জাগ্রত হোক মানবতা

0
16

নাহিদ বাবু

আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে সবকিছু দ্রুত গতিতে চলছে। বিজ্ঞানের কল্যাণে পৃথিবী চলে এসেছে হাতের মুঠোয়। কিন্তু দিনে দিনে অবক্ষয় হচ্ছে মানুষের বিবেকের, ভালোবাসা, মানবতা অবনতি হচ্ছে, হিংস্র হয়ে উঠছে মানুষ। আমরা নিশ্চয় অবগত আছি ২য় বিশ^যুদ্ধে কীভাবে হিরোশিমায় বোমা ফেলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে মেরেছে। ইতিমধ্যেই দুইটি বিশ্বযুদ্ধে সংগঠিত হয়েছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধেরে ঘণ্টা বাজছে-যে হারে পারমাণবিক অস্ত্র মজুদ আছে, যুদ্ধ বাঁধলে এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মারা পড়বে।
মানুষ পশুর চেয়ে হিংস্র হয়ে উঠছে। যখন কোলাহল মুক্ত পরিবেশে, নীরবে মনের তৃপ্তির জন্য, একাকিত্ব সময় কাটানোর চেষ্টা করি তখন মনের অজান্তে চোখের সামনে ছবির মতো ভেসে উঠে সিরিয়া, ফিলিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, রাখাইনের বাস্তুচ্যুত সেই সব মানুষের প্রতিচ্ছবি। যারা নিজেদের ঘর-বাড়ি ছেড়ে শরণার্থী জীবনযাপন করছে! এক ফোটা পানির জন্য হাহাকার, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। জানতে ইচ্ছা করে আসলে, এই মানুষগুলোর অপরাধ কী? নাকি অন্য কারো শক্তি-ক্ষমতা প্রমাণের জন্য এরা বলী?
অবাক হয়ে যাই যখন দেখি, প্রার্থনারত মানুষের ওপর নিবিচারে হত্যাকা- চলানো হয়। শ্রীলঙ্কার প্রার্থনারত মানুষের কথা বলছি। বলছি নিউজিল্যান্ডের ক্রায়াইস্টচার্চে নামাজরত মুসল্লীদের ওপর ব্রেন্টন ট্যারান্টের নৃশংস হত্যাকা-। যারা ধর্মীয় উপাসনায় হামলা চালায় ও প্রার্থনারত মানুষকে হত্যা করে, তারা কোনো ধর্মের হতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কা ও নিউজিল্যান্ডে এমন ঘটনায় পুরো বিশ্ব অবাক! কোনো দেশ বা জাতি উগ্রবাদ বা সন্ত্রাসকে সমর্থন করে না। মুসলিম যাতে নিশ্চিন্তে নামাজ পড়তে পারে সে জন্য তাদের পিছনে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে মসজিদে ‘ফাস্ট লাইন অব ডিফেন্স’ হিসাবে। এমনটা শ্রীলঙ্কার মুসলিম ভাইয়েরাও করেছে কিছুটা দেরিতে হলেও। তাদের শোকে সহমর্মীতা ঘোষণা করে তাদের সান্ত¡না দেওয়ার জন্য পাশে হিজাব পরে দাঁড়িয়েছেন সে দেশের প্রধানমন্ত্রীসহ সাধারণ মানুষ। সংসদে ও চার্চে তাদের নামাজের জন্য ব্যবস্থা নিশ্চয়তা ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী। তাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দান, অবাধ সুযোগ-সুবিদা প্রদানের ঘোসণা দিয়ে জন্য নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এক অন্যান্য মানবতার পরিচয় দিয়েছেন।
রেন্টন ট্যারান্ট এবং আন্ডের্স ব্রেভিকের মতো সন্ত্রাসীদের অনুপ্রেরণা ও দৃষ্টিভঙ্গি আমরা জানি, কারণ তারা ‘ম্যানিফেস্টো’ লিখে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাস জানিয়েছে। তাদের বিশ্বাস হলো-ইউরোপ ও সাদাদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে, ধর্ম নিয়ে নয়। তারা নিজেদের বপড়-ভধংপরংঃ বলে (নাসিস্ট হিটলারের ধারা)।
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানসহ কিছু দেশে প্রায় সময় মসজিদে, গীর্জায়, খ্রীষ্টান প্রতিষ্ঠানে বোমা ও বন্দুকধারিদের হামলা হচ্ছে, খুব ভয় হয় যদি এমনটা আমাদের দেশে শুরু হয়। ইতিমধ্যে আইএস হুঙ্কার দিয়েছে। যেসব জিহাদী সন্ত্রাসী হামলা করে, তারা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা করে সন্ত্রাসবাদ করছে, যেমন হোলি আর্টিজান হামলায় অনেক প্রমাণ পাওয়া গেল যে তারা মনে করত (অন্ধভাবে) যে তারা দ্বীনের জন্য ও ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করে আল্লাহ জন্যই এসব করে বেহেশত পাবে। আমরা তাদের ব্যাখ্যা অস্বীকার করতে পারি, কিন্তু তাদের ধর্মীয় অনুপ্রেরণা অস্বীকার করা যাবে না।
আজকের এই সমাজে কিছু উগ্রবাদীর কারণে গোটা দেশ, সমাজ, জাতি আতঙ্কিত। কোনো ধর্মে উগ্রবাদের ঠাঁই নেই, ভাবতে কষ্ট হলেও প্রতিটি ধর্মে কিছু উগ্রবাদী রয়েছে, যারা ধর্মের নামে নিজের পশুত্ব জাহির করে।
বাইবেল উগ্রবাদিত্ব সমর্থন করে না। ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম, মুসলমানেরা নিজকে আল্লাহর কাছে সঁপে দেয়। কিন্তু কতিপয় লোক জিহাদের নামে মানুষ হত্যা করে অশান্তি সৃষ্টি করে, তারা ধর্মের নামে কীভাবে এগুলো করতে পারে, এক মুসলিম হয়ে অন্য মুসলিমকে কীভাবে আল্লাহ্ আকবর বলে হত্যা করে? এটা কি সুস্থ মানুষের পক্ষে করা সম্ভব? কুরআনে যে জিহাদের কথা উল্লেখ আছে তা হলোÑনিজের সঙ্গে, পাপের সঙ্গে জিহাদ করা। কাউকে হত্যা করতে বলেনি।
আজকের বৌদ্ধরা কি গৌতম বুদ্ধের সেই অহিংস বৌদ্ধ? বুদ্ধ ১০টি নীতি প্রচলন করেছিলেন, যা ত্রিপিটকে আমরা দেখতে পাই, যার প্রথম ৫টি সাধারণদের জন্য পরের পাঁচটি সন্ন্যসীদের জন্য অবশ্যই পালনীয়। অথচ বৌদ্ধ সন্ন্যারীরা এসব থেকে অনেকটাই বিচ্যুত। অন্তত মায়ানমারের রাখাইনে তাদরে কর্মকা- দেখলে সহজেই বোঝা যায়। আজ আমরা মায়ানমারে কী দেখি? কিছু রোহিঙ্গা অপরাধী হতে পারে, তার মানে এই নয় কোমলমতি শিশুরাও অপরাধী, কোন বিবেকের তাড়নায়, কেন তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিতে হবে, কেন তাদের বিতাড়িত করতে হবে, যদি তারা অপরাধী হন তাহলে তাদের বিচার হোক। আজকের রোহিঙ্গারা হতে পারে আগামী দিনের কোনো জঙ্গিগোষ্ঠি, যার জন্য দায়ী আমরা। একইভাবে দেখলে দেখা যাবে এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে বোকা হারাম, আইএস, তালেবান ইত্যাদি। আমরা আজ হিন্দুদের শান্ত দেখি আমাদের দেশে, কিন্তু ভারতে তাদের চিত্র ভিন্ন। তারা কতটা উগ্রবাদিত্বের পরিচয় হিচ্ছে বিভিন্ন পত্রিকার মাধ্যম আমরা জানতে পারি। তাদের মধ্যে কিছু দানব উগ্রবাদিত্ব রয়েছে। অথচ হিন্দু ধর্ম বলে জীবে দয়া কর।
বিভিন্ন ধর্মের আচরণ, নীতি, ভিন্ন হলেও মূল মন্ত্র কিন্তু এক, প্রত্যেকটি ধর্ম মানবতার কথা বলে, মানুষকে ভালোবাসতে বলে, মানবতার সেবায় নিজকে ব্রত করতে বলে। বিশ্বের বিভিন্ন ধর্ম এক একটি বাগানে প্রস্ফূটিত সুন্দর ফুল, একটি বিশাল গাছের শাখারাজির মতো। মানুষের মধ্যে ধর্ম আশ্রিত। ধর্মের ব্যাখ্যা মানুষ করেছে। মানুষ মানুষের জন্য, মানবতার সেবাই সবচেয়ে উত্তম ধর্ম। সব ধর্মই সম্প্রীতির কথা বলে। এ সম্প্রীতি বজায় রাখলেই বিশ্ব শান্তিময় হবে। মানুষে-মানুষে বন্ধুত্ব ও প্রীতি বাড়বে। একে-অপরের প্রতি শ্রদ্ধা বাড়বে। সমাজ শান্ত হবে, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামবে। ভালোবাসা দিয়ে থামাতে হবে হানাহানি। আমরা এক হব, ভালো থাকব, সুখে থাকব।
নাহিদ বাবু : তরুণ লেখক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here