সবার উপর মানুষ সত্য : ড. এলগিন সাহা

0
42

৬৯’’ এর গণ আন্দোলনের কারণে আমাদের কলেজ জীবনে বেশ সংক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল। তখন বুঝিনি কিন্তু এখন বুঝি। তখন ভাবতাম হায় রে যারা ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছে তাদের কত মজা। আন্দোলন ও হরতালের নামে তারা কত কম ক্লাস করেছে। আমরা মাঝে মাঝে সেই সব মিটিং শ্লোগানে-শ্লোগানে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা মুখরিত করতাম। ক্লান্ত হলে টিএসসিতে বিরায়ানি খেতাম। তখন সেটা খুব মজাদার ছিল। সেই জীবনটাকে আমরা নটেডেম কলেজ পড়–য়ারা ঢাকা কলেজ পড়–য়াদের ঈর্ষা করতাম। এখন উপলব্ধি করছি কলেজের জীবনটা আর একটু স্থায়ি হলে ভালো হত। আমরা আরো কিছু শিখতে পারতাম। তখন প্রতি দু-তিন বছর অন্তর এমেরিকা বা ব্রিটেন থেকে সদ্য ইউনিভার্সিটি পাস করা ছাত্ররা আমাদের পড়াতে আসত। আবার দু-তিন বছর পর চলে যেত। এ সমস্ত ব্যবস্থা কলেজ কর্তৃপক্ষ করত। ‘‘রথ দেখা ও কলা বেচার মতো ব্যবস্থা’’। লন্ডন থেকে আসা এক ইয়াং শিক্ষক আমাদের পড়াতেন নাম রজার ক্লার্ক (জড়মবৎ ঈষধৎশ) বয়স আমােেদর থেকে খুব বেশি নয়, হালকা পাতলা গড়ন। শিক্ষক হিসেবে মেনে নিতে আমাদের কষ্ট হচ্ছিল। মনে আছে আমাদের সমস্ত অবজ্ঞাকে তুচ্ছ করে দিয়ে রজার স্যার অনেকেরই বন্ধু হয়ে উঠলেন। হঠাৎ করে কুমিল্লায় ঘূর্র্ণিঝড়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়Ñরজারের নেতৃত্বে আমরা ত্রাণ নিয়ে গিয়েছিলাম। সে এক দারুণ অভিজ্ঞতা। রজার ক্লার্কের দল পরিচালনার দক্ষতা ও পরিশ্রমি উদ্যোম আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করেছে। একদিন রজার ক্লার্ক আমাদের বললেন, ক্লাস বিরতির সময় আমি যেন তার রুম থেকে কুইজের খাতাগুলো নিয়ে আসি। তখন নটেডেম কলেজের পিছনে আর একটি তিন তালা দালান ছিল। নিচ তলায় ছিল ক্যান্টিন ও কমন রুম। দোতলা কলেজের সাহায্যপ্রাপ্ত গরীব ছাত্রদের হোস্টেল। তৃতীয় তালায় ভিজিটিং স্যার ও ফাদার শিক্ষকরা থাকতেন। তৃতীয় তলায় উঠার সাহস আমাদের কারো ছিল না। যেহেতু রজার ক্লার্কের আদেশ পেয়েছি। তাই তৃতীয় তলায় উঠলাম। আমাদের কলেজটি সবসময় পরিপাটি থাকত। সম্ভবত এখনও আছে। ছোট একটি ওয়েটিং রুমে কী করব ভাবছি এমন সময় আমাদের কলেজের একজন ফাদার বেরিয়ে এলেন। তিনি ডিগ্রিতে পড়ান। বেশ ভালো ছাত্র ছিলেন। তখন তার বয়স ষাটের কাছাকাছি। তিনি একগাল হেসে বললেন, রজার তো এখন নেই। তুমি কি অপেক্ষা করবে? ফাদার ডেকে তার রুমে নিয়ে গিয়ে আমার নাম জিজ্ঞাস করলেন, বললেনÑবেশ আন-কমন নাম। নটেডেম কলেজ যারা পরিচালনা করেন তারা সকলই ক্যাথলিক (হলি ক্রসের ব্রাদারেরা), আমি বললাম ফাদার আমি ব্যাপ্টিষ্ট। মনে হয় উত্তরটা শুনে তিনি খুশি হতে পারলেন না। তিনি আমাকে বসিয়ে টেবিলের ওপরে রাখা একটা বাক্স টেনে নিয়ে বললেন। দেখ তো এর মধ্যে কী কী আছে? তা বের করে টেবিলের ওপরে রাখ। আমি কলম, রাবার, স্টেপলার ইত্যাদি বের করলাম। তার পর তিনি বললেন বেশ হয়েছে। বললেন আবার সেই বাক্স রাখ। তিনি বললেন, দেখ এই বাক্সটা হচ্ছে আমাদের পৃথিবী। বিভিন্ন ধর্মাবলীম্বরা এক সাথে বাস করি। এই বাক্সে থাকা সককিছু প্রয়োজনে আমাকে সাহায্যে করে। নিজ নিজ ভূমিকা পালন করেছে। তুমিও জীবনে তোমার ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করতে পারলে তোমার জীবন স্বার্থক হবে। যেমন এক পৃথিবীতে অনেক জীবন তেমনি অনেকের জীবন নিয়ে এক জীবন বাপ্টিস্ট ক্যাথলিক মূল বিষয় নয়। ‘‘আমাদের মানবতাই মূল বিষয়’’ সেই শিক্ষা ফাদার যা দিয়েছিল তা আজও ভুলিনি।


সভ্যতা মানুষকে ভদ্র হতে শিখিয়েছে। যা উলঙ্গ, যার আচ্ছাদন নেই তাকে আমরা নগ্ন বলে ভাবি। এই নগ্নতাকে যদি আমরা সভ্যতার মানদ-ে ডেকে রাখতে না পারি তবে তা যৌনতাকে শুরশুরি দিবে। প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে জীব-জানোয়ারের মতো একটা জৈবিক ক্ষুধা রয়েছে । সে জৈবিক চাহিদা ও ক্ষুধা আমরা বিভিন্নভাবে নিবারণ করে থাকি। সাধু-সন্ন্যাসীরা চরম সংযমের মাধ্যমে তাদের জীবনে যৌনতাকে পরিহার করে চলে। তাদের জীবন দর্শনে জৈবিক চাহিদা পূরণের বিষয়টি সম্পূর্ণ পরিত্যজ্য। তাহলে কি হবে। তাদের জৈবিক চাহিদা কীভাবে মিটাবে? হিন্দু পুরাণে এমনকি বর্তমানে বিশিষ্ট সাধু-সন্ন্যাসীদের জৈবিক চাহিদা মেটানোর জন্য সেবা দাসির প্রচলন ছিল এবং আজও তা আছে। সে বিষয়টি সম্পূর্ণ লোকান্তরে হয়ে থাকে। যৌন ক্ষুধা বা চাহিদা নেই এমন মানুষ পৃথিবীতে নেই। কিন্তু সংযম ও নিষ্ঠার সাথে সেই চাহিদাকে বিরত রাখা যায় কিন্তু তার পরেও যদি সংযম ও ধৈর্য হারিয়ে কেউ যদি তার সংযম রক্ষা করতে না পারে। তাহলে তাদের কি খুব বেশি দোষ দেওয়া যায়? তবে নৈতিকতার দিক থেকে বিচার করলে, যে সংযমের জীবনযাপন করতে পারবে না, সে তার প্রতিজ্ঞা ভেঙে সংসার জীবনযাপন করেÑতাতে কোনো দোষের কিছু থাকে না।
পৃথিবীর সবচেয়ে বহুল পঠিত ম্যাগাজিনের মধ্যে অন্যতম প্লেবয় ম্যাগাজিনের লেখক ও প্রতিষ্ঠাতা হিউ-হেফ্নার এ বিষয়ে বেশ খোলাখুলিভাবে বলেছেন। তার ম্যাগাজিনে উন্মুক্ত বসনা নারীদের ছবির বেসাথি করার জন্য তাকে বেশ কয়েকবার আদালতের দারস্থ হতে হয়েছে। বিচারদের সামনে বিভিন্ন জেরার মুখে তিনি নির্লিপ্তভাবে বলেছিলেন, ‘‘ধর্মাবতার পৃথিবীতে এমন কোনো পুরুষ আছে কি? সে যতই ব্যস্ত থাকেন না কেন, কেউ কি যৌনতা বিষয়ে চিন্তা করেন না? কিংবা যৌনতা বিষয়ে চিন্তা করে পুলক অনুভব করেন না। সকলেই করেন। আর আমি সেই বিষয়টাকে প্রকাশ করে একটি শিল্পের মর্যাদা দিতে চেয়েছি মাত্র”। আজ অনেকেই স্বীকার করে নিবেন হিউ হেফনার তার ম্যাগাজিনের মাধ্যমে একটা স্বার্থক শিল্পের মর্র্যদা দিতে পেরেছেন ।
এমন একটা দিন নেই যে দিন দৈনিক পত্রিকায় ধর্ষণের খবর বের হচ্ছে না। বেশিরভাগ ধর্ষণ শিকার হচ্ছে শিশুরা। টকশোগুলোতে প্রচুর আলোচনা হচ্ছে। সবাই তার নিজের মতামত দিচ্ছেন। অনেকে আবার মন্তব্য সহকারে পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতাসম্পূর্ণ ভিন্নÑধর্ষণের হার কমছে না বরং বেড়েই চলছে। যারা স্বভাবত মূল্যাবোধ নিয়ে জীবনে চলতে চান, তাদের কাছে টকশোর বিষয়গুলি বেশ মূল্যাবান বলে মনে হয়, যারা ভবিষ্যৎ ধষর্ণকারী হবে তার কানে এ কথা কে পৌঁছাবে? শুনেছি আরব দেশে ঘরের দুয়ারে তালা না দিয়ে গেলেও কোনো কিছু চুরি হয় না। কারণ চোর জানে ধরা পড়লে তার হাতটি কেটে ফেলা হবে। হাতেনাতে ধরা পড়া ধষর্ণকারীর বেলায় যদি এমন বিচার ব্যবস্থা থাকত তাহলে আমার মনে হয় হঠাৎ করে ধষর্ণের হার শূন্যের কোটায় নেমে আসত। বিষয়টি অনেকের কাছে অমানবিক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যারা চরমভাবে মানবিকতাকে ভূলণ্ঠিত করছে তাদেরকে কোন মানবিবতা প্রদর্শনের মাধ্যমে আমার প্রেম প্রদর্শন করব!
বেশিরভাগ বিবেচক ধর্ষণকে একটা জঘন্য অপরাধ বলে মনে করেন। অনেক তাত্ত্বিক বলেন এটা কোনো অপরাধ নয় এটা ‘বিমেস’ রোগ, তাই ধর্ষকদের চিকিৎসা করা উচিত। সেই সাথে ধর্ষিতাদের যে শারীরিক, সামাজিক, চাপের সম্মুক্ষিণ হতে হয় তার দিকে খেয়াল দেন না। আমি তখন দেশের দক্ষিণাঞ্চলে কাজ করি, ঘের মালিকেরা অন্যায় অবিচার করে চাষীদের জমি দখল করত। সেই বিষয়ে প্রতিরোধ করার জন্য আমরা শোষিতদের নিয়ে দল গঠন করি। অর্থলগ্নি ব্যবস্থা করি। ঘেরে যখন মাছ বড়ো হয়ে উঠছিল, তখন সেই মাছ চুরি ঠেকাবার জন্য তারা পালাক্রমে পাহারা দিত। একটি ছাপড়ায় লাল মোহন ও কিরণ বালা (সদ্য বিবাহিত) যখন পাহাড়ায় ব্যস্ত ছিল তখন বড়ো বড়ো ঘের মালিদের লাঠিয়াল এসে ওদের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে তার সামনে তার স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে (আজ থেকে প্রায় ২৫ বছর আগের ঘটনা) প্রথমে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য সব জায়গা থেকে চাপ আসল। কিন্তু আমি সংগঠনের মাধ্যমে বিষটি কোর্ট পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলাম। যেদিন রায় বের হবে সেদিন আমি নিজে তাকে খবরটি দিব বলে ভেবেছিলামি। বাসায় গিয়ে দেখি তারা ভারতে চলে গিয়েছে। সেদিন সাংঘাতিক মনঃক্ষুণœতা নিয়ে বাসায় ফিরেছিলাম। বুঝলাম এটা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় ছিল না। গ্রাম শালিস, থানা পুলিশ ও কোর্টে বেশ কয়েকবার একই ঘটনার বিবরণ দিতে হয়েছে কিরণমালাকে। সত্যতা প্রমাণের জন্য একই কথা বারবার বর্ণনা করা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে বলা সম্ভব নয়। এ সমস্ত বিষয় কেউ তলিয়ে দেখে না।
বহুদিন আগে একটি বই পড়ে ছিলাম বইটির নাম ‘অপরাধ ও অপরাধ জগত’Ñকলকাতার প্রধান জেলার অবসর গ্রহণের পর বইটি লিখেছেন। বইটির শুরুতে তিনি অপরাধের একটা তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। খুব সহজ ও সরল ব্যাখ্যাটি আজও আমার মনে আছে। সূত্রটি এই অপরাধ করার প্রবণতা [ক] গুণ ১০০ যা হবে তাকে অপরাধ না করতে পারার জন্য বিধিনিষেধ [ মূল্যবোধ=খ] সুতারাং ১০০ক ভাগ খ যদি ফল টি ১০০ এর বেশি হয় তাবে অপরাধটি সংগঠিত হবে। যদি একশর কম হয় তাহলে অপরাধটি সংগঠিত হবে না। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, মূল্যবোধের একটা বিশেষ ভূমিকা আছে। অপরাধ না ঘটনার জন্য ধর্মীয় মূল্যবোধ কিংবা পারিবারিক শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন। যদি সেই মূল্যবোধ শক্তিশালি হয়ে থাকে তাহলে আমাদের জীবনে অপরাধ সংগঠিত হবে না। না হলে অপরাধেইে সমাজ ঢাকা পড়বে। ধর্মবেত্ত্বদের দেখা যায় ধর্ম নিয়ে ফতোয়া দিতে তারা বেশ উৎসাহী। কিন্তু সমাজে ধর্মীয় মূল্যবোধ সৃষ্টিতে তাদের কোনো ভূমিকা দেখা যায় না, যা শিশুটি আজ বেড়ে উঠছে। সে কোন মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে উঠছে। ম্যাডোনার অবক্ষ নারী মূর্তি দেখে কেউ কি যৌনতার শুরশুরি অনুভব করেন। মাইকেলেঞ্জো নির্মিত সেই নগ্ন মূতি দেখে কেউ কি কখনও অশ্লীল বলে ভেবেছেন বরং আমরা যতই তা বিচক্ষণতার সাথে দেখি, আমাদের মনের অজান্তে বেরিয়ে আসে একটি কথা বিউটিফুল, তিনি এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছেন। সানি লিওনের পর্নগ্রাফি দেখে আমরা কেউ সেই কথা উচ্চারণ করব না। জীবনে আমাদের সৌন্দর্যবোধকে সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এবং সেটাকে স্থান দিতে হবে। ধর্ষণের মধ্যে কোনো সৌন্দর্যবোধ লুকিয়ে নেই। এটা কদর্জ, গর্হিত, ও হীন্য মানসিকতার পরিচায়ক। শুধুমাত্র নিজের মাংসিক ইচ্ছা চরিতার্থ করার জন্য যে ধর্ষণে প্রবিদ্ধ হয় তার মাঝে রেসোনালিটি বলতে কিছু থাকে না। সে হয়ে যায় পশুবৎ মানুষ সে সব মানুষকে একবার চিহ্নিত করতে পারলে এমন শাস্তি দেওয়া উচিত যেন, সে রকম জঘণ্য কাজের আরেকবার সুযোগ সে না পায়। হায় মূর্র্খ মানুষ আমরা সমাজে কোনো অবিচার, অত্যাচার দেখা গেলে আমরা প্রতিবাদ করি ঠিক, বিচারের নামে অত্যাচারির শাস্তি চাই কিন্তু সেই শাস্তি কী! সেইমতো অপরাধকে আমাদের সমাজকে সম্পূর্ণভাবে তিরোহিত করবে। তাই অপরাধীর শুধু শাস্তি নয় তাৎক্ষণিকভাবে এমন শাস্তি দেওয়া উচিত যেন মানুষ দেখে এমন শিক্ষা পায় যে, অন্য কেউ এমন কাজ করতে প্ররোচিত না হয়। ২০০০ বছর আগে যীশু খ্রীষ্টের সময় অপরাধীদের ক্রুশে দেওয়ার নিয়ম ছিল। সেই শাস্তি ছিল চরম শাস্তি। অন্যরা যখন দেখত, সেই বিশেষ অপরাধের জন্য কী রকম শাস্তি পেতে হয়, তারা ভয়ে সেই রকম অপরাধের পথে আর পা বাড়ানোর সাহস পেত না। প্রভু যীশু এই রকম অপরাধ দমনের জন্য বলেছিলেন ‘‘যদি কেই কামভাবে কোনো নারীর দিকে দৃষ্টিপাত করে তখনেই সে ব্যাভিচার করে”। দৈহিকভাবে সে ধর্ষণ না করলেও মানসিকভাবে তা সংগঠিত হয়। তাই যীশু বলেছেন, যদি কারো চোখ এমন দোষ করে ফেলে তাবে সে তার দুই চোখ উপড়ে ফেলুক। সমস্ত দেহ নিয়ে নরকের যাওয়ার চেয়ে। দু-চোখ ছাড়া স্বর্গে যাওয়া ভালো।
সভ্যতার ক্রম বিকাশের সাথে সাথে মানুষ ভদ্র হতে শিখেছে। আধুনিকতা নামে যারা উগ্র নগ্নবাদকে প্রকাশ করে তারা কেউই আধুনিকতা মর্মার্থ বোঝে না। প্রকৃত শিক্ষা একজন মানুষকে মানুষ করে তোলে। মানুষের মতো মানুষ হওয়াই আমাদের প্রকৃত ধর্ম। সাহ্যিতিক লুৎফর রহমান তাঁর রচনায় বলেছেন ‘‘পশু পাখি স্বাভাবিক নিয়মেই পশুপাখি, স¦াভাবিকভাবে বেড়ে উঠে। কিন্তু মানুষকে শত চেষ্টায় মানুষ হতে হয়’’। তাই মানুষের মতো মানুষ হওয়াই আমাদের কাম্য, আধুনিকতার নামে বিকৃত যৌন লালসাকে চরিতার্থের স্বার্থে নিজেকে গড্ডালিকা প্রবাহে ভাসিয়ে দেওয়া আমাদের কোনোমতেই উচিত নয়। এ বিষয়ে ছোট বেলা থেকে আমাদের শিক্ষা লাভ করা উচিত। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে, একটি রক্ষনশীল সমাজে বাস করার পরেও এই বিষয়ে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে আমারা ভুলে যাই। আমাদের দেশে ও সমাজে যৌনতার হাতেখড়ি হয় বখাটে বন্ধুদের কাছ থেকে এবং প্রায়শই সেই শিক্ষা যত না সৌন্দর্যবোধের চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে কৃৎসিত ও নগ্নতার পরিচায়ক। উড়তি বয়সে সেই শুরশুরি উপেক্ষা করে সংযমশীলতার পরিচয় দেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু উপযুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা ও পরিবার থেকে এই শিক্ষাটি পেলে যৌনতার কদর্য দিকটি তুলে ধরে আমাদের ছেলে-মেয়েদের ধৈর্য, অপেক্ষার জন্য শিক্ষা দিতে পারি। বলতে পারি খুব বেশি দিন নয় উপযুক্ত ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিলে তোমাদের জীবনেও একজন উত্তম সঙ্গী খুজেঁ দেওয়া যাবে। তখন ঐশ্বরিক আর্শিবাদকে সঙ্গে করে তোমরা নিজ নিজ বিবাহিত জীবনে সুখি দম্পতি হতে পারবে। ধৈর্র্য ও সংযমশীলতা এই বয়সে একমাত্র বিবেচ্য বিষয়।
ইদানীং পত্রিকায় এমন একটা দিন যায় না যেদিন ধর্ষণের খবর ছাপা হয় না এবং সর্বক্ষেত্রে বয়স্ক লোকেরা ও উড়তি বয়সের ছেলেরা শিশুদের ধষর্ণ করে শিরোনাম হয়। বলতে সংকোচ বোধ হচ্ছে না যে অনেক ধর্ম শিক্ষক, মাদ্রাসা শিক্ষক নিজেদের ধর্ষক বলে প্রমাণিত করছেন। নিশ্চিতভাবে ধর্ম এ ব্যাপারে উৎসাহ যোগায় না। এটা মানুষের জৈবিক চাহিদা পূরণের বরং ধর্ম এটা না করতে শিক্ষা দেয়। সামাজিক আচরণ মেনে জৈবিক চাহিদা পূরণ করতে হয় বলে। কারো জৈবিক চাহিদা বেশি হলে সবার্ধিক ৪টি বিবাহ করার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু আমলের পরীক্ষায় সেই ধর্ম শিক্ষকরা যদি নিজেদের ইমান খুইয়ে বসেন, তবে তার কী শাস্তি হওয়া উচিত? সেই শাস্তির বিধান কে করবেন? সামাজিক আইন না ধর্মীয় আইন? ধর্ম রক্ষক যখন ভক্ষকে পরিণত হয় তখন ধর্মের মান যে ভূলুণ্ঠিত হয় সেদিকে কি কারো বিবেচনা আছে? কেন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর আগে, আমাদের ধর্মীয় গুরুরা খোতবা দিতে পারলেন না বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার।
ধর্ম আমাদের দেশের জীবনে একটা বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। ধর্মই আমাদের অনেকের জীবনে প্রধান পরিচয়। তাই ধর্মকে বাদ দিয়ে এই বিষয়ে কোনো প্রতিকার করা সম্ভব নয়। ধর্ম যুগে যুগে মানুষকে সুপথে পরিচালিত করেছে। মানুষের জীবনকে ঐশ^র্যশালি করেছে দেশ ও জাতিকে উন্নতির শিখরে উঠতে সাহায্য করেছে। আমরা যদি কেবলমাত্র ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করি তাহলে সেটা হবে অপরাধের সামিল। দ্বিজাতিতত্ত্ব ভারত মহাদেশেকে শুধু দুটো দেশে বিভক্ত করেনি। ধর্মকে তার উৎকর্ষের দিকে না নিয়ে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা চরিতার্থ করে। সেজন্য ধর্ম একটা হলেও ধর্মের নামে বিভিন্ন রাজনৈতিক উন্মেষ ঘটেছে। রাজনৈতিক স্বার্থকে চরিতার্থ করার জন্য ধর্মীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করেছে। দ্বিজাতিতত্ত্ব আমাদেরকে পাকিস্তান উপহার দিয়েছে। এই প্রক্রিয়া পাকিস্তানে আজও সমানভাবে অগ্রসরমান বলে পাকিস্তান একটা ব্যর্র্থ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। ইসলাম ধর্মের মূল বিষয় হচ্ছে শান্তি। অথচ পাকিস্তানে মসজিদে মসজিদে গোলাগুলি হচ্ছে। এইসব যুদ্ধ ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য নয় বরং নিজের ও রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার নামান্তর। শুরুটা করেছিলাম ধর্ষণ দিয়ে, যে সব ঘটনা ঘটছে চারিদিকে তাকে রহিত করতে হলে ধর্মকে এগিয়ে আসতে হবে প্রথমে। যে ধর্ম আমাদেরকে সৃষ্টিকর্তার দয়া, শান্তি ও রহমতের কথা প্রকাশ করবে ও সৃষ্টিকর্তার পর মানুষকে ভালোবাসতে শেখাবে সেটাই হবে প্রকৃত ধর্ম শিক্ষা। আমি যেন সেই বাণী শুনতে পারছি ‘সবার উপর মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই ’।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here