দ্রৌপদী :পূরবী বসু

0
61

দ্রৌপদীকে মহাভারতের নায়িকা হিসেবে মেনে নিতে কারো আপত্তি হবে মনে হয় না। শুধু মহাভারত কেন, সম্ভবত প্রাচ্যের সকল পুরাণ ও শাস্ত্রীয় গ্রন্থের সকল নারীদেরমধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় আবার সেই সঙ্গে কিছু কিছু বিবেচনায় সবচাইতে বিতর্কিত নারী চরিত্রই হলো দ্রৌপদী। পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের কন্যা তাই তাঁর আরেক নাম পাঞ্চালী। তার গাঢ় গাত্র বর্ণের জন্যে তার অন্যনাম কৃষ্ণা। মতান্তরে, তাঁর গায়ে নীলপদ্মের মতো আভা থাকায় তাঁকে কৃষ্ণা বলা হত। এছাড়া তিনি যাজ্ঞসেনী নামেও পরিচিত কারণ যজ্ঞবেদী থেকে তাঁর জন্ম হয়েছিল। অনেকে মনে করেন যজ্ঞবেদী তাঁর জন্মের উৎস হবার কারণেই তিনি কৃষ্ণবর্ণা।
সেই যুগে ফর্সা গায়ের রঙের দারুণ চাহিদা ছিল, বিশেষ করে নারীদের জন্যে এবং নারী যদি গৌরবর্ণা না হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাকে রূপসী বলেও গ্রাহ্য করা হতো না। আর শুধু রূপের জন্যেই নয়, নারীর বংশ পরিচয়, তার সামাজিক অবস্থান, অনেক কিছুকেই গায়ের রঙের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হতো। তা সত্ত্বেও সেই কালে, কৃষ্ণবর্ণা দ্রৌপদী এত বেশি আকর্ষণীয়া ছিলেন যে বলতে গেলে পুরুষ মাত্রই তাকে দেখলে প্রেমে পড়ে যেতেন। দ্রৌপদীর জীবনের অনেক জটিলতা ও যন্ত্রণার মূলেই ছিল তার অসাধারণ দেহ-সৌষ্ঠব।
কৃষ্ণবর্ণা, অপরূপ দেহবল্লভের অধিকারী, তেজী, জেদী, দ্রৌপদী সমগ্র পৌরাণিক সাহিত্যের একমাত্র নারী চরিত্র যে একই সময় পাঁচ স্বামীর সঙ্গে বিবাহিতা ছিলেন। হিন্দু ধর্মে যে পাঁচ জন পুণ্যবতী নারীকে পঞ্চকন্যা আখ্যায়িত করে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, প্রতিদিন তাঁদের স্মরণ করলে সকল পাপ ক্ষয় হয়ে যাবে, সেই পঞ্চকন্যার একজন বিশেষ তারকা দ্রৌপদী। অন্য চার জন হলেন, অহল্যা, কুন্তি, তারা ও মন্দোদরী।
“অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তি
তারা, মন্দোদরী তথা।
পঞ্চকন্যাঃ স্মরেন্নিত্যৎ
মহাপাতক নাশনম্।’’
এর অর্থ হলো, অহল্যা, দ্রৌপদী, কুন্তী, তারা আর মন্দোদরীÑএই পাঁচ কন্যাকে যিনি নিত্য স্মরণ করবেন, তিনি মহাপাপের হাত থেকে উদ্ধার হয়ে যাবেন। মানে, তাঁর সব পাপ নাশ হয়ে যাবে। এই পঞ্চকন্যার প্রত্যেকের মধ্যে কতগুলো সাধারণ বৈশিষ্ট্য বর্তমান, এঁরা সকলেই অত্যন্ত সুন্দরী এবং গুণবতী। প্রত্যেকেই বিদূষী, সম্ভবপর সকল বিষয়েই পারদর্শী, প্রত্যেকেই বিখ্যাত পুরুষের স্ত্রী। আর শাস্ত্রীয় গ্রন্থের নারী চরিত্র হিসেবে সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, এই পঞ্চ নারীর প্রত্যেকেই এক জীবনে একাধিক পুরুষের সঙ্গে সহবাস করেছেন। বলা বাহুল্য, এই পঞ্চকন্যার মধ্যে তিন কন্যা রামায়নের অহল্যা, মন্দোদরী ও তারা। অহল্ল্যা হলেন গৌতম মুণির সুন্দরী তরুণী স্ত্রী, যাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে ইন্দ্র গৌতমের অনুপস্থিতিতে তাঁর বেশ ধারণ করে এসে অহল্লার কাছে সঙ্গমের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। অহল্ল্যা গৌতম-রূপধারী ইন্দ্রকে চিনতে পারা সত্ত্বেও তাঁর ডাকে সাড়া দেন। সঙ্গম শেষে গৌতম মুনী এসে পড়লে অহল্ল্যা ইন্দ্রকে পালাতে সাহায্য করলেও ইন্দ্রকে গৌতম মুনির চোখে পড়ে যায়। তিনি স্ত্রী অহল্লাকে অভিশাপ দিয়ে নিজ বাগানে প্রস্তর মূর্তি করে রেখে দেন। গৌতম বলেন, ‘কোনোদিন যদি রামচন্দ্র এখানে এসে অহল্ল্যাকে ক্ষমা করে দেন, তাহলেই কেবল তার মুক্তি ঘটবে। অন্যথায় অহল্লা এইভাবে প্রস্তর হয়েই থাকবেন’। বহুবছর পরে বনবাসে গেলে একদিন রাম ও লক্ষণ ঘুরতে ঘরতে গৌতম মুনির বাগানে এসে উপস্থিত। অহল্ল্যার কাহিনী শুনে রাম তাঁকে ক্ষমা করে দিলে অহল্লা আবার তার অবয়ব ফিরে পান এবং বাকি জীবন স্বামী গৌতমের সঙ্গে ধ্যান-তপস্বা করে কাটিয়ে দেন। আর ওদিকে মন্দোদরী হলেন লঙ্কার রাক্ষসরাজা রাবনের প্রধান মহিষী যিনি অত্যন্ত সুন্দরী, গুণান্বীতা ও রণকর্মে পারদর্শী। সীতাকে অপহরণসহ রাবনের যাবতীয় অপকর্মকে মন্দোদরী নিন্দা করলেও স্বামীর বিপদের দিনে তিনি ঠিকই এসে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। স্বামীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন তিনি। মন্দোদরির স্বামী ও পুত্র, যথাক্রমে রাবন ও মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ এই যুদ্ধে মারা গেলে রাম, রামের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতার পুরস্কার স্বরূপ, মন্দোদরিকে এনে বিভীষণ অর্থাৎ রাবনের বিশ্বাসঘাতক ভাইয়ের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেন। যতদূর জানা যায়, পঞ্চকন্যায় বর্ণিত তারা বানর রাজা বালির ও পরে বালির সহোদর সুগ্রীবের স্ত্রী; শাস্ত্রীয় রচনায় অন্য যে তারার সন্ধান আমরা পাই, যে তারাপুরাণে কথিত বৃহস্পতির স্ত্রী, যাকে বৃহস্পতির শিষ্য সোম বা শুক্র অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল এবং যার সঙ্গে তারার শারীরিক মিলন ঘটার ফলে বুধ বলে এক পুত্রের জন্ম হয়, যেই তারার এইসব সকল কথা জানা সত্ত্বেও বৃহস্পতি তাঁকে আবার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন যখন তারা শুক্রের পুত্র বুধকে শুক্রের কাছে রেখে বৃহস্পতির কাছে ফিরে আসেন রাবনের বিরুদ্ধে রামকে যুদ্ধে সাহায্য করার বিভীষণকে উপঢৌকন হিসেবে যেমন মন্দোদরিকে দেয়া হয়েছিল স্ত্রী হিসেবে, একই রকমভাবে রাবনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বানর রাজ সুগ্রীবের নিঃশর্ত সহযোগীতার পুরস্কার হিসেবে, যুদ্ধে সুগ্রীবের সহোদর বালি মারা গেলে, বালির স্ত্রী তারাকে রাম সুগ্রীবের সঙ্গে বিয়ে দেন। এক্ষেত্রে সদ্য স্বামীহারা শোকাতুরা এই দুই নারীর প্রকৃত ইচ্ছা কী ছিল, তক্ষুণি বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগ্রহ তাদের ছিল কিনা সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় ছিল না। রামের ইচ্ছা, আদেশ ও বিভীষণ এবং সুগ্রীবকে পুরস্কৃত করাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অন্য দুই কন্যা মহাভারতের কুন্তি ও তার পুত্রবধূ দ্রৌপদী। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এই পঞ্চকন্যার মধ্যে হিন্দুদের সবচাইতে পূজনীয়, সবচেয়ে আদর্শ সতীসাধ্বী পুণ্যবতী বলে খ্যাত প্রখ্যাত নারী সীতা বা সাবিত্রীর স্থান হয়নি। সীতা যে আবহমান ভারতীয় মনোজগতে কতখানি স্থান অধিকার করে আছে তার মস্ত প্রমাণ নিম্নে উল্লেখিত একটি গুরুত্বপূর্ণ জরিপের ফলাফল থেকে বোঝা যায়।
কালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যালী সাদারল্যান্ড ২০০৫ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশে এক হাজার তরুণ-তরুণীর ওপর একটি সমীক্ষা চালান। তাদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় নারী চরিত্র কে, সেটা যাচাই করে নেবার জন্যে প্রাচ্য মিথোলজির কয়েকটি প্রখ্যাত চরিত্রের সঙ্গে তাদের পছন্দ করার জন্যে দেওয়া হয়েছিল সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের বিখ্যাত সব নায়িকা, স্বনামধন্য কয়েকজন লেখক (জনপ্রিয় জীবিত লেখকসহ) ও শিল্পীসহ বিভিন্ন বিষয়ে অসামান্য কৃতিত্বের অধিকারী বেশ কয়েকজন উজ্জ্বল নক্ষত্রের নামÑসব মিলিয়ে মোট ২৪ জন, যাঁরা সকলেই নারী। ফলাফলে দেখা যায় অধিকাংশ ভোট পেয়ে অনেক ব্যবধানে প্রথম হয়েছে দুহাজার বছরের পুরোনো পৌরাণিক ও কল্পিত চরিত্র সীতা। কোন রক্তমাংসের মানুষ নয়, এমনকি পৌরাণিক নারী দ্রৌপদী বা কুন্তির মতো কেউও নয়। অত্যন্ত দুর্বল প্রকৃতির, নির্বিরোধী, সর্বংসহা, নির্জীব এক নারী সীতা। সে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে না, পারে না কোন প্রতিবাদ করতে। নিজের বা অন্য কোন নারীর প্রতি অন্যায়, দুর্ব্যবহার অথবা কটুক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সে অক্ষম। অথচ এই রকম একটি জড় পদার্থই ভারত উপমহাদেশের আদর্শ নারীর উদাহরণ, সেই আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত। মুখ বুজে সকল অত্যাচার সইবার ভূমিকায় লোকে (পুরুষ-নারী উভয়েই) বরাবর দেখতে চায় নারীকে। আর সেটা দেখেই অভ্যস্ত তারা। আত্মসচেতন, প্রতিবাদী, অবিচারের প্রতিশোধ নিতে আগ্রহী, তেমন তেজী কাউকে পছন্দ নয় তাদের। অন্তত একজন নারী হিসেবে এই শেষোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো একেবারেই গ্রহণীয় বা বাঞ্ছনীয় নয়। ফলে সীতা-সাবিত্রী যেমন জনপ্রিয়, দ্রৌপদী বা কুন্তি, অথবা গান্ধারী তেমন নয়। সেসব সত্ত্বেও কুন্তি ও দ্রৌপদী পঞ্চকন্যায় অন্তর্ভুক্ত হলেও সীতাসাবিত্রী হননি। অবশ্য অন্য আরেক ঘরণার পঞ্চকন্যার নির্মাণে সীতাসাবিত্রীর অন্তর্ভুক্তির সন্ধান মেলে, কিন্ত সেই বাছাই জনমনে তেমন সাড়া ফেলেনি।
আগেই বলেছি, দ্রৌপদী (পঞ্চালী, কৃষ্ণা) পঞ্চাল রাজ্যের রাজা দ্রৌপদের কন্যা। পূর্বজন্মে দ্রৌপদী এক ঋষির কুটীরে বাস করতেন এবং সারাজীবন অবিবাহিত ছিলেন। শঙ্কর দেবতাকে অনুক্ষণ তপস্যা করতে করতে তাঁর কাছে শঙ্করের আবির্ভাব ঘটে। শঙ্কর তাঁকে বর প্রার্থনা করতে বলেন। দ্রৌপদী তখন তাঁর কাছে পরজন্মে সর্বগুণে গুণান্বীত স্বামী পাবার জন্যে বর ভিক্ষা করেন। শঙ্কর যতবার তাকে বর দিতে চান ততবারই দ্রৌপদী একই কথা বলে। পাঁচবার বলায় পরজন্মে দ্রৌপদীর পাঁচ স্বামী হয়।
তার স্বয়ম্বর সভায় অর্জুন জলের ওপর প্রতিফলিত ছায়া দেখে তার অব্যর্থ তীর ধনুক দিয়ে ঝুলন্ত মাছের চক্ষু ভেদ করে প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে দ্রৌপদীকে বিবাহ করতে সমর্থ হয়। যখন দ্রৌপদীকে নিয়ে পঞ্চ পা-ব বাড়ি আসে, বাইরে থেকে তারা ঘরের ভেতরে বসা মা কুন্তীকে জানান, ‘মা, আমরা তোমার জন্যে ভিক্ষা করে এনেছি এক রমনীয় পদার্থ।’ ভেতর থেকেই কুন্তি বললেন, ‘যা এনেছ, পাঁচ ভাই ভাগ করে নাও।’ কুন্তি জানতেন না তারা দ্রৌপদীকে নিয়ে এসেছে। এদিকে দ্রৌপদীকে স্বয়ংবর সভায় দেখা অব্দিই পাঁচ ভাই কামার্ত হয়ে পড়েছিলেন। মায়ের এই আদেশের পরে তখন যুধিষ্ঠিরের কথায় পাঁচ ভাইয়ের অর্থাৎ পঞ্চ পা-বের (পঞ্চপা-ব হলেন যুধিষ্ঠির, ভীম, অর্জুন, সহদেব ও নকুল) সঙ্গেই দ্রৌপদীর বিয়ে হয়ে যায়। তবে পরবর্তীকালে ভীম আর অর্জুন দ্রৌপদী ছাড়াও আরো কয়েকটি বিয়ে করেন এবং প্রতি স্ত্রীর সঙ্গেই তাদের একটি করে পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তাই দেখা যায়, দ্রোপদীর পঞ্চ স্বামী ছিল দ্রৌপদীর ইচ্ছেয় নয়, পা-বদের মাতৃ আজ্ঞা পালনের কারণে। অথবা পূর্বজন্মের বরের ফলে। অথবা পঞ্চ পা-বের দ্রৌপদীকে দেখে কামার্ত হয়ে পড়ার কারণে। তা নইলে তার স্বামী কেবল অর্জুনেরই থাকার কথা। এমন একটি অবিচারের বিরোধিতা করলেন না কেন দ্রৌপদী? তিনি কি জানেন না, স্বয়ংবর সভায় যার গলায় মালা দেওয়া হয় কেবল সেই হয় কণের স্বামী? দ্রৌপদীর অবস্থা দেখে প্রতিভা বসু মন্তব্য করেন, ‘দ্রৌপদী যেন খেলার বল। একের কাছ থেকে (যাচ্ছে) অপরের কাছে।’
পাঁচ স্বামী ছাড়াও শ্রীকৃষ্ণের প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি ছিল দ্রৌপদীর। কৃষ্ণ ছিল দ্রৌপদীর সখা, বিপদের দিনে যাঁর ওপর নির্ভর করতে পারতেন দ্রৌপদী। বহু নারীর দেহ ভোগকারী, সতত নারী-সঙ্গ-কাতর কৃষ্ণ এবং পাঁচ স্বামীর স্ত্রী দ্রৌপদীর মধ্যেকার বন্ধুত্ব কিন্তু ছিল পুরোটাই প্লেটোনিক। মহাভারতের কথা অনুসারে পরস্পরের প্রতি গভীর টান ও ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও কৃষ্ণ ও দ্রৌপদীর সম্পর্কের ভেতর যৌনতার কোন স্থান ছিল না। আবার দ্রৌপদীর প্রতি এতটা সহানুভূতিশীল হবার পরেও কৃষ্ণ যখন জানতে পারেন, দ্রৌপদীর বিশেষ পছন্দের স্বামী ও কৃষ্ণের বিশেষ প্রিয়ভাজন অর্জুন দ্রৌপদীর সঙ্গে বিবাহিত থাকা অবস্থাতেই শ্রীকৃষ্ণের বোন সুভদ্রার (যে কিনা সম্পর্কে অর্জুনেরও মামাতো বোন হয় ) প্রেমে পড়েন, স্বয়ং কৃষ্ণ তার সুহৃদ অর্জুন ও সহোদরা সুভদ্রাকে গালমন্দ করে দুজনকে পরস্পরের কাছে থেকে পৃথক করে দেবার চেষ্টার বদলে তাঁদের মিলিত হবার ব্যাপারে সরাসরি সাহায্য করেন, রথে করে দুজনকে পালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করেন। এসব সত্ত্বেও দ্রৌপদীর বিপদের দিনে কৃষ্ণ বারবার এসে দ্রৌপদীকে রক্ষা করেছেন। একবার উন্মুক্ত রাজ্য সভাস্থলে দ্রৌপদীকে পণ রেখে পাশা খেলায় যুথিষ্ঠির দুর্যোধনের সঙ্গে হেরে গেলে দুঃশাসনের মাধ্যমে দুর্যোধন দ্রৌপদীর বস্ত্র খুলে নেবার চেষ্টা করে। সকল পা-ব ও কুরুদের সামনে, এমন কি তাঁর গুরুজন, ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম, শনি, কর্ণসহ তাঁর পঞ্চ স্বামীর সামনে সেটা ঘটতে যাচ্ছে দেখে দ্রৌপদী তার স্বামীদেরসহ তার শ্বশুরালয়ের সকল গুরুজনকে তিরস্কার করেন তারা অধর্মের পথে যাচ্ছে বলে। তেজী, আত্মপ্রত্যয়ী দ্রৌপদী এই অন্যায় মুখ বুজে সহ্য করেননি। শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণ এসে তার কাপড়ের দৈর্ঘ ক্রমাগত বাড়িয়ে দিয়ে দ্রৌপদীর এই প্রচ- অসম্মান থেকে, চূড়ান্ত লজ্জা থেকে রক্ষা করেন। এছাড়াও কৃষ্ণ দ্রৌপদীকে আরেকবার খুব সাহায্য করেছিলেন। পা-বরা তখন বনে, দূর্বাসা মুনী পা-বদের কুটীরে উপস্থিত হন তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে মধ্য ভোজনের জন্যে। দূর্বাসার মেজাজের জন্যে সকলে তাকে ভয় করে। দ্রৌপদীর ঘরে কণামাত্র খাবার রয়েছে। তাঁর অনুরোধে শ্রীকৃষ্ণ এসে সেই কণা থেকে সকলের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণে উপাদেয় খাদ্য তৈরি করে দেন। দূর্বাসা খুশি হয়ে চলে যান, এবারো দ্রৌপদতা তাঁর অক্ষম ও নিশ্চল স্বামীদের তিরস্কার করেন তাদের কোন ভূমিকা না রাখার প্রতিবাদে।
পাঁচ স্বামীর সঙ্গে যাতে শান্তিপূর্ণভাবে দ্রৌপদী বাস করতে পারেন, নারদ মুনী নিয়ম করে দেন, দ্রৌপদী এক বছর করে এক একস্বামীর সঙ্গে থাকবেন। অন্য স্বামীরা তখন অপেক্ষা করবেন। এক বছর পর অগ্নির ভেতর দিয়ে গিয়ে পুনরায় পবিত্র ও সতী হয়ে তিনি দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে থাকতে শুরু করবেন। এভাবে প্রতি স্বামীকে চার বছর অপেক্ষা করতে হবে এক বছর দ্রৌপদীর সঙ্গ লাভের জন্যে। অর্জুন একদা এই নিয়ম ভঙ্গ করার অপরাধে তাকে এক বছরের জন্যে ব্রহ্মাচার্যে যেতে হয়েছিল আরো দূরে বনে। সেখানে গিয়ে অবশ্য অর্জুন ব্রহ্মাচার্যের বদলে আরো তিন খানি বিয়ে করেন, চিত্রাঙ্গদা, সুভদ্রা (কৃষনের বোন), ও উরুপীকে (রাক্ষস-কন্যা)। দ্রৌপদী সকল স্বামীকে শুধু শান্তিতে রাখেননি, সকলের আগে ঘুম থেকে উঠে সামান্য কিছু খেয়ে সারা দিন সমস্ত কাজকর্ম শেষে সকলের পরে শুতে যেতেন। তবে দ্রৌপদী একটা নিয়ম করে দেন তার স্বামীদের যা মেনে চলতে হয়। দ্রৌপদী জানতেন তার স্বামীদের কারো কারো আরো স্ত্রী রয়েছে। কিন্তু দ্রৌপদীর নির্দেশে তারা কেউ প্রাসাদে ঢুকতে পারত না। তাদের সঙ্গে মিলিত হতে হলে তার স্বামীদের বাড়ির বাইরে গিয়ে সেই স্ত্রীর সঙ্গে মিলিত হতে হতো। কৃষ্ণের সহোদরা অর্জুনের স্ত্রী সুভদ্রার বেলায় শুধু এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছিলেন দ্রৌপদী। পাঁচ স্বামীর মধ্যে অর্জুনের প্রতি দ্রৌপদীর কিছুটা পক্ষপাতিত্ব থাকলেও ভীমই একমাত্র স্বামী যে স্ত্রীর বিপদের দিনে এগিয়ে এসে সবসময় সাহায্য করার চেষ্টা করেন। বনবাসকালে রাজা বিরাটের স্ত্রী সুদেষ্ণার ভাই কচক দ্রৌপদীকে জোর করে ভোগ করতে চাইলে দ্রৌপদীর অনুরোধে আর কেউ নয়, ভীম এসে কচককে খুন করে। রাজসভায় সকলের সামনে দ্রৌপদীকে জিম্মি রেখে পাশা খেলে যুধিষ্ঠির হেরে গেলে দুর্যোধনের আজ্ঞায় দুঃসাশন দ্রৌপদীর কাপড় খুলতে উদ্যত হলে স্বামীদের ভেতর একমাত্র ভীমই বাধা দেয়। যদিও দ্রৌপদীকে রক্ষা করে শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণ-ই।
কৃষ্ণের স্ত্রী সত্যভমার কাছে দ্রৌপদী স্বীকার করেছেন, পাঁচজন স্বামীকে সন্তুষ্ট রাখতে তাকে কত কষ্ট ও জটিলতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, কতগুলো কঠিন নিয়ম মেনে চলতে হয়। দ্রৌপদী অত্যন্ত বুদ্ধিমতী, বাস্তববাদী নারী। তিনি তার প্রতি অন্যায় আচরণের জন্যে প্রতিশোধ চাইতেন, মুখ বুজে সহ্য করতেন না অবিচার। কিন্তু একই সঙ্গে অন্যের দুঃখে ও ভোগান্তিতে তিনি অত্যন্ত দয়াবতী ও সহানুভূতিশীল ছিলেন।
প্রতি স্বামীর সঙ্গে দ্রৌপদীর একটি করে পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তার পাঁচটি পুত্রকেই পাঁচ পা-ব ভ্রাতা ভেবে ঘুমন্ত অবস্থায় বধ করে অস্ত্রগুরু দ্রোণাচার্যের পুত্র অশত্থামা। অশ্বত্থামার মা একজন ধর্মপ্রাণ নারী ও গুরু। অশত্থামার পিতা কুরু পা-ব সকলের-ই অস্ত্রগুরু। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে দ্রোনাচার্য নিহত হবার কারণেই অশত্থামা পাঁচ পা-বকে বধ করতে আসেন, কিন্তু ভুলক্রমে তাদের ঘুমন্ত পাঁচ সন্তানকে পা-ব ভ্রাতা ভেবে তাদের খুন বসেন। পরে অর্জুন, ভীম ও অন্যেরা যখন অশত্থামাকে আটক করেন, দ্রৌপদী নিজে অশত্থামাকে ক্ষমা করে দেন, তার মায়ের কথা ভেবে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে দ্রৌপদী বুঝেছিলেন একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে বিধবা মায়ের কী অবস্থা হবে। এছাড়া দ্রোনাচার্য ছিলেন পা-বদের শিক্ষক। অশ্বত্থামাকে খুন করা গুরু হত্যার মতোই বিশাল পাপের কাজ। সেই বিবেচনায় এবং পাঁচ পুত্রকে হারিয়ে নিজের শোকাতুর অবস্থা অনুধাবন করে সকলের পরামর্শ ও উপদেশ অগ্রাহ্য করে অশ্বত্থামাকে দ্রৌপদী ক্ষমা করে দেন। দ্রৌপদী চান না তার মতো করে আরেকটি মা এমন প্রচ- শোকে পা-ুর হোক।
অথচ এই দ্রৌপদীই কচকের বাড়িয়ে দেওয়া হাত শুধু প্রত্যাখ্যান করেননি, ভীমকে দিয়ে তাকে খুন করিয়েছেন। একই রকভাবে বনবাসে থাকা কালীন পা-বরা তাকে কুটীরে একা রেখে যখন শিকারে চলে যান, দ্রৌপদীদের কুটীরের পাশ দিয়ে যেতে থাকা জয়দ্রথ (দুর্জোধনের সহোদরা দুঃশিলার পুত্র) দ্রৌপদীকে দেখে বিমুগ্ধ হয়। দ্রৌপদীকে প্রথমে তার সঙ্গিনী হবার আমন্ত্রণ জানিয়ে যখন ব্যর্থ হন, তখন দ্রৌপদীকে অপহরণ করতে উদ্যত হন জয়দ্রথ। জয়দ্রথকে তার এই অপরাধের জন্যে শাস্তি দিতে স্বামীদের অনুরোধ করতে পিছ পা হননি দ্রৌপদী। কিন্তু বরাবরের মতো জয়দ্রথকে অর্জুন ও ভীম আটক করলেও যুধিষ্ঠিরের ধর্মের পথে থাকার সংকল্পে এবং অতি দয়ায় অবশেষে দ্রৌপদীর ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
দ্রৌপদীর পরিণত মানসিকতা, বাস্তব বুদ্ধি ও সহমর্মিতার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ভয়াবহ পরিসমাপ্তি অবলোকনের পরেও। শত পুত্র হারিয়ে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষে গান্ধারী ও ধৃতরাষ্ট্র যখন পাগলপ্রায়, দ্রৌপদী তখন তাঁদের সেবা করে, সান্ত¡না দিয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেন।
এছাড়া, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষে দ্রৌপদী সদ্য বিধবা ও অন্তঃস্বত্বা উত্তরাকে সান্ত¡না দিতে দিতে অত্যন্ত বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ এক পরামর্শ দিয়েছিলেন। দ্রৌপদী বলেছিলেন, বৃহত্তর স্বার্থে ব্যক্তিগত শোক ভুলে এই মুহূর্তে উত্তরাকে মনে জোর এনে যে দায়িত্ব পালনে মনপ্রাণ ঢেলে দিতে হবে তা নিম্নরূপ। পা-বদের একমাত্র জীবিত উত্তরাধিকারী -একমাত্র পরবর্তী প্রজন্মের পা-ব যে তখনো উত্তরার গর্ভে বিকশিত হচ্ছে, সেই আভূমিষ্ঠ অর্জুন-পৌত্র পরীক্ষিৎ, এর পরিচর্যা ও লালনপালনে পরিপূর্ণ মনোযোগী হতে হবে উত্তরাকে। যদিও উত্তরার স্বামী অভিমন্যু অর্জুনের সন্তান হলেও দ্রৌপদীর সন্তান নয়। অভিমন্যু অর্জুনের ও তাঁর অন্য স্ত্রীর অর্থাৎ দ্রৌপদীর সতীন সুভদ্রার পুত্র। কিন্তু যেহেতু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধশেষে পা-বকুলে পরীক্ষিৎ-ই ছিল একমাত্র ও অবশিষ্ট জীবিত উত্তরাধিকারী, তাঁর রক্ষণাবেক্ষণ বড়োই জরুরি পা-বকুলের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যে, যে লক্ষ্যে দ্রৌপদীর শাশুড়ি কুন্তী আজীবন লড়ে গেছেন।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার বীরাঙ্গনা কাব্যে অর্জুনের কাছে দ্রৌপদীর লেখা একখানা চিঠি সংযোজন করেন। মাইকেলের কল্পনায় অর্জুনের প্রতি বিশেষভাবে দুর্বল দ্রৌপদী সেই চিঠিতে তীব্র প্রতিবাদ করেন স্বামীর ছলনা, দীর্ঘ বিরহ এবং তার প্রতি অর্জুনের ঔদাসিন্যের জন্যে। ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির যখন পাশা খেলায় পরাজিত ও রাজ্যচ্যুত হয়ে বনে বাস করছিলেন, মহাবীর অর্জুন শত্রু দমনের উদ্দেশ্যে অস্ত্রবিদ্যা শিখতে সুরপুরে চলে যান। কিন্তু অস্ত্রশিক্ষার নাম করে সেখানে গিয়ে নানারকম ভোগবিলাসে মেতে ওঠেন অর্জুন। এর প্রতিবাদেই স্ত্রীর অধিকার নিয়ে লেখা তার এই পত্রে বিরহী ও প্রতারিত দ্রৌপদীর মর্মবেদনা ও ঈর্ষা ফুটে ওঠে। পঞ্চ স্বামীসহ দ্রৌপদী যখন পরিণত বয়সে পদব্রজে স্বর্গারোহন করছিলেন, সারাজীবনে এত পুণ্য করা সত্ত্বেও কেবল পাঁচ স্বামীকে সমপরিমাণ ভালোবাসতে না পারার অপরাধে এবং অর্জুনের প্রতি বিশেষ দুর্বলতা থাকার জন্যে দ্রৌপদী পদব্রজে স্বর্গারোহন করতে পারেন না। পর্বতশৃঙ্গ থেকে ঢলে পড়ে যান। নিজে পায়ে হেঁটে স্বর্গে যেতে পারেন না। অথচ অতি মনোরম দেহ সৌষ্ঠবের অধিকারী কৃষ্ণাঙ্গি দ্রৌপদী সারাটা জীবন অসংখ্য পুরুষের লোভী দৃষ্টি ও আগ্রাসনকে যেভাবে প্রতিহত করেছেন, স্বর্গে যাবার ছাড়পত্রে তার কতখানি মূল্যায়ণ হয়েছিল বলা শক্ত।
২০১১ সালে ভারতের রাজ্যসভার প্রাক্তন সদস্য যারলাগাদ্দা লক্ষ্মীপ্রসাদ (Yarlagadda Lakshmi Prasad) যিনি ২০০৩ সালে তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্যে ভারত সরকারের কাছ থেকে পদ্মশ্রী উপাধি পেয়েছিলেন, তেলেগু ভাষায় ‘দ্রৌপদী’ নামে এক উপন্যাস লেখেন যেখানে তিনি তাঁর কল্পনায় দ্রৌপদীর যৌন আকাক্সক্ষা, পছন্দ অপছন্দের ব্যাপারটা বিস্তৃতভাবে বিধৃত করেন। কর্নের প্রতিও দ্রৌপদীর দুর্বলতা ছিল বলে ঐ উপন্যাসে ইঙ্গিত রয়েছে, যেটা লেখক লক্ষ্মীপ্রসাদের নিজস্ব কল্পনা, যার উল্লেখ মহাভারতে নেই। ২০১২ সালে ভারতের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছে এই বই।
কিন্তু লক্ষ্মীপ্রসাদকে তার উপন্যাস দ্রৌপদীর জন্যে ডানপন্থী হিন্দু রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে অত্যন্ত নোংরা ভাষায় গালাগাল করেছে, কেননা এই উপন্যাসে লক্ষ্মীপ্রসাদ তাঁর মতো করে অত্যন্ত খোলামেলাভাবে দ্রৌপদীর যৌনতা, স্বামী হিসেবে পঞ্চপা-বের মধ্যে তার নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ, সর্বোপরি কর্নের দিকে দ্রৌপদীর চোখ পড়ার কথা উল্লেখ করেছেন। কট্টর হিন্দুদের কাছে মনে হয়েছে, যদিও এটি একটি উপন্যাস, তাহলেও সাহিত্য একাডেমি একে পুরস্কৃত করে হিন্দু ধর্মকে অপমান করেছে। এটি নাকি পর্নোগ্রাফির সমতুল্য। আর সেটা করা হয়েছে হিন্দুদের পূজনীয় নারী চরিত্র দ্রৌপদীকে নিয়ে। তারা এই গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করার অনুরোধ জানান সরকারের কাছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছেও লেখক ও তার পুস্তকের বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ যায়। কিন্তু দৃঢ়চেতা লক্ষ্মীপ্রসাদ সটান এবং স্থির দাঁড়িয়ে আছেন নিজস্ব স্থানেÑশক্ত মাটির ওপরে। এতটুকু সমঝোতা করার লক্ষণ নেই সেখানে। লেখকের কল্পনা ও তার লেখার স্বাধীনতায় তিনি বিশ্বাস করেন। সাহিত্য একাডেমি এই পুরস্কারটির নির্বাচনকালে ওই একাডেমির প্রেসিডেন্ট ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সুনীলের আমলে এমন একখানি গ্রন্থ একাডেমি পুরস্কার পেলে অবাক হবার কিছু নেই। লেখকের কল্পনা ও সৃষ্টিশীলতাকে আর যেই হোক অন্তত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো সৃষ্টিশীল লেখক গলা টিপে মারার কথা কল্পনা করেননি বলেই আমাদের ধারণা। আসলে, সৃজনশীলতার গতি বন্ধ করার ক্ষমতা কারো নেইÑথাকা উচিত নয়। প্রাচ্য মিথোলজির ঘটনা ও চরিত্রগুলো আজকের লেখকদেরও প্রবলভাবে আন্দোলিত করছে। এইসব ধ্রুপদী ও শাস্ত্রীয় সাহিত্যের, বিশেষ করে মহাকাব্য মহাভারতের এবং তার বৈচিত্র্যময় চরিত্রদের, আবেদন সার্বজনীন, চিরন্তন। আর তাই নবরূপে, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে সমকালীন সমাজের সঙ্গে সাজুয্য রেখে উপস্থাপিত হচ্ছে হাজার হাজার বছরের পুরাতন উপাখ্যানের অংশবিশেষ, এর বিভিন্ন অনুষঙ্গ, চরিত্র, চরিত্রের নাম ও অন্তর্নিহিত দর্শন, ঘটনার বাঁক। বর্তমান লেখক-শিল্পীরা পুরাণের আখ্যানকে, চরিত্রকে, বিশেষ করে নারী চরিত্রকে নবায়ন করছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ হয়ে সমসাময়িক লেখক ও কবি পর্যন্ত এই নবায়নের ধারা বিস্তৃত। লক্ষ্মীপ্রসাদেও ‘দ্রৌপদী’ এরই ভেতর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পূরবী বসু : প্রাবন্ধিক, কবি ও ঔপন্যাসিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here