পাড়া এই দুটি পাড়ার সমন্বয়ে গঠিত। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত রুইলুই পাড়ার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৭২০ ফুট। আর ১৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত কংলাক পাহাড়ে কংলাক পাড়া অবস্থিত। সাজেকে মূলত লুসাই, পাংখোয়া এবং ত্রিপুরা আদিবাসী বসবাস করে। রাঙামাটির অনেকটা অংশই দেখে যায় সাজেক ভ্যালি থেকে। তাই সাজেক ভ্যালিকে বলা হয় রাঙামাটির ছাদ।


খাগড়াছড়ি জেলা সদর থেকে সাজেকের দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। আর দীঘিনালা থেকে প্রায় ৪৯ কিলোমিটার। রাঙামাটি থেকে নৌপথে কাপ্তাই হয়ে এসে অনেক পথ হেঁটে সাজেক যাওয়া যায়। খাগড়াছড়ি শহর অথবা দীঘিনালা হতে স্থানীয় গাড়িতে (জিপ গাড়ি, সি.এন.জি, মটরসাইকেল) করে সাজেকে যাওয়াই হচ্ছে বর্তমানে সবচেয়ে সহজ ও জনপ্রিয় মাধ্যেম।
তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম হলো খাগড়াছড়ি শহর বা দীঘিনালা উপজেলা শহর থেকে জিপগাড়ি রিজার্ভ নিয়ে ঘুরে আসা। সাইজ অনুযায়ী প্রতি গাড়িতে দশ থেকে ১৫ জন বসতে পারবেন। এরপর যদি খাগড়াছড়ির আলুটিলা, রিসং ঝর্না, ঝুলন্ত ব্রিজ সহ এগুলোও ঘুরতে আসতে পারেন।
যাত্রাপথে প্রথমেই পরবে ১০ নং বাঘাইহাট পুলিশ ও সেনাক্যাম্প। সেখান থেকে ভ্রমণরত সদস্যদের তথ্য দিয়ে সাজেক যাবার মূল অনুমতি নিতে হবে। একে আর্মি এসকর্ট বলা হয়। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গাড়িবহর দ্বারা পর্যটকদের গাড়িগুলোকে নিরাপত্তার সাথে সাজেক পৌঁছে দেয়া হয়। মূলত সাজেকের ভ্রমণার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রখে বাঘাইঘাট বাজার থেকে সাজেক পর্যন্ত সবগুলো জিপকে নিরাপদে পৌঁছে দেন নিরাপত্তাবাহিনীর কর্মীরা। দিনের দুইটি নির্দিষ্ট সময় ব্যতীত আর্মি ক্যাম্পের পক্ষ হতে সাজেক যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় না। পর্যটকদের সর্বাধিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্যই এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বাঘাইহাট বাজারের পাশ দিয়ে চলে গেছে কাচালং নদী। দীঘিনালা থেকে আরো প্রায় ১৫ কিলোমিটার সামনে বাঘাইহাট আর্মি ক্যাম্প থেকে। বাঘাইহাট বাজারের পর গঙ্গারাম মুখ। দু-পাশ থেকে বয়ে আসা দুটি নদী এক হয়েছে এখানে। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সর্পিল নদী চলে গেছে বহু দূর।
সাজেক যাওয়ার রাস্তার দু-পাশের বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি ঘর। নীল আকাশের নিচে বিশাল সমৃদ্ধ বনভূমির দেখা পাওয়া যাবে সাজেক ভ্যালির পথে। উড়োবাজার, গঙ্গারামমুথ, নন্দরাম এসব পাহাড়ি পাড়া পেরিয়ে যাত্রাবিরতি দিতে হবে মাচালং বাজারে। পাশের সীমান্তঘেঁষা ভারত থেকে আসা মাচালং নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে ছোটখাটো বাজার। এই এলাকা সাজেক ইউনিয়নের প্রধান কেন্দ্রস্থল। মাচালং বাজারে স্থানীরা পাহাড়ের জুমের ফসল বিক্রি করেন।
মাচালং বাজার থেকে সাজেকের দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। বন্ধুর পথের দু-পাশেই আকাশচুম্বী পাহাড়ের বুকে দেখা মিলবে বৃক্ষরাজির। মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্ন বসতি। দেখা মিলবে কয়েকটি প্রাকৃতিক ঝর্ণার। নীল আকাশ আর পাহাড়ে মেঘের গড়াগড়ি দেখতে দেখতেই পৌঁছে যাবেন মেঘের রাজ্য সাজেকে।
সাজেকের শুরুতেই চোখে পড়বে রুইলুইপাড়া। এটা সাজেক উপত্যকার মূল কেন্দ্র। রুইলুইপাড়ায় লুসাই, পাংখোয়া ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বসবাস। পাড়ার সবগুলো বাড়ির রঙ লাল-সবুজ। সাজেকে সর্বত্র মেঘ, পাহাড় আর সবুজের দারুণ মিতালী চোখে পড়ে । এখানে তিনটি হেলিপ্যাড বিদ্যমান, যা থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা যায়। সাজেকে একটা ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা হচ্ছে এখানে ২৪ ঘণ্টায় প্রকৃতির তিনটা রূপই দেখা মিলে। কখনো খুবই গরম, একটু পরেই হটাৎ বৃষ্টি এবং তার কিছু পরেই হয়তো চারদিকে ঢেকে যায় মেঘের চাদরে। মনে হয় যেন একটা মেঘের উপত্যকা।
সাজেকের রুইলুই পাড়া থেকে ট্রেকিং করে কংলাক পাহাড়ে যাওয়া যায়। কংলাক হচ্ছে সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া। কংলাকে যাওয়ার পথে মিজোরাম সীমান্তের বড়ো বড়ো পাহাড়, আদিবাসীদের জীবনযাপন, চারদিকে মেঘের আনাগোনা পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
রুইলুইপাড়ায় বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট পাবেন। এখানে প্রায় সব ধরনের খাবার পাবেন অল্প দামের মধ্যেই। থাকার জায়গাও পাবেন স্বাভাবিক খরচেই। ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার সেরে ঘুরে আসতে পারবেন হেলিপ্যাড ও রুইলুইপাড়া। খুব ভোরে উঠেই কংলাকপাড়া যেতে পারেন, হেঁটে যেতে ৩০-৪০ মিনিট লাগবে। কাঁচা রাস্তা এবং কিছুটা পাহাড় আছে, তাই ভালো গ্রিপ আছে এমন জুতো পরে যাবেন। তবে কিছু রাস্তা গাড়িতে করে যেতে পারেন। রুইলুইপাড়ার হেলিপ্যাডের পাশ দিয়ে সোজা উত্তরে একটি রাস্তা চলে গেছে, সেই রাস্তা ধরে এগোলেই কংলাকপাড়ায় পৌঁছে যেতে পারবেন।
কংলাক আগে মূলত লুসাই ও পাংখোয়া অধ্যুষিত পাড়া ছিল। এখন পাংখোয়া নেই বললেই চলে, কিছু লুসাই পরিবার আছে। আর আছে ত্রিপুরা। কংলাক সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া।
সব ঘোরাঘুরি শেষ করে দুপুরের আগেই গাড়িতে উঠবেন, আসার পথে বাঘাইহাট এলাকায় হাজাছড়া ঝর্ণা, দীঘিনালা ঝুলন্ত ব্রিজ ও দীঘিনালা বনবিহার দেখে আসতে পারেন। রাস্তা থেকে ১০-১৫ মিনিট হাঁটলেই ঝর্ণায় যাওয়া যায়। যাওয়ার পথে তেমন কোনো পাহাড় নেই, তাই যে কেউই যেতে পারে। একদিনে এই সবগুলো দেখতে হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেড়িয়ে পড়বেন।

নীলগিরি

বান্দরবান জেলা সদর থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বান্দরবান-থানছি সড়কে পাহাড় চূড়ায় নীলগিরি পর্যটন কেন্দ অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় এই পর্যটন কেন্দ্রটি অবস্থিত। এখান থেকে পর্যটকরা সহজেই মেঘ ছুঁতে পারেন বলে একে বাংলাদেশের দার্জিলিংও বলা হয়। নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে যে দিকে চোখ যায় শুধুই সবুজ আর সবুজ। চারপাশে সবুজের সমারোহ আর নির্জন প্রকৃতি নীলগিরির অন্যতম আকর্ষণ।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৭ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন কর্তৃক চিম্বুক-থানচি সড়কটি নির্মাণের সময় ম্রো জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বান্দরবান থানিছ সড়কের কাপ্রু পাড়া এলাকায় প্রথমে নিরাপত্তা চৌকি হিসেবে এটি নির্মিত হয়। পরবর্তীতে এটি পর্যটন কেন্দ্রের পূর্ণতা লাভ করে। এখানে মেঘদূত, আকাশনীলা, নীলাঙ্গনা, মারমা হাউজসহ নানা নামের আকর্ষণীয় কটেজ রয়েছে। আছে একটি ক্যাফেটেরিয়া।
দিনের বেলায় এই স্থান থেকে খালি চোখে বঙ্গোপসাগর ও জাহাজ চলাচলের দৃশ্য দেখা যায়। যা পর্যটকদের খুব সহজেই আকৃষ্ট করে। এছাড়া ছোট ছোট পাহাড়ের কোল ঘেষে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদীর আঁকাবাঁকা দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য সকলকে আকর্ষণ করে। আধুনিক সুযোগ সুবিধা সম্বলিত এই নীলিগিরি রিসোর্টে অবস্থান ও রাত্রিযাপনের জন্য সেনাবাহিনীর বান্দরবান ব্রিগেড হেডকোয়াটারের সাথে আগাম যোগাযোগ করতে হয়। প্রকৃতির অপরূপ মনমুগ্ধকর নয়নাভিরাম এই দৃশ্যগুলো পর্যটকদের স্মৃতিতে ধরে রাখার জন্য নীলগিরি রিসোর্ট অত্যন্ত চমকার একটি স্থান।

অবস্থান
জেলা সদর থেকে পাহাড়ি আকাঁবাঁকা সড়কে ৪৭ কিলোমিটার দূরে নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রের অবস্থান। আর বাংলার পাহাড়ের রানী খ্যাত চিম্বুক পাহাড় থেকে থানছি উপজেলা সড়কপথে নীলগিরি পৌঁছাতে আরও ২৬ কিলোমিটার যেতে হয়। যাওয়ার পথে চারপাশের দৃশ্যগুলো খুবই চমৎকার। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে নীলগিরি পর্যটন স্পটটি। এখানে রাত্রিযাপনসহ থাকা-খাওয়ার সু-ব্যবস্থাও রয়েছে। নীলগিরি পর্যটন স্পটে গড়ে তোলা কটেজগুলোও দেখতে বেশ আকর্ষণীয়। চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়।

আকাশ ও পাহাড়ের মিতালী
শীতকাল এবং বর্ষাকাল দুই ঋতুতেই এইখানে ভ্রমণে অনেক বেশি আনন্দ। তবে বর্ষাকালে ভ্রমণে গেলে বেশি আন্দন পাওয়া যায়। কারণ এই সময়ে মেঘের অপরূপ নৃত্য দেখতে দেখতেই দিন বয়ে যায়।
দুর্গম পাহাড়ে নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রে গড়ে তোলা হয়েছে আকাশনীলা, মেঘদূত, নীলাতানা নামে পর্যটকদের জন্য সকল সুবিধা সম্বলিত তিনটি কটেজ। এখানে রয়েছে অত্যাধুনিক একটি রেস্টুরেন্টও।
নীলগিরি যেন প্রকৃতির এক অনন্য দান। নীলগিরির চূড়া থেকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় কেওক্রাডং, প্রাকৃতিক আশ্চর্য বগালেক, কক্সবাজারের সমুদ্র, চট্টগ্রাম সমদ্র বন্দরের আলো-আঁধারি বাতি এবং চোখ জুড়ানো পাহাড়ের সারিও দেখতে পাওয়া যায়।
নীলগিরির কাছাকাছি রয়েছে বেশ কয়েকটি ম্রো আদিবাসী গ্রাম। নীলগিরির একদম কাছে কাপ্রু পাড়া, আপনি সহজেই পরিদর্শন করে ম্রো আদিবাসী সম্পর্কে জানতে পারবেন। নীলগিরিতে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প। ফলে এখানে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই।
নীলগিরির রাতের অদ্ভুৎ সৌন্দর্য আরো মুগ্ধতা জাগাবে। চারিদিকের হরিণ, শিয়ালসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর ডাক আর পাহাড়গুলোর আলো-আঁধারির খেলা দেখে আপনার জীবনকেই যেন রহস্যময় বলে মনে হবে। নীলগিরি যাওয়ার পথে আপনি দেখে যেতে পারেন বান্দরবানের অপার সৌন্দর্যময় শৈলপ্রপাত। একটু পরই চোখে পড়বে স্বপ্নচূড়া। স্বপ্নচূড়া থেকেও বান্দরবানের অবাক করা সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
নীলগিরির সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এখান থেকে চোখে পড়ে বান্দরবানের উপর দিয়ে বয়ে চলা সর্পিল সাঙ্গু নদী। এখান থেকে মনে হবে সাঙ্গু নদী আপনার খুব কাছে।

কটেজ সংক্রান্ত তথ্য
সেনানিয়ন্ত্রিত নীলগিরি রিসোর্টে আকাশনীলা, মেঘদূত, নীলাঙ্গনা, হেতকরা রাইচা এবং মারমারাইচা নামের ছয়টি কটেজ রয়েছে। নীলগিরিতে রাত্রিযাপনে কটেজের রুম বুকিং এবং রেস্টুরেন্টে খেতে প্রায় দেড় মাস আগে বুকিং দিতে হয়।

কীভাবে যাবেন
প্রতিদিন ঢাকা থেকে বিভিন্ন পরিবহন সার্ভিসের বাসে চড়ে সরাসরি বান্দরবান সদরে পৌঁছাতে পারবেন। বান্দরবান সদর থেকে চান্দের গাড়িতে চড়ে নীলগিরিতে যেতে পারেন। অথবা চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট থেকে ননএসি এবং কদমতলি থেকে বিআরটি এসি বাস সার্ভিস চালু রয়েছে বান্দরবান। এছাড়াও চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের কেরানীহাট স্টেশন থেকেও বান্দরবান-কেরানীহাট বাস সার্ভিস চালু রয়েছে। যেভাবে খুশি সেভাবেই বান্দরবান যেতে পারেন। নীলগিরিসহ বান্দরবানের পর্যটন স্পটগুলো ঘুরে বেড়াতে ভাড়ায় চালিত বিভিন্ন রকমের গাড়ি পাওয়া যায়। সিএনজি এবং মহেন্দ্র গাড়িতে করেও নীলগিরি যাওয়া যায়। এছাড়াও বান্দরবান-থানছি উপজেলা সড়কে চলাচলকারী যাত্রীবাহী বাস সার্ভিসগুলোতে করেও নীলগিরি যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে সময় অপচয় হলেও খরচ কমবে।

কুয়াকাটা

সাগরকন্যা খ্যাত অপরূপ এক জায়গা কুয়াকাটা। পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালী ইউনিয়নে অবস্থিত এ জায়গায় আছে দেশের সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকত। একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখার মতো জায়গা দ্বিতীয়টি আর এদেশে নেই। অনিন্দ্য সুন্দর সমুদ্র সৈকত ছাড়াও কুয়াকাটায় আছে বেড়ানোর মতো আরও নানান আকর্ষণ।

সমুদ্র সৈকত
কুয়াকাটার বেলাভূমি বেশ পরিচ্ছন্ন। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে এ সৈকত থেকেই কেবল সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। সৈকতের পূর্ব প্রান্তে গঙ্গামতির বাঁক থেকে সূর্যোদয় সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যায়। আর সূর্যাস্ত দেখার উত্তম জায়গা হল কুয়াকাটার পশ্চিম সৈকত।
কুয়াকাটার সৈকত প্রায় ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। সৈকত লাগোয়া পুরো জায়গাতেই আছে দীর্ঘ নারিকেল গাছের সারি। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে এ বনেও। বিভিন্ন সময়ে সমুদ্রের জোয়ারের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় ভাঙনের কবলে পড়েছে সুন্দর এই নারিকেল বাগান। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে সারা বছরই দেখা মিলবে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য।

শুঁটকি পল্লী
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম প্রান্তে আছে জেলে পল্লী। এখানে প্রচুর জেলেদের বসবাস। নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত এখানে চলে মূলত শুঁটকি তৈরির কাজ। সমুদ্র থেকে মাছ ধরে এনে সৈকতেই শুঁটকি তৈরি করেন জেলেরা।

গঙ্গামতির জঙ্গল
কুয়াকাটার সমুদ্র সৈকত শেষ হয়েছে পূর্ব দিকে গঙ্গামতির খালে। এখান থেকেই শুরু হয়েছে গঙ্গামতির জঙ্গল। অনেকে একে গজমতির জঙ্গলও বলে থাকেন। নানান রকম বৃক্ষরাজি ছাড়াও এ জঙ্গলে আছে বিভিন্ন রকম পাখি, বন মোরগ-মুরগি, বানর ইত্যাদি।

ক্রাব আইল্যান্ড
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পুবদিকে গঙ্গামতির জঙ্গল ছাড়িয়ে আরও সামনে গেল আছে ক্রাব আইল্যান্ড বা কাঁকড়ার দ্বীপ। এ জায়গায় আছে লাল কাঁকড়ার বসবাস। নির্জনতা পেলে এ জায়গার সৈকত লাল করে বেড়ায় কাঁকড়ার দল। ভ্রমণ মৌসুমে (অক্টোবর-মার্চ) কুয়াকাট সমুদ্র সৈকত থেকে স্পিড বোটে যাওয়া যায় ক্রাব আইল্যান্ডে।
ফাতরার বন
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম পাশে নদী পার হলেই সুন্দরবনের শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল, নাম তার ফাতরার বন। সুন্দরবনের সব বৈশিষ্ট এ বনে থাকলেও নেই তেমন কোন হিংস্র প্রাণী। বন মোরগ, বানর আর নানান পাখি আছে এ বনে। কখনো এ বনে বুনো শূকরের দেখা মেলে। কুয়াকাটা থেকে ফাতরার বনে যেতে হবে ইঞ্জিন নৌকায়।

কুয়াকাটার কুয়া
কুয়াকাটা নামকরণের ইতিহাসের পেছনে যে কুয়া সেটি এখনও টিকে আছে। তবে কয়েক বছর আগে অদূরদর্শী ও কুরুচিকর সংস্কারের ফলে এর সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে গেছে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের কাছে রাখাইনদের বাসস্থল কেরানিপাড়ার শুরুতেই প্রাচীন কুয়ার অবস্থান।
জনশ্রুতি আছে ১৭৮৪ সালে বর্মী রাজা রাখাইনদের মাতৃভূমি আরাকান দখল করলে বহু রাখাইন জায়গাটি ছেড়ে নৌকাযোগে আশ্রয়ের খোঁজে বেড়িয়ে পড়েন। চলতি পথে তারা বঙ্গোপসাগরের তীরে রাঙ্গাবালি দ্বীপের খোঁজ পেয়ে সেখানে বসতি স্থাপন করেন। সাগরের লোনা জল ব্যবহারের অনুপযোগী বলে মিষ্টি পানির জন্য তার এখানে একটি কূপ খনন করেন। এরপর থেকে জায়গাটি কুয়াকাটা নামে পরিচিতি পায়।

সীমা বৌদ্ধ মন্দির
কুয়াকাটার প্রাচীন কুয়ার সামনেই সীমা বৌদ্ধ মন্দির। কাঠের তৈরি এই মন্দির কয়েক বছর আগে ভেঙে দালান তৈরি করা হয়েছে। তবে মন্দিরের মধ্যে এখনও আছে প্রায় ৩৭ মন ওজনের প্রাচীন অষ্টধাতুর তৈরি বুদ্ধ মূর্তি।

কেরানিপাড়া
সীমা বৌদ্ধ মন্দির থেকে সামনেই ক্ষুদ্র আদিবাসী রাখানদের আবাসস্থল কেরানিপাড়া। এখানকার রাখাইন নারীদের প্রধান কাজ কাপড় বুনন। রাখাইনদের তৈরি শীতের চাদর বেশ আকর্ষণীয়।

মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ মন্দির
কুয়াকাটা সৈকত থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে আদিবাসী রাখাইনদের একটি গ্রামের নাম মিশ্রিপাড়া। এখানে আছে বড়ো একটি বৌদ্ধ মন্দির। কথিত আছে এ মন্দিরের ভেতরে আছে উপমাহাদেশের সবচেয়ে বড়ো বুদ্ধ মূর্তি। এছাড়া এখান থেকে সামান্য দূরে আমখোলা গ্রামে আছে এ অঞ্চলে রাখাইনদের সবচেয়ে বড়ো বসতি।

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে নদী ও সড়ক পথে কুয়াকাটা যাওয়া যায়। সবচেয়ে সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা হলো ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে পটুয়াখালী, সেখান থেকে বাসে কুয়াকাটা। প্রতিদিন সন্ধ্যায়ই ঢাকার সদরঘাট থেকে পটুয়াখালী যায় বেশ কয়েকটি লঞ্চ। কুয়াকাটা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল থেকে কুয়াকাটার বাস সার্ভিস আছে। এছাড়া ঢাকার গাবতলী বাস স্টেশন থেকে বাস যায় কুয়াকাটা। এছাড়া কমলাপুর বিআরটিসি ডিপো থেকেও প্রতিদিন সকাল ও রাতে কুয়াকাটার বাস ছাড়ে।

কোথায় থাকবেন
কুয়াকাটায় পর্যটকদের থাকার জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল আছে। সবচেয়ে ভালো আবাসন ব্যবস্থা পর্যটন করপোরেশনের ইয়ুথ ইন কুয়াকাটা। এছাড়া ব্যক্তি মালিকানাধীন হোটেল ও তো রয়েছেই।
লাউয়াছড়া

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের কথা সর্বজনবিদিত। ভৌগোলিক ভাবে আমাদের দেশটি ইন্দোবার্মা হট স্পটের অন্তর্গত, অর্থাৎ জীব বৈচিত্র্যের এক দারুণ সমাহার হবার জন্য আমাদের দেশটি আদর্শ। মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এমন একটি জায়গা।
লাউয়াছড়া উদ্যানটি বহু পূর্বে আসামের কাছাড়ের জঙ্গলের সাথে সংযুক্ত ছিল। তখন আমাদের দেশের পূর্বাঞ্চল আর ভারতের আসামের কাছাড় জেলা সংলগ্ন এক বিরাট অবিচ্ছিন্ন জঙ্গলের অংশ ছিল এটি। বহু বছরের বন বিনাশ ও অযতেœর ফলে আজ একটি বিচ্ছিন্ন জঙ্গল হিসেবে এটি টিকে আছে। ১৯৯৬ এ একে সংরক্ষিত জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে হয়। জঙ্গলে ঢুকতেই আপনার চোখে পড়বে আকাশ ছোয়া সব গাছের সারি, রাস্তার দুপাশে সারি সারি টিলা অথবা খাদ। প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এই এলাকায়, ফলে ভীষণ ঘন ঝোপঝাড় ভেদ করে দৃষ্টি বেশিদূর যাবে না, তবে শুনতে পারবেন অসংখ্য পাখির ডাক, মাঝে মাঝে দেখা পাবেন নানা প্রজাতির বানর, ভাগ্য ভাল থাকলে পেয়ে যেতে পারেন বিপন্ন প্রায় উল্লুকের দেখাও। গাছের ফাঁক দিয়ে চোখে পড়বে বৃষ্টির পানি প্রবাহী নালা, বা স্থানীয় ভাষায় ছড়া। বালি ঢাকা এই ছড়াগুলো বৃষ্টির সময় পানি প্রবাহী হয়, বাকি সময়ে প্রায় শুকিয়ে থাকে।
রেলপথ পার করে কিছু দূর হাঁটলে বনের গভীরে যাবার বেশ কিছু ট্রেইলের দেখা পাবেন। এগুলোর যেকোনো একটা ধরে হাটা শুরু করুন, কিছুক্ষণের জন্য হলেও প্রবেশ করবেন এক অন্য আদিম জগতে, পাখপাখালির ডাক আর জঙ্গলের নানা শব্দে রোমাঞ্চিত হবেন, দেখা পেতে পারেন জঙ্গলের ভেতরে বসবাস কারী আদিবাসী খাসিয়া, টিপরা অথবা মনিপুরীদের। আরো দেখা পাবেন জঙ্গলের বিচিত্র সব পাখপাখালি আর পশু, যাদের মধ্যে হরেক রকমের বানর অন্যতম।

জীব বৈচিত্র্য
২৭৪০ হেক্টরের আয়তন হলেও জঙ্গলটির জীববৈচিত্র্য বিস্ময়কর সমৃদ্ধ। এখানে প্রায় ১৫৯ রকমের গাছগাছড়ার দেখা মেলে, পাওয়া যায় ধনেশ, বন মোরগ, হরিয়ালসহ প্রায় ১২০ রকমের পাখি। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে আছে লজ্জাবতী বানর, আসামী বানর, শূকর লেজী বানরসহ ৬ প্রজাতির বানর, কমলা পেট কাঠবেড়ালী, খাটাশ, বন বেড়াল, সোনালী শেয়াল, শূকর, মায়া হরিণ, নানা রকম সরিসৃপ ও সাপ। তবে এখানকার সেরা আকর্ষণ উল্লুক।

কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৬০ কিলোমিটার, সিলেট শহর থেকে দূরত্ব হবে প্রায় ৬০ কিলোমিটার। তবে যেতে ট্রেনই সবচেয়ে ভালো। কমলাপুর স্টেশন থেকে সিলেটগামী ট্রেনে উঠে নামবেন শ্রীমঙ্গলে। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটারের দূরত্বে এই উদ্যান। সিএনজি অথবা রিকশাতে করে খুব কম সময়ে পৌঁছে যেতে পারবেন। আর বাসে যেতে চাইলে ঢাকা থেকে মৌলভীবাজারগামী যেকোনো বাসে উঠে পড়লেই হবে, মৌলভীবাজার শহর থেকেও যেতে পারবেন উদ্যানে সি এন জি অথবা লোকাল বাসে চড়ে।

কোথায় থাকবেন
লাউয়াছড়া শহরের কাছেই, এক দিনের মধ্যে জঙ্গল দেখে চলে আসতে পারেন, শ্রীমঙ্গল অথবা মৌলভীবাজারেই সস্তায় থাকার জন্য হোটেল পাবেন। আগে থেকে বন বিভাগের লাউয়াছড়া বিট অফিসে যোগাযোগ করে যেতে পারলে থাকতে পারবেন জঙ্গলের ভিতরে ফরেস্ট রেস্ট হাউসে। তবে রাতে জঙ্গলে থাকার রোমাঞ্চ উপভোগ করতে এখানে থাকা যেতেই পারে। নাজিম উদ্দিন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here