সেকালের ঢাকার ঈদ :নাজিম উদ্দীন

0
59

ঢাকার ঈদ উৎসবের ইতিহাস বেশ প্রাচীন, ঢাকা মোঘল রাজধানী হওয়ার থেকেও হয়ত পুরনো। পূর্ববাংলায় মুসলমানদের আগমনের পর থেকেই দুই ঈদ পালিত হয়ে আসছে। অর্থনৈতিক অবস্থার কারণে সাধারণ জনগণ নিজেরা সেভাবে উদ্যাপন করতে না পারলেও, উৎসবে শামিল হআে সবাই-ই। আর বাংলার রাজধানী ও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে এবং শাসকগোষ্ঠীর আনুকূল্যে ঈদ, রমজান বা মহররমে উৎসবের আমেজ যে ঢাকায় বেশি ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ উৎসবের নথিবদ্ধ বিবরণ পাওয়া দুষ্কর। মির্জা নাথানের ‘বাহারীস্তান-ই-গায়বী’ (গ্রন্থে বর্ণিত সময়কাল ১৬০৮-১৬২৪)-তে মেলে পূর্ববঙ্গে ঈদের কার্যকলাপের বিবরণ। কিন্তু এর পূর্বেও আফগান-পাঠান শাসকরা যে ঢাকায় ঈদ পালন বা উৎসবের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং তাতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছিল, সেটি ধারণা করা যেতে পারে। কেননা মুসলমান হিসেবে এটি শাসকদের কর্তব্যের মধ্যেই পড়তো। তবে মোঘলরা আসার পরে ঈদ যে আরো জাঁকজমকের সাথে পালিত হতে থাকে।
মির্জা নাথানের বর্ণনাটি ঢাকার না হলেও ধারণা করা যায় যে, ঢাকায়ও একইভাবেই পালিত হতো রমজান ও রোজার ঈদ। রমজানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সকল বয়সীরা বন্ধুবান্ধবের তাঁবুতে জমায়েত হতো, তাদের একসঙ্গে এক শিবিরে থাকাও ছিলো এর অনুষঙ্গ। উল্লেখ্য, ঢাকা তখনো কিন্তু একটি দুর্গ বা কেল্লাকেন্দ্রিক সেনা ছাউনি, তাই এই রীতিগুলো সেখানেও পালিত হওয়া অসম্ভব নয়। তখনো শেষ রোজার সন্ধ্যায় চাঁদ দেখা বেশ উল্লেখযোগ্য ব্যাপার ছিলো, নতুন চাঁদ দেখা গেলেই বেজে উঠতো তূর্য, শুরু হতো গোলন্দাজ বাহিনীর আতশবাজি ও বন্দুকের গুলি ছোঁড়া এবং তোপ দাগা, এসব চলতো প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত। ঈদের দিন প্রাসাদ বা কেল্লা শিবিরে হতো সারা দিন-রাত খানাপিনা, গায়িকা ও নর্তকীদের নৃত্য-গীত ও অমাত্যদের আড্ডা। এছাড়াও দরিদ্র ও অভাবীদের মধ্যে দান-খয়রাত করতেন উচ্চ-পদস্থরা; শ্রমিক বা শিবিরে যারা কাজ করতো তারাও বাদ যেত না।
নির্দিষ্টভাবে ঢাকা শহরে ঈদ উদ্যাপনের প্রথম বর্ণনা পাওয়া যায় আজাদ হোসেন বিলগ্রামীর গ্রন্থ ‘নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খান’-এ (মুর্শিদকুলী খান ঢাকায় ছিলেন ১৭০০-১৭০২ সময়কালে), যা থেকে ঐতিহাসিক আবদুর রহিম লিখেছেন, তৎকালীন নবাব শুজাউদ্দিনের অধীনে ঢাকার সহকারী শাসনকর্তা শোভাযাত্রা করে দূর্গ থেকে এক ক্রোশ দূরে, পথে প্রচুর পরিমাণে অর্থ ছড়াতে ছড়াতে ‘ঈদগাহ’ ময়দানে যেতেন। মনে করা হয় এই বর্ণনা খানিকটা অতিরঞ্জিত। ১৬৪০ সালে ধানম-ির ঈদগাহ তৈরি হয়েছিল বাংলার সুবাদার শাহ সুজার অমাত্য মীর আবুল কাসেম কর্তৃক। ঐতিহাসিক তায়েশের বর্ণনা থেকে জানা যায়, উনিশ শতকের শেষেও সেখানে ঈদের জামাতে যেতেন শহরের মুসলমানেরা, তবে তা হয়ে পড়েছিলো জঙ্গলাকীর্ণ। এর সাথে সেখানে তখন একটি মেলার আয়োজনও করা হতো, যাতে যোগ দিতেন ঢাকা ও আশেপাশের লোকজন। ঈদের সাথে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি মেলাকে সংযুক্ত করে বাঙালি আপন করে নিয়েছিল এ উৎসবকে।
ঢাকার নায়েব নাজিমরা এর সাথে যুক্ত করেন ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণটি, ঈদের মিছিল। যার বেশ কিছু ছবি আছে জাতীয় জাদুঘরে, মহররমের মিছিলসহ মোট ৩৯টি ছবি। ছবিগুলো নওয়াব নুসরাত জঙ্গের আমলে (১৭৮৫-১৮২২) আলম মুসাওয়ার নামের এক শিল্পীর আঁকা। এ মিছিল ঠিক কবে শুরু হয় তা জানা যায়নি, তবে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের অনুমান, হয়ত নিমতলীর প্রাসাদে নায়েব নাজিমরা এসে থাকা শুরু করার পরে এর শুরু (নিমতলী প্রাসাদ তৈরির কাজ সম্পন্ন হয় ১৭৬৬-তে)। এই মিছিল নিমতলী প্রাসাদের ফটকের সামনে থেকে, নানা পথ হয়ে, চক ও হুসেনী দালানের সামনে দিয়ে ঘুরে আবার ফটকে এসে শেষ হতো। মিছিলে থাকতো সুসজ্জিত হাওদাসহ হাতি, উট ও পালকি, যার সর্বাগ্রে থাকতেন স্বয়ং নায়েব নাজিম। কিংখাবে থাকতো ছাতিবরদার, বাদ্যযন্ত্র হিশেবে কাড়া-নাকাড়া ও শিঙ্গা, আর থাকতো রংবেরঙের নিশান। রাস্তায় ফকিরদের সাথে থাকতো নানা খেলা দেখানেওয়ালারা। আর সারি সারি দর্শক জমায়েত হতো রাস্তার দু-পাশে, বাড়ির ছাদে; দেশীয়, মোঘল বা ইংরেজ সাহেব-মেম কেউ-ই বাদ যেত না। ১৮৪৩ সালে নায়েব নাজিম বংশের বিলুপ্তির আগেই হয়ত অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় এ মিছিল। কারণ ১৮২৪ সালে বিশপ হেবার নিমতলী প্রাসাদ জঙ্গলাকীর্ণ দেখে গিয়েছিলেন, সুতরাং নায়েব নাজিমদের অবস্থা তখনই ছিল পড়তির দিকে।
নায়েব নাজিম প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাবার পরে, ঢাকার মুসলমানদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব দেয় ঢাকার নবাব বলে বিখ্যাত খাজা পরিবার। সে সময় ঢাকা ক্ষয়িষষ্ণুু শহর, সংকুচিত হয়ে ধানম-ি প্রায় শহরের বাইরে ও জঙ্গলাকীর্ণ; তাই সেখানে ঈদগাহে জামাত হলেও মানুষের আকর্ষণ কমে যায়। ঢাকার প্রধান দুটি ঈদের জামাত তখন হতে থাকে লালবাগ শাহী মসজিদে এবং নবাববাড়ি জামে মসজিদ ও এর প্রাঙ্গণে।
সে সময় ঈদের চাঁদ দেখার জন্যে নবাববাড়ির ছাদই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত। চাঁদ দেখা গেলে নবাববাড়ি থেকে তোপধ্বনি করে মহল্লাতে জানিয়ে দেয়া হতো, এজন্যে নবাববাড়ির পুকুর, গোলতলবের পাড়ে মহল্লাবাসী ভিড় জমাতো। ঈদ উপলক্ষে মেলা বসতো চকবাজার, আরমানিটোলা ও রমনার মাঠে, তাতে জনসাধারণের সাথে আসতেন নবাব পরিবারের সদস্যরাও। ঈদের আনন্দোৎসবে নবাববাড়িতে নাচ-গান হতো, বায়স্কোপ আসার পরে তা দেখার ব্যবস্থাও করা হতো, আবার নাটক-থিয়েটারও আয়োজিত হতো। তবে এসব আয়োজনে সাধারণের প্রবেশাধিকার ছিলো না। কথিত আছে নবাবরাই ঢাকায় সেহেরির সময় গান গাওয়ার প্রচলন করেন, যা পুরনো ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তারা ঢাকার উল্লেখযোগ্য মসজিদগুলোতে তারাবী পড়ানোর জন্যে ইমাম নিয়োগ দেন এবং খতম তারাবীর জন্যে হাফেজও নিয়োগ করেন।
এরপরে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের, বিশ শতকের ত্রিশ-চল্লিশের দশকের ঈদের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়েছেন মুনতাসীর মামুন; আশরাফুজ্জামান ও আবদুস সাত্তারের আত্মজীবনীমূলক নিবন্ধের বরাত দিয়ে। তারাও উল্লেখ করেছেন সে সময়ের চকবাজারে এবং রমনা ময়দানে ঈদের মেলার। সেখানের দোকানে থাকতো কাঠের খেলনা, ময়দা ও ছানার তৈরি খাদ্য ইত্যাদি, বাঁশের তৈরি খঞ্চা, ডালা প্রভৃতি আর বিকেলে হতো কাবলীর নাচ।
জেমস টেইলর তার বইয়ে (১৮৪০) শুধু ঈদ না, বরং পুরো রমজান মাসকেই উৎসব বলে অভিহিত করেছিলেন। আসলে ছিলোও তাই, হাকিম হাবিবুর রহমানও তার ১৮৯০-এর দশকের রমজান ও ঈদের বিবরণে এ মতকে সমর্থন দেন। তাই পুরো রোজার মাসের বর্ণনাও ঈদের আলোচনার সাথে প্রাসঙ্গিক। তখন রমজানের শুরুতেই অবস্থাপন্ন লোকদের বাড়িঘর ও সকল মসজিদ পরিষ্কার করে চুনকাম করা হতো। এমনকি একটু গরিবরাও চেষ্টা করতো তাদের বাড়িঘর পরিষ্কার করে মাটি দিয়ে লেপে ঝকঝকে করে রাখতে। ঢাকাবাসী সেহরিতে পছন্দ করতো কোরমা আর শীরবিরঞ্জ (এক রকমের দুধের পায়েস), ভাতের সাথে থাকতো শীরমাল রুটি আর পহেলা রোজাতে অবশ্যই থাকতো কোফতা। ইফতারে ডাল বেটে ফুলুরি তৈরি হতো, মুড়ি ছিলো অত্যাবশ্যক; পেঁয়াজ, তেল, মুড়ি মাখিয়ে খাওয়া হতো, এখনকার মতোই। এগুলোর সাথে থাকতো ফালুদা, আর নানা ধরনের শরবত, যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল পেস্তা বাদাম ও তোকমার শরবত। এসবের বেশিরভাগ বাড়িতেই তৈরি হতো, কিন্তু বাইরে বাজার থেকে ভুনা চিড়া ও ‘গোলাবি উখরে’ (ধান, ভূট্টার খৈর সাথে মিষ্টি মিশ্রিত একটি খাবার) আসতোই ইফতারে। ধনী-গরীব সকলেই চকে ইফতার কিনতে যেত ও দুপুর থেকেই তাই সেখানে থাকতো ভিড়। ঢাকার প্রাচীন ঐতিহ্য না হলেও একমাত্র চকেই ছিল লখনৌ থেকে আসা আলাউদ্দিন হালুইকরের দোকান (এখন যা আলাউদ্দিন সুইটস), যেখানে লখনৌর হালুয়া, নিমক পারা, শিরমাল ইত্যাদি পাওয়া যেতো।
এ সকল প্রথা ও ঐতিহ্যর অধিকাংশই এখন আর অবশিষ্ট নেই। সেহরি, ইফতার বা ঈদের দিনের খাদ্যতালিকার বেশিরভাগই বর্তমানে বিলুপ্ত। সুবাদার, নায়েব নাজিম বা ঢাকার নবাবরাও আজ ইতিহাস। তবুও ঈদের জৌলুস কমে যায়নি, বরং যুক্ত হয়েছে নানা নতুন মাত্রা, নানা আয়োজন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here