তীব্র দাবদাহ মৃত্যুরও কারণ হতে পারে

0
21

বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে তীব্র দাবদাহ চলছে। বাংলাদেশে যেমন আমরা তা টের পাচ্ছি, তেমনি ইউরোপের দেশগুলোও ভুগছে। জার্মানি, পোল্যান্ড ও চেক রিপাবলিক জুনে তাদের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করেছে। ভারতের উত্তরে সম্প্রতি ৫০ ডিগ্রির উপরে উঠেছিল তাপমাত্রা। সেখানে ভয়াবহ দাবদাহে ১০০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছে। মারাত্মক গরম মানুষের শরীরে নানা ধরনের প্রভাব ফেলে। এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

গরমে কারা সবচেয়ে ঝুঁকিতে
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ২০০০ সাল থেকে ২০১৬ পর্যন্ত দাবদাহে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১২৫ মিলিয়ন। ২০০৩ সালে ইউরোপে তীব্র দাবদাহের কারণে ৭০ হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। ২০১০ সালে রাশিয়াতে ৫৬ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ ছিল দাবদাহ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আরো জানিয়েছে, বয়োবৃদ্ধ, শিশু, গর্ভবতী, খেলোয়াড় এবং যারা বাইরে কায়িক পরিশ্রমের পেশার সাথে জড়িত তারা সবচাইতে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বয়োবৃদ্ধ, শিশু এবং গর্ভবতী নারী ঝুঁকিতে থাকেন কারণ তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীর থাকে। যারা বাইরে কায়িক পরিশ্রম করেন যেমন-কৃষক অথবা রিকশাওয়ালা, তারা ঝুঁকিতে থাকেন কারণ তারা সূর্যের নিচে বেশি সময় কাটান।
গরমে শারীরিক শ্রম শরীরকে আরও গরম হয়ে ওঠে। বাইরে যারা কায়িক পরিশ্রম করেন তাদের সাথে সাথে খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও এটি বেশি ঘটে।

তীব্র গরমে মানুষের শরীরে যা ঘটে
মানুষের শরীরের রক্ত গরম হয়ে থাকে। মানুষের শরীর আভ্যন্তরীণ তাপ ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখার জন্য কাজ করে। আশপাশে পরিবেশ যদি গরম হয়ে ওঠে তাহলে মানুষ তার শরীর থেকে সেটি দুর করার জন্য কাজ করে।
চিকিৎসকদের মতে, আমাদের শরীরের ওপরে যদি তাপ বেশিক্ষণ থাকে তাহলে তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে হৃদযন্ত্র শরীরের ওপরিভাগ ও ত্বকে বেশি রক্ত পাঠাতে থাকে। সে কারণে বেশি গরম লাগলে অনেক মানুষের চেহারা লাল দেখায়।

হিটস্ট্রোকের লক্ষণ
হিটস্ট্রোকের বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ রয়েছে। প্রধান কয়েকটি হলো-মাথাব্যথা হবে ও মাথা ঘুরবে, শারীরিক অস্বস্তি, অস্থিরতা, বিভ্রান্তি দেখা দেবে, শরীরের ত্বক গরম, লাল ও শুকনো দেখাবে। আক্রান্ত ব্যক্তির সাড়া দেয়ার ক্ষমতা ধীর হয়ে আসবে। তার নাড়ীর গতি তীব্র হতে থাকবে। শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে উঠে যাবে। আক্রান্ত ব্যক্তি এক পর্যায়ে অজ্ঞানও হতে পারে।

ঘাম ও গরমের সম্পর্ক
গরমে আমাদের অনেক ঘাম হয়। ঘাম মানুষের শরীরকে ঠান্ডা করার একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু চারপাশের তাপ যদি আমাদের ত্বকের তাপের সমান বা বেশি হয় তাহলে সেটি কম কাজ করে। শরীরের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রির ওপরে উঠে যাওয়া বিশেষ বিপজ্জনক। বাতাসে আর্দ্রতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর্দ্রতা বেশি হলে ঘাম হতে সমস্যা হয়। আর তাতে শরীরের নিজেকে ঠান্ডা রাখার প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়।

শরীরের ওপর প্রভাব
প্রাথমিকভাবে ত্বকে ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। ত্বক ফুলে যেতে পারে। গরম বেশি লাগলে মানুষের শরীর ঠান্ডা হতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে। রক্ত পরিবহন পথ বড় হয়ে ওঠে। ত্বক ঘাম বের করতে বেশি পরিশ্রম করে। ত্বক ফুলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পা ও গোড়ালিতে এমনটি ঘটে। শরীর থেকে বেশি ঘাম বের হয়ে যাওয়া এবং সেই সাথে যদি রক্তচাপ বেড়ে যায় তাহলে আরও বড় সমস্যা হতে পারে।

হার্ট-অ্যাটাক হতে পারে
দীর্ঘ সময় গরমে থাকলে হৃদযন্ত্রে ওপর প্রভাব পরতে পারে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, বেশি ঘামলে শরীর থেকে পানি কমে যায়। তাতে রক্তের পরিমাণ কমে যায়। তখন হৃদযন্ত্র শরীরের নানা জায়গায় রক্ত পাঠাতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে। যাদের হৃদযন্ত্রে সমস্যা রয়েছে বা যারা ঝুঁঁকিতে রয়েছেন তাদের এমন পরিস্থিতিতে হার্ট-অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে।

আছে মৃত্যু ঝুঁকিও
প্রতি বছর মেক্সিকো এবং ইন্দোনেশিয়াতে অতিরিক্ত তাপের সাথে সম্পর্কিত নানা জটিলতায় বহু মানুষ মারা যান। বাইরের তাপের সাথে শরীর যখন আর সামঞ্জস্য রাখতে পারে না তখন এটি ঘটে। তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৪২ পর্যন্ত গেলে, সেই সাথে যদি আর্দ্রতা বেশি থাকে তখন এমন সম্ভাবনা বেশি থাকে।

দাবদাহে করণীয়
বাইরে কাজ কমিয়ে আনতে হবে। বিশেষ করে বেলা ১১টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সূর্য থেকে দূরে থাকুন। এই সময়টাই দিনের সবচাইতে গরম সময়। ঘর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করুন। পর্দা ব্যবহার করে গরম ঢুকতে বাধা দিন। অথবা জানালার বাইরে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয় এমন বস্তু দিয়ে রাখুন। প্রচুর পানি খেতে হবে। গোসল করুন এবং বারবার মুখ ও শরীরে পানির ঝাপটা দিন। যথেষ্ট বিশ্রাম নিতে হবে। ঢিলেঢালা এবং বাতাস পরিবহনকারী পোশাক পরুন। বাইরে রোদ-চশমা ব্যবহার করুন। তীব্র দাবদাহ চলাকালীন দিনে তিন ঘণ্টার বেশি বাইরে কাটাবেন না। এই সময়ের মধ্যেও ঘনঘন ছায়ায় চলে যান। অ্যালকোহল জাতিয় পানিয় বর্জন করুন।

নাজিম উদ্দীন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here