জয় ক্রিকেট, জয় বাংলাদেশ : ড. এলগিন সাহা

0
51

 

শ্রীলংকার অবিশ্বাস্য জয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপটা দারুণ জমে ওঠেছে। সকলেই ভেবেছিল নিউজিল্যান্ড, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত এই চারটা দেশই সেমিফাইনাল পর্যায় খেলবে। বিবিসিতেও গ্লোরিয়া মজুমদারের উক্তি উদ্ধৃতি করে বলেই ফেলল এই চারটা দলের বাইরে আর অন্য কারো স্থান পাওয়ার সম্ভাবনাই নেই। যে যেমন দল সে তেমনভাবেই কাজ করছিল, খেলার মধ্যে চমক খুব বেশি একটা ছিল না। তবে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার সাথে হেরেও ক্রিকেট বোদ্ধাদের দেখিয়ে দিয়ে কীভাবে লড়াই করতে হয়। এর আগে তিনশ’র ওপরে অধিক রান তাড়া করে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর যে সুখ ছিল, অস্ট্রেলিয়ার সাথে হেরেও বাংলাদেশ ক্রিকেটের যে মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে তা এক অনন্য ইতিহাস।
আমাকে এক বিদেশি প্রশ্ন করেছিল, দেশ ও কৃষ্টি হিসেবে তোমাদের তো ফুটবলের ওপরেই প্রাধ্যান্য দেয়া উচিত ছিল বেশি হঠাৎ ফুটবলকে ছেড়ে ক্রিকেটের ওপরে এত মাতোয়ারা হলে কেন? আমার মনে আছে, স্টেডিয়ামে আবাহনী-মোহামেডানের ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে যত না নাকাল হয়েছি তার চেয়েও ফুটবলের জন্য উন্মাদনা কমেনি কোনোদিন। প্রশ্নটি আমাকে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভাবিয়ে তুলল। বললাম, এত বছর ফুটবল খেলে পৃথিবীতে আমাদের স্থান ১৮০ এর ওপরে। কিন্তু ক্রিকেটে আমরা টপ টেন। তাই বলো আমাদের উন্মাদনাটা কোথায় বেশি হওয়া উচিত। গত কয়েক বছর বাংলাদেশ ক্রিকেটে যে উন্নতি করেছে তা অনেক ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরাই বাংলাদেশের প্রশংসা না করে পারেনি। অস্ট্রেলিয়ার সাথে হারের পরেও বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কে অনেকেই অনেক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশি হিসেবেও আমাদেরও উৎসাহে ভাটা পড়েনি। ২০ তারিখ পর্যন্ত খেলার ফলাফল দেখে ওপরে উল্লেখিত চারটি দেশই খেলায় টিকে থাকবে অন্য কেউ নয়। কিন্তু ২১ তারিখ রাতে শ্রীলংকা এক বিরাট অঘটন ঘটিয়ে ফেলল, সকলের হিসাব-নিকাশ ওলোট-পালোট হয়ে গেল। পাতা উল্টে এতদিনের হিসেব এখন তাদের বদলাতে হবে।
ক্রিকেটা ইংরেজদের খেলা, আমাদের নয়। গ্রীষ্মকালে ওদের দেশে সূর্য ডুবতে ডুবতে রাত এগারটা বেজে যায়। এত বড়ো প্রলম্বিত দিনে লাঞ্চের পরে তাদের করার তেমন কিছু একটা থাকে না। তাই ক্রিকেট খেলাটা আবিষ্কার করে এই খেলাটাকে তারা শুধুমাত্র কেতাদুরস্তের মধ্যে রেখেছিল এতদিন। ক্রিকেটর নিয়ম-কানুন এতটাই রাজকীয় ছিল যে সেই নিয়মকানুন রপ্ত করতে গেলে ওদের হাবভাব চালচলন অন্যদেরও অনুসরণ করতে হয়। তাই দুইশ বছর যখন তারা রাজত্ব করেছে ক্রিকেটকে তারা শুধুমাত্র নিজেদের পোশাকী খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করেছিল তা নয় বরং তাদের কৌলিন্য বজায় রাখবার জন্য প্রধানত সাদা চামড়াই এই খেলাটা খেলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনেবিশক দেশগুলো যখন স্বাধীন হতে শুরু করে তখন তারা বৃটিশদের রেখে যাওয়া এই খেলাটিকেও রপ্ত করতে শুরু করে। তাই বৃটিশরা যেসব দেশে রাজত্ব করেছে ও ঔপনিবেশ স্থাপন করেছিল তাদের মধ্যেই বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। বহু বছর খেলাটিকে রপ্ত করেও ঔপনিবেশ দেশগুলো ক্রিকেট খেলার মান তেমনটি বেড়ে উঠতে পারেনি। যখন উঠতে শুরু করল তখন বিভিন্ন নিয়মের বেড়াজাল সৃষ্টি করে তারা তাদের কৌলিন্য বজায় রাখতে সচেষ্ট হলো। কিন্তু সুখের বিষয় এই যে যাদের দেশে এই রাজকীয় খেলার সৃষ্টি হয়, যারা এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের কৌলিন্য বজায় রাখার নামে একের পর এক নিয়ম সৃষ্টি করেছে তারা আজ পর্যন্ত ক্রিকেটে বিশ্বকাপ জয় করতে পারেনি। তাই তাদের মনে আক্ষেপ থাকাটা স্বাভাবিক। তারা এই আক্ষেপটা বহু বছর বহন করে আসছে। কিন্তু এবার তারা যথাযথ প্রস্তুতি নিয়েই এবার মাঠে নেমেছিল। শুধু তাই না এবার যে ইংল্যান্ড একটা সম্ভাব্য বিজয়ী দেশ হতে যাচ্ছে, বিশ্বকাপ জয় না করে তারা কোনোমতেই ক্ষান্ত হবে না এমন একটা মনোভাব তারা তৈরি করতে সচেষ্ট ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। বলা হয় যে বর্তমান বিশ্বে ক্রিকেট শুধু দক্ষতার খেলা নয়, এটা একটা কৌশল ও পরিকল্পনার খেলা। যারা উপযুক্ত পরিকল্পনা করবে, ও সেইমতো তা বাস্তবায়ন করবে তারাই শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে। সেইরকম হিসেব করেই সবকিছু এগিয়ে চলছিল। কিন্তু ২১ তারিখ এক অবিশ^াস ক্রিকেট খেলে শ্রীলংকা সে সমস্ত পরিকল্পনা ভেঙে দিয়ে ক্রিকেট বোদ্ধা ও বিশ্লেষকদের দর্পে এক বিশাল আঘাত হেনেছে। এমনকি বিবিসিও ফলাফল তালিকায় ইংল্যান্ডের অবস্থান শীর্ষে থাকবে বলে ঘোষণা দিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু হায় বিধি বাম! লাসিথ মালিঙ্গা অধিনায়কত্ব পায়নি বলে তার মনে একটা ক্ষোভ থাকা খুব স্বাভাবিক। অনেকেই ভেবেছিল কী জানি লাসিথ মালিঙ্গা এই বিশ^কাপ খেলার আগেই অভিমানে নাকি অবসরের ঘোষণা দিয়ে ফেলেন। সে যাই হোক শুধু লাসিথ মালিঙ্গার জন্যেই নয় ক্রিকেটের জন্যও তার অনেক কিছু দেয়ার অবশিষ্ট ছিল। সেটাই ২১ তারিখে সে দেখিয়ে দিল। বলের ঘূর্ণিতে ইংল্যান্ডকে সে কুপোকাত করে ফেলল। শ্রীলংকা প্রথম ব্যাটিং করে মাত্র ২৩২ রান করতে সক্ষম হয়। বিরতির সময় অনেক বিশ্লেষক দম্ভভরে বলেছিল, ইংল্যান্ডের জন্য এটা কোনো বিষয়ই নয়। এই রান সহজেই তারা টপকে যাবে। না, ইংল্যান্ড সে রান টপকাতে পারেনি। বরং ২১২ রানেই তাদের ইনিংস থমকে যায় আর শ্রীংলংকা অবিশ^াস্য জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে।
সকলেই জানেন ও সকলেই প্রায়শই উচ্চারণ করেন, ক্রিকেট হচ্ছে একটা অনিশ্চয়তার খেলা। ভারতের বিখ্যাত ক্রিকেট ভাষ্যকার গ্লোরিয়া মজুমদার বিবিসেকে দেয়া তার সক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ইংল্যান্ড খুব সহজেই এই রানকে টপকে গিয়ে তালিকার শীর্ষে উঠবে। তা যখন হলো না তখন বিবিসিও এই বিষয়ে আর কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। বরং ২২ তারিখের সকাল বেলার খবরে বাংলাদেশ দলের এক প্রাক্তন নারী ক্রিকেটারের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। সাধারণ ও সাদামাঠা মন্তব্যে সেই বিশ্লেষণ শেষ হয়েছিল। আমার ইচ্ছে ছিল, বিবিসিকে বলি, গ্লোরিয়া মজুমদারের সাক্ষাৎকার নিলেন না কেন?
ক্রিকেট শুধু একটা বিখ্যাত খেলাই নয় বর্তমান বিশে^ এই খেলাটিকে নিয়ে হাজার কোটি টাকার খেলা চলে। মিডিয়া থেকে শুরু করে, বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে ব্যবসা সবছিুকে ঘিরে ক্রিকেট এগিয়ে যাচ্ছে। এবং ক্রিকেট যে এগিয়ে যাচ্ছে এমন নয় বরং এই খেলাটি যে নিয়ন্ত্রণ করছে যে আইসিসি তারা অতীব ঘনিষ্টতার সাথে খেলাটি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রাণপণ করে যাচ্ছে। এতদিন আইসিসির মোড়লগিরি সাদা চামড়াঅলাদের মধ্যেই নিবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিশাল ভারতে খেলাটি জনপ্রিয় হওয়াতে ক্রিকেটজনিত শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্যে ভূমিকা অগ্রগণ্য হওয়াতে আইসিসিতে তাদের স্থান দেয়া হয়েছে। তাই অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও ইংল্যান্ড এই তিন কুতুবই আইসিসির ধারক বাহক ও রক্ষা কবচ হয়ে আসছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক উন্নতি হলেও সেই মোড়লদের মোড়লীপানার জন্যে বাংলাদেশ বেশি খেলার সুযোগ পায়নি। অন্যান্য অনেক দেশের থেকে বাংলাদেশে ক্রিকেট অনেক বেশি জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও মোড়ল দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের ক্রিকেট খেলার সংখ্যা বেড়ে উঠেনি। ফলে ওদের সাথে খেলে আমাদের খেলোয়ারদের দক্ষতা-কৌশল ততটা বাড়েনি যতটা বাড়তে পারেনি। তারপরও বাংলাদেশের ক্রিকেট যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে বাংলাদেশ দিন দিন আরো অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। পাকিস্তান ভারত ও শ্রীলংকার মতো আমরা অবশ্য করি বিশ্ব জয়ী হবো। সেদিনের আর বেশি দেরি নেই। জয় ক্রিকেট, জয় বাংলাদেশ।
ড. এলগিন সাহা : লেখক ও এনজিও ব্যক্তিত্ব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here