রমজানে অবশ্যই পালনীয় স্বাস্থ্যবিধি : শওকত আরা সাঈদা

0
45

ইসলাম ধর্মানুসারীদের কাছে রমজান রহমতের মাস। এই রমজান মাসে ভালো থাকার জন্য কিছু স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরামর্শ জেনে রাখুন, যা খাদ্যাভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনযাপন প্রণালীর সামান্য কিছু পরিবর্তন এনে মেনে চললে স্বাস্থ্য ভালো থাকার পাশাপাশি পুষ্টিও নিশ্চিত হবে।

> অনেকেই রোজায় খুব অলস জীবনযাপন করেন। যার ফলে ওজন বেড়ে যায়। এ মাসে তাই কর্মক্ষম থাকা উচিত। অতিরিক্ত ক্যালরি ক্ষয় করার জন্য ইফতারের পর একটু হাঁটলে খাবারগুলো সহজে হজম হয়।
> সবসময় যারা ব্যায়াম করেন তারা রোজায় অনেক সময় বুঝতে পারেন না ঠিক কখন ব্যায়াম করবেন। তারা ইফতারের আগে ব্যায়ামের কাজটা সেরে নিতে পারেন। যেন ব্যায়াম শেষ করার কিছুক্ষণ পরই ইফতার করতে পারেন এবং শরীরকে হাইড্রেট করে নিতে পারেন।
> অনেকেরই রোজার সময় ইফতারে অনেক বেশি খাওয়ার প্রবণতা দেখা দেয় যার ফলে ওজন বৃদ্ধি পায়। তাই ফল ও সবজির সমন্বয়ে তৈরি স্বাস্থ্যসম্মত ইফতার করা, মিষ্টি পানীয় যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চললে এবং কর্মব্যস্ত থাকলে সুস্থ থাকা ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
> মাথা ব্যথা বা ঘুম এড়ানোর জন্য কফি খাওয়ার অভ্যাস থাকলে রোজায় চেষ্টা করুন সেটা বাদ দিয়ে দিতে বা কমিয়ে দিতে।
ইফতারে মাগরিবের নামাজের আগে সব খাবার এতো দ্রুত খাওয়া সম্ভব হয় না তাই প্রথমে খেজুর, স্যুপ, ফল, সালাদ ইত্যাদি খেয়ে নামাজের পরে অন্য খাবার খেলে এই সময়ের মাঝে খাবারগুলো হজম হয়। এর ফলে বেশি খাবার খেয়ে ফেলার অস্বস্তি থাকে না।
> রোজায় সেহেরীর খাবার অনেকেই খান না, যা ঠিক নয়। কারণ সেহেরীর খাবারটা সারাদিনের রোজাকে সহজ ও সহনীয় করতে এবং জীবনীশক্তি ও কাজের শক্তি বজায় রাখার জন্য অত্যাবশ্যকীয়। তাই এই সময়ের খাবারে ভাত, রুটি বা ধীরে ধীরে শোষিত হয় এমন শর্করা সমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করুন।
> বিভিন্ন লবণ জাতীয় খাবার ও টিনজাত বা প্রসেসড খাবার, লবণাক্ত বাদাম, আচার, অতিরিক্ত ঝাল খাবার ইত্যাদি না খাওয়াই ভালো কারণ এগুলো খেলে সারাদিন তৃষ্ণা অনুভব করবেন। এছাড়া অন্যান্য খাবারে লবণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে চেষ্টা করুন এর পরিবর্তে খাবারের স্বাদ বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন সবজি ও ভেষজ মশলা ব্যবহার করুন।
> রোজার সময় যারা রক্তের শর্করার মাত্রা কমে যাওয়ার জন্য মাথা ব্যথা বাধ করেন বা মাথা ঘোরায় তারা ইফতারের শুরুতেই ২-৩ টি খেজুর খেয়ে নিতে পারেন, ফলে তারা কিছুটা সুস্থ বোধ করবেন।
> ইফতার ধীরে ধীরে সময় নিয়ে চিবিয়ে খেতে হবে। যার ফলে মিষ্টি জাতীয় খাবার ও অন্য খাবার বেশি খাওয়া হবে না।
বিভিন্ন ধরনের রকমারি ইফতার রোজায় প্রত্যেকেরই খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু শরীরের সুস্থতা বজায় রাখতে চাইলে সেগুলো প্রতিদিন খাওয়া চলবে না। খুব যদি ইচ্ছে করলে সপ্তাহে একদিন, অন্যান্য সুষম খাবারের সাথে পছন্দনীয় খাবার খুব কম পরিমাণে খেতে পারেন।
> চেষ্টা করুন রোজায় প্রতিদিনের খাবারে অল্প পরিমাণ খেজুর, বাদাম ও শুকনো ফল রাখতে যা সারাদিনের প্রয়োজনীয় পুষ্টি প্রদানের পাশাপাশি শরীরকে সতেজ ও জীবনীশক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
> রোজায় সারাদিন সুস্থ ও কর্মক্ষম থাকার জন্য সেহেরীতে এমন শর্করা সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে যেগুলো ধীর গতিতে হজম হয়। যেমন ভাত, রুটি বা চাইলে বিভিন্ন সিরিয়ালও খেতে পারেন। যার ফলে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
> রোজায় খাবার ও দৈনন্দিন জীবনের কর্মকা-ে পরিবর্তন আসে। যার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। তাই প্রতিদিনের খাবারে ফল, সবজি, ডাল ও পানি রাখতে হবে এবং চেষ্টা করতে হবে কর্মচঞ্চল থাকার।
> রোজায় স্বাস্থ্যসম্মত ইফতার সুস্থতার জন্য খুবই জরুরি। দুইটি খেজুর, এক গ্লাস পানি, বাসায় তৈরি যেকোনো ফলের জুস, এক বাটি গরম স্যুপ, সালাদ এবং কিছু পরিমান শর্করা যেমন ভাত, পাস্তা বা আলুর তৈরি কিছু খাবার থাকলে ভালো, সেই সাথে মাংস, মুরগি বা মাসের তৈরি কিছু খাবার রাখতে পারেন। তবে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে হবে।
> গরম স্যুপ দিয়ে ইফতার শুরু করলে সারাদিন রোজা রাখার পর তা আপনার দেহকে সতেজ করে এবং পরিপাকতন্ত্রকে খাবার হজমের জন্য তৈরি করে।
> প্রচুর পান করতে হবে ইফতারের সময় থেকে সেহেরি খাওয়া পর্যন্ত, কমপক্ষে ৮ গ্লাস। তবে একসাথে বেশি না খেয়ে কম কম করে খেতে হবে। অনেকেই সেহেরীর সময় বেশি করে পানি পান করে নেন সারাদিনের পিপাসা থেকে মুক্ত থাকার জন্য কিন্তু সেটা ঠিক না, এতে পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি হতে পারে।
> ইফতারের তেলে ভাজা খাবার বাদ দেয়াই উচিত কেননা এগুলো খাওয়ার ফলে কোলেস্টেরলের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বেশি তেল মশলাযুক্ত ভারী খাবারের পরিবর্তে স্বাস্থ্যকর হালকা খাবার বাছাই করুন এবং স্বাস্থ্যকর উপায়ে রান্না করা যেমন বেক, গ্রিল, সেদ্ধ বা স্টিম করা খাবার খান।
> ইফতারের পর রাতে ঘুমাতে যাবার আগে কিছু খেতে চাইলে ভারী খাবার না খেয়ে হালকা খাবার খেতে পারেন যেমন ফল, টকদই বা শুকনো ফল। এছাড়া সেহেরীতে রাখতে পারেন ডাল জাতীয় খাবার। খেতে পারেন এক গ্লাস লো ফ্যাট দুধ।
> মিষ্টি জাতীয় খাবার যদি খেতেই হয় তাহলে বাইরে থেকে না কিনে বাসায় তৈরি করুন। লো ফ্যাট দুধ, কম চিনি ইত্যাদি ব্যবহারের ফলে খাবারের ক্যালরির পরিমাণ কমে আসবে। আর ইফতারের প্রথমেই মিষ্টি খাবার খেলে তাতে পেট ভরে যাবার সম্ভাবনা থাকে এবং খাবার হজমে দেরি হতে পারে। এছাড়াও এতে রক্তের শর্করার মাত্রা উঠানামা বেড়ে গিয়ে আর মিষ্টি খাবারের ইচ্ছাকে বাড়াতে পারে।
> মাংস, ডাল, ডিম, দুধের তৈরি জিনিসগুলো প্রোটিনের খুব ভালো উৎস। চেষ্টা করুন এর যেকোনো একটি প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় রাখার জন্য। কারণ প্রোটিন দেহের কোষের জন্য খুব প্রয়োজনীয়। এর ফলে মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়ার ইচ্ছেটা কম থাকবে।
> সালাদ বা স্বাস্থ্যকর খাবারে সৃজনশীল হোন। তেলে ভাজা বা ভারী খাবার না খেয়ে খাবারে বৈচিত্র্য আনতে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত নিত্য নতুন খাবার তৈরি করুন। বিভিন্ন ধরনের ও রঙের সবজি ও ফল দিয়ে বিভিন্ন সালাদ তৈরি করে খান। যার ফলে পুষ্টি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের সমন্বয় হবে যা আপনার দেহকে এবং দেহ কোষকে এই মাসে ভালো রাখতে সাহায্য করবে।
আশা করি সবাই রোজায় সুস্থ থাকবেন এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাবেন।
শওকত আরা সাঈদা : জনস্বাস্থ্য পুষ্টিবিদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here