শষ্কা তো রয়েই গেল : ড. এলগিন সাহা

0
51

পৃথিবী তার নিয়ম মতো চলছিল। আমরাও বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে আমাদের আট-পৌরে জীবন নিয়ে বেশ ব্যস্ত ছিলাম। হঠাৎ করে সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া দুটো দুর্ঘটনা সচেতন মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। সকলের মনে এক প্রশ্ন, বহুবার এই পৃথিবীতে তারা মানবতাকে রক্ষা করেছে, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরিক্ষা, ত্যাগের মধ্যে দিয়ে আজকের এই মানবতা এ পর্যন্ত এসছে। কিন্তু আজ মনে হয় মানবতা সংরক্ষণ প্রক্রিয়াটি প্রচ-ভাবে ব্যাহত হতে চলছে। হ্যাঁ, আমি সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া নিজজিল্যান্ড ও শ্রীলক্সকার কথা বলছি। উগ্র জাতীয়তবাদ ও ধর্মীয় জঙ্গিবাদ মানুষের মানবতা বোধকে কি জানি কোন শঙ্কায় ফেলে দিল। আজ সেই শঙ্কা নিয়ে এই লেখাটা লিখব বলে বসেছি।
বেশ কয়েক বছর আগে ১৯৯৬ সনে Samuel P. Hantington তাঁর ‘The Clash of Civiligation’ লিখে পৃথিবীতে এক বিরাট সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। মানবতাবাদি ও অনেক চিন্তাশীল ব্যক্তি ‘The Clash of Civiligation’ বইটির বিষয়বস্তু নিয়ে অনেকেই আলোচনা-সমালোচনা করেছিলেন। আজ বহুদিন পর আমি মনে করি, স্যমুয়েল হাংটিংটন (Samual P. Hantington) অনেকটাই সঠিক ছিলেন। অনেকে বলেছিলেন সভ্যতার সংঘাত না বলে এটাকে সাংস্কৃতিক সংঘাত বলা উচিত। যে যাই বলুক সংঘাতের গোরার কথা নিয়ে কেউ তেমন একটা চিন্তা ধারণা করেনি Samuel Hantington সভ্যতাই বলুন বা সংস্কৃতির কথাই বলুন সংঘাতের মূলে কিছু মৌলবাদের বিষয় রয়েছে। সে বিষয়ে বিশেষভাবে আলোচনা করার ইচ্ছা থাকলেও সংক্ষেপে এখন কিছু একটা বলতে চাই।
উদাহরণ স্বরূপ দুটো ঘটনার কথা উল্লেখ করছি, দুটো মৌল বোধের ওপর ভিত্তি করে। নিউজিল্যান্ড সংঘটিত দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল পশ্চিমাজাতির উগ্র জাতিয়তাবাদ থেকে ঘটনাটির সংগঠক ঔদ্ধত্যের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন তাতে শুধু মাত্র পশ্চিমাদের উগ্র জাতীয়তবাদের উল্লেখ ছিল। যুক্তি তর্কে পেরে না উঠলে পৃথিবীর সব জায়গায় পেশি শক্তির আবির্ভাব হয়। ব্রেন্টল ট্যারান্টদের মনে বড় একটা শঙ্কা কাজ করে থাকে বিধর্মী ও বিদেশিরা এসে হয়ত বা তাদের দেশকে গ্রাস করে ফেলবে। বিধর্মীদের (এ ক্ষেত্রে মুসলমান) সংস্কৃতির প্রভাব ও প্রসার দেখে তারা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। উদিয়মান কোনো সভ্যাতাকে পৃথিবীতে জোর করে দমিয়ে রাখা যায় না। ইতিহাস সেই সাক্ষ্যই দেয়। আমেরিকায় কত না দেশ থেকে প্রবাসীরা গিয়ে সেই দেশে উন্নয়ন ঘটিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে, প্রবাসীদের সংখ্যা বেড়েছে। তাই বলে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর করে তাদের দমিয়ে দিতে পারেন না। তিনিও তাহলে ethnic cleansing এর দায়ে পড়বেন। সাদা চামড়ার খ্রীষ্টানদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা একবিংশ শতাব্দিতে এসে কখনই সফল হবে না। ইতিহাস কখনই মিথ্যা বলে না। কিন্তু ট্র্যাম্প সাহেবেরা সেই বিষয়টি নিয়ে খেলায় মেতেছেন।
ঠিক একইভাবে ইসলামিক দেশগুলো ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে যদি চেষ্টা করে তাহলে তাদের কি দোষ দেওয়া যায়? যদি সত্যিই দোষ দেওয়া যায় তাহলে ট্রাম্প সাহেবেরা একই দোষে দোষি হবেন না কেন? আমেরিকা সব দিক দিয়ে এগিয়ে থাকতে পারে। তাই বলে সত্যটাকে এভাবে বাদ দেওয়া যায় না। কথা বলে ‘দ্বার বন্ধ করে দিয়ে ভ্রমটারে রুখি। সত্য বলে, আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি?।’
এমন একদিন ছিল যখন রাজ শক্তিরাই কেবল অস্ত্র তৈরিতে সক্ষমতা রাখত। ক্রমশ সেই শক্তি এখন সব সাধারণের কাছে এসেছে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হলে রাজারাই ঠিক করতেন তাদের তৈরি বোমা তারা ফাটাবেন কিনা। আমেরিকা জাপানের ওপর সেই বোমা ফাটিয়ে এক অনৈতিক উদাহরণ রেখেছিল। এটাকে সম্বল করে আমরা যদি একইভাবে তা প্রয়োগ করেত শুরু করি তাহলে বিশ্ব থেকে জাতীয় উগ্রবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ রুক্ষবে কারা? হতাশাগ্রস্ততরা চারদিক থেকে আমাদের গ্রাস করে চলছে। এ দুর্দশা গ্রস্ততা থেকে আমারা কীভাবে নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারব। আমার ব্যক্তিগত মতে কাজটা করা অনেক কঠিন ও কখনই তড়িৎ করা সম্ভব না। দুজন রাজনীতিবিদ এ বিষয়ে খুব সুন্দর কথা বলেছেন। যা আমাদের প্রণিধান করা উচিত। প্রথম জন নিউজিল্যন্ডের প্রধানমন্ত্রীÑতিনি হিজাব পরে, যে মসজিদে সেই দুর্ঘটনা সংগঠিত হয় সেই মসজিদে গিয়ে তার দুঃখবোধ জানিয়ে এসেছিলেন। কোনো চিঠি বা দূতের মাধ্যমে নয়। তিনি বলেছিলেন এটা শুধু মুসলিমদের নয়। যারা মরেছেন তারা আমার দেশের নাগরিক এবং তারা সকলেই মানুষ। মৃতদের ধর্মীয় পরিচয় তিনি বড় করে দেখাননি। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীও ঠিক একই ভাবে জুম্মার নামাজের পর পর ইমামদের ধর্মীয় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে উপদেশ দিতে বলে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
বর্তমানে আমরা সবাই মুক্তবাজার অর্থনীতির যুগে বাস করছি। এই যুগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি। বাজার অর্থে এই উন্মুুক্ত প্রতিযোগিতা। কোনো অবগুণ্ঠন দিয়ে নয় বরং উন্মুক্তভাবে দ্রব্যের গুণাবলী প্রর্দশনের মাধ্যমে আমরা সার্থকভাবে দ্রব্য বাজারজাত করতে পারবো। বাস্তবতার নিরিখে শুধুমাত্র দ্রব্যের ক্ষেত্রেই বিষয়টি সত্য তা নয়, বরং বিশ্বাস ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সমানভাবে প্রযোজ্য। এই মূল্যবোধ সৃষ্টির জন্যে আমাদেরকে ‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শিখাও’ ব্রত পালন করতে হবে। কাজটি সহজ নয় যেমন ঠিক তেমনি কাজটি না করলে পৃথিবীতে সঠিক মূল্যবোধের সৃষ্টি হবে না। শুধু কথায় কি চিড়ে ভিজে? কিন্তু এখন কথায় ও কাজে মিল না থাকলে কোনো কিছুই এগুবে না। ধর্মীয় জঙ্গিরা যদি মনে করে থাকেনÑ‘লারকে লেঙ্গে পাকিস্তান’ শ্লোগান দিয়ে তারা যুদ্ধ জয় করে ফেলবেন। তাহলে তারা ভুুল করবে। পাকিস্তানরে বর্তমান হাল সে বিষয়েই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
আমাদের মানব জীবনে প্রধান লক্ষ্য কী? বিদগ্ধ সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরি এক প্রবন্ধে বলেছেনÑ যুবকদের মনে হত যে বিয়ে সাদি করে সংসারী হওয়াটাই জীবনের প্রধান লক্ষ্য। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, নিজ নামকে বহু গুণে প্রকাশ করাই হচ্ছে জীবনের লক্ষ্য। শ্রীলঙ্কায় এতগুলো প্রাণ ঝরিয়ে যদি কেউ মনে করে থাকে ধর্মীয় জঙ্গিবাদি নিউজিল্যান্ডের উগ্রবাদের জবাব দেওয়া হয়ে গেল তাহলে তা হবে নিকৃষ্ট ও হীন মানসিকতার প্রমাণ। এ সকল ঘটনা কেবল ঘৃণার সৃষ্টি করে। ঘৃণা দিয়ে কখনই ঘৃণাকে উপশম করা যায় না। ক্ষমা ও ভালোবাসা দিয়ে একমাত্র জয় লাভ করা সম্ভব। ২১ এপ্রিল ইস্টার সানডেতে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছিল। ইস্টার সানডে হচ্ছে, সেই দিন যে দিনে যিশু কবর থেকে উঠেছিলেন সব কিছু জয় করে। প্রথম ইস্টারের তিন দিন পূর্বে অর্থাৎ শুক্রবার তিনি যখন ক্রুশে লম্বমান অবস্থায় যারা তাকে ক্রুশে দিয়েছিলেন তাদের জন্য তিনি মহান ক্ষমার বাণী উচ্চারণ করেছিলেন। ‘পিত : তুমি ইহাদিগকে ক্ষমা কর, কারণ ইহারা কি করতেছে এরা নিজেরাই তা জানে না।’ ক্ষমার চাওয়ার আগেই আমাদের বিরুদ্ধচারীদের ক্ষমা করে দেওয়া উচিত। ক্ষমাই মহত্বের লক্ষণ। সেই মহত্ব দিয়ে আমাদেরকে পৃথিবী জয় লাভ করতে হবে। ক্ষমার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে নিজেকে বঞ্চিত করা। কেবলমাত্র অর্থবহ ক্ষমাই সকল জাতির মধ্যে প্রকৃত মৃল্যবোধের সৃষ্টি করবে। সেটাই হবে প্রকৃত জয় মানুষ মেরে নয়।
আমরা যেন না ভাবি শ্রীলঙ্কায় খ্রীষ্টানেরা ও নিউজিল্যান্ডে মুসলমানেরা মারা গিয়েছে। এই ধারণা আমাদের সংকীর্ণতার দিকে নিয়ে যাবে। সাম্প্রতিককালে শ্রীলঙ্কার সরকার ১১ জন আত্মঘাতীর পরিচয় দিয়েছেন। যব্বুর শরীফে দায়ুদ বলেছেন, ‘সৃষ্টিকতাই একমাত্র প্রতিশোধ নিতে পারেন, আামরা নই’। যারা মারা গেছেন, তাদের প্রথম পরিচয় তারা মানুষ, পরবর্তীতে তারা মানবতার ধর্ম পালনকারী মানুষ।
সংকটা থেকে যাবেই, ইসলামিক রাষ্ট্র বলেছে, প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য শ্রীলঙ্কার পর তারা নাকি বাংলাদেশে আসবে। শ্রীলঙ্কার হানাহানির পর ১০ বছর পর শান্তি এসেছিল। তারা নিজদের সক্ষম করে তুলেছিল। একইভাবে রাজনীতিতে অনেক অস্থিরতার পর অনেকেই মনে করেন বাংলাদেশ শীঘ্রই নিজেদের উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যেতে পারবেন। ঠিক সে সময় ইসলামিক দেশ থেকে ঘোষণাটি এলÑ‘আমরা বাংলাদেশে আসছি’। ঘোষণাটি আমাদের শঙ্কিত করে তুলছে। আমাদের ধর্মীয় মূল্যাবোধ আমাদের কীভাবে সংকীর্ণতার উর্ধ্বে ওঠে আমাদের প্রকৃত মৃল্যাবোধ সৃষ্টি করতে সক্ষম করবে? আমাদের কীভাবে সাহস যোগাবে সেটা দেখার অপেক্ষায় রইলাম। মন যেন না ভাবে সংকটটি তো রয়েই গেল। বরং এটা যে তিরহিত হচ্ছে দিন দিন সেটা দেখার জন্য অধির হয়ে রইলাম। কে জানে পরবর্তীতে কোনো একটি দুর্ঘটনায় আমিও মারা যেতে পারি। তবু মারা যাওয়ার আগে শঙ্কার বিষয়টি জানিয়ে রাখলাম, আর কি!
ড. এলগিন সাহা : লেখক ও এনজিও ব্যক্তিত্ব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here